চিনুয়া আচেবে বা চিনোয়া আচেবে বা চিনুয়া আচিবে (১৬ নভেম্বর ১৯৩০ -২২ মার্চ ২০১৩) ছিলেন ছিলেন একজন নাইজেরিয়ান ঔপন্যাসিক, কবি ও সমালোচক। তাঁকে আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ও খ্যাতিমান পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস এবং অসাধারণ রচনা, সবকিছু ভেঙে পড়ে বা থিংস ফল অ্যাপার্ট (১৯৫৮), আফ্রিকান সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে এবং এখনও সর্বাধিক চর্চিত, অনূদিত এবং পঠিত আফ্রিকান উপন্যাস।
থিংস ফল অ্যাপার্টের সাথে, তাঁর নো লংগার অ্যাট ইজ (১৯৬০) এবং অ্যারো অফ গড (১৯৬৪) “আফ্রিকান ট্রিলজি” সম্পূর্ণ করে। পরবর্তী উপন্যাসগুলির মধ্যে রয়েছে আ ম্যান অফ দ্য পিপল (১৯৬৬) এবং অ্যান্থিলস অফ দ্য সাভানা (১৯৮৭)। আচেবেকে প্রায়শই “আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের জনক” বলা হয়, যদিও তিনি এই চরিত্রায়নকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তিনি ১৯৩০ সালে নাইজেরিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নাইজেরিয়ার ইবাদান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে শিক্ষা সমাপ্তির পর নাইজেরিয়ান বেতারে কর্মজীবন শুরু করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে তার লেখালেখি শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে তিনি নিজেই একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সংগে নাইজেরিয়ার একজন বিশিষ্ট কবিও যোগ দিয়েছিলেন। গৃহযুদ্ধকালে আচেবে দেশ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত থাকেন। পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালে নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।[১]
১৯৯০ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে আসছিলেন চিনুয়া। এরপর তিনি প্রায় ২০ বছরের বেশি সময় কোনো বই লেখেননি। তার পরবর্তী বছরগুলো বেশিরভাগই কেটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করে। ২০১৩ সালের ২২ মার্চ এক বর্ণাঢ্য প্রতিবাদি জীবন শেষে তিনি মারা গেলেন।
থিংস ফল অ্যাপার্ট বা সবকিছু ভেঙে পড়ে
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’-এর সুবাদে ব্যাপক পরিচিত লাভ করেন আচেবে। উপন্যাসটি প্রকাশিত হবার পর পাশ্চাত্য জগতে দারুণভাবে আলোচিত হয়েছে। উপন্যাসটি অনুবাদ হয়েছে ৫০টিরও বেশি ভাষায়। তাছাড়া, বিশ্বজুড়ে উপন্যাসটি প্রায় ১ কোটি কপি বিক্রি হয়।
উপন্যাসটিতে নাইজেরিয়ার সনাতন ইবো গোত্রের জীবন আচরণ সম্পর্কিত। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শক্তির সহায়তায় খৃষ্টান মিশনারীদের আগমনের পর তার দেশে যে সংঘাতের সৃষ্টি হয় তারই একটি বাস্তব চিত্র এই আখ্যানে উপস্থিত করা হয়েছে। এই উপন্যাসের খ্যাতির কারণ, আচেবে আবেগহীনভাবে তার দেশের সামাজিক এবং মানসিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে ফুটিয়ে তুলেছেন বিশেষ করে যে পরিবর্তন ও সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে মূলত সনাতন আফ্রিকান সামাজিক মূল্যবোধ ও কৃষ্টির উপরে পাশ্চাত্যের চাপিয়ে দেয়া সংস্কৃতির কারণে।
তার এই উপন্যাসটি পাঠ করার সময় অ্যালেক্স হ্যালী-এর ‘রুটস’ উপন্যাসের প্রথম অংশের কথা মনে পড়ে। সাম্প্রতিককালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত ‘রুট্স’-এর সঙ্গে এই কাহিনীর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে ‘রুটস’ এবং ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’র মধ্যে একটি বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ‘রুটস’-এর কালো মানুষ আধুনিক অর্থে সভ্য। অর্থাৎ মুসলমান। অন্যদিকে ওকোনকোর সমাজ এক অর্থে পৌত্তলিক। তারা ভূত-প্রেত, আত্মার পূজারি। তাদের দেবতারা প্রধানত ক্ষতিকারক। অবশ্য মঙ্গলকারক দেবদেবীও রয়েছে, যারা বৃষ্টিপাত ঘটায়, ফসল ফলনে সহায়তা করে।
