শাহেরা খাতুন বাঙলার লোকসংগীত শিল্পী, পরিবেশকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

শাহেরা খাতুন বা শায়রা খাতুন (জন্ম: ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ ব. ৭ আশ্বিন, ১৩৪৫ — মৃত্যু: ০২ জুন, ২০২১ ব. ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮) হচ্ছেন বিশ শতকের উত্তর বাঙলার একজন সংগীত, কথক ও কারু শিল্পী, পরিবেশ কর্মী, প্রকৃতিপ্রেমী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাতারু, সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী বাঙালি। উত্তরবঙ্গের মেয়েলী গীতের এই শিল্পী সংস্কৃতি ক্ষেত্রে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বহুবিধ অবদান রেখেছেন। তিনি তারুণ্যে দক্ষ সাতারু এবং শিল্পানুরাগী হিসেবে চাঁপাই নবাবগঞ্জ, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং বিহারের কিষণগঞ্জ, কাটিহার, পাটনা ও পূর্ণিয়া জেলা এবং বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর জেলায় সুনাম অর্জন করেন। পেশাগত জীবনে ব্যবসায়ী ও গৃহিণী শাহেরা খাতুন জীবনের শেষদিকে শিক্ষা ও সমাজসেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।

শাহেরা খাতুন ১৯৩৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের মালদহ জেলার রতুয়া থানার মাঠিয়ারি গ্রামে এক উচ্চবিত্ত কৃষক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নূর হোসেন, মাতার নাম জমিলা খাতুন। তার দাদা জবেদ আলী মুন্না ছিলেন গ্রামে শিক্ষা বিস্তারে উদ্যোগী একজন ব্যক্তি। ভাই ও বোনেদের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো। তিনি স্থানীয় গ্রামের মক্তবে আরবি ও বাঙলা লেখাপড়া করেছেন।[১]

ব্যক্তিগত জীবন

শাহেরা খাতুনের স্বামীর নাম মো. সাবের আলী। তিনি তিন পুত্র সন্তান ও এক কন্যা সন্তানের জননী। তার বড় সন্তান লেখক ও অধ্যাপক মো. আবদুল ওদুদ, দ্বিতীয় সন্তান ব্যবসায়ী বানি ইসরাইল ও ছোট সন্তান প্রাবন্ধিক, লেখক, গবেষক ও আলোকচিত্রী অনুপ সাদি এবং একমাত্র কন্যা সুফিয়া খাতুন গৃহিণী। তার দীর্ঘ জীবনের সহকর্মী স্বামী মো. সাবের আলী ১৯৯২ সালের ২১ ডিসেম্বর মৃত্যু হলেও তিনি ভেঙ্গে পড়েননি।

শাহেরা খাতুনের অভিবাসন

শাহেরা খাতুনের স্বামীর পরিবার ১৯৪৮ সালেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসলেও বয়স অল্প থাকার কারণে এবং পিতামাতার অনিচ্ছায় তিনি বাংলাদেশে আসতে দুবছর দেরী করেন। অবশেষে ১৯৫০ সালে তিনি পিতার পরিবারের সাথে স্বামীর নতুন স্থাপিত গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। তার প্রথম সন্তান লুৎফর রহমান ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করে এবং ১৯৭০ সালের দিকে মৃত্যুবরণ করে।

আরো পড়ুন:  মানুষ ও তার পরিবেশ এবং মানুষের স্বরূপ সম্পর্কে আবুল কাসেম ফজলুল হক

কর্ম জীবনে শাহেরা খাতুন

শাহেরা খাতুন শৈশবেই বিভিন্ন জনের বিবাহের অনুষ্ঠানে মেয়েলী গীত গাওয়া শুরু করেন। মেয়েলী গীত দলের সদস্য হিসেবে তিনি এসব গান গাইতে পারতেন। প্রায় শতাধিক গান তিনি মুখস্থ করেছিলেন। গ্রামে গ্রামে মেয়েলী গীত ও বিয়ের গীত জনপ্রিয়করণে তার অবদান আছে। ১৯৪৫ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিবাহ ও গায়ে হলুদের সময় মেয়েলী গীত গাইতেন।

