আধুনিক বাংলা গান সমকালের রুচি ও মনন থেকে জন্ম নেওয়া এক অনন্য সুরশৈলী

আধুনিক বাংলা গান (ইংরেজি: Modern Bangla song) মূলত সমকালের রুচি ও মনন থেকে জন্ম নেওয়া এক অনন্য সুরশৈলী। এর নামেই মিশে আছে সমসাময়িকতা আর নতুনের জয়গান। বাংলা গানের দীর্ঘ পথচলায়—প্রাচীন চর্য্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী কিংবা লোকসংগীতের আঙিনা পেরিয়ে—অনেকগুলো বিবর্তনের স্তর অতিক্রম করেই আধুনিক গান আজ তার নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে। এটি কেবল ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী নয়, বরং যুগের প্রয়োজনে নিজেকে প্রতিনিয়ত ভেঙে গড়ে এক আধুনিক ও সমৃদ্ধ রূপ পরিগ্রহ করেছে।

বাংলা গানের বিবর্তন: চর্যাপদ থেকে আধুনিকতার আঙিনায়

বাংলা গানের ইতিহাস মূলত হাজার বছরের এক সুরের অভিযাত্রা। এই যাত্রার আদি পর্বে আমরা পাই মরমী চর্যাপদ, যা কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে কীর্তন ও পদাবলীর ভক্তিধামায় অবগাহন করে। আঠারো ও উনিশ শতকের সন্ধিক্ষণে এই ধারা আরও বিস্তৃত হয় শ্যামাসংগীত, রামপ্রসাদী ও মালসী গানের মরমি মূর্ছনায়। ঠিক সেই সময়েই লোকায়ত বাংলার মাটি থেকে উঠে আসে পাঁচালী, তর্জা, হাফ-আখড়াই, টপ্পা ও কবিগানের মতো চটুল ও প্রাণবন্ত সব পরিবেশনা, যা যাত্রাপালার গানের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়।

বিশ শতকের দুয়ারে দাঁড়িয়ে বাংলা গান এক নতুন বাঁক বদলের সাক্ষী হয়। একদিকে চিরায়ত ধ্রুপদ ও খেয়াল আশ্রিত রাগসংগীতের আভিজাত্য, অন্যদিকে নাগরিক জীবনের চাঞ্চল্য মেশানো থিয়েটারের সেই ‘জংলী’ ও চটুল সুরের মিশ্রণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অস্থির অথচ সৃজনশীল আবহ। তবে আধুনিক বাংলা গানের প্রকৃত ভিত্তি রচিত হয়েছিল এই সমস্ত সাবেকি ও পরীক্ষামূলক ধারার এক অনবদ্য সমন্বয়ে। প্রাচীন ঐতিহ্যের শিকড় আর আধুনিক মননের ডালপালা মিলেমিশে তৈরি হয়েছে আজকের এই স্বতন্ত্র সংগীতশৈলী।[২]

পঞ্চকবির সুর-সাধনা: আধুনিক বাংলা গানের ভিত্তিভূমি

বাংলা গানের সেই অনন্য বিবর্তনের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন পাঁচ দিকপাল মহাপুরুষ—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, অতুলপ্রসাদ সেন এবং কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁদের সৃজনী-প্রতিভায় রচিত গানগুলো আজ আমাদের পরম সংগীত-সম্পদ। এই অসামান্য ‘পঞ্চকবির’ সুর ও বাণীর কারুকাজ বাংলা গানকে যে কত বিচিত্র ঐশ্বর্যে বিভূষিত করেছে, তার পরিমাপ করা অসাধ্য।

বিশেষত, রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা ও ভাবনার ব্যাপ্তি অতুলনীয়; তা যেন এক বিশাল সমুদ্র। তবে দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত, অতুলপ্রসাদ এবং নজরুলের সৃষ্টিও আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। এই পাঁচ জন বিদগ্ধ সংগীতকারের কাব্যময় সৃষ্টি, সুরের নিখুঁত বুনন আর ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্যের মিলনই জন্ম দিয়েছে সেই ধারাকে, যাকে আমরা আজকের পরিভাষায় বলি ‘আধুনিক বাংলা গান’। মূলত তাঁদের উত্তরসূরি হয়েই আধুনিক গান পেয়েছে তার আধুনিকতার প্রাণভোমরা।

