কবিতা শব্দের এবং ছন্দের আন্তঃব্যবহারের উপর ভিত্তি করে একধরণের সাহিত্য

কবিতা বা পদ্য (ইংরেজি: Poetry) হচ্ছে শব্দ এবং ছন্দের আন্তঃব্যবহারের উপর ভিত্তি করে রচিত একধরণের সাহিত্য। এটি প্রায়শই ছড়া এবং ছন্দ নিয়োগ করে (প্রতিটি লাইনে শব্দাংশের সংখ্যা এবং বিন্যাস পরিচালনা করে এমন নিয়মের একটি ঝাঁক)। কবিতায় ধ্বনিগুলি শব্দ, চিত্র এবং ধারণাগুলি গঠনের জন্য একত্রিত হয় যা সরাসরি বর্ণনার ক্ষেত্রে খুব জটিল বা বিমূর্ত হতে পারে। অর্থাৎ কবিতা হলো একধরণের সাহিত্যের রূপ যা ভাষার নান্দনিক এবং ছন্দযুক্ত গুণাবলী যেমন ধ্বনিসৌন্দর্যতত্ত্ব, প্রতীকবাদ এবং ছন্দ ব্যবহার করে দৃশ্যমান সাধারণ অর্থের পরিবর্তে অনিবার্য ভাবার্থের অর্থ বোঝাতে উপমা-উৎপ্রেক্ষা-চিত্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবহৃত হয়।

কবিতা কবিতা নিয়ে কথা বলা যতো সহজ এর সংজ্ঞার্থ নির্ণয় করা ততোটা সহজ কাজ নয়। কবিতা পছন্দ করে না পৃথিবীতে এরকম লোকের সংখ্যা খুবই কম। কবিতা সম্পর্কে যতো আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে, সাহিত্যের অন্য কোনো রূপ নিয়ে তা হয়নি। প্রত্যেক সচেতন সংবেদনশীল মানুষের মধ্যেই কবিতার প্রতি আকর্ষণ রয়েছে। মানুষের বিস্ময়, স্মৃতি, স্বপ্ন, কল্পনার এক অপরূপ মিশ্রণে কবিতার সৃষ্টি। ব্যক্তির অনুভূতি, আবেগ, রহস্যানুভূতি প্রতিফলন ঘটায় প্রতিটি যথার্থ কবিতাই এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি। যথার্থ বলার কারণ, অনেক অনুকারী কবিতা আছে যেখানে মৌলিক অনুভবের পরিবর্তে অন্য কোনো কবির অনুভুতি, আবেগ ও সৃষ্টিশীল কল্পনার প্রতিধ্বনিই মুখ্য হয়ে ওঠে। 

উপরের আলোচনা থেকে অনুমান করা সম্ভব যে, কবিতার সংজ্ঞার্থ নির্ণয় সহজ কাজ নয়। তবুও সাহিত্যের প্রতিটি শাখারই একটি মৌলিক মানদণ্ড আছে। সে মানদন্ড বিচার করে কবিতা সম্পর্কেও একটা মোটামুটি ধারণা অর্জন করা যেতে পারে। বিশেষ অনুভূতি প্রকাশের জন্য শব্দগুচ্ছের তাৎপর্যময় বিন্যাস থেকে কবিতার সৃষ্টি। কিন্তু এ-ধারণাও পূর্ণাঙ্গ নয়। আরো সুস্পষ্ট করে বলা যায় আবেগ, অনুভূতি, স্বপ্ন, কল্পনা প্রভৃতি ব্যক্তিমানসের সাধারণ প্রবণতার অংশ; এগুলোর সঙ্গে যখন সৃষ্টিশীলতা যুক্ত হয়, অনিবার্য শব্দের তাৎপর্যময় বিন্যাস তাকে করে তোলে ব্যঞ্জনাময়। তখনই একটি কবিতার জন্ম সম্ভব হয়। এ-আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি কবিতার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের বিশ্লেষণ  থেকে আমরা একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা করতে পারি।[১]

