ডেভিড হিউম: অভিজ্ঞতাবাদ ও সংশয়বাদী দর্শনের এক অমর আখ্যান

ডেভিড হিউম (৭ মে ১৭১১ – ২৫ আগস্ট ১৭৭৬) ছিলেন একাধারে একজন স্কটিশ অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক, ঐতিহাসিক, অর্থনীতিবিদ এবং প্রাবন্ধিক। তিনি তাঁর প্রভাবশালী অভিজ্ঞতাবাদদার্শনিক সংশয়বাদ এবং প্রকৃতিবাদের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ১৭৩৯ সালে প্রকাশিত তাঁর অমর সৃষ্টি ‘এ ট্রিটিজ অফ হিউম্যান নেচার’ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি মানুষের একটি প্রকৃতিবাদী বিজ্ঞান গড়ে তোলার চেষ্টা করেন, যেখানে মানব প্রকৃতির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিই ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়। জন লকের উত্তরসূরি হিসেবে হিউম ‘সহজাত ধারণা’ বা জন্মগত জ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দাবি করেন যে, মানুষের সমস্ত জ্ঞান কেবলমাত্র অভিজ্ঞতা থেকেই অর্জিত হয়। তাঁর এই শক্তিশালী যুক্তি তাঁকে ফ্রান্সিস বেকন, টমাস হবস ও জর্জ বার্কলির মতো শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতাবাদীদের কাতারে আসীন করেছে।[১]

অনুভূতি ও ধারণা: প্রত্যক্ষণের দ্বৈত রূপ

হিউমের দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো তাঁর প্রত্যক্ষণতত্ত্ব, যা তিনি ‘এ ট্রিটিজ অফ হিউম্যান নেচার’ গ্রন্থের শুরুতেই স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, আমাদের মনের সমস্ত উপাদান বা প্রত্যক্ষণ দুটি প্রধান শ্রেণীতে বিভক্ত: অনুভূতি (Impressions) এবং ধারণা (Ideas)। হিউম মনে করতেন এই পার্থক্যটি এতটাই স্পষ্ট যে এর জন্য দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই—সহজ কথায় এটি হলো কোনো কিছু ‘অনুভব করা’ এবং সেই সম্পর্কে ‘চিন্তা করা’র মধ্যে পার্থক্য।

হিউম এই পার্থক্যের মাপকাঠি হিসেবে শক্তি, প্রাণবন্ততা এবং সজীবতাকে (যাকে হেনরি ই. অ্যালিসন ‘এফএলভি মানদণ্ড’ বলেছেন) ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে:

  • অনুভূতি: এটি হলো আমাদের সরাসরি অভিজ্ঞতা বা সংবেদন, যা অত্যন্ত তীব্র ও সজীব। যেমন—একটি গরম কড়াই স্পর্শ করলে যে তীব্র বেদনার উদ্রেক হয়, তা হলো একটি ‘অনুভূতি’।
  • ধারণা: এটি হলো সেই অভিজ্ঞতার একটি স্মৃতি বা মানসিক প্রতিচ্ছবি। গরম কড়াই স্পর্শ করার কথা মনে করা বা চিন্তা করা হলো একটি ‘ধারণা’, যা মূল অভিজ্ঞতার তুলনায় অনেক বেশি ক্ষীণ ও নিস্প্রভ।

এই তত্ত্ব থেকেই হিউমের বিখ্যাত ‘অনুলিপি নীতি’ (Copy Principle)-এর উদ্ভব হয়েছে (শব্দটি ডন গ্যারেট কর্তৃক উদ্ভাবিত)। এই নীতি অনুসারে, আমাদের মনের প্রতিটি ধারণা—তা যত জটিলই হোক না কেন—অবশ্যই কোনো না কোনো মূল অনুভূতি বা সংবেদন থেকে নকল বা অনুলিপি করা। অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো ধারণাই মানুষের মনে নিজে থেকে জন্মাতে পারে না।

