চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ

চীনের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ (ইংরেজি: China-Europe trade relations and cultural contacts) শুরু হয় ষোলো শতকের প্রথমার্ধে। ঐ শতকের প্রথমার্ধে পর্তুগিজ বণিকরা মেলাকা বা মালাক্কা অধিকার করে চীনের উত্তরপূর্বে চলে আসে এবং তারপর ষোলো শতকের মধ্যভাগে চীনা সম্রাট তাদের ম্যাকাও দ্বীপে বাণিজ্যের অনুমতি দেন। তখন থেকেই পুরোদমে চীন-ইউরোপ বাণিজ্য চলতে থাকে। তবে পণ্য আমদানি-রপ্তানি প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কেন্দ্র করেই চলতে থাকে। ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথও এই সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আঠারো শতকে ইংল্যান্ডে শিল্প-বিপ্লব হয়। তারপর শিল্প-বাণিজ্যের স্বার্থে ব্রিটিশ বণিকরাও এই বাণিজ্যে এগিয়ে আসে। শুরু হয় ভারত-চীন-ইউরোপ—ত্রিমুখী বাণিজ্য। বাণিজ্যের মুনাফার লোভেই ইংরেজরা চীনে জোর করে আফিমের বিক্রি বাড়াতে চায় আর চীনের চায়ের ব্যবসার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

ইউরোপের সঙ্গে চীনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সূচনাও হয় এই বাণিজ্যের পথ ধরেই। যদিও বিদেশিদের চীনারা অবিশ্বাসের চোখে দেখত, তবুও একদিকে মিশনারিদের চেষ্টা আর অন্যদিকে কিছু চীনা পণ্ডিতের ইউরোপীয় জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ—এই দুইয়ে মিলে চীনের পশ্চিমমুখী দরজা ক্রমশ খুলে যায়। শুরু হয় ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই-এর চীনা ভাষায় অনুবাদ। আফিম যুদ্ধ আর তাইপিং বিদ্রোহের পর ইউরোপীওরাও চীনের সমাজ ও অর্থনীতির উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে চীনে পশ্চিমী প্রযুক্তির আমদানি করতে থাকে। চীনের ঐতিহ্যবাদী গোষ্ঠীর বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে একদল চীনা পশ্চিমীকরণ-বাদী ইউরোপীয় জ্ঞান-প্রযুক্তিকে স্বাগত জানান। এরই ফলে ক্রমশ চীন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে।

চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক 

ইউরোপের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক

ইউরোপের সঙ্গে চীনের প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক সংযোগ পর্তুগিজদের মাধ্যমেই প্রথম আরম্ভ হয়। ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে চীনা সম্রাট পার্ল নদীর মোহনায় অবস্থিত ম্যাকাও (Macao) দ্বীপে ব্যবসা করার অনুমতি প্রদান করেন। পর্তুগিজদের মাধ্যমে গোয়া ও মেলাকা (মালাক্কা) থেকে চন্দন, হস্তিদন্ত, আবলুস কাঠ ও দক্ষিণ আমেরিকার পেরু থেকে রূপা চীনে আমদানি হতে থাকে; চীন থেকে পর্তুগিজরা চীনা রেশম সুতা, সার্টিন, তামা, পারদ, কর্পূর ও চীনামাটির পাত্রাদি রপ্তানি করে। রপ্তানিযোগ্য বস্তুর কিছু অংশ ইউরোপ ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও যেত কিন্তু অধিকাংশ ভাগ নাগাসাকিতে রূপা ও তামার সঙ্গে বিনিময় করে আবার চীন ও ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে ফিরে আসত। ফিলিপিনের বাজারে যেত চীনের সুতি কাপড় এবং স্পেনীয় জাহাজে রেশম সুতা ও পোর্সেলিন পাত্রাদির সঙ্গে মশলা ও গোলমরিচ লাতিন আমেরিকা, স্পেন ও মেক্সিকো নিয়ে যাওয়া হতো।

আরো পড়ুন:  কুয়োমিনতাং ছিল সাম্রাজ্যবাদ চালিত চীনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল

১৫১১ সালে পর্তুগিজরা মেলাকা অধিকার করে। ১৫২০ সালে তারা চীনের দক্ষিণ-পূর্ব তটে আসে। কিন্তু এই অদৃষ্টপূর্ব সামুদ্রিক বিদেশিদের প্রতি সন্দিহান চীনা শাসকরা চীনে বাণিজ্য প্রতিবন্ধিত করলেন। কিন্তু বিদেশি রূপার প্রয়োজন ও লাভজনক বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রলোভন সম্রাটকে বাধ্য করল বৈদেশিক বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে। ১৫৬৭ সাল থেকে চীনা নাগরিকদেরও এই বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হলো। চীনের বাণিজ্যিক পোত দক্ষিণ চীন সাগরে আবার দৃষ্টিগোচর হলো।