রাজনৈতিক কবিতা হচ্ছে সেসব কবিতা যেগুলো রাজনীতি এবং কবিতাকে একত্রিত করে। কবিতা এবং রাজনীতি অনুভূতি এবং অভিব্যক্তির মাধ্যমে সংযোগ করে, যদিও এদের উভয়ই প্ররোচনার বিষয়। রাজনৈতিক কবিতা মানুষের অনুভূতির সাথে সংযোগ স্থাপন করে এবং অন্যদিকে রাজনীতি বর্তমান ঘটনার সাথে সংযোগ স্থাপন করে। কবিতা রাজনীতিকে উল্লেখ করতে পারে এবং রাজনীতির উপলব্ধিতে সত্যিকারের প্রভাব ফেলতে পারে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে মাতৃভাষাপ্রেম ও গভীর দেশাত্মবোধ। কবি সনেটের আঙ্গিকে নিজের জীবনেতিহাস পর্যালোচনা ও আত্ম বিশ্লেষণণ থেকে মাতৃভাষার টানে স্বদেশ প্রেমে উজ্জীবিত হয়েছেন। চৌদ্দ মাত্রার চৌদ্দ চরণের সংক্ষিপ্ত পরিসরে অনিবার্য কিছু শব্দের বিন্যাসের মাধ্যমে কবি নিজ অনুভূতি, আবেগ, স্মৃতি, স্বপ্ন ও বাস্তব প্রাপ্তির পরিপূর্ণ ছবি তুলে ধরেছেন এই কবিতায়। ‘বলাকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ আবেগের বেগকে স্মৃষ্টিজগতের অন্তর্নিহিত অবিরাম গতির ছন্দে অনুভব করেছেন। এ-কবিতায় শব্দ-ব্যবহার ও ছন্দ-পরিকল্পনা কবির অনুভূত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাতায়ন পাশে গুবাক-তরুর সারি’ কবিতায় প্রেমচেতনা ও প্রকৃতিচেতনার অনুপম মেলবন্ধন ঘটেছে। ‘বনলতা সেন’ সম্ভবত বাংলা সাহিত্যের বহুল পঠিত কবিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্যক্তিপ্রেম কিংবা দেশপ্রেম যাই-ই ব্যক্ত হোকনা কেন, হাজার বছরের পথচলার ক্লান্ত পরিব্রাজক যখন উচ্চারণ করে – বলেছে সে, “এতদিন কোথায় ছিলেন?/ পাখির নীড়ের মত চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” — তখন দেশকালের সীমা লুপ্ত হয়ে মানুষের চির আকাঙ্ক্ষিত শুশ্রূষার মমতা স্নিগ্ধ নারীর মাতৃমুর্তিই প্রধান হয়ে ওঠে। হাসান হাফিজুর রহমানের ‘অমর একুশে’ ভাষা আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত কবিতা। এ-কবিতায় মাতৃভাষাপ্রেম ও দেশপ্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শোষণের বিরুদ্ধে ঘৃণা এবং সংগ্রামের দৃঢ়-প্রতিজ্ঞা। 

আরো পড়ুন:  বাংলা কবিতা হচ্ছে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতার সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যবাহী ধারা

পাঁচটি কবিতার বিষয়বস্তুর মতো আঙ্গিকরীতি ও স্বতন্ত্র শব্দচয়ন ও ব্যবহারে প্রত্যেক কবির রুচি আলাদা। কিন্তু প্রতিটি কবিতাই আমাদের মধ্যে স্থায়ী আবেদন সৃষ্টিতে সক্ষম। সুতরাং সাধারণভাবে বলা যায়, কবির স্বতস্ফূর্ত অনুভূতি, শব্দ ও ছন্দের অনিবার্য বিন্যাসে জীবনের অন্বয় এবং স্থায়ী আবেদন সৃষ্টির উপযোগী যে শব্দসৌধ সৃষ্টি করে তাই-ই কবিতা। কবিতার শ্রেণিকরণ প্রতিটি সাহিত্য আঙ্গিকেরই উপাদান মানুষের জীবন, পারিপার্শ্বিক সমাজ অর্থাৎ মানুষের চিন্তা ও কর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল প্রসঙ্গ। জীবনকে দেখার এবং উপস্থাপন করার বৈশিষ্ট্যই সাহিত্যের প্রতিটি আঙ্গিককে স্বতন্ত্র করে দেয়। আবার এইসব সাহিত্যরূপের মধ্যে বিষয়বস্তু, আঙ্গিকবিন্যাস ও ভাষারীতির কারণে শ্রেণিকরণ অনিবার্য হয়ে পড়ে। কবিতার আঙ্গিক-বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা অর্জন করতে হলে, তার বিভিন্ন শ্রেণির স্বতন্ত্র-গঠনরীতি, ভাষাবিন্যাস, ছন্দরীতি প্রভৃতি বিষয়ে জানতে হবে। এখানে নিম্নে আমরা কবিতার বিভিন্ন শ্রেণির অবস্থান নির্দেশ করতে পারি।

