চেতনা প্রবাহ হচ্ছে সাহিত্য সমালোচনায় একটি বর্ণনামূলক উপায় বা পদ্ধতি

চেতনা প্রবাহ বা চেতনার অন্তঃশীল প্রবাহ (ইংরেজি: Stream of consciousness) হচ্ছে সাহিত্য সমালোচনায় একটি বর্ণনামূলক উপায় বা পদ্ধতি যা “বর্ণনাকারীর মনের মধ্যে যে বহুবিধ চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতিগুলি চলতে থাকে তা চিত্রিত করবার” চেষ্টা করে।[১] এটি সাধারণত অন্তরস্থ একক উক্তির (Interior monologue) রূপে থাকে এবং এটি বেখাপ্পা, খাপছাড়া বা অনিয়মিত বিরামচিহ্ন দিয়ে প্রকাশ পায়। সমালোচকরা বিভিন্ন সাহিত্যিক পূর্বসূরীদের দিকে ইঙ্গিত করলেও, বিংশ শতাব্দীর আগে মার্সেল প্রুস্ত, জেমস জয়েস, ডরোথি রিচার্ডসন ও ভার্জিনিয়া উলফের মতো আধুনিকতাবাদী লেখকদের আগে এই কৌশলটি সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হয়নি।

আধুনিক গদ্যে চেতনা প্রবাহ ধারার আখ্যান ব্যবহার করা অব্যাহত রয়েছে এবং কবিতা, গান লেখা এবং চলচ্চিত্রের মতো অন্যান্য শিল্পরূপে অনুরূপ কৌশল বর্ণনা করার জন্য এই শব্দটি গ্রহণ করা হয়েছে।

শব্দটির উৎপত্তি

১৮৫৫ সালে দ্য সেনসেস অ্যান্ড দ্য ইন্টেলেক্ট-এর প্রথম সংস্করণে সংবেদনগুলির সম্মতি বিভিন্ন ইন্দ্রিয়কে যুক্ত করবার সক্ষমতা ব্যাখ্যা করতে আলেকজান্ডার বাইন এই শব্দটি তৈরি করেছিলেন। তবে এটির উৎসের জন্য সাধারণত উইলিয়াম জেমসকে কৃতিত্ব দেয়া যিনি ১৮৯০ সালে এটি তাঁর মনোবিজ্ঞানের নীতিমালায় ব্যবহার করেছিলেন একটি জাগ্রতমনের নিরবচ্ছিন্ন ভাবনা প্রবাহ এবং সচেতনতাকে বোঝাতে।

১৯১৮ সালে ডরোথি রিচার্ডসনের (১৮৭৩-১৯৫৭) উপন্যাসগুলি নিয়ে আলোচনার সময় উপন্যাসিক মে সিনক্লেয়ার (১৮৬৩-১৯৪৬) চেতনার প্রবাহ শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন। পয়েন্টেড রুফস (১৯১৫), রিচার্ডসনের পিলগ্রিমেজ শীর্ষক ১৩টি আধা-আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের সিরিজের প্রথম কাজ হচ্ছে ইংরেজিতে প্রকাশিত প্রথম চেতনা-প্রবাহ উপন্যাস। যা হোক, ১৯৩৪ সালে, রিচার্ডসন মন্তব্য করেছিলেন যে “প্রুস্ত, জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ এবং ডরোথি রিচার্ডসন … সবাই যুগপৎভাবে, যদিও খুব আলাদাভাবে “নতুন পদ্ধতি”টি ব্যবহার করছিলেন”। যা হোক, অতীতের অনেক পূর্বসূরীরা এবং এখনও সমকালীন অনেক লেখকরা এই কৌশলটি ব্যবহার করেন।

আধুনিক কালে কথাটি গল্প-উপন্যাসে ব্যবহৃত একটি বর্ণনা পদ্ধতি বা ন্যারেটিভ টেকনিককে বোঝায়। চেতনাপ্রবাহ রীতি আধুনিক কথাসাহিত্যের একটি অভিনব আঙ্গিক। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে Edouard Dujardin নামক একজন গৌণ ফরাসী লেখকের রচিত Les Lauriers Sont coupe’s উপন্যাসে কেন্দ্রিয় চরিত্রের চেতনায় যত দৃশ্য ও ঘটনাবলীর অভিঘাত ফেলে তার সবকিছুকে বিশ্বস্তভাবে ধরবার প্রয়াসে—এই রীতির স্থুল ব্যবহার করেছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই আঙ্গিক যথার্থভাবে বিকশিত হয়। লেখক চেতনা প্রবাহ রীতির মাধ্যমে চরিত্রের চেতন ও অর্ধচেতন মনে যেসব স্পষ্ট এবং অস্পষ্ট ভাবনা, অনুভূতি, স্মৃতি ও নানা আপাত বিচ্ছিন্ন অনুষঙ্গ ভেসে ওঠে তার সবকিছু তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এখানে ঘটনা ও কালের বাস্তব ধারাবাহিকতা ও পারম্পর্য রক্ষিত হয় না। যৌক্তিকতা কিংবা অযৌক্তিকতার বিষয়টি এখানে গুরুত্ব পায় না। মানব চেতনায় অন্তঃশীল প্রবাহে ঠিক যেমনটি ধরা পড়ে তেমটিই প্রতিফলিত হয় চেতনা প্রবাহ রীতির গল্প বা উপন্যাসের বর্ণনা রীতিতে।[৩]