সমষ্টির সুর ও আধুনিকতার কাব্য: বাংলা গানের নতুন দিগন্ত

বাংলা গানের আঙিনায় যৌথকণ্ঠের বা কোরাস গানের ঐতিহ্য আগে থেকেই বহমান ছিল। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, অতুলপ্রসাদ এবং নজরুল—এই দিকপালরা তাঁদের অসামান্য সৃষ্টির মাধ্যমে বৃন্দগানের বা সমষ্টিগত সুরের এক বিশাল জগত উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এই যৌথগান কেবল সুরের মিলন নয়, বরং অগণিত মানুষের হৃদয়ের গোপন বেদনা আর হাহাকারকে ভাষা দেওয়ার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় কোরাস গান যখন গণসংগীতে রূপান্তরিত হলো, তখন তা হয়ে উঠল সমাজ ও মানুষের জাগরণের এক তীব্র দ্যোতক।

আধুনিক বাংলা গানের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, এটি আধুনিক গীতিকবিতার সমস্ত গুণাবলিকে নিজের ভেতর ধারণ করেছে। সুরের লহরীতে শব্দগুলো যখন খেলা করে, তখন গান আর গান থাকে না; তা হয়ে ওঠে কবিতারই এক সুরময় রূপান্তর। এই নিবিড় কাব্যময়তার কারণেই আধুনিক বাংলা গানে অতি স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে প্রকৃতির চিরন্তন রূপ, প্রেমের গূঢ় অনুভব এবং সমকালীন রাজনীতি ও সমাজচেতনার বলিষ্ঠ প্রকাশ।

আধুনিক বাংলা গানে নিসর্গের ছোঁয়া: চাঁদ-ফুল-পাখির মায়াজাল

আধুনিক বাংলা গানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রকৃতির এক অনবদ্য বিচরণ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে কাজী নজরুল ইসলামের হাতে প্রকৃতি যেন সুরের শরীরে অলঙ্কার হয়ে উঠেছিল; তাঁর গানে ফুল, পাখি আর চাঁদের যে বহুমাত্রিক ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত ব্যবহার—তা বাংলা সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নজরুলের সেই রোমান্টিক ধারার রেশ ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত অত্যন্ত প্রবলভাবে বিরাজমান ছিল।

এই সময়ের চলচ্চিত্রে, বিশেষ করে উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের কালজয়ী রূপালী পর্দায় প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল গানের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। তাঁদের ঠোঁটে গাওয়া গানগুলোতে ফুল-পাখি-চাঁদ কেবল উপমা নয়, বরং প্রেম ও আবেগের এক জীবন্ত মানচিত্র হয়ে ধরা দিয়েছে। নিসর্গ আর সুরের এই মিতালি আধুনিক বাংলা গানকে দিয়েছিল এক স্নিগ্ধ ও চিরকালীন আবেদন।

আধুনিক বাংলা গান: সুর ও বাণীর এক শতাব্দীকাল বিবর্তন

বাংলা গানের ইতিহাসে ‘আধুনিক’ অভিধাটি সার্থকতা পায় মূলত ১৯৩০-এর দশক থেকে। এই সময়কার গানগুলো বাংলা আধুনিক কবিতার এক সুরময় প্রতিচ্ছবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কবিতায় যেমন প্রেমের জয়গান ছিল মুখর, গানেও তেমনই আছড়ে পড়ে রোমান্টিকতার উত্তাল তরঙ্গ। বিশেষ করে নজরুলসংগীতের আকাশ জুড়ে বিচরণ করে ভালোবাসা, ফুল, পাখি, চাঁদ আর ‘তুমি-আমি’র সেই চিরায়ত রসায়ন। আধুনিক বাংলা গান হয়ে ওঠে নর-নারীর নিবিড় ও ব্যক্তিগত অনুভূতির এক পরম আশ্রয়।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের চলচ্চিত্র এই প্রেমের গানগুলোকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। তবে চল্লিশের দশক থেকেই শুরু হয়েছিল রূপান্তরের পালা। বাণীর একঘেয়েমি কাটানো আর রুচি বদলের তাগিদে ফুল-পাখি-চাঁদের উপমার বাইরেও শুরু হয় নতুন সুরের অন্বেষণ। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে আধুনিক গান লাভ করে এক সংহত ও আধুনিক রূপ। বিশ শতকের শেষার্ধে গণনাট্য সংঘের হাত ধরে বাংলা গানের দিগন্ত আরও প্রসারিত হয়। একদিকে যেমন গানের সংস্কৃতিতে যুক্ত হয় বহুমুখিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে এই আন্দোলন বহু প্রতিভাধর সংগীতকার ও গীতিকারের বিকাশে পালন করে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা।[৩]