আফ্রিকার এই সনাতন সমাজে ইহজগত এবং পরজগতের মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত ক্ষীণ। এ যেন বাড়ির পাশেই আরেক বাড়ি, যেখানে পরপারের আত্মারা বসবাস করে। তার ফলে মৃত্যু তাদের জীবনে ভয়ংকর কিছু নয় এবং জীবনের শেষও নয়। তারা মৃত্যুর মাধ্যমে কেবল স্থান ও কাল পরিবর্তন করে মাত্র। যে সকল আচার-অনুষ্ঠান আধুনিক সমাজে গর্হিত অপরাধ, সেগুলো তাদের সমাজে কোন অপরাধই নয়। যেমনঃ জমজ সন্তানকে জঙ্গলে ফেলে দেয়া। কারণ, তারা জানে এই জমজ সন্তান মৃত্যুর পর পুনরায় তার মায়ের কোলে ফিরে আসবে। এই বিশ্বাসের প্রতি অবিচল নিষ্ঠার কারণে তাদের সুখ-দুঃখ আধুনিক মানুষের সুখ-দুঃখ হতে ভিন্নতর।
চিনোয়া আচেবে তাঁর রচনায় আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শক্তি আগমনের পর এবং সেই সঙ্গে খৃষ্টান পাদ্রীদের আবির্ভাবের ফলে তাদের নিজস্ব যে মূল্যবোধ ও ধ্যান-ধারণাগুলো ভেঙ্গে পড়তে থাকে, তাকে চিত্রায়িত করেছেন। সকলেই পাশ্চাত্য সভ্যতাকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না। বর্তমান উপন্যাসের নায়ক ওকোনকো এমনি একটি চরিত্র। যে কোনক্রমেই নতুন পদ্ধতি, শাসন ব্যবস্থা, আচার-অনুষ্ঠান ও ধর্মকে মেনে নিতে পারেনি। সে বিদ্রোহ করেছে এবং যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন সে আত্মহত্যা করেছে।
ওকোনকো চরিত্র
‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ গ্রন্থের নায়ক ওকোনকো। এটি আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যের ক্লাসিকধর্মী সাহিত্য বলে সকল মহলে স্বীকৃতি পেয়েছে। ওকোনকো এমন একটি চরিত্র, যে সর্বদা ভীতি ও ক্রোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই চরিত্রের মাধ্যমে লেখক আদিম আফ্রিকার প্রতিভূকে চিত্রায়িত করেছেন। তার দুঃখ, বেদনা, স্বভাব ও বিদ্রোহকে ফুটিয়ে তুলেছেন। শুধু তাই নয়, এই গ্রন্থের বিভিন্ন চরিত্র ও চরিত্রের কর্মের মাধ্যমে সেই সনাতন আফ্রিকাকে রক্ষা করেছেন, যে আফ্রিকা পাশ্চাত্য সভ্যতার সংস্পর্শে এসে তার স্বকীয়তা প্রায় হারাতে বসেছে। প্রকৃতপক্ষে, এই গ্রন্থ একটি সামাজিক দলিল, যেখানে ইবো গোত্র সর্বপ্রথম উপনিবেশবাদ ও খ্রিস্টান ধর্মের মুখোমুখি হয়েছে।
নাইজেরিয়ার একটি ইবো গোত্রীয় গ্রামকে অবলম্বন করে আচেবে তার কাহিনী নির্মাণ করেছেন। আফ্রিকার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, ধর্ম, আচার-অনুষ্ঠান, এক কথায় তার সমগ্র সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনধারা যা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, তিনি এই উপন্যাসের মধ্য দিয়ে হারানো সেইসব গৌরব গাঁথাকে ধরে রেখেছেন। আধুনিকতার স্পর্শে সেই প্রাচীন সমাজের প্রায় সকল পরিচয় আজ বিলুপ্ত। এই কারণে ওকোনকো উপন্যাসটি আদিম আফ্রিকার ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত হয়েছে।
‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ উপন্যাসের মধ্যে ইবো গোত্রের ভাষার বর্ণোজ্জ্বল ব্যবহার এবং জীবনঘনিষ্ঠ লোককাহিনী এমনভাবে মিশ্রিত হয়েছে যে, সেগুলো এই কাহিনীকে একাধারে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন করেছে। ফলে আদিম আফ্রিকার বর্ণাঢ্য সাহিত্যরস আমাদের নিকট সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। পশ্চিম আফ্রিকার ইবো গোত্রের জনজীবনে প্রবীণ ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, তাদের বাক্যালাপে তীর্যকতা, জীবনযাপনে পুরুষদের সাহসিকতা, তথা সামগ্রিক মূল্যবোধ যখন আমরা দেখতে পাই, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রাচীন এবং আদিম বলে তাকে তুচ্ছ করতে পারি না।