জ্ঞানের সমস্যা ও ভাববাদী দর্শনের প্রভাব

হিউম জ্ঞানের সমস্যার যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন, তা পরবর্তীকালে ভাববাদী দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর মতে, জ্ঞানের মূলে রয়েছে ‘ভাব’ বা ধারণা (Idea), আর এই তত্ত্ব দর্শনে দুটি প্রধান ধারার জন্ম দেয়। জন লকের মতে ভাবের উৎস হলো অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে বার্কলে মনে করতেন ভাবের মূল ভিত্তি হলো মন। হিউম এই তর্কে যোগ দিয়ে এক চূড়ান্ত সংশয়বাদী অবস্থানে পৌঁছান। তিনি দাবি করেন, ‘বস্তু আছে কি নেই’—এই প্রশ্নের সমাধান কোনো তত্ত্ব দিয়েই সম্ভব নয়।

হিউমের মতে, মানুষ আদৌ কোনো বস্তুর সঠিক জ্ঞান লাভ করতে পারে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে বস্তুর অস্তিত্ব নেই; বরং মানুষ তাঁর সীমিত জ্ঞান দিয়ে এর সপক্ষে বা বিপক্ষে কোনো চূড়ান্ত উত্তর দিতে অক্ষম। হিউম মনে করতেন, একমাত্র অঙ্কশাস্ত্রেই সঠিক বা ধ্রুব জ্ঞান সম্ভব। কারণ অঙ্ক কোনো বস্তু নিয়ে নয়, বরং সংখ্যা ও বিমূর্ত সূত্র নিয়ে কাজ করে, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুর সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত।[২]

কার্যকারণ সম্পর্ক ও অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা

হিউমের মতে, জ্ঞানের মূল কাজ বস্তুর পরম অস্তিত্ব নির্ণয় করা নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের সহায়ক মাধ্যম হওয়া। আমরা জগৎকে যেভাবে দেখি, তা আসলে আমাদের মনের ভেতরকার ভাবের প্রবাহ (Stream of Ideas) মাত্র। কিন্তু এই ভাবের প্রকৃত উৎস কী, তা মানুষের কাছে চিরকাল অজ্ঞেয় থেকে যায়।

তিনি একটি বৈপ্লবিক কথা বলেছেন—বস্তু আছে কি নেই, এই দুটিই আসলে প্রমাণের বিষয় নয়, বরং আমাদের বিশ্বাসের বিষয়। হিউম মনে করেন, মানুষ যখন কোনো দুটি ঘটনাকে পাশাপাশি ঘটতে দেখে (যেমন: আগুনে তাপ দেওয়া এবং পানি ফুটতে দেখা), তখন সে মনে করে এদের মধ্যে একটি কার্যকারণ সম্বন্ধ (Causality) আছে। অর্থাৎ আগুন কারণ এবং পানি ফোটা তার ফল।

কিন্তু হিউম চ্যালেঞ্জ করে বলেন:

  • ঘটনার মধ্যে কারণ বা ফল বলে কিছু আছে—তা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করা যায় না
  • এটি আসলে আমাদের মনের একটি অনিবার্য অভ্যাস (Habit)
  • আমরা অতীতে বারবার এমন ঘটতে দেখেছি বলেই বিশ্বাস করি ভবিষ্যতে এমনটাই ঘটবে। একে তিনি ‘প্রকৃতির অভিন্নতা’ (Uniformity of Nature) বা এক অন্ধ বিশ্বাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

হিউমের অজ্ঞেয়বাদ ও শৃঙ্খলার ধারণা

ডেভিড হিউম অবশ্য মানুষের ভাবের রাজ্যকে অরাজক বলতে চান নি। মানুষ অভিজ্ঞতার মধ্যে অনেক ভাবকে শৃঙ্খলাপূর্ণভাবে সংঘটিত হতে দেখে। কিন্তু কার্যকারণের অস্তিত্ব সম্পর্কে বিশ্বাস এক কথা, আর তার অস্তিত্ব প্রমাণ আর এক কথা। মোট কথা, জ্ঞানের সমস্যার বিশ্লেষণে হিউম দেখাতে চেয়েছেন যে, মানুষের পক্ষে জ্ঞান অর্থাৎ বস্তুর লাভ সম্ভব নয়। এই জন্য হিউমকে অজ্ঞেয়বাদী বলে অভিহিত করা হয়।

