কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ হচ্ছে আবেগদীপ্ত, অপরাজেয় ও তেজস্বী। তাঁর প্রবন্ধগুলো প্রধানত দেশপ্রেম, উপনিবেশবাদ ও হিন্দু-মুসলিম ঘৃণার বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত দলিল। কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে বিদ্রোহ, স্বাধীনতা ও মানবতার জয়ধ্বনি। নজরুলের প্রবন্ধ মানেই সেকল ভাঙার গান। কবিতার মতো তাঁর প্রবন্ধও সমানভাবে আবেগদীপ্ত, ধারালো এবং সোজাসাপ্টা। পরাধীন ভারতের পঙ্কিল সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নজরুল তাঁর গদ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
নজরুলের প্রবন্ধের প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে রাজনৈতিক মুক্তি ও বিদ্রোহ। তাঁর প্রবন্ধের মূলে ছিল পূর্ণ স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। তাঁর ‘যুগ-বাণী’ এবং ‘দুর্দিনের যাত্রী’ প্রবন্ধ সংকলনগুলো ব্রিটিশ সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, যার ফলে ব্রিটিশরা এগুলো নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।
যুগবাণী প্রসঙ্গে
কাজী নজরুল ইসলামের ‘যুগ-বাণী’ কেবল একটি প্রবন্ধ সংকলন নয়, এটি ছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক জ্বলন্ত ইশতেহার। ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে এটি প্রকাশিত হয় এবং ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর প্রকাশের মাত্র এক মাসের মাথায় ব্রিটিশ সরকার এটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ করে। ১৯২০ সালে নজরুল যখন সান্ধ্য দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করতেন, তখন সেখানে প্রকাশিত তাঁর জ্বালাময়ী সম্পাদকীয় ও কলামগুলো নিয়েই এই বইটি সংকলিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। বইটিতে মোট ২১টি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে।
‘যুগবাণী’ গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগুলো হলো নবযুগ, বাঙালির ব্যবসা, আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন? ডায়ার শাহীর জুলুম, কালা আদমিকে গুলি মারা, অ-কাজে কুশলতা, উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন, কালা কানুন, মুহাজিরিন আন্দোলনের কথা, লোকমান্য তিলকের তিরোধান এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ‘উপেক্ষিত শক্তির উদ্বোধন’ প্রবন্ধে কবি সমাজের নিচুতলার সাধারণ মানুষকে ‘উপেক্ষিত শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং তাদের জাগরণের মাধ্যমেই দেশের মুক্তি সম্ভব বলে দাবি করেছেন।
আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?
এই বইয়ের আরেকটি প্রবন্ধ হচ্ছে “আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?” এই প্রবন্ধে নজরুল বাঙালির চারিত্রিক দুর্বলতা, ভীরুতা এবং হুজুগপ্রিয়তাকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। তিনি বাঙালির শক্তি স্থায়ী না হবার কারণ হিসেবে বলেছেন যে “আমরা চাকুরিজীবী”। তিনি এখানে আরো লিখেছেন, মানুষ জন্মগতভাবে চঞ্চলতা, অফুরন্ত স্বাধীনতা এবং অকৃত্রিম সরলতা নিয়ে পৃথিবীতে আসে। কিন্তু পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানাবিধ সংকীর্ণতা ও শৃঙ্খল তাকে ক্রমশ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে, যা তার সহজাত প্রাণশক্তিকে কলুষিত করে। সব ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে পরাধীনতাই মানুষের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর বিষ। এটি মানুষকে একবারে মেরে ফেলে না, বরং ঘুণপোকার মতো তিল তিল করে তার বিবেক, মনুষ্যত্ব ও জীবনীশক্তিকে শুষে নেয়। পরাধীনতার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত তার আত্মপরিচয় হারিয়ে একটি অন্তঃসারশূন্য ও মূল্যহীন অস্তিত্বে পরিণত হয়।
তিনি এই প্রবন্ধে উল্লেখ করছেন, বাঙালি জাতির বর্তমান অবক্ষয়, ভীরুতা ও মনুষ্যত্বহীনতার মূল কারণ হলো দাসত্ববৃত্তি বা চাকুরির প্রতি অতিরিক্ত মোহ। সামান্য বেতনের বিনিময়ে নিজের স্বাধীনতা ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে আমরা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চেষ্টা করি না। অথচ ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প বা কৃষির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ থাকলেও আমরা আলস্য ও সদিচ্ছার অভাবে তা গ্রহণ করি না। ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীনচেতা ও স্বাবলম্বী হওয়ার মাধ্যমেই কেবল একটি জাতি সমষ্টিগতভাবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। যেমন তিনি লিখেছেন,