কবিতার প্রকারভেদ

কবিতা ৩ ধরনের। সেগুলো হচ্ছে ক. কাব্যনাট্য, খ. মহাকাব্য এবং গ. গীতিকবিতা। এই গীতিকবিতা আবার ৫ ধরনের। যথা ক. প্রার্থনাসঙ্গীত বো Hymn, খ. ওড বা Ode, গ. শোককবিতা বো Elegy, ঘ. চতুর্দশপদী বা Sonnet এবং ঙ. ব্যালাড বা Ballad. 

কাব্যনাট্য 

আদিযুগে কাব্যভাষাই ছিলো সাহিত্যের প্রধান অবলম্বন। ফলে, নাটকের প্রাথমিক রূপ কাব্যনাটকেও কবিতার ভাষা ও ছন্দরীতি অনুসৃত হতো। গ্রীক বা রোমান সাহিত্যের স্বর্ণযুগে নাটককে বলা হতো জীবনের অনুকরণ, ঘনিষ্ট প্রতিফলন। এলিজাবেথান যুগের কালজয়ী নাট্যকার শেক্সপীয়রের নাটকগুলো জীবনের বহুমুখী বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করলেও কবিতার রূপরীতিই ছিলো তার প্রধান অবলম্বন। সাধারণ দর্শক-শ্রোতার নিকট গ্রহণযোগ্য ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য নাট্যসংলাপের ভাষাকে লৌকিক ভাষার কাছাকাছি নিয়ে আসেন নাট্যকাররা। মৌখিক ভাষার স্পন্দন নাটকের কাব্যগুণকে কিছুটা ক্ষতি করলেও পরবর্তীকালে নাটকে গদ্যভাষার প্রয়োগ অনিবার্য করে তোলে। কিন্তু কাব্যনাট্যের ধারা সাহিত্যের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়নি। উনিশ শতকে গিরিশচন্দ্র ঘোষ, পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু কাব্যনাটকের রূপরীতি, ভাষা ও ছন্দকে মানুষের পরিবর্তনশীল সাহিত্যরুচির কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে প্রভূত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের সাহিত্য জগতে সৈয়দ শামসুল হক কাব্যনাটক রচনার ক্ষেত্রে গভীর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও শিল্পসাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। 

মহাকাব্য 

কবিতার প্রাচীনতম শাখা যে মহাকাব্য, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রীক Epos শব্দের ইংরেজি রূপান্তর Epic মহাকাব্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ। Epos-এর প্রাচীন অর্থ ছিলো শব্দ। সময়ের বিবর্তনে এই শব্দের ওপর বিভিন্ন অর্থ আরোপিত হয়ে কখনো বিবরণ বা কাহিনী, কখনো গীতি বা বীরত্বব্যঞ্জক কাব্য। এভাবেই অর্থের রূপান্তর ঘটতে ঘটতে এক সময় Epic-এর অর্থ দাঁড়িয়ে যায় আখ্যানমূলক বা বীরত্বব্যঞ্জক কবিতা।

মহাকাব্যের কয়েকটি প্রচলিত কাব্যরীতি হলো প্রারম্ভে কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর আবাহন, বীরোচিত নায়ক, বীররসের উদ্দীপন, যুদ্ধের বর্ণনা ইত্যাদি। মহাকাব্য দু-ধরনের হতে পারে; মৌখিক মহাকাব্য বা primary epic, যেমন ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’, ‘ইলিয়াড, ‘ওডিসি ইত্যাদি এবং লিখিত বা সাহিত্যিক মহাকাব্য বা secondary or literary epic। সাহিত্যিক মহাকাব্যের উদাহরণ হচ্ছে ভারজিল-এর ‘ইনিড’, মিলটন-এর ‘প্যারাডাইস লস্ট’ ইত্যাদি।[২]

