গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জীবনী ও জনপ্রিয় গানের তালিকা

আধুনিক বাংলা সংগীত ও স্বর্ণযুগের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক কালজয়ী নাম গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার (৫ ডিসেম্বর ১৯২৫ – ২০ আগস্ট ১৯৮৬)। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে বাংলা গানের জগতকে যারা প্রেম, বিরহ আর আবেগের মূর্ছনায় মাতিয়ে রেখেছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। কেবল একজন বিশিষ্ট গীতিকার ও সুরকার হিসেবেই নয়, বরং বাঙালির হৃদস্পন্দন বুঝতে পারা এক শব্দসৈনিক হিসেবে তিনি আজও অমর। তার রচিত অজস্র জনপ্রিয় গান আজও শ্রোতাদের মনে সমানভাবে দোলা দেয় এবং বাংলা সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

জন্ম ও শৈশব:

কালজয়ী এই গীতিকারের শৈশব কেটেছে বর্তমান বাংলাদেশের পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে। ১৯২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর (মতান্তরে ১৯২৪) এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পরিবারের সবার কাছে তিনি ‘বাচ্চু’ নামেই পরিচিত ছিলেন। তাঁর পিতা গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন তদানীন্তন সময়ের প্রখ্যাত উদ্ভিদবিদ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যাপক। অধ্যাপক পিতার সুযোগ্য ও মেধাবী সন্তান হিসেবে গৌরীপ্রসন্ন ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন। যদিও পিতা ছিলেন বেশ গুরুগম্ভীর ও শাসনপ্রিয়, তাই তাঁর চোখ এড়িয়েই লুকিয়ে লুকিয়ে ইংরেজি কবিতা লিখতেন তিনি। সেই কিশোর বয়সেই তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠতে শুরু করে বাংলা কবিতার নান্দনিক ছন্দ।

সংগীত জগতে পদার্পণ ও সাহিত্য সাধনা

প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালীন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ দুই বন্ধুকে পাশে পান—কবি অরুণ মিত্র এবং প্রখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষ। তাঁদের ঐকান্তিক উৎসাহেই তিনি প্রথম গান রচনায় হাত দেন এবং সেই গানে সুরারোপ করেন নচিকেতা ঘোষ। বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এই প্রতিভাবান গীতিকার কেবল বাংলা গানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তাঁর রচিত অজস্র ইংরেজি গানও রয়েছে, যা আজও অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে বা অনতিপ্রচারিত থেকে গেছে। আশ্চর্য হলেও সত্য যে, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রচারবিমুখ। নিজের কাজ নিয়ে ঢাকঢোল পেটানো পছন্দ করতেন না বলেই হয়তো জীবদ্দশায় তাঁর মাত্র একটি গীত-সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল, যা বর্তমানে দুষ্প্রাপ্য এক সংগ্রহে পরিণত হয়েছে।

সাফল্য ও সংগীতের স্বর্ণযুগ:

গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমর সৃষ্টিগুলোকে সার্থক রূপ দিতে সুরের মায়াজালে জড়িয়েছেন সমসাময়িক বহু নিরীক্ষাপ্রবণ সুরকার। তাঁদের মধ্যে নচিকেতা ঘোষ, রবীন চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুধীরলাল চক্রবর্তী, অনুপম ঘটক এবং অপরেশ লাহিড়ীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর গান গেয়ে যেমন শিল্পীরা কিংবদন্তি হয়েছেন, তেমনি শিল্পীদের অনবদ্য গায়কীও তাঁর গানগুলোকে অমরত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং মান্না দের কণ্ঠে তাঁর গানগুলো বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। আধুনিক বাংলা গান এবং চলচ্চিত্র—উভয় মাধ্যমেই তাঁর লেখনী ছিল সমান শক্তিশালী। কলকাতা থেকে বোম্বাই (মুম্বাই) পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। গান রচনার পাশাপাশি তিনি অনেক সফল চলচ্চিত্রের কাহিনী ও চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভারই পরিচয় দেয়।

জনপ্রিয় গান:

পুরস্কার ও মহাপ্রয়াণ:

বাংলা সংগীতে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার তাঁর কর্মজীবনে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাঁর লেখনীকে করেছিল আরও সমৃদ্ধ ও বিশ্বজনীন। সংগীত জগতের প্রতিটি মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয় এবং নির্ভরতার এক নাম। তৎকালীন সময়ের ব্যস্ততম এই গীতিকার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুর ও শব্দের মাঝেই নিজেকে নিমগ্ন রেখেছিলেন। অবশেষে ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট কলকাতায় চিরবিদায় নেন এই কিংবদন্তি। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সংগীত জগতের একটি স্বর্ণালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও, তাঁর সৃষ্টি আজও বাঙালির হৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসুত্র:

১. দোলন প্রভা, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ “গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার আধুনিক বাংলা গানের একজন বিখ্যাত গীতিকার”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/gauriprasanna-mazumder/

২. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত(১ বৈশাখ ১৩৯৪)। আধুনিক বাংলা গান। প্যাপিরাস, কলকাতা । পৃষ্ঠা: ১৬৮-১৬৯।

Leave a Comment