আমরা দশ-পনেরো টাকার বিনিময়ে মনুষ্যত্ব, স্বাধীনতা অনায়াসে প্রভুর পায়ে বিকাইয়া দিব, তবু ব্যবসা-বাণিজ্যে হাত দিব না, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াইতে চেষ্টা করিব না। এই জঘন্য দাসত্বই আমাদিগকে এমন ছোটো হীন করিয়া তুলিতেছে।
নজরুল প্রবন্ধের শেষে বলছেন, বাঙালি জাতির জাগরণ ও মনুষ্যত্ববোধ চাকুরিজীবী মানসিকতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। পরনির্ভরশীলতা ও দাসত্ববৃত্তি মানুষের অন্তরের তেজ ও সাহসকে ধ্বংস করে দেয়। তাই বিশ্বে সগৌরবে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে চাকুরির মোহ ও পরাধীনতা ত্যাগ করা জরুরি। কারণ, বাহ্যিক কাজের স্বাধীনতা ছাড়া অন্তরের স্বাধীন শক্তি অর্জন করা এবং উন্নত জাতি গঠন করা সম্ভব নয়।
কালা আদমিকে গুলি মারা
যুগবাণী গ্রন্থের আরেকটি নিবন্ধ হচ্ছে “কালা আদমিকে গুলি মারা”। এই প্রবন্ধের মূল কথা হচ্ছে, পরাধীন জাতির চরম লাঞ্ছনা ও শাসকের বর্বরতার মূলে রয়েছে শাসিতের মেরুদণ্ডহীনতা ও কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ। শাসকগোষ্ঠী যখন প্রতিবাদহীন জনগণকে তুচ্ছজ্ঞান করে দমনে লিপ্ত হয়, তখন সেই সীমাহীন অপমানই মূলত জনমানসে বিদ্রোহের জন্ম দেয়। বর্তমানের গণজাগরণ প্রমাণ করে যে, চাবুক মেরে বা মনুষ্যত্বকে অপমান করে কোনো জাতিকে চিরকাল দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নজরুল লিখেছেন,
নেহাত অসহ্য না হইয়া পড়িলে মানুষ বিদ্রোহী হয় না। শান্তিপ্রিয় জনসাধারণ যে কত কষ্ট, কত যন্ত্রণায় তবে অশান্তকে বরণ করিয়া লয়, তাহা ভুক্তভোগী ব্যতীত কেহ বুঝিবে না; এখন মনুষ্যত্ব না জাগুক, অন্তত এই পশুত্বটুকুও আমাদের মনে জাগিয়াছে যে, মনুষ্যত্বের অপমান সহার মতো পাপ আর নাই। এ শিক্ষাও আমাদের ঠেকিয়া শিখিতে হইতেছে।
পরাধীন দেশে শাসকগোষ্ঠী আইন ও মানবিকতাকে উপেক্ষা করে নিরস্ত্র জনগণের ওপর যে নির্মম দমন-পীড়ন চালায়, তার মূলে রয়েছে শাসিতের মেরুদণ্ডহীনতা। শাসকের এই ঔদ্ধত্য ও রক্তপাত মূলত তাদের নিজেদেরই নৈতিক পতন ও ধ্বংসের পথ প্রশস্ত করে। অন্যদিকে, অত্যাচারিত জাতির অন্তরে পুঞ্জীভূত দীর্ঘশ্বাস ও জাগরণই শেষ পর্যন্ত শোষকের পতন নিশ্চিত করে এবং স্বাধীনতার পথ সুগম করে।
নজরুলের প্রবন্ধ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে। নজরুল ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঘৃণার বিরুদ্ধে এক লড়াকু সৈনিক। ‘হিন্দু-মুসলমান’ বা ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধে তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষের পরিচয়কে বড় করে দেখেছেন।
নজরুল বিশ্বাস করতেন যুবশক্তিই পারবে জরাজীর্ণ সমাজকে ভেঙে নতুন এক পৃথিবী গড়তে। ‘রুদ্র-মঙ্গল’ গ্রন্থে তাঁর এই ধ্বংস ও সৃষ্টির রূপটি প্রকট।
নজরুলের প্রবন্ধের রচনশৈলী
নজরুলের প্রবন্ধের ভাষা অত্যন্ত জোরালো এবং এতে এক ধরণের ‘বক্তৃতাধর্মী’ (Oratory) মেজাজ লক্ষ্য করা যায়। ছোট ছোট বাক্য, আবেগঘন ভঙ্গি এবং প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের সার্থক ব্যবহার তাঁর গদ্যকে এক অনন্য স্বকীয়তা দিয়েছে।
উপসংহার
নজরুলের প্রবন্ধ আমাদের অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। তাঁর গদ্য কেবল সমকালীন সমস্যা নিয়ে নয়, বরং চিরকালীন মানবমুক্তি ও সাম্যের বার্তাবাহক হিসেবে অমর হয়ে আছে।
আরো পড়ুন
- জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
- কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ হচ্ছে দেশপ্রেম ও উপনিবেশবাদ বিরোধিতার জ্বলন্ত দলিল
- কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা মূলত বিদ্রোহ, দেশপ্রেম ও মানবতার জয়গানে মুখর
- বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই ঘনায় নয়নে অন্ধকার
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- নজরুল গীতি হচ্ছে দেশপ্রেম, প্রেম, ধর্মসংগীতসহ রাগ ধারার গান
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ১৮ নভেম্বর ২০১৯, “কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ প্রসঙ্গে”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/collection/esseys-of-nazrul/
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।