রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিসিজম (Romanticism) কিংবা সাহিত্যের ইতিহাসে সুপরিচিত রোম্যান্টিক যুগ ছিল মূলত একটি সুগভীর শৈল্পিক, সাহিত্যিক, সাংগীতিক এবং মনীষাগত আন্দোলন। এই যুগান্তকারী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনটি অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপের বুকে প্রথম উদ্ভূত হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে বিশ্ব সংস্কৃতির এক বিশাল অংশকে প্রভাবিত করেছিল। ইউরোপের বেশিরভাগ অঞ্চলেই আনুমানিক ১৮০০ থেকে ১৮৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়ে এই আন্দোলনটি তার জনপ্রিয়তার চূড়ান্ত শীর্ষে আরোহণ করেছিল। সামগ্রিকভাবে রোমান্টিকতাবাদ মানুষের সহজাত গভীর আবেগ, প্রগাঢ় অনুভূতি এবং অনন্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়ার পাশাপাশি এক তীব্র অতীতচারিতা ও নিসর্গ তথা প্রকৃতির গৌরবময় বন্দনা দ্বারা গভীরভাবে চিহ্নিত হয়েছিল। এই ভাবধারার চিন্তাবিদেরা সুদূর প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ধ্রুপদী বা ক্ল্যাসিকাল যুগের কঠোর নিয়মাবদ্ধতার চেয়ে মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী সমাজ ও সংস্কৃতির নান্দনিক বৈশিষ্ট্যসমূহকে অনেক বেশি পছন্দ ও আপন করে নিয়েছিলেন।
অষ্টাদশ শতকে বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যে তৎকালীন প্রচলিত ও ধরাবাঁধা সাহিত্যতত্ত্ব তথা কৃত্রিম রীতিনীতির বিরুদ্ধে এক ধরণের তীব্র দ্রোহ ও বিদ্রোহের সূচনা ঘটেছিল। সাহিত্যের সেই প্রচলিত দেয়াল ভেঙে প্রকৃতির প্রতি অকৃত্রিম নিসর্গ প্রেম, সমাজের অবহেলিত, দরিদ্র ও নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতি গভীর সহানুভূতি এবং লোকগাথা ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের প্রতি তীব্র আগ্রহের মতো অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলি দৃশ্যমান হতে শুরু করে। এই সমস্ত উপাদানই মূলত তৎকালীন সময়ে এক বৃহত্তর এবং যুগান্তকারী সাহিত্য-আন্দোলনের দিকে স্পষ্ট অঙ্গুলি সংকেত করছিলো, যা কালক্রমে বিশ্বজুড়ে ‘রোমান্টিকতাবাদ’ নামে স্থায়ীভাবে চিহ্নিত ও সমাদৃত হয়েছিল।[১]
শিল্প বিপ্লবের প্রতিক্রিয়া এবং ইউরোপীয় সাহিত্যে রোমান্টিকতার জয়যাত্রা
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোমান্টিকতাবাদ আংশিকভাবে সমকালীন শিল্প বিপ্লবের (Industrial Revolution) যান্ত্রিকতা এবং আধুনিকতার সমস্ত বস্তুবাদী উপাদানের বিরুদ্ধে এক ধরণের তীব্র মানসিক প্রতিক্রিয়া ছিল।[২] বিশেষ করে আলোকায়নের যুগের (Age of Enlightenment) অভিজাত সামাজিক ও রাজনৈতিক কঠোর নিয়মাবলী এবং প্রকৃতির ওপর বিজ্ঞানের অতিরিক্ত যুক্তিবাদের একতরফা আধিপত্যের বিরুদ্ধেই এই আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। এই বৈপ্লবিক ভাবনাটি দৃশ্যকলা, ধ্রুপদী সংগীত এবং মননশীল সাহিত্যে সবচেয়ে শক্তিশালীরূপে মূর্ত ও প্রকাশিত হলেও, পরবর্তীতে তা ইতিহাসধারা, শিক্ষা, সামাজিক বিজ্ঞান, এমনকি প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গভীর স্তরেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। রোমান্টিক চিন্তাবিদেরা মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে উদারবাদ, আমূলসংস্কারবাদ, রক্ষণশীলবাদ এবং উদীয়মান জাতীয়তাবাদকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, যা বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য ও জটিল প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।[৩]
