সাইপ্রাসে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন: ব্রিটিশ ও মার্কিন ঘাঁটি এবং ভূ-রাজনীতি

সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ায় গত ৮ মার্চ এক অভূতপূর্ব সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণজোয়ারের সাক্ষী হয়। রবিবার সকালে গ্রিক দূতাবাসের সামনে আয়োজিত এই বিশাল সমাবেশটি কেবল একটি বিক্ষোভ ছিল না, বরং তা ছিল দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বিদেশি সামরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। ‘কমিউনিস্ট ইনিশিয়েটিভ অফ সাইপ্রাস’-এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচিটি পরবর্তীকালে একটি বিশাল জনসমুদ্রে রূপ নেয় এবং মার্কিন দূতাবাসের সামনে গিয়ে শেষ হয়। বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং আপসহীন—সাইপ্রাসের ভূখণ্ড থেকে অবিলম্বে সকল বিদেশি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করতে হবে এবং বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করে দেশের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। একইসাথে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে যে কোনো ধরনের সামরিক সহযোগিতা বন্ধের জোরালো দাবি জানান, যা বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

রাজনৈতিক সংহতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট

নিকোসিয়ার এই বিশাল গণ-সমাবেশে কেবল স্থানীয় জনতা নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বামপন্থী আদর্শের সংহতিও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। এই বিক্ষোভে বিশেষভাবে সংহতি প্রকাশ করেছিল সাইপ্রাসের কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রীস (KKE)-এর সেক্টরাল অর্গানাইজেশন। দলটির পক্ষ থেকে আগে থেকেই এই প্রতিবাদী কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছিল, যা আন্দোলনের জনভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সমাবেশে মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে KKE-এর সাইপ্রাস শাখার সেক্রেটারি পেট্রোস মার্কোমিচালিস নব্য-সাম্রাজ্যবাদের নগ্ন হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটি এবং গ্রীসের ভূখণ্ডে স্থাপিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানান। মার্কোমিচালিস তাঁর বক্তব্যে একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক সত্যকে সামনে নিয়ে আসেন; তিনি সতর্ক করে বলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে এই সামরিক স্থাপনাগুলো কেবল আগ্রাসনের হাতিয়ার নয়, বরং সাইপ্রাস ও গ্রীসের জনগণের জন্য নিরাপত্তার এক ভয়াবহ হুমকি। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে এই ঘাঁটিগুলো পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ব্যবহৃত হওয়ার ফলে এগুলো যেকোনো সময় পাল্টা বা প্রতিশোধমূলক হামলার প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ফলে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সামরিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সাইপ্রাস ও এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন এক চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সাইপ্রাসের কৌশলগত সংকট

পেট্রোস মার্কোমিচালিস তাঁর ভাষণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক সতর্কবার্তা প্রদান করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, সাইপ্রাস বর্তমানে কেবল একটি ভৌগোলিক দ্বীপ নয়, বরং বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের দাবার গুটিতে একটি সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তিনি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন যে, সাইপ্রাসের ভূখণ্ডে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটিগুলো বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে পরিচালিত বিভিন্ন সামরিক অভিযানে অত্যন্ত সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই দ্বীপটি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর (NATO) দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ভূ-রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। মার্কোমিচালিসের মতে, এই সামরিক তৎপরতাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এগুলো বিশ্বব্যাপী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য নিরঙ্কুশ করার এক বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। তিনি আরও বিশ্লেষণ করেন যে, পেন্টাগনের এই যুদ্ধংদেহী পরিকল্পনার অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো এশিয়াসহ বিশ্বজুড়ে তাদের প্রধান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সামরিকভাবে সুরক্ষিত ও শক্তিশালী করা। ফলে, বৃহৎ শক্তিগুলোর এই আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে সাইপ্রাসকে একটি ‘লজিস্টিক হাব’ বা সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা এই শান্ত অঞ্চলটিকে একটি ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সাম্রাজ্যবাদী সংঘাতের সম্মুখভাগে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি সাইপ্রাসের সাধারণ মানুষের সার্বভৌমত্বকে চরম সংকটের মুখে ফেলেছে, যেখানে তাঁদের ভূখণ্ডকে তাঁদের অজান্তেই বিশ্বযুদ্ধের মহড়ায় পরিণত করা হচ্ছে।