পাশ্চাত্যের মাপকাঠিতে যে মূল্যবোধকে আমরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখে থাকি, সেগুলোও লেখকের সবল বর্ণনায় আমাদের হৃদয়কে অভিভূত করে। আমরা এই আদিমতাকে কোনক্রমেই আর অসভ্যতা বলতে পারি না। জাগতিক জীবনধারণ উপকরণের প্রাচুর্যই কেবল সভ্যতার বাহন নয়, বরং সভ্যতা বলতে আরো কিছুকে বুঝি। সেই উপকরণগুলো অর্থাৎ ভাষা, আচার-ব্যবহার, আলাপচারিতা, শ্রদ্ধা-ভক্তি ইত্যাদি নানাবিধ দৈনন্দিন জীবনের অদৃশ্য উপকরণ — এগুলোও সভ্যতা। তাই চিনোয়া আচেবের থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমরা ক্রুদ্ধ ও বিদ্রোহী ওকোনকোকে ভালবাসতে শুরু করি। তার দুঃখকে আপন দুঃখ বলে মনে করি। ওকোনকোর জন্য আমরা কেবল দুঃখই করতে পারি। কিন্তু তাকে রক্ষা করতে পারি না।
থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাসের জন্য ২০০৭ সালে বুকার পুরস্কার লাভ করেন চিনুয়া আচেবে। চিনুয়া ২০টিরও বেশি লেখা লিখেছেন। এর মধ্যে কয়েকটি লেখায় তিনি রাজনীতিবিদ এবং নাইজেরিয়ার নেতাদের নেতৃত্বের ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা প্রকাশ করেছেন।
নো লংগার অ্যাট ইজ
আচেবে তার অন্যান্য উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়েও সনাতন জীবনে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল তাকে পর্যায়ক্রমে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেমনঃ তার পরবর্তী উপন্যাসনো লংগার অ্যাট ইজ গ্রন্থের নায়ক একজন ইবো, সে আধুনিক শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত হয়ে সরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা নিয়োজিত হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যে যে সংকট অর্থাৎ একদিকে আপন ঐতিহ্য ও বিশ্বাস, অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সুখময় জীবনযাত্রা এ দু’য়ের মধ্যে যে অহর্নিশ দ্বন্দু, সেই দ্বন্দ্বকেই তিনি চিত্রায়িত করেছেন।
অ্যারো অফ গড
আচেবের আরেকটি গ্রন্থ অ্যারো অফ গড বা ঈশ্বরের স্বর। এখানে প্রধান চরিত্র, গ্রামের প্রধান পুরোহিতের পুত্র খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে খ্রিস্টানদের অথবা সাহেবদের এতখানি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিল যে, সে চাকরিকালে বেসামরিক কর্মকর্তা নিযুক্ত হয়ে আপন জনগণের উপরই চালিয়েছে নির্দয় শাসন। এমনি একটি ক্ষুব্ধ জীবনের ইতিবৃত্ত এই গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। মোটকথা, সাহিত্যের মাধ্যমে আচেবে আফ্রিকার সনাতন ও সাম্প্রতিককালের জীবনদ্বন্দ্বকে লিপিবদ্ধ করেছেন।
অ্যান্টহিলস অফ দি সাভানা
অ্যান্টহিলস অফ দি সাভানা প্রকাশিত হয় ১৯৮৭ সালে। এটি ছিল লেখক চিনুয়া আচেবের লেখা পঞ্চম উপন্যাস, যা আচেবের আগের উপন্যাস (১৯৬৬ সালে আ ম্যান অফ দ্য পিপল) এর ২১ বছর পর যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হয়েছিল এবং এই উপন্যাসটিকে “ব্রিটেনে তার খ্যাতি পুনরুজ্জীবিত” করার কৃতিত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮৭ সালের বুকার পুরষ্কারের চূড়ান্ত প্রতিযোগী, অ্যান্টহিলস অফ দ্য সাভানাহকে “১৯৮০-এর দশকে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস” হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সমালোচকরা উপন্যাসটি প্রকাশের পর প্রশংসা করেছেন।
চিনুয়া আচেবে মূল্যায়ন
আচেবের বইগুলোতে দেশটির ঔপনেবেশিক সময়ে ইবো সমাজের ঐতিহ্য, দেশটির সংস্কৃতিতে খৃস্টানদের আগ্রাসন এবং আফ্রিকা ও পশ্চিমাদের মধ্যকার প্রথাগত দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে। এছাড়াও তিনি অনেক ছ্টেগল্প, শিশু সাহিত্য এবং প্রবন্ধও রচনা করেছেন।
