নব্য ধ্রুপদী বা নিওক্লাসিকাল সাহিত্য ইউরোপীয় সাহিত্যে উদ্ভূত বিশেষ ধারার সাহিত্য

নব্য ধ্রুপদী সাহিত্য বা নয়া ধ্রুপদী সাহিত্য বা শেষ পুঁজিবাদী যুগের সাহিত্য (ইংরেজি: Neoclassical literature) হচ্ছে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত (১৬৬০-১৭৯৮) ইউরোপীয় এবং বিশেষভাবে ইংরেজি সাহিত্যে উদ্ভূত বিশেষ ধারার সাহিত্য। এই যুগের লেখকরা প্রাচীন গ্রীক এবং রোমান ধ্রুপদী সাহিত্যিকদের (যেমন—হোমার, ভার্জিল, হোরেস) আদর্শ, শৃঙ্খলা এবং শৈল্পিক নিয়মাবলীকে আধুনিক আঙ্গিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। রেনেসাঁ পরবর্তী যুগের অতি-আবেগ এবং অনিয়ন্ত্রিত কল্পনার বিপরীতে নিওক্লাসিক্যাল সাহিত্যিকরা যুক্তি (Reason)সুশৃঙ্খল কাঠামো (Order) এবং পরিমিতিবোধের (Restraint) ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল কেবল আনন্দ দেওয়া নয়, বরং মানুষকে নৈতিকভাবে শিক্ষিত করা এবং সমাজের ভুলগুলো ব্যঙ্গাত্মকভাবে (Satire) সংশোধন করা। এই যুগটি আলেকজান্ডার পোপ, জোনাথন সুইফট এবং স্যামুয়েল জনসনের মতো প্রথিতযশা লেখকদের হাত ধরে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি স্থাপন করেছিল।[১]

ষোড়শ শতকে ইতালিতে জে. সি. স্ক্যালিজার (J. C. Scaliger) এবং সমসাময়িক পণ্ডিতদের নিরলস গবেষণায় অ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব নতুন আঙ্গিকে পুনরাবিষ্কৃত হয়। স্ক্যালিজার তাঁর বিখ্যাত ‘পোয়েটিকা’ (১৫৬১) গ্রন্থে অ্যারিস্টটল বর্ণিত নাট্য-ঐক্যসূত্রগুলোকে (Three Unities) অত্যন্ত জোরালোভাবে ব্যাখ্যা ও প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যারিস্টটলের সেই কালজয়ী প্রতিপাদ্য—শিল্প বা সাহিত্য মূলত ‘অনুকৃতি’ বা ‘Imitation’—ফ্রান্সে শিল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে ঘোষিত হয়। এই অনুকৃতি-তত্ত্ব এবং ঐক্যসূত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় নব্য-ধ্রুপদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান পুরোধা বোয়ালো (Boileau) ছিলেন অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠ ও আপসহীন। তাঁর হাত ধরেই এই ধ্রুপদী নিয়মগুলো ইউরোপীয় সাহিত্যে এক অনড় ও আদর্শ কাঠামো হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

নব্য ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রেক্ষাপট ও স্বরূপ

নিওক্লাসিক্যাল যুগ মূলত ১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের পুনপ্রতিষ্ঠা (Restoration) থেকে শুরু করে ১৭৯৮ সালে রোমান্টিক যুগের সূচনা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাচীন গ্রিস ও রোমের ধ্রুপদী ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি ছিল ভাষার সুমিতি, গঠনের সুষমা এবং একটি সংযত শিল্পদৃষ্টি। ইউরোপীয় নবজাগরণের (Renaissance) কালে পণ্ডিত ও সমালোচকরা পুনরায় এই ধ্রুপদী মর্যাদার প্রতি আকৃষ্ট হন। বিশেষত প্রাচীন গ্রিক নাট্যচর্চার মধ্য দিয়ে তাঁরা গঠন-প্রকরণের উৎকর্ষ, স্থান-কাল-ঘটনার ঐক্য (Three Unities) এবং ভাবাবেগের আতিশয্য নিয়ন্ত্রণের মতো বৈশিষ্ট্যগুলোকে সশ্রদ্ধ অনুকরণের যোগ্য বলে মনে করেন। এই ‘ক্ল্যাসিসিজম’-এর মূল সূত্রগুলো প্রথমত অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিকস’ এবং পরবর্তীতে রোমান কবি হোরেসের ‘আর্স পোয়েটিকা’-তে তাত্ত্বিকভাবে সংকলিত হয়েছিল।

অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের পুনপ্রতিষ্ঠার পরবর্তী সময়ে (১৬৬০ থেকে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ) প্রাচীন ধ্রুপদী সাহিত্যের এই নিয়মগুলোই সাহিত্যের চিরস্থায়ী ও মৌলিক শর্ত হিসেবে গৃহীত হয়। এই পর্বে সংযম, শৃঙ্খলা, যৌক্তিকতা এবং আভিজাত্য কেবল আদর্শ নয়, বরং সাহিত্যের ভাব ও রূপকাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। শিল্পসৃষ্টির এই কঠোর নিয়মতান্ত্রিক ও আভিজাত্যপূর্ণ সময়টিই বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে ‘নব্য-ধ্রুপদী’ বা ‘নিও-ক্লাসিক্যাল’ যুগ হিসেবে পরিচিত।

নব্য ধ্রুপদী সাহিত্যের ইতিহাস

নব্য ধ্রুপদী সাহিত্যের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও প্রতিনিধিত্বমূলক সৃষ্টি

নব্যধ্রুপদী শিল্পতত্ত্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ইশতেহার ছিল বোয়ালো’র ‘এল’আর্ট পোয়েটিক’ (১৬৭৪), যার ইংরেজি সমতুল্য হিসেবে গণ্য করা হয় আলেকজান্ডার পোপের ‘অ্যান এসে অন ক্রিটিসিজম’ (১৭১১) গ্রন্থটিকে। ইংল্যান্ডে এই আন্দোলনের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে পোপের বিখ্যাত ‘এসে অন ম্যান’ (১৭৩৩-৩৪) কাব্যে। এই যুগে ভাবাবেগের আতিশয্য, বিস্ময়মণ্ডিত সৌন্দর্যবোধ কিংবা কল্পনার উচ্ছ্বাসের কোনো স্থান ছিল না; বরং শিল্প বলতে বোঝাত জীবন-বাস্তবতার এক শান্ত, সংযত ও নিখুঁত নির্মাণ। মিলটনের ‘স্যামসন অ্যাগোনিসটিস’-এর শেষে বর্ণিত সেই চিরন্তন প্রশান্তি—“Calm of mind, all passions spent”—ছিল এই ধ্রুপদী জীবনাদর্শের মূল প্রেরণা। ফলে মানবমনের গূঢ় রহস্য বা জীবনের অন্তরালে নিহিত অনিশ্চয়তার পরিবর্তে সামাজিক নিয়ম-নীতি, বাহ্যানুষ্ঠান এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিত্রই এ যুগের সাহিত্যে প্রাধান্য পায়।[২]

নব্য ধ্রুপদী সাহিত্য যুগের তিনটি উপ-বিভাগ

অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের পুনর্বাসন পরবর্তী ১৬৬০ থেকে ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দ দীর্ঘ সময়কালকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়: পুনর্বাসনের যুগ বা ড্রাইডেনের যুগ, অগাস্টান যুগ বা আলেকজান্ডার পোপের যুগ এবং সবশেষে ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের যুগ। এই যুগের লেখকরা রেনেসাঁ আমলের অতি-আবেগ এবং কল্পনাপ্রসূত সাহিত্যের পরিবর্তে প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সাহিত্যিকদের (যেমন হোমার, ভার্জিল ও হোরেস) প্রবর্তিত কঠোর নিয়মাবলী, শৃঙ্খলা এবং মার্জিত শৈলীকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ধ্রুপদী সাহিত্যের আদর্শে সমসাময়িক সাহিত্যকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রদান করা।

রেস্টোরেশন পিরিয়ড (The Restoration Period: ১৬৬০–১৭০০)

