সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্রের ইউনিয়ন (ইংরেজি: Union of Soviet Socialist Republics বা USSR) নামে একটি আন্তঃমহাদেশীয় দেশ। রাষ্ট্রটি ১৯২২ সাল থেকে ১৯৯১ সালে বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত ইউরেশিয়ার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। এর অস্তিত্বের সময়, এটি আয়তনের দিক থেকে দুনিয়ার বৃহত্তম দেশ ছিল, এগারোটি সময় অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং বারোটি দেশের সাথে সীমানা ভাগ করে নিয়েছিল এবং তৃতীয় সর্বাধিক জনবহুল দেশ ছিল। একটি বৈচিত্র্যময় বহুজাতিক রাষ্ট্র, এটি জাতীয় প্রজাতন্ত্রগুলির একটি ফেডারেল ইউনিয়ন হিসাবে সংগঠিত হয়েছিল, যার মধ্যে বৃহত্তম এবং সর্বাধিক জনবহুল ছিল রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক (ইংরেজি: Russian Soviet Federative Socialist Republic বা Russian SFSR)। বাস্তবে, এর সরকার এবং অর্থনীতি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিএসইউ) দ্বারা শাসিত একদলীয় রাষ্ট্র হিসাবে এটি ছিল প্রধান কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। এর রাজধানী এবং বৃহত্তম শহর ছিল মস্কো।
সোভিয়েত ইউনিয়নের শিকড় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবে নিহিত ছিল। ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে নতুন সরকার রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, যা বিশ্বের প্রথম সাংবিধানিকভাবে সাম্যবাদ অভিমুখী রাষ্ট্র। রাশিয়ান লোকতন্ত্রের সকলেই এই বিপ্লবকে গ্রহণ করেনি, যার ফলে রাশিয়ান গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। ১৯২২ সালে রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্র এবং এর অধীনস্থ লোকতন্ত্রগুলিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে একীভূত করা হয়। ১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর, জোসেফ স্তালিন ক্ষমতায় আসেন, দ্রুত শিল্পায়ন এবং যৌথীকরণের সূচনা করেন যা উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে।
১৯৩০-এর দশকের দিকে, স্তালিনের আমলে মহান শুদ্ধিকরণ (ইংরেজি: The Great Purge) চালু হয়, যার ফলে দেশে সমাজতন্ত্রের দিকে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। ইউরোপে নাৎসি-বিরোধী জোট গড়ে তুলতে ব্যর্থ হওয়ার পর, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানির সাথে একটি অ-আগ্রাসন চুক্তি স্বাক্ষর করে। তা সত্ত্বেও, ১৯৪১ সালে জার্মানি ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল আক্রমণে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে, যার ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব ফ্রন্ট খোলা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সোভিয়েতরা অক্ষশক্তিকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বেশিরভাগ অংশকে মুক্ত করে। তবে, তাদের আনুমানিক ২কোটি ৭০ লক্ষ লোকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, যা বিজয়ী মিত্রশক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ ছিল। যুদ্ধের পর, সোভিয়েত ইউনিয়ন লাল সেনাবাহিনীর দখলকৃত অঞ্চলকে একীভূত করে, প্রভাবাধীন রাষ্ট্র গঠন করে এবং দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করে যা একটি পরাশক্তি হিসেবে তাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা স্নায়ু যুদ্ধের দিকে পরিচালিত করে। ১৯৪৯ সালে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা ব্লক ন্যাটোতে একত্রিত হয়, যার ফলে ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের নিজস্ব সামরিক জোট, ওয়ারশ চুক্তি গঠন করে। উভয় পক্ষই সরাসরি সামরিক সংঘাতে লিপ্ত হয় না, বরং আদর্শিক ভিত্তিতে এবং প্রক্সি যুদ্ধের মাধ্যমে লড়াই করে।
১৯৫৩ সালে স্তালিনের মৃত্যুর পর, সোভিয়েত ইউনিয়ন নিকিতা ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে নিস্তালিনীকরণ অভিযান শুরু করে, যার ফলে স্তালিনবাদী নীতিগুলি অপসারণ এবং প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। এই অভিযান মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বাধীন গণচীনের সাথে আদর্শিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে, যার পরিণতি হয় তীব্র চীন-সোভিয়েত বিভক্তিতে।