আধুনিক বাংলা গানের রূপান্তর: স্রষ্টা থেকে যৌথ সৃজনশীলতা

বিশ শতকের ত্রিশের দশককে বাংলা গানের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণ বলা হয়। তবে এই ‘আধুনিকতা’ কেবল সুরের বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা সমসাময়িক সাহিত্যের ঢেউয়ে আসেনি; বরং এর অন্তরালে ঘটে গিয়েছিল এক কাঠামোগত বিবর্তন। দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি ছিল—যিনি কবি, তিনিই সুরকার। দাশরথি রায়ের পাঁচালি, নিধুবাবুর টপ্পা কিংবা রবীন্দ্রনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের গান তাঁদের নিজস্ব নামেই চিহ্নিত হতো। কিন্তু এই সময় থেকেই সেই অবিভাজ্য প্রথা ভেঙে যেতে শুরু করে।

গানের ভুবনে জন্ম নিল এক নতুন শ্রমবিভাজন—যেখানে কবি হলেন কেবল বাণীর রচয়িতা বা ‘গীতিকার’, আর সুরারোপের দায়িত্ব ন্যস্ত হলো এক ভিন্ন সত্তার ওপর, যাঁকে আমরা আজ ‘সুরকার’ বা ‘সংগীত পরিচালক’ হিসেবে চিনি। দিলীপকুমার রায় এবং কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সেই আদি প্রথার শেষ দুই মহীরুহ। এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করেছিল ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একদিকে পুরোনো রাজকীয় বা সামন্ততান্ত্রিক পরিমণ্ডলটি ফিকে হয়ে আসছিল, অন্যদিকে বিজ্ঞানের আশীর্বাদে গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্রের মতো বাণিজ্যিক মাধ্যমগুলো ডালপালা মেলছিল। ফলে সংগীত কেবল আত্মিক সাধনা নয়, বরং একটি লাভজনক পেশা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা অগণিত নতুন শিল্পীকে এই সুরের ভুবনে আকৃষ্ট করেছিল।

বেতার থেকে সবাক চলচ্চিত্র: আধুনিক সংগীতের যান্ত্রিক ও শৈল্পিক বিপ্লব

বেতারের নবপ্রতিষ্ঠিত কণ্ঠস্বর যখন দিগন্ত ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়তে লাগল, তখন এর অনুষ্ঠানমালায় সংগীতের প্রাধান্য হয়ে উঠল আকাশচুম্বী। গ্রামোফোন কোম্পানির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার হাত ধরে দেশজুড়ে একের পর এক দেশীয় রেকর্ডিং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে শুরু করল। শুরু হলো নতুন ধরনের বাংলা লিরিক্স যোগ। ঠিক এই সময়েই স্তব্ধ নির্বাক চলচ্চিত্র হঠাতই গান আর সংলাপে মুখর হয়ে সবাক রূপ পেল, আর সূচিত হলো গানের পেছনে ‘আবহ ঐকতান’ বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের এক জাদুকরী অধ্যায়।

এই পরিবর্তনের ফলে গানের সংজ্ঞা আর কেবল কথা ও সুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। একটি গান চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার আগে শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন মহলা-কক্ষে শিল্পীদের কণ্ঠে তা নিখুঁতভাবে তোলার এক দীর্ঘ শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া শুরু হলো। অর্কেস্ট্রার প্রয়োজনে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের একক ও সম্মিলিত প্রয়োগের শৈল্পিক জ্ঞান যেমন অপরিহার্য হয়ে উঠল, তেমনি যান্ত্রিক সুরলহরীকে শ্রুতিমধুর করে শ্রোতার কানে পৌঁছে দিতে ‘মাইক্রোফোন’ নামক যন্ত্রটির কলাকৌশল ও যথাযথ ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও হয়ে উঠল আধুনিক সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আধুনিক বাংলা গানের নবযুগ: গীতিকার ও সুরকারের সেই অনন্য মিতালি

সব মিলিয়ে বাংলা গানের ভুবনে এক নতুন ও জটিল যুগের পদধ্বনি শোনা গেল, যেখানে প্রতিটি কাজের জন্য প্রয়োজন হলো বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞের। গানের বাণী যখন কবির কলম থেকে ঝরে পড়ত, তখন সেই সুরহীন শরীরকে প্রাণদান করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতেন সংগীত-বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ থিয়েটার বা রঙ্গালয়ে যে রীতির ভ্রূণ জন্ম নিয়েছিল, বিশ শতকের এই সন্ধিক্ষণে এসে তা-ই গানের সাধারণ নিয়মে পরিণত হলো। তবে সুরের খাতিরে কাব্যকে কিছুটা আপস করতে হতো বলে আধুনিক যুগের অনেক কবিই এই ধরাবাঁধা ছকে নিজেকে সঁপে দিতে রাজি ছিলেন না।