১৬৬০ সালে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের পুনর্বাসন বা পুনপ্রতিষ্ঠা এবং রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে এই যুগের সূচনা হয়। দীর্ঘকাল নির্বাসনে থাকার কারণে রাজার সাথে ফরাসি সাহিত্যের মার্জিত ও পরিশীলিত প্রভাব ইংল্যান্ডে প্রবেশ করে। এই সময়ে সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রাচীন গ্রীক ও রোমান নিয়মাবলীর কঠোর অনুসরণ। বিশেষ করে ‘কমেডি অফ ম্যানার্স’ (Comedy of Manners) নামক নাট্যধারাটি এসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল, যেখানে তৎকালীন উচ্চবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং ভণ্ডামিকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপে ব্যঙ্গ করা হতো।

রেস্টোরেশন যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন জন ড্রাইডেন, যার হাত ধরে ইংরেজি গদ্য ও পদ্যে এক ধরণের গাণিতিক শৃঙ্খলা এবং সুশৃঙ্খল কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। রেস্টোরেশন ও অগাস্টান যুগের এই আচার-নির্ভর ধারাটি ফুটে উঠেছিল তাঁর রাজনৈতিক রূপক-কাব্য ‘অ্যাবসালাম অ্যান্ড অ্যাকিটোফেল’ এবং তাঁর বীররসাত্মক ট্র্যাজেডিগুলোতে (যেমন: দ্য কনকুয়েস্ট অফ গ্রানাডাঅল ফর লাভ)।

ইংরেজ সংসদীয় যুগ (The Augustan Age: ১৭০০–১৭৪৫):

অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধকে নব্যধ্রুপদী যুগের স্বর্ণযুগ বা ইংরেজ সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক সংসদীয় যুগ বা ‘অগাস্টান এজ’ বলা হয়, কারণ এই সময়ের লেখকরা প্রাচীন রোমান সম্রাট অগাস্টাস সিজারের আমলের ধ্রুপদী সাহিত্যিক আদর্শকে চরমভাবে অনুসরণ করতেন। এই যুগের সাহিত্য ছিল মূলত যুক্তি (Reason) এবং বুদ্ধিবৃত্তির (Intellect) আধার; এখানে ব্যক্তিগত আবেগ বা কল্পনার চেয়ে সামাজিক শৃঙ্খলা ও গাণিতিক নির্ভুলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। এই সময়েই ‘হিরোইক কাপলেট’ (Heroic Couplet) নামক বিশেষ কাব্যশৈলী পূর্ণতা পায়। সমাজের অসংগতি ও মানুষের বোকামিকে সংশোধন করার জন্য আলেকজান্ডার পোপ এবং জোনাথন সুইফট এই যুগে স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

আলেকজান্ডার পোপের কালজয়ী ব্যঙ্গ-মহাকাব্য ‘দ্য রেপ অফ দ্য লক’, তীক্ষ্ণ বিদ্রুপাত্মক ‘দ্য ডানসিয়াড’ এবং হোরেসের অনুকরণে লেখা তাঁর কবিতা ও পত্রাবলি ছিল এই যুগের অনন্য নিদর্শন।

পাশাপাশি হেনরি ফিল্ডিংয়ের সুনির্মিত গদ্য-আখ্যান ‘টম জোন্স’, জোনাথন সুইফটের বিধ্বংসী স্যাটায়ার ‘টেল অফ আ টাব’ ও রূপক-গল্প ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’, এবং অ্যাডিসন ও স্টিলের সামাজিক বিষয়াশ্রয়ী সরস প্রবন্ধাবলি ইংরেজি সাহিত্যে নব্য-ধ্রুপদী যুগের শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিত্বমূলক রচনা হিসেবে স্বীকৃত।

ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল মূলত ‘গদ্য ও যুক্তির যুগ’। এই সময়ে জীবনদর্শন ও শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে কঠোর নীতি-নিয়ম, ঐতিহ্যের প্রতি অটল আনুগত্য এবং আভিজাত্যের এক বিশেষ অহমিকা পরিলক্ষিত হয়। স্থায়িত্ব ও শৃঙ্খলার প্রতি অগাধ বিশ্বাস এই যুগের সাহিত্যিক আবহে একটি শক্ত লাগাম টেনে ধরেছিল। ড্রাইডেন, পোপ, জনসন এবং ফিল্ডিংদের মতো মহীরুহদের হাত ধরে এই যুগটি ‘নব্য-ধ্রুপদী’ বা ‘অগাস্টান যুগ’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যেখানে যুক্তিবাদ ও বিদ্রুপের এক পরিশীলিত সমন্বয় ঘটেছিল। তবে সুনিয়ন্ত্রিত জীবনবিন্যাস এবং সুসঙ্গত শিল্পসৃষ্টির এই তথাকথিত ‘আভিজাত্যের স্বর্ণযুগ’-এ সৃজনশীলতার স্বতঃস্ফূর্ততা, গভীর আবেগ, অনুভবের স্পন্দন কিংবা কল্পনাপ্রসূত স্বপ্নময়তার কোনো স্থান ছিল না। আঙ্গিকের অভিনবত্ব অপেক্ষা এখানে অলঙ্করণ ও কঠোর নিয়মনিষ্ঠাই ছিল মুখ্য।

সংবেদনশীলতার যুগ বা এজ অফ সেনসিবিলিটি (Age of Sensibility: ১৭৪৫–১৭৯৮):

নব্যধ্রুপদী যুগের শেষ পর্যায়টি সংবেদনশীলতার যুগ বা Age of Sensibility হিসেবে পরিচিত। যদিও মহান পণ্ডিত ও ইংরেজি অভিধানের প্রণেতা ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের নামানুসারে এই যুগকে ‘এজ অফ জনসন’ বলেও অভিহিত করা হয়। এই উপ-বিভাগটি ছিল মূলত নব্য ধ্রুপদী যুগের কঠোর যুক্তিবাদ এবং আসন্ন রোমান্টিক যুগের ভাবাবেগের মধ্যবর্তী একটি সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে নব্য ধ্রুপদী নিয়মগুলো কিছুটা শিথিল হতে শুরু করে এবং মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ‘সেনসিবিলিটি’ সাহিত্যে জায়গা করে নিতে থাকে। এই যুগেই আধুনিক ইংরেজি উপন্যাসের প্রকৃত বিকাশ ঘটে এবং জীবনী ও প্রবন্ধ সাহিত্য অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। এটি মূলত রোমান্টিক যুগের (১৭৯৮) সূত্রপাতের জন্য একটি শক্তিশালী মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল।

নব্য ধ্রুপদী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য

জন ড্রাইডেন, আলেকজান্ডার পোপ, জোসেফ অ্যাডিসন, জোনাথন সুইফট, স্যামুয়েল জনসন, অলিভার গোল্ডস্মিথ এবং এডমন্ড বার্কের মতো প্রথিতযশা লেখকদের রচনার মাধ্যমেই নব্যধ্রুপদী সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁদের সাহিত্যকর্মে আবেগের চেয়ে যুক্তি, শৃঙ্খলা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমিতিবোধকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের আদর্শ অনুসরণ করে তাঁরা যেমন একদিকে মার্জিত ও সুসংহত ভাষারীতি প্রবর্তন করেছেন, তেমনি অন্যদিকে শাণিত ব্যঙ্গ ও নৈতিক দর্শনের মাধ্যমে তৎকালীন সমাজকে সংস্কার করতে চেয়েছেন। মূলত কল্পনাপ্রবণতার পরিবর্তে বাস্তববাদ, সামাজিক সচেতনতা এবং ধ্রুপদী কাঠামোর প্রতি গভীর আনুগত্যই তাঁদের লেখনীকে নব্যধ্রুপদী সাহিত্যের এক অনন্য মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

১. ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য ও ধ্রুপদী অনুকরণ: নব্যধ্রুপদী লেখকরা ঐতিহ্যের প্রতি ছিলেন অগাধ শ্রদ্ধাশীল। তাঁরা মনে করতেন, কোনো নতুন বৈপ্লবিক উদ্ভাবন নয়, বরং অতীত বা ঐতিহ্যের সঠিক অনুসরণই শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠি। বিশেষ করে প্রাচীন রোমান ও গ্রিক লেখকদের সাহিত্যকর্মকে তাঁরা শিল্পের সর্বোচ্চ শিখর এবং সর্বাংশে অনুকরণীয় বলে বিশ্বাস করতেন। এই ধ্রুপদী ঘরানাকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তোলার কারণেই তাঁদের সাহিত্যিক প্রচেষ্টাকে ‘নিওক্লাসিক’ বা নব্যধ্রুপদী নামে অভিহিত করা হয়। হোমার, ভার্জিল কিংবা হোরেসের মতো ধ্রুপদী লেখকদের পদাঙ্ক অনুসরণ করাকেই তাঁরা সাহিত্যের প্রধান সার্থকতা বলে গণ্য করতেন।

