গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমর সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আধুনিক বাংলা গান হলো ‘একটি দুটি তারা করে উঠি উঠি, মনকে দিলাম ছুটি’। ১০ লাইনের এই ছোট অথচ গভীর প্রেমময় গানটিতে সুরারোপ করেছিলেন কিংবদন্তি সুরকার নচিকেতা ঘোষ। শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের মায়াবী কণ্ঠে প্রথম রেকর্ড হওয়া এই গানটি মূলত গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের একটি চমৎকার অনুত্তীর্ণ গীতিকবিতা, যা আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে দোলা দেয়।
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এই গানটিতে আধুনিক বাংলা প্রেমের গানের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্যগুলো সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে। প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি এবং এক গভীর সমর্পণের সুরেলা আবেশ গানটিকে নিয়ে গেছে রোমান্টিকতার এক অনন্য উচ্চতায়। যদিও এখানে ফুল, পাখি ও চাঁদের মতো ধ্রুপদী উপমাগুলোর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, তবুও প্রকাশের ভিন্নতায় তা গানটিকে দিয়েছে এক স্নিগ্ধ ও চিরকালীন আবেদন।

গানটির কাব্যিক বিশ্লেষণ
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এই গানটিতে এক শান্ত ও মায়াবী সন্ধ্যার আবহ ফুটে উঠেছে। গানের শুরুতেই ‘একটি দুটি তারা’ ফুটে ওঠার সাথে সাথে মনের সব বাঁধন ভেঙে যেন এক মুক্তির আনন্দ প্রকাশ পায়। প্রকৃতির সাথে মনের এই মিতালি গানটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে।
গানের গভীরে গেলে দেখা যায়, প্রেমিক হৃদয়ের এক অদ্ভুত আকুতি। যেখানে ‘তোমার আমার মাঝে রবে নীরবতা’—অর্থাৎ শব্দহীন এক গভীর অনুভূতির কথা বলা হয়েছে। মৌনতার মাঝে দু-একটি কথা আর নিশিগন্ধার সৌরভে অলিদের গুঞ্জন যেন এক পবিত্র আবহের সৃষ্টি করে। সবশেষে, দূরে জেগে থাকা চাঁদ আর বাতাসের বাঁশির সুরে এক তন্দ্রাচ্ছন্ন আবেশের মধ্য দিয়ে গানটি প্রেমের এক চিরন্তন ও প্রশান্ত রূপকে তুলে ধরে।
গানের কথা
একটি দুটি তারা করে উঠি উঠি
মনকে দিলাম ছুটি তাই গো এই সন্ধ্যায়।
একটি দুটি ফুল করে ফুটি ফুটি
যেথা খুশি মুঠি মুঠি পাই গো সেথা মন ধায়।।
তোমার আমার মাঝে রবে নীরবতা
মাঝে মাঝে শুধু একটি দুটি কথা,
সেই শুনে উলু দেবে অলি নিশিগন্ধায়।।
প্রথম রাতের চাঁদ জেগে রবে দূরে
বাতাসের বাঁশি ভরে যাবে সুরে,
সেই শুনে ঢুলু ঢুলু হবে আঁখি তন্দ্রায়।।
আরো পড়ুন
- গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমূল্য সৃষ্টি: অখিলবন্ধু ঘোষের ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’ গানের সার্থকতা
- একটি দুটি তারা করে উঠি উঠি: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এক অমর সৃষ্টি
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
গানটি দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে
১. লেখাটি ১০ আগস্ট ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ১৪৬ পৃষ্ঠা থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।