আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি লিরিক্স: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এক অমর সৃষ্টি

বিখ্যাত গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কালজয়ী সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আধুনিক বাংলা গান হলো— ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি মোর নিশীথ বাসর শয্যায়, মন বলে ভালোবেসেছি’। ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই রোমান্টিক গানটিতে সুর দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সুরকার রবীন চট্টোপাধ্যায়। গানটি প্রথমবার রেকর্ড করা হয় কিংবদন্তি শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে। মূলত তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বিপাশা’-তে এই গানটি ব্যবহার করা হয়। রূপালি পর্দায় মহানায়ক উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেনের অনবদ্য রসায়নে গানটি দর্শকদের মাঝে এক অনন্য আবেদন সৃষ্টি করেছিল।

গানের কাব্যিক ও শৈল্পিক বিশ্লেষণ

গীতিকার হিসেবে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের মুন্সিয়ানা এই গানটিতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং আধুনিক বাংলা প্রেমের গানের এক সার্থক প্রতিচ্ছবি। প্রেম, বিরহ, আকাঙ্ক্ষা আর প্রকৃতির নিপুণ মিশ্রণে গানটি রোমান্টিকতার এক অনন্য শিখরে পৌঁছেছে। এতে সুরের আবেশে প্রিয়জনকে পাওয়ার ব্যাকুলতা এবং হৃদয়ের গহীন কোণে লুকিয়ে থাকা নিভৃত সমর্পণের কথা বলা হয়েছে। গানের প্রতিটি ছত্রে প্রিয় মানুষের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং সেই না-বলা কথাগুলো যে কাব্যিক সুষমা তৈরি করেছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে শব্দচয়নগুলো ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে এক গভীর আচ্ছন্নতা বা বিহ্বলতা তৈরি করে।

১. স্বপ্নের আবহে মিলনের আকুতি: গানের শুরুতেই ‘নিশীথ বাসর শয্যা’র উল্লেখ বাস্তব আর কল্পনার এক ধূসর সীমানা তৈরি করে। এখানে ভালোবাসা যতটা না রক্ত-মাংসের, তার চেয়ে বেশি মায়াবী। অবচেতন মনে (স্বপ্নে) প্রিয়জনকে পাওয়ার যে তৃপ্তি, তা চেতনার জগতে এক অতৃপ্ত ব্যাকুলতা হয়ে ধরা দিয়েছে।

২. নীরব প্রেমের দ্বান্দ্বিকতা: “মন বলে ভালবেসেছি, আঁখি বলিতে পারেনি লজ্জায়”—এই পঙক্তিটি চিরন্তন বাঙালি প্রেমের সেই চিরচেনা রূপটি ফুটিয়ে তোলে, যেখানে হৃদয় উন্মুখ হলেও চক্ষুলজ্জা বা সংকোচ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটি মনের সংলাপে মুখর কিন্তু অভিব্যক্তিতে নির্বাক।

৩. রূপক ও অলংকার:

  • মাধুরী বিলানো: এখানে প্রেমকে এক আধ্যাত্মিক পর্যায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যেখানে নিজের আনন্দ বা সৌন্দর্যকে অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার এক পবিত্র ইচ্ছা কাজ করছে।
  • বধূর সজ্জা: ‘মধুর বধূ’র সাজে নিজেকে ভাবার মাধ্যমে এখানে সমর্পণের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত। এটি কেবল শারীরিক উপস্থিতি নয়, বরং নিজেকে একজনের করে নেওয়ার আজন্ম সাধ।
  • খুশীর বিজুরি (বিদ্যুৎ): আগুনের দহন আর খুশির বিদ্যুৎ—এই বৈপরীত্যটি চমৎকার। ফাগুনের আগুনে পুড়ে মরা এবং একই সাথে পুলকিত হওয়া মূলত প্রেমের সেই ‘মধুর যন্ত্রণা’কে নির্দেশ করে, যা শরীরের মজ্জা অবধি অনুভূত হয়।

৪. চিরস্থায়ী আবেশের প্রার্থনা: ‘মায়া তিথি’র এই আবেশ যেন কখনো না ভাঙে—এই আকুলতা প্রমাণ করে যে, বক্তা বাস্তবতার কঠোরতার চেয়ে স্বপ্নের এই রঙিন ঘোরকেই বেশি ভালোবাসেন। এখানে বিচ্ছেদ ভয় এবং মিলনের আনন্দ একই সুতোয় গাঁথা।

আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি গানটি ইউটিউব থেকে সরোজিনী ঘোষের কণ্ঠে শুনুন

গানের কথা

আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি
মোর নিশীথ বাসর শয্যায়,
মন বলে ভালবেসেছি,
আঁখি বলিতে পারেনি লজ্জায়।।

জানিনা এ কোন লীলাতে
মন চায় যে মাধুরী বিলাতে,
তবু পারেনি তোমারে ভোলাতে
মধুর বধুর সজ্জায়।।

সুন্দর এই মায়া তিথিতে
মন তুমি ছাড়া কিছু জানে না,
যেন এ আবেশ কোনদিন ভাঙ্গে না।
জানিনা তো এই ফাগুনে
আমি জ্বলে মরি কীসের আগুনে
এ কোন খুশীর বিজুরি
শিহরে তনুর মজ্জায়।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ‘আমি স্বপ্নে তোমায় দেখেছি মোর নিশীথ বাসর শয্যায়’ গানটি কেবল ষাটের দশকের একটি জনপ্রিয় গানই নয়, বরং এটি বাংলা সংগীত জগতের এক অমূল্য সম্পদ। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কাব্যিক শব্দমালা, রবীন চট্টোপাধ্যায়ের জাদুকরী সুর এবং সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মায়াবী কণ্ঠ—সব মিলিয়ে গানটি আজও আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। বিপাশা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের সেই চিরচেনা রসায়ন এই গানটিকে দিয়েছে এক অনন্য পূর্ণতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে গেলেও বিরহ আর ভালোবাসার এই সুর বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা:

১. লেখাটি ২০ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৩৫৬-৩৫৭ পৃষ্ঠা থেকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!