২. আধুনিক গদ্য ও উপন্যাসের বিকাশ: নব্যধ্রুপদী সাহিত্যের যুগ কেবল কবিতার জন্য নয়, বরং আধুনিক ইংরেজি গদ্য এবং উপন্যাসের সূচনালগ্ন হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড্যানিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুসো’ বা স্যামুয়েল রিচার্ডসনের লেখার মাধ্যমেই ইংরেজি উপন্যাসের প্রাথমিক কাঠামো দাঁড়িয়েছিল। এছাড়া ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের সংকলিত ইংরেজি অভিধান ভাষার প্রমিতকরণে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখে। এই যুগের লেখকরা গদ্যকে জটিল অলঙ্কারের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করে সহজ, প্রাঞ্জল এবং তথ্যনির্ভর করে তোলেন। যদিও পরবর্তীতে রোমান্টিক কবিরা এই যুগের কঠোর নিয়মের বিরোধিতা করেছিলেন, তবুও নব্যধ্রুপদী সাহিত্যের যুক্তিবাদ এবং কাঠামোগত শৃঙ্খলা ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এক শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।

৩. যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি: এই যুগের সাহিত্যের প্রধান ভিত্তি ছিল মানুষের ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে যুক্তি (Reason) এবং বুদ্ধিবৃত্তিকে (Intellect) বেশি প্রাধান্য দেওয়া। নিওক্লাসিক্যাল লেখকরা বিশ্বাস করতেন যে সাহিত্যের মূল কাজ হলো মহাজাগতিক শৃঙ্খলা এবং মানুষের চিরন্তন স্বভাবকে প্রতিফলিত করা। এজন্য তারা কবিতায় ‘হিরোইক কাপলেট’ (Heroic Couplet) বা দুই লাইনের অন্ত্যমিলের ব্যবহারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যা অত্যন্ত পরিমিত এবং সুসংগত ছিল। আলেকজান্ডার পোপের কবিতাগুলোতে এই গাণিতিক সুক্ষ্মতা এবং যুক্তিনির্ভর প্রকাশভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

৪. পরিশ্রমী অনুশীলন ও নিয়মনিষ্ঠা: এই যুগের লেখকদের কাছে সাহিত্য ছিল মূলত একটি সুচারু শিল্পকর্ম বা ‘আর্ট’। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, একজন লেখকের কেবল জন্মগত প্রতিভা থাকলেই চলে না, বরং ব্যাপক পঠন-পাঠন এবং নিরলস অনুশীলনের মাধ্যমেই সেই প্রতিভাকে পূর্ণতা দিতে হয়। সার্থক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য তাঁরা কঠোর নিয়মকানুন ও রীতিনীতি মেনে চলায় বিশ্বাসী ছিলেন। তখনকার লেখকরা মনে করতেন নিয়মহীন আবেগ কেবল বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, তাই শিল্প সৃষ্টিতে ব্যাকরণ এবং অলঙ্কারের নিখুঁত প্রয়োগ অপরিহার্য।

এই নির্দেশনার মূল উৎস ছিল হোরেসের ‘আর্টস পোয়েটিকা’ (Arts Poetica) এবং ধ্রুপদী সাহিত্যিকদের কৌশলসমূহ। যেমন—নাটক রচনার ক্ষেত্রে সময়, স্থান এবং কর্মের ‘তিনটি ঐক্য’ (Three Unities) রক্ষা করাকে তাঁরা অপরিহার্য মনে করতেন, যা সাহিত্যের কাঠামোকে সুসংহত ও যুক্তিগ্রাহ্য করত। 