এছাড়াও মালদহ জেলার খাবারকে ঠাকুরগাঁও জেলায় জনপ্রিয়করণে তিনি ভূমিকা গ্রহণ করেন। চারুশিল্পে দক্ষ এই নারী নকশি কাঁথা ও সুজনী কাঁথা সেলাই করতে পারতেন। মারা যাবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি পর্যন্ত আগ্রহ সহকারে কাঁথা সেলাই করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের তরুণীদেরকে কাঁথা সেলাইয়ে আগ্রহী করেছেন।

১৯৪৮ সালে সাবের আলির সংগে বিবাহসূত্রে এবং স্বামীর কাজকর্মে যুক্ত হয়ে তিনি পরিব্রাজক হিসেবে এবং স্বামীর আলকাপ গান ও লাঠি খেলার সহযোগী হিসেবে প্রদর্শনীতে অংশ নিতে মালদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কিষণগঞ্জ, কাটিহার, পাটনা, পূর্ণিয়া ও অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন জায়গায় দেশ ভাগের পূর্বে ও পরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। এছাড়াও ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পূর্ববঙ্গের ঠাকুরগাঁও থেকে পশ্চিমবঙ্গের মালদহে পারিবারিক প্রয়োজনে বহুবার গমনাগমন করেন।

সামাজিক কর্মকাণ্ডে শাহেরা খাতুন

শাহেরা খাতুন পরিবারসমেত ১৯৫২ সালে দেশভাগের পর দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার হরিপুর থানার দামোল গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। অত্যন্ত পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল ও অধ্যবসায়ী হবার কারণে তিনি কৃষিকাজেও দ্রুত সফলতার মুখ দেখেন। ১৯৪৯-৫০ সালের দিকে স্বামী ও শ্বাশুড়ি আসমা খাতুনের ঐকান্তিক ইচ্ছাতে বীরগড় দারুল উলুম খারেজী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে ভূমিকা রাখেন। তারা এই মাদ্রাসায় ৫ বিঘা জমি দান করেন। শাহেরা খাতুন বাড়ীর পাশে একটি মসজিদ এবং বাড়িতে বৈঠকখানা তৈরি করেন যা সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিলো।

পঞ্চাশের দশক জুড়ে শাহেরা খাতুন ও সাবের আলী দম্পতিদ্বয় মাতা আসমা খাতুনের প্রেরণায় বীরগড় মাদ্রাসার বহু ছাত্র শিক্ষকদের সাহায্য সহযোগিতা ও অনুদান দিতে গিয়ে শিক্ষানুরাগী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে নিজগ্রামে শিহিপুর মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে শাশুড়ির সঙ্গে অবদান রাখেন। তাদের বাড়িতে জায়গীর হিসেবে থেকে বহু ছাত্র লেখাপড়া করেছেন।

আরো পড়ুন:  বড় ফুপু শাহেরা খাতুন ছিলেন পুরো পরিবারের তথ্য ভাণ্ডার

শাহেরা খাতুনের অদম্য ইচ্ছা ছিল প্রতিটি সন্তানকে শিক্ষিত করে তোলা। তার চারটি সন্তানকেই তিনি বীরগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রণহাট্টা চৌরঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করিয়েছেন। বড় সন্তান আবদুল ওদুদের উচ্চশিক্ষা ও অন্যান্য সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় নির্বাহ করার সমস্যা ও ব্যবসায়িক মন্দায় তার স্বচ্ছলতা কমতে থাকে। তদুপরি তিনি আশপাশের স্কুল ও মাদ্রাসার সকল শিক্ষকদেরকে সহমর্মিতার বন্ধনে জড়িয়ে রেখেছিলেন।

রাজনৈতিকভাবে সচেতন এই মানুষটি ১৯৭০ সালের পূর্বে কৃষক প্রজা পার্টির অনুরাগী ছিলেন। ১৯৮৬ সালের দিকে মেজ ছেলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির খেতমজুর সমিতিতে যোগ দিলে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির অনুরাগী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে সিপিবি ও বাসদের জনসভাসমূহে যোগ দিয়েছেন।

পরিবেশ রক্ষায় শাহেরা খাতুন

শাহেরা খাতুন শৈশব থেকেই ভালো মানের সাতারু ছিলেন। তিনি বিবাহের পরে প্রাকৃতিক কৃষির উপর মনোযোগ দেন, কৃষি কাজ শেখেন। পরিবেশ সম্পর্কে নিজ আগ্রহে প্রকৃতি থেকে শেখেন। বন্য প্রাণী ও পাখির উপরে আগ্রহ জন্মে। বীজ সংরক্ষণ ও উদ্ভিদ প্রাণী সংরক্ষণের জন্য নিজ জমিতে ফলজ ও ঔষধি উদ্ভিদের বাগান তৈরি করেন।