ব্যক্তিগত পরিচয় ও গুচ্ছ তত্ত্ব (Bundle Theory)

জর্জ বার্কলির মতো ডেভিড হিউমও ব্যক্তিগত পরিচয়ের ক্ষেত্রে ‘গুচ্ছ তত্ত্ব’ সমর্থন করতেন। প্রচলিত দর্শনে মনে করা হতো মানুষের ভেতরে একটি স্থায়ী ‘আত্মা’ বা ‘সত্তা’ আছে যা সারা জীবন অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু হিউম এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন। তাঁর মতে, মন কোনো স্বাধীন বা স্থায়ী শক্তি নয়; বরং এটি হলো বিচ্ছিন্ন কিছু ‘প্রত্যক্ষের গুচ্ছ’ (A bundle of perceptions) মাত্র।

হিউম যখন নিজের অন্তরে অনুসন্ধান করেন, তখন তিনি স্থায়ী কোনো ‘আমি’ বা ‘সত্তা’ খুঁজে পান না; পরিবর্তে তিনি কেবল প্রেম, ঘৃণা, ব্যথা বা আনন্দের মতো মুহূর্তের কিছু অভিজ্ঞতা খুঁজে পান। তাঁর এই তত্ত্ব অনুসারে:

  • আত্মা হলো কার্যকারণ ও সাদৃশ্যের সম্পর্কে আবদ্ধ অভিজ্ঞতার একটি সমষ্টি বা গুচ্ছ ছাড়া আর কিছুই নয়।
  • মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয় বলতে যা বোঝায়, তা আসলে স্মৃতির মাধ্যমে সংযুক্ত কতগুলো অভিজ্ঞতার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ।

সহজ কথায়, হিউমের কাছে মানুষের মন হলো একটি থিয়েটারের মতো, যেখানে বিভিন্ন প্রত্যক্ষণ বা অভিজ্ঞতা একের পর এক আসে, চলে যায় এবং বিচিত্র ভঙ্গিতে মিশে যায়। কিন্তু এই থিয়েটারের কোনো স্থায়ী মঞ্চ বা অস্তিত্ব নেই।

নীতিবিদ্যা: আবেগ বনাম যুক্তির লড়াই

ডেভিড হিউমের নীতিবিদ্যা সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা ১৭৪০ সালে তাঁর ‘ট্রিটিজ’ গ্রন্থে শুরু হলেও ১৭৫১ সালে প্রকাশিত ‘অ্যান এনকোয়ারি কনসার্নিং দ্য প্রিন্সিপলস অফ মোরালস’ গ্রন্থে তা আরও পরিমার্জিত ও পরিণত রূপ পায়। হিউমের নৈতিক দর্শনের মূল কথা হলো—মানুষের নৈতিক কর্মের প্রকৃত চালিকাশক্তি শুষ্ক যুক্তি বা জ্ঞান নয়, বরং মানুষের অনুভূতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমাদের নৈতিক সিদ্ধান্তগুলো মূলত নৈতিক অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

হিউম অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, নৈতিকতার পেছনে যুক্তির কোনো একক আধিপত্য থাকতে পারে না। তাঁর বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ ছিল:

“নৈতিকতা আবেগকে উদ্দীপ্ত করে এবং কর্মের জন্ম দেয় অথবা তা প্রতিরোধ করে। এই বিশেষ ক্ষেত্রে যুক্তি নিজেই সম্পূর্ণ শক্তিহীন। সুতরাং, নৈতিকতার নিয়মগুলো আমাদের যুক্তির সিদ্ধান্ত নয়।”

