বাংলা গানের জগতের এক কিংবদন্তি শিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় (৪ অক্টোবর ১৯৩১ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২) ছিলেন ভারতীয় সংগীত ইতিহাসের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বিশেষ করে আধুনিক বাংলা গান ও নেপথ্য সংগীতে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯৩১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করা এই মহীয়সী নারী তাঁর সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে সুরের জাদুতে জয় করেছেন কোটি মানুষের হৃদয়।
শৈশব ও সংগীত শিক্ষার হাতেখড়ি
এই ‘কোকিলকণ্ঠী’ শিল্পীর কণ্ঠের মাদকতা শ্রোতাদের দশকের পর দশক মুগ্ধ করে রেখেছে। শৈশবেই মায়ের সুমধুর কণ্ঠ শুনে তাঁর গানের প্রতি প্রথম অনুরাগ জন্মেছিল। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার পথচলা শুরু হয় গুরু সন্তোষ বসুমল্লিকের হাত ধরে। এই তালিমই তাঁকে ভবিষ্যতের এক পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
গীতশ্রী উপাধি ও প্রথম প্রকাশ
১৯৪৩ সালের ৫ই ডিসেম্বর ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স’-এ অংশগ্রহণের মাধ্যমে পেশাদার শিল্পী হিসেবে তাঁর রাজকীয় পদযাত্রা শুরু হয়। এর মাত্র তিন বছর পর, ১৯৪৬ সালে তাঁর অসাধারণ গায়কী ও শাস্ত্রীয় সংগীতে পারদর্শিতার জন্য তিনি সম্মানজনক ‘গীতশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন। এরপর থেকে সংগীতের দুনিয়ায় তিনি এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হন।
শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর সাধনা
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত ছিল অত্যন্ত মজবুত। তিনি সুখেন্দু গোস্বামী, চিন্ময় লাহিড়ী এবং এ কাননের মতো প্রথিতযশা শিক্ষকদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে সংগীতের চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছাতে ১৯৫০ সালে তিনি কিংবদন্তি ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ওস্তাদ মুনাব্বর আলির কাছেও তিনি সংগীতের সূক্ষ্ম কলাকৌশল রপ্ত করেছিলেন।
বেতার ও রূপালি পর্দায় অভিষেক
মাত্র ১২ বছর বয়সেই আকাশবাণীর শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। বেতারের সর্বভারতীয় অনুষ্ঠানে তাঁর পরিবেশিত খেয়াল ও ঠুংরি শিল্পীমহলে তাঁকে ব্যাপক খ্যাতি এনে দেয়। প্রখ্যাত সুরকার রাইচাঁদ বড়াল তাঁর কণ্ঠের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে ‘অঞ্জনগড়’ চলচ্চিত্রে তাঁকে প্রথম প্লেব্যাকের সুযোগ দেন। তবে তাঁর কণ্ঠের প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ছিল ১৯৪৮ সালের ‘সমাপিকা’, যেখানে রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে তাঁর গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।[১]
জাতীয় স্বীকৃতি ও কালজয়ী সম্মাননা
দীর্ঘ পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে তিনি শুধু বাংলা নয়, বরং হিন্দি, ওড়িয়া এবং অসমীয়া ভাষাতেও গান গেয়েছেন। ১৯৭০ সালে ‘নিশি পদ্ম’ ও ‘জয় জয়ন্তী’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি সেরা গায়িকার জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর গানের আকাশচুম্বী চাহিদার কারণে গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁকে ১৯৮০ সালে ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ এবং ১৯৯১ সালে ‘হীরক খচিত রেকর্ড’ দিয়ে বিরল সম্মান জানায়। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদান করে।
শেষ বিদায় ও নৈতিক অবস্থান