গীতিকবিতা

ব্যক্তি-অনুভূতির স্বত:স্ফূর্ত প্রকাশ গীতিকবিতার প্রধান লক্ষণ। সাবলীলতা ও সহজতায় এই কাব্য-আঙ্গিক সর্বাপেক্ষা বৈচিত্র্যময় ও প্রভাবশালী। প্রাচীন গ্রীসে বীণাযন্ত্র সহযোগে যে সঙ্গীত পরিবেশিত হতো, তাকে বলা হতো Lyric । এ থেকে বোঝা যাচ্ছে Lyric বা গীতিকবিতার সঙ্গে সঙ্গীত ধর্মের সম্পর্ক সুনিবিড়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল ইসলামের অনেক কবিতা একই সঙ্গে কবিতা ও গান। তবুও মনে রাখতে হবে সঙ্গীত অপেক্ষা গীতিকবিতার ক্ষেত্র বহুবিচিত্র। মানবীয় অনুভূতির বহুমুখী সত্য গীতিকবিতায় রূপ পায়। সঙ্গীতে থাকে সুরের প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণ, আর গীতিকবিতায় কথা ও সুরের সমন্বয়। ফলে, সঙ্গীত অপেক্ষা গীতিকবিতার ক্ষেত্র বহু বিস্তৃত। ব্যক্তি অনুভূতির সুক্ষ্মতর প্রকাশ অনিবার্য শব্দ, ধ্বনি এবং ছন্দোবিন্যাসে গীতিকবিতায় রূপ পায় বলে আদিকাল থেকেই কবিতার এই রীতি সর্বাধিক চর্চিত সাহিত্যধারা। এ-প্রসঙ্গে মহাকাব্যের সঙ্গে গীতিকবিতার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকগত পার্থক্যের স্বরূপ নির্দেশ করা প্রয়োজন। মহাকাব্যের বিষয় আঙ্গিক ও পূর্বনিরূপিত আর গীতিকবিতার বিষয়, রীতি ও সময়, সমাজ ও রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মহাকাব্য বস্তুনিষ্ঠ (Objective) আর গীতিকবিতা ভাবনিষ্ঠ (Subjective) কবিতা। 

আরো পড়ুন:  ছিন্নপত্র তুলে ধরে উনিশ শতকের বাঙলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন

গীতিকবিতার প্রকারভেদ

গীতিকবিতার বিচিত্র রূপ-রীতি পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে। লিরিক বা গীতিকবিতার জনপ্রিয়তার ও ধারাবাহিকতা উৎসের রূপগত বৈচিত্র্য থেকেই তা অনুধাবন করা সম্ভব।

সাহিত্য ও কবিতার ভাষা নিয়ে অনুপ সাদির বক্তৃতা

স্তবসঙ্গীত বা Hymn 

সৃষ্টিকর্তা বা দেবতার উদ্দেশে রচিত প্রার্থনামূলক কবিতাকে বলা হয় হিম বা স্তব সঙ্গীত। এ ধরনের কবিতা জনসাধারণের সামনে গাওয়া হতো আবার আবৃত্তিও করা হতো। অর্থাৎ সঙ্গীতধর্ম বা কাব্যগুণ উভয়ই স্তবসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য। আধ্যত্মিকতা ও ভক্তিভাব এ-কবিতার প্রাণ। শ্রোতা সাধারণের মনে মহৎ ভাবনা জাগ্রত করার লক্ষ্যে সঙ্গীত রচিত হতো। প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে এ-ধরনের সঙ্গীতধর্মপ্রধান কবিতা হয়েছে প্রচুর। বৈষ্ণব পদাবলী, শ্যামাসঙ্গীত ও বাউল গানে স্তবসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ ‘গীতিমাল্য’, ও ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় স্তবসংগীত বা Hymn-এর বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। 

স্ত্রোত্রকবিতা বা ওড

বাংলা ভাষায় ওড (ইংরেজি: Ode)-এর কোনো প্রতিশব্দ নেই। বিষয়বস্তু ও গঠনবৈশিষ্ট্য অনুসারে একে স্ত্রোত্রকবিতা বলা যেতে পারে। কবি কোনো মহৎ ভাবনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ব্যক্তি বা বস্তুর উদ্দেশে সমিল বা অমিল ছন্দে যে কবিতা রচনা করেন তাই-ই ওড বা স্ত্রোত্র কবিতা। প্রাচীন গ্রীক কবি পিণ্ডার ওড রচনার ক্ষেত্রে পথিকৃত। রোমান কবি হোরেসও বেশ কিছু ওড রচনা করেছেন । বাংলা সাহিত্যে সচেতনভাবে ওড রচনার সূত্রপাত মাইকেল মধুসূদন দত্তের ব্রজাঙ্গনা কাব্য থেকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বসুন্ধরা’, ‘সমুদ্রের প্রতি’ কিংবা ‘উর্বশী’ ওড-এর আধুনিক রূপায়ণ। ওড-এর লক্ষণযুক্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবিতা আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রচিত হয়েছে। 