ইউরোপীয় সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে রোমান্টিকতাবাদের বিকাশ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যখন ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকপ্রাপ্তির যুগের বিপুল ও যুক্তিভিত্তিক কর্মকাণ্ড চলছিল, ঠিক তখনই জার্মানিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর সাতের দশকে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক আলোড়ন শুরু হয়। সাহিত্যের ইতিহাসে এটি ‘স্টর্ম এন্ড ড্রাং’ (Storm and Drang) বা ‘ঝড় ও চাপ’ আন্দোলন নামে পরিচিত, যা ছিল মূলত ক্লিংগারের ১৭৭৬ সালের একটি বিখ্যাত নাটকের উপশিরোনাম। এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল সাহিত্যের প্রচলিত কঠোর নিয়ম ও কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য ও আপসহীন জেহাদ ঘোষণা করা। প্রখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটের কালজয়ী মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘তরুণ ওয়ের্থরের দুঃখ’ (The Sorrows of Young Werther – 1774) ইউরোপীয় সমাজে প্রচলিত মুক্তির যান্ত্রিক আধিক্যের বদলে মানুষের মনের গহীন ভাবালুতা ও কল্পনাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে এই আন্দোলনের প্রথম পর্বকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলেই জন্ম নেয় রোমান্টিক ‘শিল্পী’র এক নতুন শাশ্বত ধারণা; যেখানে একজন শিল্পীকে মনে করা হতো প্রকৃতির এক বিশেষ নির্বাচিত দৈবিক শক্তি এবং তাঁর প্রতিটি শিল্পকর্ম হবে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, অভিনব ও অনন্য। প্রাপ্তবয়স্কদের কৃত্রিম সভ্যতা ও যান্ত্রিক সংস্কৃতির বিপরীতে নির্মল প্রকৃতি, নিষ্পাপ শিশু এবং আদিম অসভ্যতাকে এই যুগে আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো এবং না পাওয়ার তীব্র বেদনার মাঝেই সার্থক হয়ে উঠল চিরন্তন রোমান্টিক প্রেম।
জার্মানি ও ইংল্যান্ডের সাহিত্যাকাশে রোমান্টিকতার স্বরূপ বিশ্লেষণ
জার্মানির এই ক্লাসিক বা ধ্রুপদী পর্বে মহীরুহ গ্যেটে ছাড়াও সমান তালে লিখছিলেন হোল্ডারলিন ও শিলার-এর মতো প্রথিতযশা কবি ও নাট্যকারেরা। পরবর্তীতে নোভালিস, টিক, শ্লেগেল ভ্রাতৃদ্বয় এবং একেরনাম-রা আনুমানিক ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে জার্মান সাহিত্যের শেষ ‘রোমান্টিক’ পর্বের সূচনা করেন। তবে জার্মানিতে এই মহান রোমান্টিক আন্দোলনকে কয়েক দশক আগে থেকেই নেপথ্যে থেকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন ক্লপস্টক, উইলাভ, হার্ডারের মতো মননশীল দার্শনিকেরা এবং ফ্রান্সের বিখ্যাত চিন্তাবিদ জঁ-জ্যাক রুশো ও দিদেরো। এরাই প্রথম মানুষ ও সভ্যতার এনলাইটেনমেন্ট বা একরৈখিক প্রগতির ধারণা সম্পর্কে তীব্র সন্দেহ ও যৌক্তিক প্রশ্ন করা শুরু করেন। ফলে জার্মানিতে দর্শন, রাজনীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, বিজ্ঞান, চিত্রকলা, সংগীত এবং শিল্পকলাসহ মানববিদ্যার প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই এই আন্দোলনের এক বিশাল ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল।