বুর্জোয়া স্বার্থ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা

পেট্রোস মার্কোমিচালিস তাঁর বক্তৃতায় সাইপ্রাসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের একটি গভীর শ্রেণিবৈষম্যমূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে যুক্তি প্রদান করেন যে, সাইপ্রাসের শাসক বুর্জোয়া বা ধনিক শ্রেণি নিজেদের সংকীর্ণ ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুনাফা নিশ্চিত করতেই এই সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাগুলোতে অত্যন্ত সুকৌশলে ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে। তাদের এই সহযোগিতার মূল চালিকাশক্তি হলো আঞ্চলিক লুণ্ঠনের একটি লভ্যাংশ নিশ্চিত করা এবং বিশ্ব-পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করা। মার্কোমিচালিসের মতে, জাতীয় স্বার্থের দোহাই দেওয়া হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এটি হলো শাসক শ্রেণির অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।

একই তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে তিনি গ্রীক সরকারের দ্বিমুখী ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে সাইপ্রাসের জলসীমায় গ্রীসের দুটি ফ্রিগেট এবং আকাশে চারটি অত্যাধুনিক এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে, যা আদতে সাধারণ মানুষের স্বার্থে নয় বরং শাসক শ্রেণির আধিপত্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। যদিও সরকারি ভাষ্যমতে একে সাইপ্রাসবাসীর নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষাকবচ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে, মার্কোমিচালিস একে ‘আদর্শিক প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, এই বিশাল সামরিক আয়োজন ও ব্যয়ভার সাধারণ জনগণের জানমাল রক্ষার চেয়ে গ্রীক ও সাইপ্রাসীয় শাসকগোষ্ঠীর আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই নিরঙ্কুশ প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে, জাতীয় নিরাপত্তার আড়ালে মূলত নব্য-সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে এই অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা এবং সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকি

পেট্রোস মার্কোমিচালিস সাইপ্রাস সরকারের চরম ব্যর্থতা ও দূরদর্শিতার অভাব তুলে ধরে এক তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন যে, সম্ভাব্য বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত বা প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে সাধারণ জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষার জন্য সরকারের কাছে দৃশ্যমান বা পর্যাপ্ত কোনো সুপরিকল্পিত প্রস্তুতি নেই। তিনি বিশেষ করে সাইপ্রাসের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি—পর্যটন খাতের হাজার হাজার শ্রমিক এবং বিমানবন্দরসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর কর্মস্থলে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভয়াবহ নিরাপত্তার অভাবের কথা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন।

মার্কোমিচালিস তাঁর সতর্কবার্তায় একটি রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে আনেন; তিনি বলেন যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সাইপ্রাস যখন বিজাতীয় সামরিক বাহিনীর ‘লজিস্টিক হাব’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন এই পর্যটন কেন্দ্র বা বিমানবন্দরগুলো যেকোনো মুহূর্তে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। অথচ সরকার এই সাধারণ মেহনতি মানুষ ও কর্মীদের সুরক্ষায় কোনো ধরনের কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়নি। তাঁর মতে, সরকার যখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যস্ত, তখন দেশের সাধারণ নাগরিক ও শ্রমিকদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই উদাসীনতা প্রমাণ করে যে, শাসক শ্রেণির কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণ মেলানোই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের আবহে সাইপ্রাসের বেসামরিক জনগণ এখন সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন এবং অরক্ষিত অবস্থায় দিনাতিপাত করছে।

শান্তি ও সমাজতন্ত্রের অচ্ছেদ্য বন্ধন

পেট্রোস মার্কোমিচালিস তাঁর বক্তৃতার এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের এক গভীর তাত্ত্বিক ও আদর্শিক ভিত্তি তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই সত্যের ওপর জোর দেন যে, পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং বর্তমান শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উৎখাতের সংগ্রাম মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ এবং একে অপরের অবিচ্ছেদ্য পরিপূরক। তাঁর মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজে পুঁজিবাদের অস্তিত্ব থাকবে, ততক্ষণ মুনাফার লালসা ও সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দাবানল জ্বালিয়ে রাখবে। তাই প্রকৃত শান্তির পথ কেবল আলোচনার টেবিলে নয়, বরং পুঁজিবাদী কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মধ্যেই নিহিত।

