ইহুদি বিদ্বেষ মানে হলো ইহুদিদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ছড়ানো। অভিশপ্ত জার শাসিত রাজতন্ত্র যখন তার শেষ দিনগুলো পার করছিল, তখন তারা অজ্ঞ শ্রমিক ও কৃষকদের ইহুদিদের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। জার আমলের পুলিশ, জমিদার এবং পুঁজিবাদীদের সাথে জোট বেঁধে ইহুদিদের ওপর পোগ্রম১ সংগঠিত করেছিল। অভাবের তাড়নায় জর্জরিত শ্রমিক ও কৃষকদের ঘৃণা বা ক্ষোভকে আসল জায়গা থেকে সরিয়ে ইহুদিদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল এই জমিদার ও পুঁজিবাদীরা।
অন্য দেশগুলোতেও আমরা প্রায়ই দেখি যে, পুঁজিবাদীরা শ্রমিকদের অন্ধ করতে এবং মেহনতি মানুষের আসল শত্রু ‘পুঁজি’ থেকে তাদের মনোযোগ সরিয়ে নিতে ইহুদিদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেয়। ইহুদিদের প্রতি এই ঘৃণা কেবল সেই দেশগুলোতেই টিকে থাকে যেখানে জমিদার ও পুঁজিবাদীদের দাসত্ব শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে চরম অজ্ঞতা তৈরি করেছে। কেবলমাত্র অত্যন্ত অজ্ঞ এবং নিগৃহীত মানুষরাই ইহুদিদের সম্পর্কে ছড়ানো মিথ্যা ও অপবাদ বিশ্বাস করতে পারে। এটি প্রাচীন সামন্তবাদের একটি অবশিষ্টাংশ—যখন পুরোহিতরা হেরিটিকদের২ আগুনে পুড়িয়ে মারত, যখন কৃষকরা দাসত্বের মধ্যে বাস করত এবং যখন সাধারণ মানুষ ছিল পিষ্ট ও নির্বাক। এই প্রাচীন ও সামন্তবাদী অজ্ঞতা দূর হয়ে যাচ্ছে; মানুষের চোখ খুলে যাচ্ছে।
ইহুদিরা মেহনতি মানুষের শত্রু নয়। শ্রমিকদের শত্রু হলো সকল দেশের পুঁজিবাদীরা। ইহুদিদের মধ্যেও মেহনতি মানুষ আছে এবং তারাই সংখ্যাগুরু। তারা আমাদের ভাই, যারা আমাদের মতোই পুঁজির দ্বারা নিপীড়িত; তারা সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে আমাদের সহযোদ্ধা। ইহুদিদের মধ্যেও কুলাক৩, শোষক এবং পুঁজিবাদী আছে—ঠিক যেমনটা রুশদের মধ্যে এবং বিশ্বের সকল জাতির মানুষের মধ্যেই আছে। পুঁজিবাদীরা বিভিন্ন ধর্ম, জাতি ও বর্ণের শ্রমিকদের মধ্যে ঘৃণা বপন ও তা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে। যারা কাজ করে না, তারা পুঁজির শক্তি ও ক্ষমতার মাধ্যমেই নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। ধনী ইহুদিরা যেমন ধনী রুশদের সাথে, তেমনি তারা বিশ্বের সকল দেশের ধনীদের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে শ্রমিকদের নিপীড়ন, চূর্ণ, লুণ্ঠন এবং তাদের ঐক্য নষ্ট করার কাজে লিপ্ত রয়েছে।
ধিক্কার সেই অভিশপ্ত জার-তন্ত্রকে, যারা ইহুদিদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়েছে। ধিক্কার তাদের, যারা ইহুদিদের প্রতি ঘৃণা ছড়ায় এবং যারা অন্যান্য জাতির প্রতিও বিদ্বেষ উসকে দেয়।
পুঁজিবাদকে উৎখাত করার সংগ্রামে সকল জাতির শ্রমিকদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আস্থা ও সংগ্রামী ঐক্য দীর্ঘজীবী হোক।৪
আরো পড়ুন
- ভ্লাদিমির লেনিন-এর ঐতিহাসিক রেকর্ডকৃত ভাষণসমূহ: একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন
- ইহুদি নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে
- দুর্ভাগা শান্তি-সমস্যার ইতিহাস প্রসঙ্গে
- প্রেসনেয়া জেলার জনসভায় বক্তৃতা
- যুব লীগের কর্তব্য
- নারী-শ্রমিকদের প্রথম সারা রুশ কংগ্রেসে বক্তৃতা
- অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে
পাদটীকা
১. পোগ্রম (Pogrom): কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত ও সংগঠিত হামলা বা গণহত্যা।
২. হেরিটিক (Heretic): প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাসের বাইরে ভিন্ন মত পোষণকারী ব্যক্তি বা ভিন্নমতাবলম্বী।
৩. কুলাক (Kulak): তৎকালীন রাশিয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থাসম্পন্ন কৃষক, যারা অন্যদের শ্রম ভাড়া করে মুনাফা করত।
৪. ভি. আই. লেনিন-এর ১৯১৯ সালের মার্চ মাসে গ্রামোফোনে রেকর্ড করা “Anti-Jewish Pogroms” ভাষণের [অনুপ সাদি] কর্তৃক করা বাংলা অনুবাদ।

ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (২২ এপ্রিল, ১৮৭০ – ২১ জানুয়ারি, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।