জর্জ মেরেডিথ এবং হেনরি জেমসের মতো ঔপন্যাসিকদের রচনায় সুদীর্ঘ মনোবিশ্লেষণাত্মক অনুচ্ছেদ বর্ণনায় চেতনা প্রবাহ রীতির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। জেমস জয়েস ‘ইউলিসিস’ (১৯২২) উপন্যাসে স্ট্রীম অব কনশাসনেস-এর একাধিক টেকনিক নিপুনভাবে প্রয়োগ করেন। এই উপন্যাসের ‘লেস্ট্রিগনিয়ান’ এপিসোড থেকে চেতনা প্রবাহ রীতির বর্ণনা কৌশলের একটু উদ্ধৃতি দেয়া হলো: ডাবলিনের ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লিওপোল্ড ব্লুমের চোখে এবং মনের পর্দায় যা ভেসে ওঠে তার ছবি এখানে জেমস জয়েস উপস্থাপন করেছেন চেতনার অন্ত শীল প্রবাহের আঙ্গিকে:

Pineapple rock, lemon platt, butter scoteh. A sugarsticky girl shoveling scoopfuls of creams for a christian brother. Some school tract. Bad for their tummies. Lozenge and comfit manufacturer to His Majesty the king. God. Save. Our Sitting of his throne, sucking red jujubes white.

চেতনাপ্রবাহ রীতি: ভার্জিনিয়া উলফ ও উইলিয়াম ফকনার

সাহিত্যে ‘চেতনাপ্রবাহ রীতি’ বা Stream of Consciousness-এর সফল প্রয়োগের কথা বলতে গেলে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কিছু কালজয়ী উপন্যাসের নাম অবধারিতভাবেই চলে আসে। এই আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক আখ্যানভাগকে জনপ্রিয় ও সার্থক করে তোলার ক্ষেত্রে ইংরেজ ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফ এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘মিসেস ড্যালওয়ে’ (১৯২৫) এবং ‘টু দি লাইট হাউস’-এ এই বিশেষ আঙ্গিকের ব্যাপক ও অত্যন্ত নিপুণ ব্যবহার দেখিয়েছেন। উলফ এই উপন্যাসে প্রথাগত রৈখিক কাহিনীর কাঠামো ভেঙে চরিত্রের মনের ভেতরের জটিল ও অবিরাম চিন্তার গতিপ্রকৃতিকে অবিকল তুলে ধরেছেন। মানুষের স্মৃতি, বর্তমানের অনুভূতি এবং অবচেতন মনের ক্ষণিক ভাবনাগুলো কীভাবে একসাথে খেলা করে, তা তাঁর লেখনীতে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

ভার্জিনিয়া উলফের পাশাপাশি এই আঙ্গিকের আরেকটি অসামান্য ও যুগান্তকারী প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায় আমেরিকান কথাসাহিত্যিক উইলিয়াম ফকনারের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি সাউন্ড অ্যান্ড দি ফিউরি’তে (১৯২৯)। ফকনার এই উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহ রীতির ব্যবহারকে এক চরম মাত্রায় নিয়ে গেছেন। তিনি প্রচলিত ব্যাকরণ ও যতিচিহ্নের নিয়মকে উপেক্ষা করে চরিত্রের মানসিক বিশৃঙ্খলা, হতাশা এবং ভাঙন ধরা ভেতরের জগতকে অত্যন্ত সার্থকতার সাথে উপস্থাপন করেছেন। বিশ্ব সাহিত্যের এই অনন্য সৃষ্টিগুলো প্রমাণ করে যে, মানুষের মন কোনো সাজানো গল্প নয়, বরং এটি এক অবিরাম বয়ে চলা চেতনার নদী—যার কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা নেই।[২][৩]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. আন্তর্জাতিক রেফারেন্স: জে. এ. কাডন, এ ডিকশনারি অব লিটারেরি টার্মস, (হারমন্ডসওয়ার্থ, পেঙ্গুইন বুকস, ১৯৮৪), পৃষ্ঠা: ৬৬০-৬৬১। (J. A. Cuddon, A Dictionary of Literary Terms. Harmondsworth, Penguin Books, 1984, pp. 660–1)।
২. জাতীয় রেফারেন্স: কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ: ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা: ১২১।
৩. অনলাইন প্রকাশনা ও সংস্করণ: প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে ‘রোদ্দুরে.কম’ (roddure.com) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে, লেখকের মূল স্বর, সুনির্দিষ্ট উপাত্ত এবং ভাষার গভীরতা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে একে একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রবন্ধের রূপ দেওয়া হয় এবং ২৭ এপ্রিল ২০২১ তারিখে ‘ফুলকিবাজ.কম’-এ পুনরায় প্রকাশ করা হয়।

বর্তমান সংস্করণ: সর্বশেষ পরিমার্জন ও তথ্য সংস্কারের মাধ্যমে লেখাটি আজ ২১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ হালনাগাদ করা হলো।

Leave a Comment