৫. মানুষ ও সমাজকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু: নব্যধ্রুপদী কবিতার বিষয়বস্তুর মূল উৎস ছিল মানুষ, বিশেষ করে একটি সুবিন্যস্ত ও সুসংহত সমাজের মার্জিত ও সভ্য মানুষ। তাঁরা কাব্যকে কল্পনাপ্রসূত কোনো জগতের পরিবর্তে বাস্তব জগতের প্রতিফলন হিসেবে দেখতেন। তাঁদের কাছে সাহিত্য ছিল মানবজীবনের এক স্বচ্ছ দর্পণ—‘a mirror held to nature’। প্রকৃতির এই অনুকৃতি বলতে তাঁরা মূলত মানব স্বভাবের চিরন্তন রূপকে বুঝতেন। তাই নির্জন প্রকৃতি বা অতীন্দ্রিয় জগতের চেয়ে সামাজিক মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও আচার-আচরণই তাঁদের লেখায় প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছিল।[৩]

৬. প্রতিনিধিত্বমূলক রুচি ও পরিশীলন: বিষয়বস্তু এবং নির্মাণশৈলী উভয় ক্ষেত্রেই নব্যধ্রুপদীবাদ সাধারণ ও প্রতিনিধিত্বমূলক বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব দিত। ব্যক্তিগত কোনো অদ্ভুত চিন্তা বা চমক জাগানো নতুনত্ব নয়, বরং অধিকাংশ মানুষের চিন্তাভাবনা, অনুভূতি এবং রুচি যা দ্বারা প্রতিফলিত হয়, তাকেই তাঁরা শ্রেষ্ঠ মনে করতেন। আলেকজান্ডার পোপের ভাষায় ‘True wit’ হলো এমন এক শিল্প যেখানে সাধারণের ভাবনাকেই অসাধারণ নিপুণতায় প্রকাশ করা হয়—‘what oft was thought but ne’er so well expressed’। এই লক্ষ্য অর্জনে তাঁরা কল্পনার হঠাৎ ঝলকানির চেয়ে শব্দের ঘষামাজা, পরিমার্জন এবং অধ্যবসায়ী নির্মাণকে বেশি প্রাধান্য দিতেন। 

৭. মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও শৃঙ্খলার বোধ: সমকালীন দার্শনিকদের মতো নব্যধ্রুপদী লেখকরাও মানুষকে একটি সীমাবদ্ধ সাধ্য ও সম্ভাবনার প্রাণী হিসেবে দেখতেন। এই যুগের ব্যঙ্গাত্মক এবং উপদেশমূলক রচনাগুলোতে মূলত মানুষের অহমিকা, অদম্য উচ্চাভিলাষ এবং উশৃঙ্খল আকাঙ্ক্ষাকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হতো। ব্যঙ্গাত্মক শৈলী ও সামাজিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে নব্যধ্রুপদী সাহিত্যিকগণ শক্তিশালী মাধ্যম ছিল স্যাটায়ার বা ব্যঙ্গকে গ্রহণ করেছিলেন। তৎকালীন সমাজের ভণ্ডামি, রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং অভিজাত শ্রেণীর চারিত্রিক দুর্বলতাগুলোকে সংশোধন করার উদ্দেশ্যে লেখকরা হাস্যরসের ছলে কঠোর সমালোচনা করতেন।

নব্যধ্রুপদী লেখকদের মতে, মানুষের সুখ ও সার্থকতা নিহিত রয়েছে নিজ সীমারেখা বা গণ্ডি মেনে চলার মধ্যে—যা জীবন ও সাহিত্য উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই শৃঙ্খলার বোধ থেকেই তাঁরা সানন্দে অনেক কঠিন নিয়ম মেনে নিতেন। যেমন—কবিতার ক্ষেত্রে তাঁরা ‘ক্লোজড কাপলেট’ (Closed Couplet) বা দুই চরণের অন্তমিল যুক্ত পংক্তির ব্যবহারকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

জোনাথন সুইফটের ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’ বা আলেকজান্ডার পোপের ‘দ্য রেপ অফ দ্য লক’ এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তাদের মতে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন নয়, বরং সমাজের ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে মানুষকে নৈতিকভাবে শিক্ষিত করা। এই যুগে ব্যক্তিগত অনুভূতির চেয়ে সামাজিক সমস্যা এবং নাগরিক জীবনই ছিল সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য বিষয়।

