স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তি এবং বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের প্রান্তিক জনপদগুলোতেও গভীরভাবে অনুভূত হয়েছিল। বিশেষ করে হাওর, পাহাড় ও সমতলের বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি ঘেরা নেত্রকোনা জেলা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে প্রগতিশীল ও শ্রমিক আন্দোলনের এক অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। একদিকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিশ্বজনীন সংকট, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে স্বৈরাচার পরবর্তী গণতান্ত্রিক উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা—এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নেত্রকোনার বামপন্থী ও মেহনতি মানুষেরা তাদের অধিকার আদায়ের লড়াইকে থামতে দেয়নি। দুর্গাপুরের পাথর কোয়ারি থেকে শুরু করে কলমাকান্দার পাহাড় আর হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকের কণ্ঠস্বর আজও এ জনপদের রাজপথে প্রতিধ্বনিত হয়। আদর্শিক রূপান্তর আর সুবিধাবাদের হাতছানি এড়িয়ে নেত্রকোনার লড়াকু মানুষেরা কীভাবে তাদের সংগ্রামের মশাল জ্বালিয়ে রেখেছে, তা বুঝতে হলে এই স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী তিন দশকের রাজনৈতিক বিবর্তন ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের ইতিহাস জানা আজ বড় প্রয়োজন।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যে সংকটের সৃষ্টি হয়, তার ঢেউ নেত্রকোনা জেলা সিপিবির ওপরও আছড়ে পড়ে। ওই সময় দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও বিলোপবাদী ধারার কারণে সাংগঠনিক কাঠামো কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লেও ১৯৯৩ সালের বিশেষ কনভেনশনের মাধ্যমে নেত্রকোনার তৃণমূল নেতাকর্মীরা সিপিবির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেন। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার খনি ও পাথর শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনগুলো মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে কমরেড ডা. দিবালোক সিংহের মতো স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে সোমেশ্বরী নদীর পাড়ের মেহনতি মানুষের দাবি এবং আদিবাসীদের ভূমি অধিকার রক্ষায় সিপিবি রাজপথে সক্রিয় থেকে নিজেদের ভিত্তি পুনরায় মজবুত করে।
গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতি
নব্বই দশকের পরবর্তী সময়ে নেত্রকোনা জেলা সিপিবি একদিকে যেমন সংসদীয় রাজনীতিতে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে স্বৈরশাসন ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের প্রতিটি নির্বাচনে নেত্রকোনা-১ ও নেত্রকোনা-৪ এর মতো আসনগুলোতে সিপিবি প্রার্থীরা সম্মানজনক ভোট পেয়ে প্রগতিশীল রাজনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেন। ২০০১ পরবর্তী চারদলীয় জোট সরকারের আমলে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক জনমত গঠনে নেত্রকোনার নেতাকর্মীরা ছিলেন সোচ্চার। এ সময় জলি তালুকদারের মতো তরুণ নেতৃত্বের উত্থান এবং প্রবীণ বিপ্লবীদের দিকনির্দেশনায় দলটি ছাত্র ও যুব ইউনিয়নকেও শক্তিশালী করে তোলে, যা নেত্রকোনায় বামপন্থী রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনা করে।
২০২৪ সালের আগস্ট অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়গুলোতে নেত্রকোনা জেলা সিপিবি তৎকালীন সরকারের দুঃশাসন ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাজপথে সক্রিয় ছিল। এই সময়ে দলটি মূলত মেহনতি মানুষের অধিকার, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে নেত্রকোনা শহরে একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশি হামলার শিকার হন সিপিবির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি মোহাম্মদ শাহ আলম, ডা. দিবালোক সিংহ এবং জলি তালুকদারও আহত হয়েছিলেন। এই ঘটনাটি নেত্রকোনায় গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার লড়াইকে আরও বেগবান করে এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়। মূলত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার দাবিগুলোকে কেন্দ্র করেই অভ্যুত্থানের আগের মাসগুলোতে দলটির কার্যক্রম আবর্তিত হয়েছে।
আগস্ট অভ্যুত্থান পরবর্তী নেত্রকোনার রাজনীতি
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নেত্রকোনা জেলায় কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে নতুন উদ্যমে মাঠে নেমেছে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, রেশন ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দাবিতে দলটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে আয়োজিত বিশাল সমাবেশটি ছিল এর একটি বড় উদাহরণ, যেখানে স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সিপিবি নেতৃবৃন্দ এই অঞ্চলের আদিবাসী ও শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষায় এবং যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে জনমত গঠনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