এর বিপরীতে ইংল্যান্ডের বুকে রোমান্টিক আন্দোলন কিন্তু প্রধানত সাহিত্য এবং বিশেষ করে কবিতার গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ঐতিহাসিক ১৭৯৮ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও স্যামুয়েল টেলর কোলরিজের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘লিরিক্যাল ব্যালাডস’ (Lyrical Ballads) ইংরেজি সাহিত্যের এই উর্বর ও বৈপ্লবিক পর্বের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। তবে প্রতিভাবান ইংরেজ কবি ও চিত্রশিল্পী উইলিয়াম ব্লেক অবশ্য এর অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তীব্র চাবুক মেরে ‘শিল্পী-পরিত্রাতা’-কে নতুন যুগের প্রধান আহ্বায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ইংল্যান্ডে রোমান্টিক আন্দোলন খানিকটা তাদের নিজস্ব বা স্থানীয় সাংস্কৃতিক রীতি অনুসারেই গড়ে উঠেছিল। এছাড়া সমকালীন শিল্প-বিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ডের শহরগুলোতে যে দূষিত ও কলকারখানার যান্ত্রিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রকৃতির অনাবিল প্রেমকে মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ আশ্রয় বলে প্রতিষ্ঠা করা রোমান্টিকতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। প্রচলিত খ্রিষ্টধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতাপ থেকে মুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে তারা খ্রিষ্টপূর্ব প্রাচীন যুগে অথবা তথাকথিত ‘অজানা’ আফ্রিকা বা প্রাচ্যের লোকজ সংস্কৃতিতে এক ধরণের মাহাত্ম্য ও পবিত্রতা আরোপ করতেন, যা ছিল রোমান্টিক তত্ত্বের অন্যতম প্রধান অংশ বিশেষ। তার ওপর ইংল্যান্ডের এই ধারার কবিদের মনে ফরাসি বিপ্লবের (French Revolution) সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার অমোঘ বাণী গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ইংল্যান্ডে এই আন্দোলনের প্রথম পর্বে (১৭৯৮-১৮০৬) ওয়ার্ডসওয়ার্থের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে কোলরিজ, ক্র্যাব, জন ক্লেয়ার প্রমুখ সাহিত্যিকেরা লিখতে শুরু করেন। ১৮০৫ থেকে ১৮১০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কে বলা যায় স্যার ওয়াল্টার স্কট, টমাস ক্যাম্পবেল, টমাস মুর এবং রবার্ট সাদের সুবর্ণ সময়। আর এই আন্দোলনের শেষ ও সবচেয়ে উজ্জ্বল পর্বটি (১৮১৮-১৮২২) ছিল পার্সি বিশি শেলি, জন কিটস এবং লর্ড বায়রনের মতো বিশ্ব কাঁপানো কবিদের যুগ, যদিও এই যুগ-গোষ্ঠী বিভাগ নিয়ে সাহিত্য সমালোচকদের মাঝে মতান্তরের কোনো শেষ নেই।
ফ্রান্সের মাটিতে ফরাসি বিপ্লব এবং রোমান্টিকতার বিস্তৃতি
আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইংল্যান্ডের এই বিখ্যাত ও প্রধান রোমান্টিক কবিরা যখন প্রায় সকলেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমিয়েছেন, ঠিক তখনই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ফ্রান্সে এই রোমান্টিক আন্দোলনের প্রবল ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে। ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি কবি আলফনসো দ্য লামারতিনের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘মেদিতাসয় পোএতিক’ (Méditations poétiques) প্রকাশিত হয়, যা ফ্রান্সে রোমান্টিক আন্দোলনের সূচনা করে। ফরাসি সাহিত্যে এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল শিল্পকে দীর্ঘদিনের নব্য-ধ্রুপদী বা নিও-ক্ল্যাসিকাল (Neo-classical) কঠোর ও কৃত্রিম নিয়মের রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করা। এই সময়ে জার্মান কবি ও দার্শনিকদের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে মাদাম দ্য স্টায়েল রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ল আলেমন’ (১৮১০)। শুধু তাই নয়, ওঁর ঐতিহাসিক ও অভিজাত সালোঁর আড্ডার মূল কার্যাবলির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত ছিল তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল কবিদের নতুন ও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ করা। তবে ফ্রান্সে সাধারণ পাঠক ও সমালোচকেরা নব্য-ধ্রুপদী রুচিতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, লামারতিন, আলফ্রেড দ্য ভিনি, শাতোব্রিয়া কিংবা আলফ্রেড দ্য মুসে-র মতো কবিদের পক্ষে কেবল প্রতিভার জোরে নিজেদের জায়গা করে নেওয়া মোটেই সহজ সাধ্য ছিল না। অবশেষে ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি নাট্যকার ভিক্টর হুগোর বিখ্যাত ‘হেরনানি’ (Hernani) নাটকটিকে ঘিরে রক্ষণশীলদের সাথে যে ঐতিহাসিক যুদ্ধ বা তুমুল বিতর্ক হলো, তার মাধ্যমেই ফ্রান্সে রোমান্টিক যুগ চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে প্রখ্যাত ফরাসি রোমান্টিক কবি চার্লস বোদলেয়ারের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘লে ফ্লর দু মাল’ (Les Fleurs du mal – 1857) বা ‘শয়তানের ফুল’ রোমান্টিক ধারাকে অবলম্বন করেও সম্পূর্ণ নতুন এক আধুনিক কাব্যিক পথের দিশা দিলে বিশ্ব সাহিত্যে জন্ম হয় প্রতীকীবাদের (Symbolism)। এক অর্থে রোমান্টিকতার এই গর্ভেই লুকিয়ে ছিল আধুনিকতার আদি বীজ। ফরাসি লেখক স্তাদাঁল লিখেছেন যে, সব আধুনিক সাহিত্যই আসলে এক অর্থে রোমান্টিক, অর্থাৎ সব কালজয়ী সাহিত্যিকই তাঁর নিজের সমকালীন যুগে ছিলেন রোমান্টিক (যদিও সমালোচকদের মতে এটি নেহাতই এক ধরণের সাহিত্যিক অত্যুক্তি)। ইংল্যান্ডের মতোই ফ্রান্সেও রোমান্টিক আন্দোলন কেবলমাত্র সাহিত্যের আঙিনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
যদিও এই রোমান্টিকতাবাদ আন্দোলনটি প্রধানত জার্মানি, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স—এই তিনটি দেশের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ছিল, তবুও এর বাইরেও সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকায় এর বিশাল অংশীদারিত্ব ছিল। ইতালির বুকে লিওপার্দি (১৭৯৮-১৮৩৭), মানজোনি (১৭৮৫-১৮৭৩) ও উগো ফোসকোলো (১৭৭৮-১৮২৭); পোল্যান্ডের জাতীয় কবি অ্যাডাম মিকিউইক্স (১৭৯৮-১৮৮৫) ও স্লোওয়াকি (১৮০৯-৪৯); স্পেনে হোসে দে এসপ্রোনসেডা (১৮০৮-৪২); রুশ সাহিত্যের মহান জনক আলেকজান্ডার পুশকিন (১৭৯৯-১৮৩৭) ও লেরমেনতভ (১৮১৪-৪১); এবং দূর আমেরিকার মাটিতে হারম্যান মেলভিল (১৮১৯-৯৯)-এর মতো বিশ্বখ্যাত লেখকেরা এই রোমান্টিক ধারার সার্থক প্রতিনিধি ও অংশীদার ছিলেন।[৪]
রোমান্টিকতাবাদ আন্দোলনের ঐতিহাসিক সময়কাল ও দার্শনিক ভিত্তিভূমি
রোমান্টিকতাবাদ আন্দোলনের সঠিক উদ্ভব, সময়কাল এবং এর বিশ্বব্যাপী বিস্তার সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে হলে তৎকালীন সময়ের কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক ঘটনার ওপর বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়। সাহিত্য সমালোচকেরা যারা মনে করেন যে, আমেরিকার ঐতিহাসিক স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬) এবং ফ্রান্সের গৌরবময় ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) রোমান্টিকতার মূল ঐতিহাসিক ভিত্তিভূমি প্রস্তুত করেছিল, তারা মূলত একটি সুনির্দিষ্ট অর্থেই এই দাবিটি করেন। এই দুটি যুগান্তকারী বিপ্লবেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের বহুকাল ধরে প্রচলিত, বিধিবদ্ধ, যান্ত্রিক ও নিপীড়নমূলক নিয়মাবলির শৃঙ্খল ভেঙে প্রথমবারের মতো দেশের সাধারণ জনতার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রত্যাশা, স্বপ্ন ও মুক্তির আদিম সংগ্রাম বাস্তবায়িত হয়েছিল। আর এই সমগ্র জনসমষ্টি গড়ে উঠেছিল