পরবর্তীকালের নব্য ধ্রুপদীবাদ

‘ধ্রুপদী’ বা ‘ক্লাসিক্যাল’ তকমাটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট যুগের ফ্রেমে আটকে রাখা হয়তো সংগত নয়। অষ্টাদশ শতকেই যখন বার্নস, ব্লেক বা ওয়ালপোলের মতো লেখকরা নতুনের আবাহন করছিলেন, তখনও ধ্রুপদী চেতনার অন্তঃস্রোত প্রবাহিত ছিল। এমনকি উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ এবং বিশ শতকের আধুনিকতাবাদী (Modernist) আন্দোলনেও ধ্রুপদী ভাবাদর্শ ও প্রকরণের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট। ম্যাথু আর্নল্ডের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সমালোচনা কিংবা টি.এস. এলিয়টের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘Tradition and the Individual Talent’-এ প্রাচীন সাহিত্যের গীতি-আদর্শের প্রতি গভীর সমর্থন ও প্রশস্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

রোমান্টিক কাব্যতত্ত্বের অতি-ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং আবেগনির্ভর প্রবণতার বিপরীতে এই তাত্ত্বিকরা নৈর্ব্যক্তিকতা, ঐতিহ্যানুগত্য, মননশীলতা ও আভিজাত্যবোধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এলিয়ট তো সরাসরি ঘোষণাই করেছিলেন যে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে তিনি ধ্রুপদী ভাবাদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী— ‘Classicist in literature’। অর্থাৎ, ধ্রুপদীবাদ কেবল অতীতের কোনো মৃত কঙ্কাল নয়, বরং এটি একটি চিরন্তন শিল্প-দর্শন যা বিভিন্ন যুগে আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে পুনর্গঠিত করেছে।

ধ্রুপদী জীবনদৃষ্টির সীমাবদ্ধতা ও রোমান্টিক আন্দোলনের উৎস

ধ্রুপদী শিল্পভাবনা ও আঙ্গিকের মূলে প্রোথিত ছিল এক প্রথানুগ, রক্ষণশীল ও আভিজাত্যপূর্ণ জীবনদর্শন। জীবনের যে বহুবিচিত্র গতিশীলতা এবং নিত্যপ্রবহমান রূপ, তার প্রতি এই ধারার প্রবক্তাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না। বরং সামাজিক আচার-আচরণ, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং মানবজীবনের বহিরঙ্গ বিষয়াবলিই ছিল তাঁদের প্রধান কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তিশৃঙ্খলা এবং প্রাকরণিক উৎকর্ষের মাধ্যমে একটি নিখুঁত ও সুসংগত শিল্পকর্ম নির্মাণই ছিল তাঁদের শিল্পের পরম লক্ষ্য। ফলে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য, কল্পনার স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাস কিংবা দৃশ্যমান জগতের সীমানা ছাড়িয়ে কোনো ইন্দ্রিয়াতীত অনুভবের জগতের প্রতি তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ নিস্পৃহ। মূলত, নিও-ক্লাসিক্যাল যুগের এই আভিজাত্যপূর্ণ নিস্পৃহতা এবং কঠোর নিয়মতন্ত্রের গর্ভেই নিহিত ছিল পরবর্তীকালের রোমান্টিক আন্দোলনের অবদমিত জন্মবীজ।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৭ আগস্ট, ২০২০; রোদ্দুরে.কম, ঢাকা; “নব্যধ্রুপদীবাদ শিল্প, সাহিত্য, থিয়েটার, সংগীত ও স্থাপত্যের সাংস্কৃতিক আন্দোলন”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/literary-glossary/neoclassicism/
২. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, “ক্ল্যাসিসিজম ও নিওক্ল্যাসিসিজম” মোস্তফা আহাদ তালুকদার সম্পাদিত পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি, ভাষাপ্রকাশ ঢাকা, তৃতীয় সংস্করণ অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা ৮৭-৮৮
৩. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮।

Leave a Comment