ঠিক এই শূন্যস্থানেই এগিয়ে এলেন রবীন্দ্র-অনুগামী একদল প্রগতিশীল কবি ও গীতিকার। হেমেন্দ্রকুমার রায়, শৈলেন রায়, সুবোধ পুরকায়স্থ, অজয় ভট্টাচার্য ও প্রণব রায়ের মতো শব্দশিল্পীদের সঙ্গে সুরের জাদুকর কৃষ্ণচন্দ্র দে, হিমাংশু দত্ত, পঙ্কজ মল্লিক, শচীন দেববর্মন এবং কমল দাশগুপ্তের এক অবিস্মরণীয় মেলবন্ধন ঘটল। তাঁদের সেই সৃজনশীল রসায়ন থেকেই জন্ম নিল আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণধারা। পরবর্তীতে এই সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সযত্নে বয়ে নিয়ে গেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, মোহিনী চৌধুরী, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতিমান গীতিকারেরা। আর তাঁদের সেই অমূল্য বাণীকে অমর সুরের মোড়কে সাজালেন অনুপম ঘটক, সুধীরলাল চক্রবর্তী, রবীন চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও নচিকেতা ঘোষের মতো কিংবদন্তি সুরকারবৃন্দ। এই যৌথ সাধনাই আধুনিক বাংলা গানকে পৌঁছে দিয়েছিল জনপ্রিয়তার তুঙ্গে।

সলিল চৌধুরী ও আধুনিক গানের নব-জাগরণ: কথা ও সুরের একীভূত শক্তি

চল্লিশের দশকের শেষার্ধে বাংলা গানের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হলেন সলিল চৌধুরী। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক আশা-নিরাশা, যন্ত্রণা আর প্রগতির স্বপ্নকে গানের ভাষায় বুনতে শুরু করলেন এই কালজয়ী স্রষ্টা। তাঁর বিশেষত্ব ছিল এখানেই যে, তিনি কেবল সুরের কারিগর ছিলেন না, ছিলেন শব্দেরও জাদুকর। নিজের গানের বাণী নিজেই রচনা করে তিনি বাংলা গানে সুরকারদের এক নতুন ও শক্তিশালী সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

সলিল চৌধুরীর এই পথ ধরে আরও একদল মেধাবী সংগীতজ্ঞ এগিয়ে এলেন, যাঁরা সুরারোপের পাশাপাশি চমৎকার কাব্যরচনায় ছিলেন সমান পারদর্শী। হীরেন বসু কিংবা জ্ঞানপ্রকাশের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের সুরের ভাবকে নিজস্ব বাণীতেই রূপ দিচ্ছিলেন। পরবর্তীকালে এই সমৃদ্ধ ধারায় যুক্ত হলেন দিলীপ সরকার, সুধীন দাসগুপ্ত, প্রবীর মজুমদার, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অমল চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রতিভাধর স্রষ্টারা। তাঁদের এই সমন্বিত প্রয়াস বাংলা গানকে কেবল শ্রুতিমধুরই করেনি, বরং করে তুলেছিল জীবনমুখী ও বলিষ্ঠ।