১৬শ শতাব্দীতে এই অঞ্চলের বাণিজ্য পর্তুগিজ ও স্পেনীয়দের কুক্ষিগত ছিল। শিল্প-বিপ্লবের পর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের একীকরণের পর এবং ব্রিটিশ-শক্তির ভারতে পাকাপাকিভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাণিজ্যপোত দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করে চীনের দিকে হস্ত প্রসারিত করল। চীনের তটবর্তী প্রদেশ চিয়াংসু (Jiangsu) ও চিচিয়াং (Zhijiang)-এর বণিকরা প্রভূত পরিমাণ রেশম সুতা ও সুতির কাপড়, পারদ, কাঁচা তামা ও ঔষধি জাতীয় লতা-পাতা ক্যান্টনে (অধুনা কোয়ং চোউ) নিয়ে গিয়ে ইউরোপীয়দের কাছে বিক্রি করত। 

ত্রিমুখী বাণিজ্য

অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ইউরোপে চীনা পণ্যদ্রব্যের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে চীন সাম্রাজ্য তখন ভারত মহাসাগরীয় সামুদ্রিক বাণিজ্যের মুখ্য কেন্দ্র। ঢাকা এবং কোলকাতা এই চীনমুখী বাণিজ্যের প্রধান বন্দর ছিল। ভারতের দেশী বণিক সম্প্রদায় ও মূলধন বিনিয়োগকারীদের সহযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতীয় কাপড় ও আফিম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিক্রি করে রূপা ও গোলমরিচ আহরণ করত, যা দিয়ে চীনে কেনা চা ও তুলার মূল্য শোধ করা হতো। এই বাংলা-চীন বাণিজ্যের ওপর ব্রিটিশরাই প্রভুত্ব করতেন, যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বণিকদের প্রাধান্য দেখা গেছে। 

দক্ষিণ চীন সমুদ্র অঞ্চলে চীন ও থাই দেশের বণিকরা চাল রপ্তানির ক্ষেত্রে যে প্রভুত্ব বিস্তার করেছিল, ইউরোপীয়রা আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও সেই স্থান অধিকার করতে পারেনি। তাছাড়া চীনা শিল্পপতি ও জাহাজ মালিকরা ওলন্দাজ ক্ষেত্রের সঙ্গে দ্বীপময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যের উপর বরাবর আধিপত্য করেছে। কিন্তু ব্রিটিশের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার বোনা কাপড় ও আফিমের বাণিজ্যে অধিকার কায়েম করে চীনের চায়ের ব্যবসার উপর প্রভুত্ব বিস্তার করা; তাঁদের এই প্রয়াস ফলপ্রসূ হয়েছিল।

আরো পড়ুন:  চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে

ইউরোপের সঙ্গে চীনের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ

ষোলো শতক থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত চীন ও ইউরোপীয় দেশের সঙ্গে যে সম্পর্ক হয়েছিল তার পুরোধা যারা ছিলেন তাদের মধ্যে ইতালির ম্যাটিও রিক্কি (Matteo Ricci) এক প্রধান ব্যক্তিত্ব। রিক্কি ও অন্যান্য ধর্মযাজক চীনে ধর্মপ্রচারে লিপ্ত না হয়ে পাশ্চাত্য জ্ঞানভাণ্ডার উন্মুক্ত করতে উৎসুক ছিলেন। প্রথম দুই শতাব্দীতে ৩৭০টি ইউরোপীয় গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনূদিত হয়েছিল, এই গ্রন্থসমূহে ১২০ বা তার অধিক সংখ্যক ছিল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যা সম্বন্ধীয়। কিন্তু স্বকীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে গৌরব বোধসম্পন্ন চীনা বুদ্ধিজীবী এবং উচ্চ শ্রেণির ব্যক্তিরা বহিরাগত জ্ঞান সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিলেন। বিদেশিদের অভিপ্রায় নিয়ে চীনে সর্বদাই অবিশ্বাসের আবহাওয়া ছিল। আফিমের অনীতিকর বেচাকেনা চীনা শাসকদের ও জনতার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। বিদেশিদের উপর প্রতিবন্ধ (ban) চালু হলো। 

