বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই: নজরুলের এক অমর বিরহী সুরের কাব্যিক বিশ্লেষণ

বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই ঘনায় নয়নে অন্ধকার’—বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এক অসামান্য সৃষ্টি, যেখানে কবির কলমে ফুটে উঠেছে বিরহ ও বিচ্ছেদের এক মরণপণ আর্তনাদ। এটি কেবল একটি গান নয়, বরং নজরুলগীতির এক কালজয়ী করুণ রসাত্মক আবেদন। গোধূলির ম্লান আলোয় প্রিয়জনকে হারানোর যে গভীর হাহাকার এই গানে চিত্রিত হয়েছে, তা শ্রোতার হৃদয়ে এক বিষণ্ণ অনুভূতির সৃষ্টি করে। সুরের মূর্ছনা আর শব্দের নিপুণ কারুকার্যে কবি এখানে জীবনের অনিবার্য বিচ্ছেদ ও একাকীত্বকে অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

গানটি সম্পর্কে অন্যান্য তথ্য

গানটির রাগ, তাল ও প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য

‘বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই’ গানটি সংগীতের শাস্ত্রীয় বিন্যাসে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এটি মূলত মিশ্র ভীমপলশ্রী রাগে এবং একতালা তালে নিবদ্ধ। নজরুলের গানে শাস্ত্রীয় রাগের এমন করুণ রসাত্মক প্রয়োগ সচরাচর বিরল, যা বিরহের সুরকে আরও গভীর ও মরমী করে তুলেছে।

প্রকাশনার ইতিহাস ও মূল উৎস

গানটি প্রথম আলোর মুখ দেখে ১৯৩২ সালের এপ্রিল মাসে (চৈত্র ১৩৩৮ – বৈশাখ ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ)। নজরুলের বিখ্যাত সংগীত গ্রন্থ ‘সুর-সাকী’-তে (সুর-সাকী ৩) এটি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি হিসেবে এটি আজও নজরুল সংগীতের এক অনন্য সম্পদ।

কণ্ঠশিল্পী ও ঐতিহাসিক রেকর্ডিং

গানটির প্রথম রেকর্ডিং করেছিলেন কালজয়ী নজরুল গীতি শিল্পী আঙ্গুরবালা (এপ্রিল ১৯৩২, এইচএমভি রেকর্ড)। পরবর্তীতে তাঁর পথ ধরে বর্তমান সময় পর্যন্ত সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, সন্তোষ সেনগুপ্ত, শাহীন সামাদ এবং প্রিয়াঙ্কা গোপের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা এই গানে কণ্ঠ দিয়েছেন।

স্বরলিপি ও সংরক্ষণ

এই অমূল্য সৃষ্টির বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে স্বরলিপি তৈরি করেছেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ আহসান মুর্শেদ। এটি নজরুল ইন্সটিটিউট থেকে প্রকাশিত ‘নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি’-র ৩০তম খণ্ডে সযত্নে সংরক্ষিত আছে।

গানের মর্মার্থ: বিরহ ও অভিমানের এক কাব্যিক চিত্রায়ন

‘বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই’ গানটিতে কবি নজরুল বিচ্ছেদের যন্ত্রণাকে নিপুণভাবে প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। গানের এই অংশে কবির যে দর্শন ফুটে উঠেছে তা নিচে আলোচনা করা হলো:

  • প্রকৃতি ও বিরহের মেলবন্ধন: কবি বিচ্ছেদের সেই করুণ মুহূর্তটিকে দিনের শেষ অর্থাৎ সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন সন্ধ্যা নেমে এলে আলো হারিয়ে যায়, তেমনি প্রিয়জনের বিদায়ে কবির জীবনেও অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।
  • অবহেলিত প্রেমের আর্তনাদ: কবি নিজেকে স্রোতে ভেসে আসা একটি নিঃসঙ্গ ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি আশা করেছিলেন প্রিয়জনের হৃদয়ে ঠাঁই পাবেন, কিন্তু প্রিয়জন তাকে সমাদর না করে পুনরায় অবহেলার স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছে। কবির ভাষায় এটি কেবল বিচ্ছেদ নয়, বরং এক গভীর হৃদয়ভঙ্গ বা অভিমান
  • ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসার রূপক: কবি সংসারের প্রেমকে ক্ষণস্থায়ী বুনো ফুলের সাথে তুলনা করেছেন। ফুল যেমন ফোটার পর শুকিয়ে যাওয়া অবধারিত, কবির কাছে সংসারের এই মায়াও তেমনি নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী।
  • নিঃসঙ্গতার সুর: পরিশেষে, হৃদয়ের একাকীত্ব এবং প্রিয়জনের প্রতি এক ধরণের নীরব অভিযোগই এই গানটির মূল উপজীব্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সায়নী বন্দোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে

গানের কথা

বিদায়-সন্ধা আসিল ঐ ঘনায় নয়নে অন্ধকার।
হে প্রিয়, আমার, যাত্রা-পথ অশ্রু-পিছল ক’রো না আর॥

এসেছিনু ভেসে স্রোতের, ফুল
তুমি কেন প্রিয় করিলে ভুল
তুলিয়া খোঁপায় পরিয়া তা’য় ফেলে দিলে হায় স্রোতে আবার॥

হেথা কেহ কারো বোঝে না মন
যারে চাই হেলা হানে সে’ জন
যারে পাই সে না হয় আপন হেথা নাহি হৃদি ভালোবাসার।

তুমি বুঝিবে না কি অভিমান
মিলনের মালা করিল ম্লান
উড়ে যাই মোর, দূর বিমান সেথা গা’ব গান আশে তোমার॥

আরো পড়ুন

👉 বিশেষ সংকলন: নজরুল সাহিত্যের অনন্য ভাণ্ডার থেকে ঘুরে আসুন—পড়ুন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান ও প্রবন্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment