কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ

কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়—আধুনিক বাংলা গানের এক নিভৃত ও মরমী সৃষ্টি। প্রণব রায়ের কালজয়ী লেখনীতে সমৃদ্ধ এই গানটি মূলত ১২ লাইনের একটি নাতিদীর্ঘ কিন্তু গভীর আবেদনময় প্রেমের কবিতা। গানের চরণে চরণে আছে এক আশ্চর্য চিত্রকল্প, যেখানে কবি গেয়েছেন—মুকুল যেমন আপনারে ঢাকে বনপল্লব ছায়

সুরকার ও শিল্পীর নাম কালের গর্ভে হারানো এক অমীমাংসিত রহস্য হলেও, এর সুরের মূর্ছনা আজও সংগীতপ্রেমীদের আবিষ্ট করে। গানটি মূলত প্রেমের এক প্রশস্তিগাথা, যেখানে হৃদয়ের সমস্ত আবেগ আর আড়াল ভেঙে নিজেকে ভালোবাসার কাছে নিঃশর্তভাবে সমর্পণ করার এক আর্তি মিশে আছে। আত্মনিবেদনের এই অপূর্ব কাব্যিক প্রকাশ গানটিকে আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এক অনবদ্য ও শাশ্বত আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।

হৃদয়ের গোপন আড়াল ও আদিম সংকোচ

গানের শুরুতেই প্রেমের এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে। কবি এখানে হৃদয়ের অনুভূতিকে ‘মুকুল’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা বনপল্লবের ছায়ায় নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায়। এটি মূলত প্রেমের সেই প্রাথমিক পর্যায়, যেখানে হৃদয়ে অনুরাগের সঞ্চার হলেও তা প্রকাশ করতে এক ধরনের মধুর দ্বিধা ও জড়তা কাজ করে। প্রিয়তমের সামনে নিজেকে মেলে ধরার চেয়ে লজ্জার আবরণে ঢেকে রাখাই যেন এখানে বেশি স্বস্তির, ঠিক যেমন প্রকৃতিতে ফুল ফোটার আগে মুকুল পাতার আড়ালে সুরক্ষিত থাকে।

অব্যক্ত আর্তি ও অন্তরের নিঃশব্দ রক্তক্ষরণ

দ্বিতীয় স্তবকে শিল্পী তার মনের গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। হৃদয়ে ভালোবাসার অজস্র ‘ফুল’ ফুটলেও তা অঞ্জলি হিসেবে প্রিয়তমের চরণে তুলে দেওয়ার সাহস তিনি সঞ্চয় করতে পারছেন না। ফলে সেই অনুভূতিগুলো অজানিতেই মনের গহীনে ঝরে যাচ্ছে। এই ‘নীরবে ঝরে যাওয়া’ আসলে এক নীরব দহন, যেখানে প্রকাশের অভাবে প্রেম কেবলই দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়। এখানে প্রেম কেবল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং নিজেকে বিলীন করে দেওয়ার এক পবিত্র ব্যাকুলতা যা কেবল অন্তরেই গুমরে মরছে।

বিরহের সাহস বনাম সান্নিধ্যের ভীরুতা ও চূড়ান্ত সমর্পণ

গানের শেষাংশে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের চিত্র পাওয়া যায়। প্রিয়জন দূরে থাকলে তাকে তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়ে দেখার সাহস থাকলেও, কাছে এলে ‘ভীরু আঁখি’ লজ্জায় নমিত হয়ে পড়ে। এই লাজুকতাকে যেন প্রিয়তম ভুল না বোঝেন, সেই করুণ মিনতি এখানে স্পষ্ট। শিল্পী নিজেকে একটি ‘নিবেদিত ফুল’ হিসেবে কল্পনা করেছেন, যার অস্তিত্ব কেবল প্রিয়তমের চরণে অর্পিত হওয়ার জন্যই। নিজের জড়তাকে স্বীকার করে নিয়ে তিনি পরম ধৈর্যের সাথে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছেন, যখন প্রিয়তম নিজ গুণে তার এই কুণ্ঠিত হৃদয়কে জয় করে নেবেন।

গানের কথা

কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায় –
মুকুল যেমন আপনারে ঢাকে বনপল্লব ছায়।।

আপনারে কেন অঞ্জলি সম
পারি না তোমারে দিতে প্রিয়তম
অন্তরে মোর কত ফুল ফোটে
নীরবেই ঝ’রে যায়।।

দূরে গেলে তুমি দূর হতে চেয়ে থাকি।
ফিরে এলে কাছে মুখপানে তব চাহে না তো ভীরু আঁখি।
তবু তুমি মোরে করিয়ো না ভুল
আমি যে তোমাতে নিবেদিত ফুল
এ-হৃদয় কবে জয় ক’রে লবে
রয়েছি সে আশায়।।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ‘কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়’ কেবল একটি গান নয়, বরং এটি মানুষের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সেই চিরন্তন সংকোচের প্রতিচ্ছবি, যা ভালোবাসার আগমনে আরও বেশি প্রকট হয়। প্রণব রায়ের কালজয়ী শব্দমালা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রেম মানে কেবল উচ্চকণ্ঠের ঘোষণা নয়; বরং কখনো কখনো তা বনপল্লবের আড়ালে ঢাকা থাকা এক পবিত্র মুকুল। আধুনিকতার এই কোলাহলপূর্ণ যুগে এমন নিভৃত ও গভীর আত্মনিবেদনের সুর আমাদের হৃদয়ে এক প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। হয়তো এভাবেই কিছু গান সমকালীন হয়েও শাশ্বত থেকে যায়, আর কিছু অব্যক্ত কথা সুরের ডানায় ভর করে যুগ যুগ ধরে মানুষের মনের আঙিনায় গুনগুনিয়ে ফেরে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪ পৃষ্ঠা ১৩০-১৩১ থেকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!