আধুনিক বাংলা গানের গীতিকারদের তালিকা

আধুনিক বাঙালি গীতিকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন অজয় ভট্টাচার্য, অজয় দাস, অঞ্জন কুণ্ড, অনল চট্টোপাধ্যায়, অনাদিকুমার দত্ত, অনিল ভট্টাচার্য, অবনী সাহা, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমল গুহঠাকুরতা, অমিতাভ নাহা, অমিয় চট্টোপাধ্যায়, অমিয়জীবন মুখোপাধ্যায়, অমিয় দাশগুপ্ত, অরিন্দম বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ গুপ্ত, অরুণ সেন, অলক উকিল, আনন্দ মুখোপাধ্যায়, আভা দেব, কবিতা সিংহ, কমল ঘোষ, কবিশেখর কালিদাস রায়, করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, কেষ্ট চক্রবর্তী, গিরিন চক্রবর্তী, গোপাল দাশগুপ্ত, গোপালকৃষ্ণ মুখখাপাধ্যায়, গোবিন্দ হালদার, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, জীবনময় গুহ, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, তপেন্দ্র দেব, তারক ঘোষ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী লাহিড়ী, দিনেশ দাস, দিলীপ সরকার, দিলীপকুমার রায়, দিনেন্দ্র চৌধুরী, দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, ধীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ননীগোপাল আইচ, নির্মলচন্দ্র বড়াল, নিশিকান্ত রায়চৌধুরী,  নীহাররঞ্জন চট্টোপাধ্যায়, পবিত্র মিত্র, পরেশ ধর, পান্নালাল বসু, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রকাশকালী ঘোষাল, প্রণব বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রণব রায়, প্রতিমা গঙ্গোপাধ্যায়, প্রবীর মজুমদার, প্রবোধ ঘোষ, প্রভাতকুমার গোস্বামী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, ফণীভূষণ ভট্টাচার্য, বনফুল, বরুণ বিশ্বাস, বাণীকুমার, বিনয় রায়, বিমলচন্দ্র ঘোষ, বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ভবেশ গুপ্ত, ভাস্কর বসু, মধু গুপ্ত, মনীশ ঘোষ, মনোজ বিশ্বাস, মন্টু সরকার, মিল্টু ঘোষ, মিহিরকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মীরা দেববর্মন, মুকুল দত্ত, মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহিনী চৌধুরী, রঞ্জিৎ দে, রবি গুহমজুমদার, লক্ষ্মীকান্ত রায়, শক্তিকুমার সরকার, শঙ্কর বসু, শান্তিময় কারফরমা, শিবকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, শুদ্ধস্বত্ব বসু, শৈলশেখর মিত্র, শৈলেন চক্রবর্তী, শৈলেন রায়, শৈলেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, শ্যামল গুপ্ত, সজনীকান্ত দাস, সজনীকান্ত মতিলাল, সত্যেশ্বর মুখ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সদানন্দ সিকদার, সরিৎ সেন শর্মা, সলিল চৌধুরী, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুখময় ভট্টাচার্য, সুখময় সেনগুপ্ত, সুধাংশু মল্লিক, সুধীন দাশগুপ্ত, সুধীন্দ্রনাথ মিত্র, সুনীলবরণ, সুবোধ পুরোকায়স্থ, সুহাস চৌধুরী, সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, স্বামী সত্যানন্দ, হাসান ফকরী, হিমেন নস্কর, হীরেন বসু, হেমন্ত গুপ্ত, হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং হেমেন্দ্রকুমার রায়। এই নামগুলিই আধুনিক বাংলা গানের গীতিকারদের একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংগ্রহ।

বাংলা গানের বাঁকবদল: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার টানাপোড়েন

আশির দশক পর্যন্ত আধুনিক বাংলা গানের শব্দমাধুর্যে রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী কবিত্বের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল স্পষ্ট। তবে সময়ের ব্যবধানে ইদানীন্তন গানের বাণীতে সেই রবীন্দ্র-আবেশ ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে। সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে অনুকরণ—তা সে যত বড় মাপের কবিরই হোক না কেন—মৌলিকতার পথে অন্তরায়। সেই বিচারে সমকালীন গীতিকারদের নিজস্বতা খোঁজার প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে মনে রাখা জরুরি, মৌলিকতার অন্বেষণ যেন উৎকেন্দ্রিকতায় পর্যবসিত না হয় এবং শব্দের বুনন যেন তার সহজাত কাব্যগুণ না হারায়।

সুরের ক্ষেত্রে বাংলা গান আজ পূর্বতন প্রভাব অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সবটুকুই যে ইতিবাচক, তা বলা কঠিন। সুরের বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে অনেক সময় বিজাতীয় উপাদানের সংমিশ্রণ কানে বেশ বিসদৃশ ঠেকে। বিশেষ করে বিদেশি ‘পপ’ বা ‘রক অ্যান্ড রোল’-এর অন্ধ অনুকরণ বাংলা সুরের চিরায়ত বিশুদ্ধতাকে বিপন্ন করে তুলছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে সহগামী যন্ত্রসংগীতের তীব্র কোলাহল, যা মাঝেমধ্যে গানের মূল আবেদনকেই ছাপিয়ে যায়। বাংলা গানের সুরের একটি সমৃদ্ধ ও ধারাবাহিক ঐতিহ্য রয়েছে। বৈচিত্র্যের নামে সেই ঐতিহ্যকে বিকৃত করা কোনোভাবেই কাম্য নয়; বরং সুরারোপ ও পরিবেশনার এই নেতিবাচক প্রবণতাগুলো এখনই রোধ করা প্রয়োজন।