নেত্রকোনা জেলা সিপিবির রাজনীতিতে বর্তমানে ডা. দিবালোক সিংহের মতো কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃত্বের বলিষ্ঠ ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট। ২০২৪-২৫ এর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে তারা নিরন্তর কাজ করছেন। দুর্গাপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি আলকাশ উদ্দিন মীর ও সাধারণ সম্পাদক রূপন কুমার সরকারের নেতৃত্বে স্থানীয় রাজনীতিতে প্রগতিশীল ধারার চর্চা অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে নেত্রকোনা-৪ আসনের পরিচিত মুখ জলি তালুকদারসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় দাবিগুলোকে গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করছেন। সিপিবির নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে নেত্রকোনা জেলা শাখা বর্তমানে সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে।
নেত্রকোনা জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অধিকার রক্ষা এবং প্রগতিশীল আদর্শিক লড়াইয়ের এক বলিষ্ঠ চিত্র ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কর্মকাণ্ড জেলাটিতে বিশেষ মাত্রা যোগ করেছে।
আদর্শিক অভিভাবকের বিয়োগ ও শোক
২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর নেত্রকোনা জেলার প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট-এনডিএফ এর জেলা আহবায়ক মাস্টার মতিউর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে নেত্রকোনা ও পার্শ্ববর্তী ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনে শোকের ছায়া নেমে আসে। ৭ ডিসেম্বর তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, শোক নীরবতা পালন এবং শপথ গ্রহণের মাধ্যমে স্থানীয় নেতাকর্মীরা সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও আমলা-দালাল পুঁজি বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
শ্রমিক নেতা আনোয়ার হোসেনের গ্রেফতার ও মুক্তি সংগ্রাম
২০২৬ সালের মে মাসে নেত্রকোনার শ্রমিক আন্দোলন এক অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়। ১২ মে নেত্রকোনা জেলা হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টি বেকারী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের জেলা সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারকে স্থানীয় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ “হোটেল মালিকদের চক্রান্ত” হিসেবে অভিহিত করেন।
তাঁর নি:শর্ত মুক্তি এবং শ্রমিকদের ৭ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১৬ মে দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়। ‘বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশন’-এর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আহ্বানে এই আন্দোলন তীব্র রূপ নিলে শেষ পর্যন্ত আনোয়ার হোসেন মুক্তি লাভ করেন। এটি নেত্রকোনায় শ্রমিক সংহতির এক বড় বিজয় হিসেবে গণ্য হয়।
বিভাগীয় সমন্বয় ও ভবিষ্যতের লড়াই
নেত্রকোনার শ্রমিক নেতৃবৃন্দ কেবল জেলা পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভাগীয় পর্যায়েও সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল জামালপুরে অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিটির সভায় নেত্রকোনা জেলা ইউনিয়নের সভাপতি আনোয়ার হোসেন অংশ নেন। সভায় তিনিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং হোটেল সেক্টরে ন্যূনতম মজুরি ও শ্রম আইন বাস্তবায়নে প্রতিটি জেলায় আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
উপসংহার
নেত্রকোনা জেলার এই ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানকার রাজনীতিতে নেতৃত্বের ওপর দমন-পীড়ন চললেও শ্রমিক ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলো সাংগঠনিকভাবে বেশ সুসংহত। আদর্শিক লড়াই এবং রাজপথের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নেত্রকোনা অঞ্চলে শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে।
আরো পড়ুন
- নেত্রকোনার রাজনৈতিক ইতিহাস: স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী প্রগতিশীল ও শ্রমিক আন্দোলন
- মণি সিংহ: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক জীবন
- বাংলাদেশে সাম্যবাদ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি
- সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি প্রসঙ্গে
- সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ
- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ইতিহাস
- সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কমরেড জ্যোতিষ বসু: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে সশস্ত্র সংগ্রামের এক কিংবদন্তি শ্রেণিযোদ্ধা
- অ্যাডভোকেট রোকেয়া বেগম: নারীমুক্তি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এক আপসহীন কাণ্ডারি
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