২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করতে চেয়েছিল। তবে জীবনের সায়াহ্নে এসে এই সম্মানকে তিনি “মর্যাদাহানিকর” হিসেবে গণ্য করে প্রত্যাখ্যান করেন, যা তাঁর ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। শেষ পর্যন্ত শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে কলকাতার এক হাসপাতালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২ তারিখে এই কালজয়ী শিল্পীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সংগীতের এক স্বর্ণযুগের অবসান হলেও তিনি বেঁচে আছেন তাঁর অমর সৃষ্টির মাঝে।
দশটি কালজয়ী গান
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের হাজারো গানের মধ্যে থেকে সেরা দশটি কালজয়ী গান নির্বাচন করা কঠিন, তবে নিচে তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও স্মরণীয় ১০টি গানের তালিকা দেওয়া হলো।
১. এই পথ যদি না শেষ হয় (চলচ্চিত্র: সপ্তপদী) – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গাওয়া এই কালজয়ী দ্বৈত সঙ্গীতটি আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।
২. গানে মোর ইন্দ্রধনু (চলচ্চিত্র: অগ্নিপরীক্ষা) – রোমান্টিক বাংলা গানের এক অনন্য নিদর্শন।
৩. তুমি যে আমার (চলচ্চিত্র: হারানো সুর) – সুচিত্রা সেনের লিপে এই গানটি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা কাজ।
৪. কে তুমি আমারে ডাকো (চলচ্চিত্র: অগ্নিপরীক্ষা) – অনুরাগের এক গভীর অনুভূতি জাগানিয়া গান।
৫. মধু মালতী ওগো জনমে জনমে – এই আধুনিক গানটি বাঙালির সব প্রজন্মের কাছে সমান জনপ্রিয়।
৬. প্রতিমা গড়িয়া দেবতা চেয়েছি (চলচ্চিত্র: সমাপিকা) – তাঁর প্রারম্ভিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জনপ্রিয়তা পাওয়া গান।
৭. হয়তো কিছুই নাহি পাবো – বিরহী মনের এক দারুণ প্রকাশ ফুটে উঠেছে এই গানে।
৮. ওগো মোর গীতিময় – শাস্ত্রীয় সংগীতের স্পর্শে এটি একটি অত্যন্ত উঁচুমানের সৃষ্টি।
৯. ঝরা পাতা গো – বিষাদমাখা এক অসাধারণ মেলোডি যা শ্রোতাকে আজও আবিষ্ট করে।
১০. যামিনী যে যায় – এই গানটির মধ্য দিয়ে তাঁর কণ্ঠের অসামান্য মাধুর্য এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের দখল ফুটে ওঠে।
পরিশেষে বলা যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য অভিধা। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে তিনি কয়েক প্রজন্মকে আবিষ্ট করে রেখেছেন এবং বাঙালির সুখ-দুঃখের সাথী হয়েছেন তাঁর অজস্র কালজয়ী গান। সম্মান ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে তাঁর আপসহীন অবস্থান তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও শ্রদ্ধেয় করে তুলেছে। সুরের ভুবনে তাঁর শারীরিক অনুপস্থিতি ঘটলেও, আকাশবাণীর স্তোত্র থেকে শুরু করে রূপালি পর্দার গানে—সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় অমর হয়ে থাকবেন তাঁর চিরসবুজ সুরের মূর্ছনায়।[২]
আরো পড়ুন
- সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছিলেন সুরের এক চিরভাস্বর নক্ষত্র
- অনিল চন্দ্র তালুকদার: নেত্রকোনার এক নিভৃতচারী সংগীত সাধক
- হীরেন বসু আধুনিক বাংলা ভাষার গীতিকার, কণ্ঠশিল্পী, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক
- শাহেরা খাতুন বাঙলার লোকসংগীত শিল্পী, পরিবেশকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
টিকা:
১. বিমলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চতুরঙ্গ, আব্দুর রউফ সম্পাদিত, বর্ষ ৫৩, ১ মে ১৯৯২ সংখ্যা; পৃষ্ঠা – ৭৭-৮১;
২. লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটি ‘কাল্পনিক প্রতিকৃতি’ যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।