এক-একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিমানুষের সমন্বয়ে। প্রতিটি সাধারণ মানুষ যে পূর্বনির্ধারিত স্বৈরতান্ত্রিক প্রশাসনবিধির অধীনে এক বাধ্যতামূলক ও নিপীড়িত জীবনযাপন করছিল, ফরাসি বিপ্লব সেই বৃত্ত ভেঙে সাধারণ মানুষকে বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের স্বাধীন পৃথিবী গড়ে তোলার সাহস জুগিয়েছিল। পৃথিবীর যে কোনো দেশেই যে কোনো বৈপ্লবিক আন্দোলন তখনই সফল হয়, যখন এভাবে প্রত্যেক স্বতন্ত্র মানুষের মনের ও চেতনার তরঙ্গগুলো এক অভিন্ন স্রোতে বাহিত হয়ে একটি বিশাল জনসমুদ্রের সৃষ্টি করে। ইতিহাসে এই যে প্রথমবার রাজা তথা পরম ক্ষমতাশালী প্রশাসক একজন সাধারণ ব্যক্তি নাগরিককে মূল্য দিতে বাধ্য হলো—ঠিক এখানেই নিহিত আছে রোমান্টিকতার আদি বীজ, যা হলো ব্যক্তি-অনুভবের চূড়ান্ত মুক্তি এবং অক্ষুণ্ণ স্বাতন্ত্র্য।
যদিও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে প্রায় একই সময়ে রোমান্টিকতার প্রথম প্রাথমিক ধারণা অনুভূত হতে শুরু করেছিল, তবু এই দর্শনের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনার ক্ষেত্রে জার্মান দার্শনিকদের কথাই সবার প্রথমে বলতে হবে। অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে, যখন শিল্প ও সাহিত্যের বিশ্বজনীন ক্ষেত্রে প্রাচীন গ্রিক শিল্প ধারণার কঠোর ধ্রুপদী লক্ষণসমূহ তথা ক্ল্যাসিসিজম (Classicism) ছিল সর্বতোস্বীকৃত ও অমোঘ নিয়ম, তখনও কিন্তু সেই ক্ল্যাসিসিজমের সঙ্গে রোমান্টিসিজমের এক মহা-বিচ্ছেদের উর্বর ক্ষেত্র নেপথ্যে তৈরি হচ্ছিল। পরবর্তীতে ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিক নিটশে তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ ‘দ্য বার্থ অব ট্র্যাজেডি’ (The Birth of Tragedy) বা ‘ট্র্যাজেডির জন্ম’ নামক বই রচনার মাধ্যমে রূপাবয়বের বিন্যাসগত সুসংগত সৃষ্টি (অ্যাপোলোনিয়ান) এবং যুক্তি-বন্ধন-বিহীন প্রবল ভাবাবেগের অনিয়ন্ত্রিত উচ্ছ্বাসের (ডায়োনিসিয়ান) মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য করে এই দুটিকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। মূলত নিটশের এই দার্শনিক তত্ত্বের পর থেকেই ক্ল্যাসিকের প্রথাগত রূপগত এবং সংহতি-ঘন প্রাঞ্জল সৌন্দর্যের চেনা সৃষ্টিজগৎ ভেঙে অবয়ব-সংগতি বর্জিত, তীব্র ও আদিম হৃদয়াবেগের এক নতুন শৈল্পিক অস্তিত্ব চারদিকে সমাদৃত ও স্বীকার করে নেওয়া হলো। এর ফলেই শতাব্দী প্রাচীন আত্মস্থ ক্ল্যাসিক নির্মাণের দেয়াল ভেঙে বিশ্ব সাহিত্যে সগৌরবে দেখা দিল রোমান্টিকতাবাদ আন্দোলনের মর্মছেঁড়া আকুতি, যন্ত্রণা ও মানুষের পরম মুক্তির জয়গান। নিটশের মতে, মানুষের মনের গহীন অরণ্যে চিরকালই ছিল ক্ল্যাসিক ও রোমান্টিকতার এই চিরন্তন সংযোগ ও সংঘাতের এক অনন্য ও শাশ্বত পরিসর।[৫][৬][৭]
আরো পড়ুন
- রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিসিজম: শিল্প ও সাহিত্যের এক বৈপ্লবিক যুগান্তর
- উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘Tintern Abbey’: প্রকৃতি ও রোমান্টিক কাব্যের কালজয়ী আখ্যান
- She Dwelt Among the Untrodden Ways কবিতার মূল বক্তব্য ও মূল্যায়ন
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী: জন্ম, সাহিত্য ও নোবেল জয়ের ইতিহাস
- ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রদত্ত প্রকৃতির বর্ণনা হচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতির বন্ধন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
- লন্ডন, ১৮০২ বা মিল্টনের প্রতি কবিতার মূল বক্তব্য বা সার-সংক্ষেপ
- কুবলা খান কবিতাটির মূল বক্তব্য বা সারসংক্ষেপ বিষয়ক আলোচনা
