বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা নেত্রকোনা চিরকালই শিল্প-সংস্কৃতি ও লোকজ গানের উর্বর ভূমি হিসেবে পরিচিত। এই জনপদ যেমন জন্ম দিয়েছে মহাজনী গানের সাধকদের, তেমনি উপহার দিয়েছে ধ্রুপদী ও কাব্যসংগীতের গুণী শিল্পীদের। এমনই একজন প্রচারবিমুখ অথচ অসামান্য সংগীত প্রতিভা ছিলেন অনিল চন্দ্র তালুকদার। তিনি ছিলেন একাধারে বরেণ্য সংগীত শিল্পী, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক এবং ময়মনসিংহ সংগীত বিদ্যালয়ের দক্ষ অধ্যক্ষ।
জন্ম ও শৈশব
অনিল চন্দ্র তালুকদার ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার দনাচাপুর-নওপাড়া গ্রামে এক সাংস্কৃতিক আবহে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সুরেন্দ্র কিশোর তালুকদার। শৈশব থেকেই সুরের প্রতি এক সহজাত আকর্ষণ ছিল তার, যা তাকে পরবর্তীতে সংগীতের উচ্চতর শিক্ষার পথে ধাবিত করে।
সংগীত শিক্ষা ও সাধনা
অনিল তালুকদারের সংগীত জীবনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল কলকাতার প্রখ্যাত ‘গৌরী কেদার সংগীত বিদ্যালয়ে’। সেখানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে রাগ সংগীত, উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং আধুনিক সংগীতের ওপর দীর্ঘকালীন শিক্ষা গ্রহণ করেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের কঠিন ব্যাকরণ আয়ত্ত করার পাশাপাশি তিনি কাব্যসংগীতের নান্দনিকতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তার গায়কিতে এক বিশেষ ধরণের আভিজাত্য ছিল, যা শ্রোতাদের মুগ্ধ করত।
কর্মজীবন ও অধ্যক্ষ পদ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সেই সন্ধিক্ষণে তিনি ময়মনসিংহে ফিরে আসেন। সংগীতের প্রসারে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে মনোনিবেশ করেন। তিনি ময়মনসিংহ সংগীত বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন এবং দীর্ঘকাল অত্যন্ত সুনামের সাথে এই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বিদ্যালয়টি এই অঞ্চলের সংগীত চর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।
সংগীতের শিক্ষক ও পথপ্রদর্শক
অনিল চন্দ্র তালুকদার কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন ‘গুরুর গুরু’। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বহু স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত সংগীত শিল্পী তার সরাসরি তত্ত্বাবধানে গানের তালিম নিয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে তিনি হয়তো অনেকের মতো বহুল পরিচিত হয়ে ওঠেননি, কিন্তু এই অঞ্চলের শুদ্ধ সংগীত চর্চার প্রসারে তার অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে কাব্যসংগীতের শৈল্পিক রূপকে সাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তার নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়।
প্রস্থান ও শেষ জীবন
জীবনের অনেকটা সময় বাংলাদেশে সংগীত সাধনায় পার করার পর, তিনি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চাকদহে চলে যান। সেখানেও তিনি সুরের সাথেই কাটান জীবনের বাকি সময়টুকু। অবশেষে ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে এই নিভৃতচারী সাধক পরলোকগমন করেন।
অনিল চন্দ্র তালুকদারের মতো গুণী শিল্পীরা প্রচারের আলোয় না আসলেও তাদের রেখে যাওয়া শিষ্য এবং সুরের ধারা আজও আমাদের সংস্কৃতিকে ঋদ্ধ করে চলেছে। নেত্রকোনার এই কৃতি সন্তানকে মনে রাখা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতারই অংশ।
আরো পড়ুন
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ২১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।