তিনি এমন এক প্রগতিশীল ও সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণের উদাত্ত আহ্বান জানান, যেখানে শ্রমজীবী মানুষ ও সাধারণ নাগরিকেরা তাঁদের নিজেদের শ্রম ও মেধা দিয়ে উৎপাদিত সম্পদের সুফল সরাসরি ভোগ করতে পারবে। মার্কোমিচালিস স্বপ্ন দেখেন এমন এক সাইপ্রাসের, যেখানে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং মানুষ কোনো ধরনের যুদ্ধ বা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের আতঙ্ক ছাড়াই প্রকৃত মানবিক মর্যাদায় ও শান্তিতে বসবাস করতে সক্ষম হবে। তাঁর এই সুদূরপ্রসারী ও মানবিক আদর্শিক অবস্থান থেকেই তিনি উপসংহারে এক বলিষ্ঠ ঘোষণা দেন। তিনি পুনরায় নিশ্চিত করেন যে, গ্রীসের কমিউনিস্ট পার্টি (KKE) কেবল ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হিসেবেই নয়, বরং সংগ্রামের রাজপথের সহযাত্রী হিসেবে সাইপ্রাসের কমিউনিস্টদের পাশে থাকবে। এই সম্মিলিত লক্ষ্য অর্জনে এবং নব্য-সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে সাইপ্রাসকে মুক্ত করতে KKE তাদের সমস্ত রাজনৈতিক শক্তি ও জনবল নিয়ে সর্বাত্মক লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এই ঘোষণা মূলত আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণির সেই চিরন্তন ঐক্যের বার্তাকেই পুনরুজ্জীবিত করে, যা সীমানা পেরিয়ে শোষণের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী দুর্গ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখায়।

মেহনতি মানুষের ঐক্য এবং শ্রমিক অধিকারের রক্ষাকবচ

পেট্রোস মার্কোমিচালিস তাঁর বক্তৃতার এক পর্যায়ে কমিউনিস্ট কর্মীদের প্রতি এক বলিষ্ঠ ও দিকনির্দেশনামূলক আহ্বান জানান। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে কমিউনিস্টদের সকল প্রতিকূলতা ও ভিন্নমত কাটিয়ে একটি ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মতে, কেবল একটি সুশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক নেতৃত্বই বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মুক্তি সংগ্রামের সঠিক দিশা দেখাতে পারে। তিনি অবিলম্বে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানান যেন কোনো অজুহাতে সাধারণ জনগণের জানমাল বিপন্ন না করা হয় এবং যুদ্ধকালীন বা অস্থির পরিস্থিতিতে নাগরিকদের সুরক্ষায় কার্যকর ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

একইসাথে, মার্কোমিচালিস এই লড়াইকে কেবল রাজপথের বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে শ্রমজীবীদের রুটি-রুজির আন্দোলনের সাথে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি দেশের শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর প্রতি সম্মিলিত ও সুসংগঠিত আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন যে, চলমান ভূ-রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সংকটের দোহাই দিয়ে কোনো মালিকপক্ষ যেন কোনো শ্রমিককে চাকরি থেকে ছাঁটাই করতে না পারে। এই উত্তাল সময়েও যেন প্রতিটি মেহনতি মানুষের ন্যায্য মজুরি সময়মতো পরিশোধ করা হয় এবং তাঁদের অর্জিত শ্রম অধিকারগুলো কোনোভাবেই খর্ব না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য তিনি রাষ্ট্র ও পুঁজিপতিদের সতর্ক করে দেন। মার্কোমিচালিসের এই অবস্থান প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের ভিত্তি মূলত শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

শ্রমিক অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা

পেট্রোস মার্কোমিচালিস তাঁর ভাষণে কেবল ভূ-রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের চরম সংকটের দিকেও আলোকপাত করেন। তিনি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা—বিশেষ করে খাদ্য, জ্বালানি এবং জীবনদায়ী ওষুধের লাগামহীন ও আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি মোকাবিলায় সরকারকে অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাঁর মতে, শাসকগোষ্ঠী যখন যুদ্ধের উন্মাদনায় মত্ত থাকে, তখন বাজার সিন্ডিকেট ও অসাধু পুঁজিপতিরা এই সুযোগে নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে এক অসহনীয় মানবেতর জীবনের দিকে ঠেলে দেয়। মার্কোমিচালিস স্পষ্ট করে বলেন যে, রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা ও জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করা, যা বর্তমান সরকার চরমভাবে অবহেলা করছে।

একই গুরুত্বের সাথে তিনি সাইপ্রাসের ভবিষ্যৎ কর্ণধার—শিক্ষার্থীদের সংকটের বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসেন। বর্তমান উত্তাল ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তরুণ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন যাতে কোনোভাবেই থমকে না যায়, সেদিকে তিনি রাষ্ট্রের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, যুদ্ধের আবহে বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় কোনো শিক্ষার্থীর একটি শিক্ষাবর্ষও যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। শিক্ষার অধিকারকে একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি দাবি করেন যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সংকটের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। মার্কোমিচালিসের এই দাবি মূলত একটি বৈপ্লবিক ও দূরদর্শী সমাজ কাঠামোরই প্রতিফলন, যেখানে মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারগুলো সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

