অজয় ভট্টাচার্য ছিলেন আশাবাদী, রোমান্টিক গীতিকার ও কবি

অজয় ভট্টাচার্য (জুলাই, ১৯০৬ – ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৪৩) একজন বিখ্যাত বাঙালি কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও চিত্রপরিচালক। হিমাংশু দত্ত ও শচীন দেব বর্মন সহ বহু সুরকারের সুরে ও বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে তাঁর লেখা বেশ কিছু গান চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর অনেক গান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মধ্যবিত্তের জীবনে প্রেমের দোলা দিয়েছে তাঁর গান।[১]

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

অজয় ভট্টাচার্য কুমিল্লার শ্যামগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। কৃতি ছাত্ররূপে তিনি ১৯২৯ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান এবং ১৯৩৩ সালে যান কলকাতায়। তিনি কলকাতায় গিয়েছিলেন কুমার শচীন দেব বর্মণ, তাঁর বাল্যকালের বন্ধুর অনুরোধে, শচীন দেব বর্মণের গানের কলি লিখবার জন্য।

কর্মজীবন:

চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন রেকর্ড—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর লেখা গান সাড়া জাগিয়েছিল। হিমাংশু দত্ত সুরসাগরের সুরে তাঁর লেখা গান চল্লিশ দশকের কলকাতার সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগায়।

বাংলা সবাক চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই তাঁর লেখা গান রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজ মল্লিক, শচীন দেববর্মণ ও অনুপম ঘটকের সুরে সারা দেশে বারে বারে উচ্চকিত হয়ে ওঠে। এর ফলে চিত্রজগতের সাথে তাঁর অন্যতর সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

চলচ্চিত্রের কাহিনী ও সংলাপ রচনায় মন দেন তিনি। অধিকার, শাপমুক্তি, নিমাই সন্ন্যাস, মহাকবি কালিদাস ইত্যাদি চলচ্চিত্রের কাহিনী বা সংলাপ লেখেন। অশোকছদ্মবেশী নামের দুটি চলচ্চিত্রও তিনি পরিচালনা করেন।[১]

অজয় ভট্টাচার্য-এর গানে প্রেমের বহিঃপ্রকাশ:

স্বল্পায়ু জীবনে অজয় ভট্টাচার্য দুই হাজারেরও বেশি গান লিখেছিলেন। বাংলা গানে, কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরে, অজয় ভট্টাচার্য্য সব থেকে বেশি গানের কলি লিখেছেন।[২] সেসব গানে বেদনাবিধুর প্রণয়-স্বপ্নের মহিমা এবং রোমান্টিক বাসনা-বিলাসের দোলাচল গীত-রসিক সমাজে সাড়া জাগায়।

অজয় ভট্টাচার্যের অনেক গান আমাদের আশাবাদী করে তোলে। দুঃখের ভেতরে থেকেও তিনি আশার প্রদীপ জ্বেলে রাখেন। ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কি রে?’ গানটিতে তিনি বলেছেন, ‘হাসবি তোরা বাঁচবি তোরা, মরণ যদি আসেই ফিরে।’

আরো পড়ুন:  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ

তবে তাঁর আশাবাদ আমাদের বিদ্রোহী হতে সাহায্য করে না। বরং তাঁর আশাবাদ আমাদের কাছে হয়ে ওঠে এক রোমান্টিক মনোবেদনা। তিনি দুঃখকে বরণ করতে আমাদেরকে সাহসী করেন; কিন্তু দুঃখের কারণগুলোকে উপড়ে ফেলার জন্য পথ বাতলে দেন না।

বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রেম, আশা আর মনোবেদনার কানাগলিতে অজয় ভট্টাচার্যের ঘোরাফেরা। বাংলা গণসংগীতের দিকে তিনি যেতে পারেননি।

জনগণের মুক্তিসংগ্রাম আর স্বাধীনতার আলো তিনি গানে আনতে হয়তো পারেননি। অথচ তাঁর গানে আলো শব্দটি বহুলব্যবহৃত। এই আলো দ্বীপশিখা হয়ে বন্ধুর মনে জ্বালানোর জন্যে।

বাঙালি মধ্যবিত্তের বিরহ-বিধুর ছিঁচ-কাঁদুনে যন্ত্রণার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে এই বিখ্যাত গীতিকারের গানে। নিচে অজয় ভট্টাচার্যের দশটি গানের লিংক দেয়া হলো, আপনারা লিংকে ক্লিক করে গানগুলো পড়তে পারবেন।

অজয় ভট্টাচার্য-এর গান ও কবিতার সংকলন:

তাঁর প্রখ্যাত গানগুলি পরে অনেকগুলি সংকলন আকারে প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে শুকসারি, সুরের লিখন, একদিন যবে গেয়েছিল পাখি, আজো ওঠে চাঁদ, আমার দেশে যাইও সুজন, যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

তিনি বেশ কিছু কবিতাও লিখেছিলেন তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ রাতের রূপকথা, ঈগল ও অন্যান্য কবিতা, সৈনিক ও অন্যান্য কবিতা, ইত্যাদি। ১৯৪৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তাঁর প্রয়াণ ঘটে।[৩][৪]

১. দুঃখে যাদের জীবন গড়া তাদের আবার দুঃখ কি রে?
২. তুমি যে গিয়াছ বকুল-বিছানো পথে
৩. চৈত্র দিনের ঝরা পাতার পথে
৪. ছিল চাঁদ মেঘের ওপারে বিরহীর ব্যথা লয়ে
৫. জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা
৬. এ গান তোমার শেষ করে দাও
৭. আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে
৮. আমার ব্যথার গানে তোমায় আমি
৯. কথা কও দাও সাড়া
১০. সে নিল বিদায় না বলা ব্যথায়

তুমি যে গিয়াছ বকুল বিছানো পথে গানটি ইউটিউবে শুনুন:

অজয় ভট্টাচার্যের লেখা গান, সে নিল বিদায়

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৮ জুন, ২০১৮ “অজয় ভট্টাচার্য বিখ্যাত বাঙালি কবি এবং আধুনিক রোমান্টিক গানের গীতিকার”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/ajoy-vottacharya/

আরো পড়ুন:  উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ইংরেজি সাহিত্যের কবি

২. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত(১ বৈশাখ ১৩৯৪)। আধুনিক বাংলা গান। কলকাতা প্যাপিরাস। পৃষ্ঠা ১৬৫।

৩. সুখময় ভট্টাচার্য, আজো ওঠে চাঁদ (গীতি সংগ্রহ), ভূমিকা, কালিকা প্রেস লি. কলকাতা, প্রথম সংস্করণ মাঘ ১৩৫২, পৃষ্ঠা ভূমিকাংশ ৬-৭।

৪. দীপেশ চক্রবর্তী, “গীতিকারের আধুনিকতা: অজয়কুমার ভট্টাচার্য” শারদীয়া ‘বারোমাস’ পত্রিকা, ২০১০ পৃষ্ঠা ৭০-৭৭।

৫.প্রধান সম্পাদক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, সম্পাদক অঞ্জলি বসু (দ্বিতীয় মুদ্রণ: ২০১৩)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খন্ড)। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ পৃষ্ঠা ৬ আইএসবিএন 978-81-7955-135-6।

Leave a Comment

error: Content is protected !!