- It is a Beauteous Evening, Calm and Free কবিতার মূলভাব ও সারমর্ম
- On First Looking into Chapman’s Homer কবিতার মূলভাব ও সারমর্ম
- উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ইংরেজি সাহিত্যের কবি
- পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি
- কল্পনা ও শৌখিন কল্পনা সম্পর্কে স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের বিশ্লেষণ
- জন কিটসের কবিতায় সৌন্দর্য চেতনা হচ্ছে রোমান্টিকতার বহিঃপ্রকাশ
- জন কিটসের কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সৌন্দর্যচেতনা, অতীতচারিতা ও প্রকৃতিপ্রীতি
- জন কিটস ছিলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি
- ফ্যানির প্রতি, জন কিটসের Ode To Fanny কবিতার অনুবাদ
- রোমান্টিক কবিতা হচ্ছে রোমান্টিকতাবাদী সাহিত্য আন্দোলন থেকে উদ্ভূত কবিতা
- স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ ছিলেন ইংরেজ কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং দার্শনিক
- লর্ড জর্জ গর্ডন বায়রন ছিলেন ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. চট্টোপাধ্যায়, কুন্তল।ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা; দ্বিতীয় সংস্করণ: জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা: ১৭।
২. The Editors of Encyclopaedia Britannica.Encyclopædia Britannica. “Romanticism”, Britannica Online URL (সংগৃহীত: ২৫ আগস্ট ২০২০)।
৩. Morrow, John (2011). “Romanticism and political thought in the early 19th century” (PDF). In Stedman Jones, Gareth; Claeys, Gregory (eds.). The Cambridge History of Nineteenth-Century Political Thought. The Cambridge History of Political Thought. Cambridge, United Kingdom: Cambridge University Press. pp. 39–76 (সংগৃহীত: ২৫ আগস্ট ২০২০)।
৪. বাগচী, জয়িতা।“রোমান্টিসিজম”, সুধীর চক্রবর্তী (সম্পাদিত), বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা; প্রথম সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা: ৫৬৫।
৫. চক্রবর্তী, সুমিতা।“রোমান্টিসিজম: এক কূলভাঙা সাহিত্যতত্ত্ব”, মোস্তফা আহাদ তালুকদার (সম্পাদিত), পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা পদ্ধতি, ভাষাপ্রকাশ, ঢাকা; তৃতীয় সংস্করণ: অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা: ৯১-৯২।
৬. অন্যান্য প্রকাশনা ও হালনাগাদের ইতিহাস:
- রচনাকাল ও স্থান: প্রবন্ধটি সর্বপ্রথম ২৫ আগস্ট ২০২০ তারিখে নেত্রকোনায় অবস্থানকালীন সময়ে রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল এবং ১২ এপ্রিল ২০২১ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশিত হয়েছিল।
- সর্বশেষ আপডেট: তথ্যগত নতুনত্ব, গুগলের সাম্প্রতিক নিয়মাবলী এবং পাঠকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে আজ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সম্পূর্ণ কন্টেন্টটি পুনরায় নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাইপূর্বক পরিমার্জিত, পরিবর্ধিত ও আপডেট করা হলো।
৭. প্রচ্ছদ/পেইন্টিংয়ের ইতিহাস: এই নিবন্ধের মূল প্রচ্ছদে ব্যবহৃত পেইন্টিংটি প্রখ্যাত ইংরেজ কবি ও চিত্রশিল্পী উইলিয়াম ব্লেকের (২৮ নভেম্বর ১৭৫৭ – ১২ আগস্ট ১৮২৭) একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম। এটি ওবেরন, টাইটানিয়া এবং পাক পরীদের সাথে নৃত্যরত একটি দৃশ্যকে ধারণ করে ১৮৩০ সালে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