নিকোসিয়ার এই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম কেবল একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি সাইপ্রাসের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির এক অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এই বিশাল সমাবেশকে সাইপ্রাসের সমাজতান্ত্রিক দল (Socialist Party of Cyprus) পূর্ণ এবং অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল। দলটির সাধারণ সম্পাদক মেহমেত বিরিঞ্চি ব্যক্তিগতভাবে সমাবেশে উপস্থিত হয়ে যে সংহতি প্রকাশ করেন, তা আন্দোলনের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। তাঁর এই সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের মুখে সাইপ্রাসের প্রগতিশীল শক্তিগুলো আজ আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ।

দ্বি-সাম্প্রদায়িক সংহতি ও চূড়ান্ত অঙ্গীকার

মেহমেত বিরিঞ্চির উপস্থিতি একটি গভীর তাৎপর্য বহন করে; কারণ এটি সাইপ্রাসের গ্রিক ও তুর্কি—উভয় সম্প্রদায়ের মেহনতি মানুষের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনার এক অভূতপূর্ব মিলনস্থল হিসেবে চিহ্নিত হয়। তিনি তাঁর বক্তব্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিভাজনমূলক নীতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং স্পষ্ট করে দেন যে, ব্রিটিশ ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কেবল যুদ্ধের কেন্দ্র নয়, বরং তা সাইপ্রাসের সার্বভৌমত্বের পথে প্রধান অন্তরায়। বিরিঞ্চির এই বলিষ্ঠ অবস্থান ও সংহতি বার্তা আন্দোলনকে কেবল শক্তিশালীই করেনি, বরং একে একটি সর্বজনীন ও আন্তর্জাতিক রূপ দান করেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে, যখন লড়াকু মেহনতি মানুষ তাদের অভিন্ন শত্রুকে চিনতে পারে, তখন কোনো ভৌগোলিক বা নৃতাত্ত্বিক বিভাজন তাদের ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। সাইপ্রাসের সমাজতান্ত্রিক দলের এই সমর্থন মূলত দ্বীপরাষ্ট্রটির স্বাধীনতা ও অখণ্ডতা রক্ষার লড়াইকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

বিক্ষোভ মিছিলটি যখন সাইপ্রাসের রাজপথ প্রদক্ষিণ করে মার্কিন দূতাবাসের সামনে গিয়ে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক উত্তাল ও আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সমাবেশের সমাপনী অধিবেশনে এক চূড়ান্ত ও তেজস্বী বক্তব্য রাখেন সাইপ্রাসের কমিউনিস্ট ইনিশিয়েটিভ-এর নির্বাহী সম্পাদক এইচ. কোর্টেলারিস। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, আজকের এই বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ হওয়া মানেই লড়াইয়ের সমাপ্তি নয়, বরং এটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এক দীর্ঘস্থায়ী মহাযুদ্ধের সূচনা মাত্র। কোর্টেলারিস তাঁর ভাষণে কর্মীদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন যে, তাঁদের এই সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের সংকল্প চিরকাল অটুট থাকবে।

তিনি এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার ব্যক্ত করে উচ্চারণ করেন, “আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে যতদিন না সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর শেষ চিহ্নটুকু মুছে যাচ্ছে এবং তাদের প্রতিটি সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদ করা হচ্ছে, ততদিন আমরা রাজপথ ছাড়ব না।” তিনি আরও কঠোর ও আপসহীন ভাষায় বিশ্ব সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকান, ইসরায়েলি কিংবা অন্য কোনো বিদেশি দখলদার শক্তি সাইপ্রাসের পবিত্র ভূমি ত্যাগ না করছে এবং যতক্ষণ না এদেশের সাধারণ মানুষ—কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি জনতা—তাদের নিজেদের দেশ ও সম্পদের প্রকৃত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাচ্ছে, ততক্ষণ এই বিরামহীন সংগ্রাম চলতেই থাকবে। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও শোষণমুক্ত সাইপ্রাস গড়ার যে স্বপ্ন ফুটে উঠেছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং তা ছিল শোষিত মানুষের এক অমোঘ রণধ্বনি।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ০৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে ইন ডিফেন্স অফ মার্কিসজম সাইটে প্রকাশিত খবর থেকে তথ্য নিয়ে লেখাটি প্রস্তুতকৃত এবং সেখান থেকে অনুপ সাদি কর্তৃক অনুবাদ করে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হয়েছে। লেখাটি পরবর্তীতে সংস্কার করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!