১৯৫০-এর দশকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ অনুসন্ধানে তার প্রচেষ্টা প্রসারিত করে এবং প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ, প্রথম মানব মহাকাশযান, প্রথম মহাকাশ স্টেশন এবং অন্য গ্রহে অবতরণের জন্য প্রথম পরীক্ষণের মাধ্যমে মহাকাশ দৌড়ে নেতৃত্ব দেয়। ১৯৮৫ সালে, শেষ সোভিয়েত প্রতিবিপ্লবী নেতা মিখাইল গর্বাচেভ, তার গ্লাসনস্ত এবং পেরেস্ত্রোইকা নীতির মাধ্যমে দেশটির সংস্কারের চেষ্টা করেছিল। ১৯৮৯ সালে, ওয়ারশ চুক্তির বিভিন্ন দেশ তাদের সোভিয়েত-সমর্থিত শাসনব্যবস্থা উৎখাত করে, যার ফলে পূর্ব ব্লকের পতন ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে জাতীয়তাবাদী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের একটি বড় ঢেউ শুরু হয়, বিশেষ করে আজারবাইজান, জর্জিয়া এবং বাল্টিক রাজ্যগুলিতে। ১৯৯১ সালের আগস্টে, দেশটিকে একটি নতুন ফেডারেশন হিসেবে সংরক্ষণের প্রচেষ্টার মধ্যে কট্টর কমিউনিস্টগণ গর্বাচেভের বিরুদ্ধে একটি ক্যু প্রচেষ্টা চালায়; এই ফলশ্রুতিতে ইউনিয়নের বৃহত্তম প্রজাতন্ত্র — ইউক্রেন, রাশিয়া এবং বেলারুশ — কে বিচ্ছিন্ন করতে প্ররোচিত করে।
২৬ ডিসেম্বর, গর্বাচেভ আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তিকে স্বীকৃতি দেয়। রাশিয়ান সোভিয়েত ফেডারেটিভ সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্রের (Russian SFSR) তৎকালীন প্রতিবিপ্লবী নেতা বরিস ইয়েলৎসিন রুশ ফেডারেশনে এর পুনর্গঠনের তত্ত্বাবধান করেন, যা সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরী রাষ্ট্রে পরিণত হয়; অন্যান্য সমস্ত প্রজাতন্ত্র সোভিয়েত-পরবর্তী সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। সোভিয়েত পতনের পর স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির কমনওয়েলথ গঠিত হয়েছিল, যদিও বাল্টিকরা কখনও যোগ দেয়নি।
তার অস্তিত্বের সময়, সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল সবচেয়ে উন্নত শিল্প রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একটি, যা অনেক উল্লেখযোগ্য সামাজিক ও প্রযুক্তিগত সাফল্য এবং উদ্ভাবনী তৈরি করেছিল। এটি ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এবং এটার বৃহত্তম স্থায়ী সামরিক বাহিনী ছিল। একটি পারমাণবিক রাষ্ট্র হিসেবে, এটি বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার ধারণ করেছিল। একটি মিত্রশক্তির জাতি হিসেবে, এটি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যের মধ্যে একটি ছিল। বিলুপ্তির আগে, সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপ এবং এশিয়ায় তার একাধিপত্য, বৈশ্বিক কূটনীতি, আদর্শিক প্রভাব (বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ), সামরিক জোর, অর্থনৈতিক শক্তি এবং বৈজ্ঞানিক সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বের দুটি পরাশক্তির মধ্যে একটি ছিল।
আরো পড়ুন
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টির ভূমিকা
- সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর — পল রবসন
- সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে পরিচিত ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক লোকতন্ত্রের ইউনিয়ন
- আলোকায়নের বা আলোকিত যুগ ছিল ইউরোপ এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার একটি সময়কাল
- ফেবিয়ানবাদ বা ফেবিয়ান সমিতি হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী সমিতি
- চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ
- ইউরোকমিউনিজম ইউরোপের এক সংশোধনবাদী রাজনৈতিক ধারা
- ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তায় রেনেসাঁ বা নবজাগরণ বা পুনর্জাগরণ আন্দোলনের প্রভাব
তথ্যসূত্র
১. ইংরেজি উইকিপিডিয়া।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।