আফিম যুদ্ধ ও তাইপিং থিয়েনকুও (মহাসমতা-স্বর্গীয় রাজ্য) যুদ্ধের পর ১৮৬০-এর দশক থেকে ইউরোপীয়রা চীনে বিভিন্ন প্রকারের কারখানা খুলতে লাগলেন এবং ক্রমাগত অর্থ-বিনিয়োগ করে চীনের অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার আরম্ভ করলেন। এদিকে চীনেও এক প্রভাবশালী “পশ্চিমীকরণ গোষ্ঠী”র (ইংরেজি: Self-Strengthening Movement, অন্য নাম Westernization) উদ্ভব হলো। তাঁরা চীনকে সর্বপ্রকারে শক্তিশালী করার জন্য পশ্চিমের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার প্রসারের উপর জোর দিলেন। তাঁরা চাইতেন যে, পশ্চিমের বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে চীনকে অর্থনৈতিক ও সামরিক দুই ক্ষেত্রেই শক্তিশালী করা হোক। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পাশ্চাত্য দেশগুলির সহায়তা নিতে হবে। সম্রাটের আজ্ঞানুসারে নিম্নলিখিত উপায় অবলম্বন করা হলো:

প্রথমত, চীনা সরকার বিদেশি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই অনুবাদ করার জন্য অনুবাদ প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এই প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা ও উদ্যোগী গোষ্ঠীর সাহায্যে পরিচালিত হতো।

দ্বিতীয়ত, পাশ্চাত্য দেশের মতো শক্তিশালী আর্থিকরূপে উন্নত হওয়ার জন্য মেশিন ও অন্যান্য যান্ত্রিক উপকরণ উৎপাদনের কারখানা স্থাপিত হতে থাকে। অস্ত্রশস্ত্র বিস্ফোরক পদার্থ-আদি সামরিক উপকরণের জন্য রাসায়নিক কারখানা নির্মিত হলো। বিদেশী উদ্যোগপতি ও কতিপয় চীনা ধনপতিরা ভারী উদ্যোগের যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। এবং এইরূপে ক্রমশ আধুনিক শিল্পের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হলো।

তৃতীয়ত, পশ্চিম ধাঁচের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হলো। ভাষা জ্ঞান আহরণের দ্বার, অর্থাৎ পেইচিং, সাংহাই, ক্যান্টন (কোয়ং চোউ) ইত্যাদি প্রধান শহরগুলিতে ইংরেজি, ফরাসি ও রুশি ভাষা শিক্ষার বিদ্যালয় স্থাপিত হলো। তাছাড়া বিদেশি অধ্যাপকদের আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষাদানের জন্য নিয়োগ করা হলো। চীনা শিক্ষার্থী ও অধ্যাপকদের ইউরোপ ও আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানো হলো।

আরো পড়ুন:  চীনা সমাজের শ্রেণি বিশ্লেষণ

চতুর্থত, এ ছাড়া বিদেশের বিভিন্ন দেশে চীনা দূত পাঠিয়ে সেই দেশগুলি সম্বন্ধে বিস্তারিত তথ্য আহরণ করার কাজ আরম্ভ হলো। বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর নিজের খরচায় বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে অনুশীলনে প্রবৃত্ত হলেন। ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আধিকারিক স্তরে দূত পাঠানো হয়েছিল। ১৮৭২ সালে প্রথম দল ইউরোপে এবং প্রায় একই সময়ে জাপানে পড়াশোনার জন্য যেতে শুরু করে। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত জাপানই চীনা বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রদের প্রধান শিক্ষা, অনুশীলন ও রাজনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বিদেশ থেকে এসে এই চীনা বিদ্বানদের দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের কাজে নিয়োগ করা হয়।

বিদেশি শিক্ষার মাধ্যমে পশ্চিমীকরণের সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খাং য়ু-ওয়েই ও লিয়াং ছি-ছাও। এই দুই বিদ্বান রাজনীতিক চীনকে আধুনিক জ্ঞানে প্রশিক্ষিত করে সর্বতোভাবে শক্তিশালী করার জন্য আন্দোলন করেন। ১৮৯৭ সালে স্বল্পকালের জন্য এ আন্দোলন ফলপ্রসু হয়েছিল, তারপর রক্ষণশীলদের চাপে এই আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়। এই প্রাচীনপন্থীরা পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ কনফুসিয়াসের প্রভাবে লালিত-পালিত চীনের পক্ষে অত্যন্ত হানিকারক বলে মনে করতেন। তাই তাঁদের ধ্যানধারণায় পশ্চিমের এই সাংস্কৃতিক হানা চীনের সভ্যতার বিরুদ্ধে এক চ্যালেঞ্জ এবং এর প্রভাব চীনের সমাজকে দূষিত করবে ও চীনেদের চারিত্রিক অধঃপতন ঘটাবে। এইসব দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়েই চীন বিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে। 

তথ্যসূত্র

১. হরপ্রসাদ রায়, “চীনের ইতিহাস”, নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা, ষষ্ঠ মুদ্রণ মে ২০১০, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৮।

Leave a Comment

error: Content is protected !!