জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া গানটি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কালজয়ী জাগরণের গান। ১৯২৩ সালে রচিত এই গানটি মূলত তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় বিদ্যমান জাত-পাত, অস্পৃশ্যতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। কবি এখানে দেখিয়েছেন যে, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী এই জাতিভেদ প্রথা আসলে ধর্মের মূল শিক্ষা নয়, বরং শোষক শ্রেণির একটি স্বার্থান্বেষী চাল। নজরুলের বলিষ্ঠ ভাষায় এটি ছিল মানবতার জয়গান, যেখানে তিনি জন্মগত পরিচয়ের চেয়ে মানুষের কর্ম এবং মনুষ্যত্বকে বড় করে দেখেছেন। আজও আমাদের সমাজ থেকে সংকীর্ণতা দূর করতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এই গানটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অনুপ্রেরণাদায়ক।

জাতের নামে বজ্জাতি সব রচনার পটভূমি

কাজী নজরুল ইসলামের ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’ নজরুল গীতিটি রচনার পটভূমি নিয়ে দুটি উল্লেখযোগ্য মত প্রচলিত রয়েছে। প্রথম মতানুসারে, নজরুল তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ডাঃ নলিনাক্ষ সান্যালের বিয়ের বরযাত্রী হয়ে বহরমপুরে গিয়েছিলেন। সেখানে পঙ্ক্তি ভোজনে (একসাথে বসে খাওয়া) বসলে জাত-পাতের অজুহাতে তাঁকে বাধা দেওয়া হয়। এই সংকীর্ণতায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও অপমানিত হয়ে কবি তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রতিবাদী গানটি রচনা করেন।

দ্বিতীয় মতটি অনুসারে, গানটি রচনার প্রেক্ষাপট আরও গভীর। ১৯২৩ সালে বহরমপুর জেলে বন্দি থাকাকালীন মাদারিপুরের শান্তিসেনা অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাসের অনুরোধে নজরুল তাঁর চারণদলের নাটকের জন্য এটি লিখেছিলেন। শোনা যায়, এই নাটকের পাণ্ডুলিপিটি জেল থেকে গোপনে বাইরে পাঠানোর সময় চিরতরে হারিয়ে যায়, তবে গানটি মানুষের মুখে মুখে অমর হয়ে থেকে যায়। মূলত অস্পৃশ্যতা ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র চপেটাঘাত হিসেবেই এই গানটি নজরুল সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সম্পদ।

জাতের নামে বজ্জাতি সব পরিবেশনা

১৯২৫ সালের মে মাসের ২-৩ তারিখে (১৯-২০ বৈশাখ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ) ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের ঐতিহাসিক অধিবেশনে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কালজয়ী গান ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’ পরিবেশন করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মোহনদাস গান্ধী। অধিবেশনে নজরুল যখন তাঁর স্বভাবসুলভ বলিষ্ঠ কণ্ঠে মানবতার জয়গান গেয়ে ওঠেন, তখন গান্ধী ও চিত্তরঞ্জন দাশসহ উপস্থিত সকলেই মুগ্ধ হন। বিশেষ করে গান্ধীর অনুরোধেই নজরুল এই গানটি গেয়েছিলেন এবং এখানেই গান্ধীজির সঙ্গে কবির প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ ঘটে। জাত-পাত ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সোচ্চার এই গানটি সেদিন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক ঐক্যের এক অনন্য বারতা ছড়িয়ে দিয়েছিল, যা আজও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।

গানের কথা

জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া!
ছুঁলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয়তো মোয়া॥

হুঁকোর জল আর ভাতের হাঁড়ি—ভাবলি এতেই জাতির জান,—
তাইত বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশ’-খান।
এখন দেখিস ভারত জোড়া পঁচে আছিস বাসি মড়া,
মানুষ নাই আজ, আছে শুধু জাত-শেয়ালের হুক্কাহুয়া॥

জানিস নাকি ধর্ম সে যে বর্ম সম সহন-শীল,
তাকে কি ভাই ভাঙতে পারে ছোঁয়া ছুয়ির ছোট্ট ঢিল!
যে জাত-ধর্ম ঠুনকো এত, আজ নয় কা’ল ভাঙবে সে ত,
যাক্ না সে জাত জাহান্নামে, রইবে মানুষ, নাই পরোয়া॥

বলতে পারিস, বিশ্ব-পিতা ভগবানের কোন সে জাত?
কোন্ ছেলের তার লাগলে ছোঁয়া অশুচি হন জগন্নাথ?
ভগবানের জাত যদি নাই তোদের কেন জাতের বালাই?
ছেলের মুখে থুথু দিয়ে মার মুখে দিস ধূপের ধোঁয়া॥

আরো পড়ুন

ছায়ানটের শিল্পীদের পরিবেশনায় গানটি ইউটিউব থেকে শুনুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: গানের কথা এবং রচনার পটভূমির ইতিহাস নেয়া হয়েছে আবদুশ শাকুর, বাঙালির মুক্তির গান, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৭, পৃষ্ঠা ৫৬ থেকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!