হিউমের এই ‘নৈতিক ভাবপ্রবণতা’ (Moral Sentimentalism) তত্ত্বের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের মতের ব্যাপক মিল ছিল। তাঁরা দুজনেই তাঁদের সমসাময়িক দার্শনিক ফ্রান্সিস হাচিসনের চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। হিউমের এই দর্শনের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আধুনিক দার্শনিক পিটার সিঙ্গার দাবি করেন—নৈতিকতার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি থাকতে পারে না, হিউমের এই একক যুক্তিটিই নীতিশাস্ত্রের ইতিহাসে তাঁকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট।

‘হওয়া-উচিত’ সমস্যা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ

দার্শনিক যুক্তিবাদীদের ঘোর বিরোধী হিসেবে হিউম বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের আচরণ আদতে যুক্তি দ্বারা নয়, বরং আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাঁর সেই বিখ্যাত ও কালজয়ী ঘোষণা ছিল: “যুক্তি হলো আবেগের দাস, এবং তার কেবল তাই হওয়া উচিত।” তিনি মনে করতেন, নৈতিকতা কোনো বিমূর্ত গাণিতিক নিয়ম নয়, বরং এটি মানুষের গভীর অনুভূতি ও সংবেদনশীলতার ফসল।

হিউমই প্রথম দার্শনিক যিনি ‘হওয়া-উচিত’ সমস্যাটি (Is-Ought Problem) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর মতে, কোনো একটি ঘটনা ‘কেমন’ বা বাস্তবে ‘কী ঘটছে’ (Is), তা থেকে সরাসরি ‘কী করা উচিত’ (Ought) বা নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায় না। অর্থাৎ, শুধুমাত্র বস্তুনিষ্ঠ তথ্য থেকে আদর্শিক বা নৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যৌক্তিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ। তাঁর এই পর্যবেক্ষণ আধুনিক নীতিশাস্ত্র ও দর্শনে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা করে।

উপসংহার ও প্রভাব (Legacy)

ডেভিড হিউমের দর্শন কেবল তাঁর সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর সংশয়বাদ জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকে তাঁর “Dogmatic Slumber” বা অন্ধবিশ্বাস থেকে জাগিয়ে তুলেছিল। আধুনিক মনোবিজ্ঞান, বিজ্ঞানের দর্শনে ‘সম্ভাব্যতা তত্ত্ব’ এবং এমনকি অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের চিন্তাধারাতেও হিউমের সংশয়বাদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। একজন স্কটিশ ভাববাদী ও অভিজ্ঞতাবাদী হিসেবে হিউম মানুষকে শিখিয়েছেন কোনো কিছুকে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে অভিজ্ঞতার কষ্টিপাথরে যাচাই করতে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২৬ মে ২০১৯, “ডেভিড হিউম ছিলেন ইংরেজ ভাববাদী দার্শনিক”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/david-hume/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২০১-২০২।
৩. Hume, David (1739–40). A Treatise of Human Nature. (হিউমের মূল দার্শনিক ভিত্তি)।
৪. Hume, David (1751). An Enquiry Concerning the Principles of Morals. (নীতিবিদ্যা ও নৈতিক অনুভূতি সংক্রান্ত)।
৫. Allison, Henry E. (2008). Custom and Reason in Hume: A Kantian Reading of the First Book of the Treatise. (এফএলভি মানদণ্ড ও প্রত্যক্ষণের ব্যাখ্যা)।
৬. Garrett, Don (2002). Cognition and Commitment in Hume’s Philosophy. (অনুলিপি নীতি বা Copy Principle সংক্রান্ত বিশ্লেষণ)।
৭. Singer, Peter. The Methods of Ethics (Commentary). (হিউমের নীতিশাস্ত্রের গুরুত্ব ও যৌক্তিক ভিত্তি সংক্রান্ত আলোচনা)।

Leave a Comment

error: Content is protected !!