আধুনিক বাংলা গানের ধরন

গণসংগীত: শোষিত মানুষের হৃদস্পন্দন ও জাগরণের সুর

গণসংগীত কেবল সুরের কারুকার্য বা রাগের ব্যাকরণে আবদ্ধ কোনো সৃষ্টি নয়; এর প্রাণভোমরা মিশে আছে এর শাণিত শব্দ আর বলিষ্ঠ বাণীতে। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে বাংলা গানের জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেন তিন কিংবদন্তি স্রষ্টা— সলিল চৌধুরী, পরেশ ধর ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সংগীত রচনা ও সুরারোপের গতানুগতিক ধারা ভেঙে তাঁরা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। মূলত তাঁদের হাত ধরেই নিপীড়িত ও শোষিত মানুষের আজন্ম বঞ্চনা, পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর গভীর বেদনার সুরগুলো সমবেত কণ্ঠে বা ‘যৌথগানে’ রূপ পায়।

মূল নিবন্ধ: বাংলা গণসংগীত

কোরাস গান থেকে গণসংগীতে এই উত্তরণ কেবল সংগীতশৈলীর পরিবর্তন নয়, বরং এটি ছিল একটি আদর্শিক বিবর্তন। এই রূপান্তর দেশপ্রেমের সাধারণ আকুতিকে ছাপিয়ে সমাজতান্ত্রিক চেতনার অভিমুখে যাত্রার এক অনন্য দলিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মায়াবী দেশপ্রেমকে ছাড়িয়ে গণসংগীত হয়ে ওঠে সর্বহারা শ্রেণির অধিকার আদায়ের হাতিয়ার এবং গণজাগরণের এক তীব্র দ্যোতক।[৪]

বিপ্লবী গান: মুক্তির রণতূর্য ও আগামীর ইশতেহার

বিপ্লবী গান কেবল সুরের মূর্ছনা নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এক রাজনৈতিক অঙ্গীকার। এই গানগুলো বিপ্লবের জয়গান গায়, শোষিতের বুকে সাহসের সঞ্চার করে এবং আন্দোলনের পথকে করে তোলে কণ্টকমুক্ত। ফরাসি বিপ্লবের রণধ্বনি ‘লা মার্সেইয়েজ’ কিংবা বিশ্ব কাঁপানো ‘আন্তর্জাতিক’ (The Internationale)—এই কালজয়ী সৃষ্টিগুলো প্রমাণ করেছে কীভাবে একটি গান হয়ে উঠতে পারে অগণিত মানুষের রাজনৈতিক প্রচার ও মনোবল বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার।

মূল নিবন্ধ: বিপ্লবী গান

অনেক ক্ষেত্রে সময়ের দাবি মেনে রচিত ‘প্রতিবাদী গান’ পরবর্তীতে সফল বিপ্লবের স্মারক হিসেবে বিপ্লবী গানের মর্যাদায় ভূষিত হয়। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে; কোনো বিপ্লব যখন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তখন পুরোনো অনেক প্রতিবাদী সুরকেই কখনো কখনো ‘প্রতিবিপ্লবী’ তকমা দিয়ে বর্জন করা হয়। মূলত, গণজাগরণ ও রাজনৈতিক প্রচারণার এক অপরিহার্য এবং শক্তিশালী অঙ্গ হিসেবে বিপ্লবী গান ইতিহাসের পাতায় সর্বদা অম্লান।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ১৬ মে, ২০২০; রোদ্দুরে.কম, ঢাকা; “আধুনিক বাংলা গান আধুনিককালে প্রচারিত ও প্রসারিত বাংলা গানের এক বিশিষ্ট ধারা”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/art/music/modern-bangla-song/
২. নারায়ণ চৌধুরী, চার দশকের বাংলা গান, অরুণ সেন ও গোপালকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সংকলিত, প্রকাশ ভারতী কলকাতা, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা-৫-৭।
৩. দিনেন্দ্র চৌধুরী, গ্রাম নগরের গান (১৮০০-২০০৫) লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ, সেপ্টেম্বর ২০০৯, পৃষ্ঠা ৯২-৯৩
৪. নারায়ণ চৌধুরী, চার দশকের বাংলা গান, অরুণ সেন ও গোপালকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সংকলিত, প্রকাশ ভারতী কলকাতা, মে ১৯৬০, পৃষ্ঠা-৫-৭

Leave a Comment

error: Content is protected !!