শোককবিতা বা এলিজি

মূল গ্রীক শব্দ Elegia-এর অর্থ হলো বেদনার আর্তি। এই শব্দ থেকে Elegy শব্দের উৎপত্তি। Elegia বা Elegos কেবল শোক অর্থ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো না। প্রাচীন গ্রীক এবং ল্যাটিন সাহিত্যে এলিজিয়াক (Elegiac) নামে ৬+৫ মাত্রায় ( প্রথমে ছয় পরে পাঁচ) রচিত এক ধরনের কবিতা প্রচলিত ছিলো। সময়ের বিবর্তনে এলিজি বলতে এখন কেবল শোক কবিতাকেই বোঝায়। এ-রীতির কবিতায় কবির ব্যক্তিগত শোক কিংবা জাতীয় শোক রূপায়িত হয়। প্রিয়জনের মৃত্যুজনিত বিচ্ছেদ-বেদনা, কোনো জাতীয় ব্যক্তিত্বের মৃত্যুজনিত উপলব্ধি থেকে শোককবিতার সৃষ্টি। গ্রীক কবি বিয়ন রচিত Lament for Adonis বিশেষ ধরনের শোককবিতা Pastal Elegy-র আদি দৃষ্টান্ত। জন মিল্টনের Licidus এবং শেলির Adonis এই ধারার আরো অগ্রসর পর্যায়ের কবিতা। বিয়নের কবিতা শোকেই শুরু এবং সমাপ্তি। কিন্তু মিল্টন এবং শেলি তাঁদের শোকের মধ্যে প্রত্যাশা ও আনন্দের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন। টমাস গ্রের Elegy written in country churchyard সর্বাধিক পঠিত শোক কবিতা। প্রিয়জন কিংবা কোনো ব্যক্তিবিশেষ নয়, নাম না-জানা কোনো গ্রামের মৃত কৃষিজীবীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছে কবিতাটি। টেনিসনের এলিজিগুচ্ছের নাম In Memorium। 

বাংলা ভাষায় শোককবিতা রচিত হয়েছে প্রচুর। কিন্তু সে-তুলনায় কালোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা কম। প্রায় সকল কবিই শোককে ভাষারূপ দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত স্ত্রীর উদ্দেশে রচিত কবিতা গুচ্ছ ‘স্মরণ’ শোককবিতারই আধুনিক রূপায়ন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ২২শে শ্রাবণ-১৩৪৮, মোহন দাস গান্ধীর মৃত্যুতে প্রেমেন্দ্র মিত্রের লেখা ‘তিনটি গুলি’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু উপলক্ষে সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘পাথরের ফুল’, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়’ সার্থক এলিজির দৃষ্টান্ত ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের অকাল প্রয়াণে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ‘চিত্তনামা’ । জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ পারিবারিক শোককবিতার অনন্য দৃষ্টান্ত। 

আরো পড়ুন:  পাশ্চাত্যে ও ভারতে নাটকের ইতিহাস শুরু হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব সময়ে

সনেট বা চতুর্দশপদী

সনেট শব্দটির উৎপত্তি ইটালিয়ান Soneto (অর্থ: মৃদুধ্বনি) শব্দ থেকে। ইটালীয় কবি দান্তে এবং পেত্রার্ক সনেটের আদি রচিয়তা। একটি অখণ্ড অনুভূতি যখন ১৪ মাত্রার (কখনো কখনো ১৮ মাত্রাও হয়) ১৪ পংক্তিতে (কখনো কখনো ১৮ পংক্তির ব্যবহারও দেখা যায়) বিন্যস্ত হয়ে আবেগের শিখর স্পর্শ করে, তখনই একটি সার্থক সনেট জন্ম নেয়। বাংলা সাহিত্যের আদি এবং সার্থক সনেট রচিয়তা মাইকেল মধুসূদন দত্ত সনেটের আঙ্গিককে ‘চতুর্দশপদী’ হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন। পরবর্তী কালের সার্থক সনেট রচিয়তাগণ এই রীতিই মূলত অনুসরণ করেছেন। সনেটের প্রথম আট পংক্তিকে বলা হয় অষ্টক (Octave)। এই প্রথম অংশে কবির ভাব বা কল্পনা ঈঙ্গিতময় রূপ লাভ করে। শেষ ছয় চরণকে বলা হয় ষটক (Sestet) – এ-অংশে পূর্ববর্তী ভাবের বিস্তৃতিসাধন বা ব্যাখ্যা দান করা হয়। সনেটের বক্তব্য বিন্যাসের এই রীতি মধুসূদন দত্ত অনুসরণ করেছেন। তাঁর ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি বিশ্লেষণণ করলে এ-মন্তব্যের যথার্থতা প্রমাণিত হবে। 