বন্য প্রাণী ও পাখি সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় জোতদারদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালনা করেন, উল্লেখ্য তখন এয়ারগান দিয়ে পাখি হত্যার রেওয়াজ চালু ছিল। গ্রামের পরিবেশ রক্ষা করবার জন্য তিনি নিজ জমিতে প্রায় ৫০ প্রজাতির গাছপালার বাগান করেন। এছাড়াও অন্তত শখানেক দেশি জংলী অবাণিজ্যিক প্রজাতির উদ্ভিদ রক্ষা করেছেন যা পশুপাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে টিকে ছিল।

ব্যবসা ও কৃষিকাজে অবদান

দুর্ভাগ্যবশত দম্পতিদ্বয় থ্যালাসেমিয়ার বাহক হওয়ায় তাদের বড় সন্তান লুৎফর রহমান ১৯৭০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বড় সন্তান লুৎফর ১৫ বছর জীবিত ছিলেন। শাহেরা খাতুনের পরিবার বিভিন্ন প্রকার ভোজ্য তৈল, পেট্রোলিয়ামজাত তৈল, বেকারী আইটেম, দেশী-বিদেশী ফল এবং ধান চাউলের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন এবং এই ব্যবসা পঞ্চাশ-ষাটের দশকে চালিয়ে আর্থিক উন্নতি লাভ করেন এবং প্রয়োজনীয় ভূসম্পত্তির মালিক হন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধ পরবর্তী অভাবের সময়ে বড় আকারে ব্যবসা করা তার দ্বারা সম্ভব না হলেও স্বল্প পরিসরে আশির দশকেও ব্যবসা চালিয়ে গেছেন এবং কৃষিকাজ করেছেন।

আরো পড়ুন:  সাবের আলী ছিলেন বিশ শতকের সাতারু, ক্রীড়া ও শিক্ষানুরাগী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

ভ্রমণ ও জনসংযোগ কাজে

শাহেরা খাতুনের বড় ও ছোট সন্তান রাজনীতিতে দীর্ঘদিন যুক্ত থাকার কারণে তিনি পারিবারিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অবিরাম সহযোগিতা করে গেছেন। সন্তানদের সাথে সামাজিক রাজনৈতিক কাজে তিনি ময়মনসিংহে ২০১২ সালে বেশ কয়েকবার জনসভায় অংশগ্রহণ করেছেন। ২০০৭ সালের জুন মাসে তিনি নরসিংদীতে প্রায় মাসখানেক অবস্থান করেন। এছাড়াও তিনি ২০০৩ সাল থেকে ২০২১ সালের ভেতরে বহুবার ঢাকা, নরসিংদী, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর অঞ্চলে ঘুরেছেন এবং গণমানুষের সাথে কথা বলেছেন। শাহেরা খাতুন সারা জীবন মানুষ ও প্রকৃতির জন্য অবিরাম কাজ করে গেছেন।

মৃত্যু

শাহেরা খাতুন ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ২ জুন বিকেল ৪ টায় তিনি ৮৩ বছর বয়সে রাণীশংকৈল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যু বরণ করেন।[২] পরদিন তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার দামোল গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কিডনি দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতায় ভুগছিলেন।[৩]

টিকা

১. অনুপ সাদি, ৮ মে ২০২০, “শাহেরা খাতুন বাঙলার লোকসংগীত শিল্পী, পরিবেশকর্মী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/shahera-khatun/
২. ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা, ২ জুন ২০২১, “লোকসংগীত শিল্পী ও পরিবেশ কর্মী শাহেরা খাতুন মারা গেছেন“, দিনবদলবিডি ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.dinbodolbd.com/country/news/24713
৩. লেখাটি ৮ মে ২০২০ তারিখে রচনা করা হয় এবং সেদিনই রোদ্দুরে ডট কমে প্রকাশ করা হয়। সেখান থেকে কিছুটা পরিবর্ধিত আকারে ফুলকিবাজে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment

error: Content is protected !!