‘বঙ্গভাষা’ কবিতার প্রথম আট চরণে কবি নিজের আত্ম রূপান্তরের ঈঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, বঙ্গভাণ্ডারে বিচিত্র রত্নসম্ভার থাকা সত্ত্বেও তিনি মত্ত থেকেছেন পর-সম্পদ লোভে পরদেশে বা বিদেশে ভ্রমণ করে জীবনযাপনের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তির মতো নিকৃষ্ট অভিজ্ঞতার চিত্রই ফুটে ওঠে। ব্যর্থ সাধনায় তাঁর জীবনে সাফল্যের পরিবর্তে এসেছে হতাশা। মাতৃভূমি রূপ পদ্মকানন পরিত্যাগ করে শৈবালের আবেষ্টনীতে আবদ্ধ থেকে নষ্ট করেছেন জীবনের সকল সম্ভাবনার পথ। এই অংশে কবির আত্ম বিশ্লেষণ প্রাধান্য পেয়েছে। পরবর্তী ছয় চরণে দেশমাতৃকার পথনির্দেশনা পেয়ে যান স্বপ্নে। ‘পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম কালে/ মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজাল’। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সতর্কতায় মধুসূদন সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতার আঙ্গিক নির্মাণ করেছিলেন। 

ব্যালাড

গীতিকবিতার আদিরূপ হিসেবে বিচার করা যায় ব্যালাড বা গীতিগাথাকে (ইংরেজি: Ballad)। ইতালীয় শব্দ বালারে (ballare) থেকে ব্যালাড শব্দের উৎপত্তি। বালারে শব্দের অর্থ ‘নৃত্য করা’। অর্থাৎ কবিতার সঙ্গে নৃত্য ও নাটকীয়তার মিশ্রণে ব্যালাডের সৃষ্টি। ব্যালাড-এ প্রেম, ধর্ম, বীরত্ব, রাজনীতি, সামাজিক প্রসঙ্গ, হাস্যরস ও করুণরসের ঘটনা স্থান পেত। আদি ব্যালাডগুলোর রচয়িতারা অজ্ঞাতনামা। মূলত লোকজীবন তথা গ্রামজীবনের বিচিত্র প্রসঙ্গ ব্যালাড-এ স্থান পেয়েছে।

এতে ব্যক্তি কিংবা সামষ্টিক জীবনের বেদনাকরুণ কাহিনীরই প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। আধুনিক রোমান্টিক যুগের কবিরা ব্যালাডের অনুসরণে লিখেছেন প্রচুর কবিতা। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হার্ডি, কোলরিজ, কীটস, মেরিডিথ, সুইনবার্ন প্রমুখ কবি ব্যালাডের অনুসরণে প্রচুর কবিতা লিখেছেন। 

বাংলা ভাষার ব্যালাড জাতীয় আদি রচনা মৈমনসিংহ গীতিকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কথা ও কাহিনী’ কাব্যের বেশ কিছু কবিতায় মারাঠী ব্যালাডের অনুরণন আছে। রবীন্দ্রনাথই ব্যালাডের আধুনিক শিল্পসম্মত রূপকার। জসীমউদ্দীনের ‘নকসীকাঁথার মাঠ’ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ ব্যালাডের নিদর্শন হিসেবে অতুলনীয়। 

তথ্যসূত্র

১. বেগম আকতার কামাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, রফিকউল্লাহ খান ও অন্যান্য, বাংলা ভাষা: সাহিত্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর, পুনর্মুদ্রণ ২০১১, পৃষ্ঠা ১১-১৩।
২. সুরভি বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যের শব্দার্থকোষ, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৯৩।

রচনাকাল: ২৯ ডিসেম্বর ২০২০, এসজিআর।

Leave a Comment

error: Content is protected !!