আচেবে শুধুমাত্র সাহিত্য অথবা রাজনীতির মানুষ নন, তিনি শুধুমাত্র আফ্রিকার মানুষের কন্ঠস্বর নন। তিনি গোটা বিশ্বে পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী কায়েমী শক্তির বিপক্ষে যুদ্ধবন্দী, দারিদ্রপীড়িত, শোষিত মানুষের প্রাণের আত্মীয়। তিনি কলম দিয়ে বলেছেন শোষিত মানুষের মুক্তির কথা।
চিনুয়া আচেবের লেখা কারাগারের দেয়ালও ভেঙে দেয় ব’লে মন্তব্য করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ‘বর্বর’ খেতাব পাওয়া আফ্রিকার ভূমিহীন দেশহীন মানুষগুলোর কথা বলার এই লেখক অজস্র নিপীড়িত মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস।
লেখক হিসাবে চিনুয়া আচেবি আফ্রিকা এবং পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেছিলেন। তার কাজকে মানদণ্ড ধরেই প্রজন্মান্তরে আফ্রিকান লেখকদের কাজের মূল্যায়ন হয়ে আসছে। আচেবে বেঁচে না থাকলে ও কোটি কোটি মানুষের কাছে আজীবন প্রেরণার উৎস হয়ে বেঁচে থাকবে তার ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’, ‘গড অব অ্যারো’র মত অসংখ্য রচনা।
আফ্রিকার আধুনিক সাহিত্য
এই প্রসঙ্গে আফ্রিকার আধুনিক সাহিত্য সম্পর্কে দু’টি কথা বলা যেতে পারে। প্রকৃতপক্ষে ইংরেজ ও ফরাসীদের ঔপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমেই আফ্রিকান জনগোষ্ঠী পাশ্চাত্যের সংস্পর্শে আসে। তবে আফ্রিকান সাহিত্যের বিকাশ ঘটে ১৯৪০-এর দশকের দিকে। তারপর ১৯৫০-এর দশকের দিকে আক্রা, ঘানা, ইবাদান স্থানে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ স্থাপিত হয়েছিল তারই মাধ্যমে আধুনিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে।
কালো অর্ফিয়ুস নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা আধুনিক চিন্তাসম্পন্ন সাহিত্য সৃষ্টিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পত্রিকায় ইংরেজি ভাষায় আফ্রিকার সাহিত্যিকদের রচনা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। তার ফলে সহজেই আফ্রিকান সাহিত্যের মূল্য বহির্বিশ্বে ধরা পড়ে। তারা ১৯৫৬ সালে প্যারিসে আফ্রিকান সাহিত্য সম্মেলনেরও আয়োজন করেছিল। ধীরে ধীরে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় বহু আধুনিক আফ্রিকান সাহিত্যিকের জন্ম হয়। এই সকল সাহিত্যকর্ম বিশ্বের অন্য যে কোনো উন্নত সাহিত্য থেকে কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই।
ইতিপূর্বে বাংলাদেশেও আফ্রিকার কবিতা, ছোট গল্প ইত্যাদি অনূদিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। আমরা তাদের পরিচয় ইতিমধ্যেই পেয়েছি। চিনোয়া আচেবের থিংস ফল অ্যাপার্ট উপন্যাসের মাধ্যমে আমরা আফ্রিকার সনাতন জীবনপদ্ধতিকে কিছুটা জানতে পারছি। সেই সঙ্গে আফ্রিকার আধুনিক সাহিত্যের বলিষ্ঠ পদচারণা আমাদের সাহিত্য অঙ্গনকে কিছুটা জীবনঘনিষ্ঠ হওয়ায় উৎসাহিত করছে।[২]
আরো পড়ুন
- চিনুয়া আচেবে ছিলেন আফ্রিকান সাহিত্য জগতের খ্যাতিমান পুরুষ
- প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক
- ল. ন. তলস্তয়
- হার্বার্ট মারকুস মার্কসবাদবিরোধী আবর্জনা সৃষ্টিকারী জার্মান-মার্কিন দার্শনিক
- হাসান ফকরী বাংলাদেশের একজন কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
- শামসুল ফয়েজ বাংলাদেশের একজন কবি, লেখক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক
- মার্কো পোলো একজন ভেনিসীয় বণিক, অনুসন্ধানকারী এবং লেখক
- বারট্রান্ড রাসেল ছিলেন একজন ব্রিটিশ মহাজ্ঞানী, চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও মনীষী
- আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় উপন্যাসিক এবং বাংলা ভাষায় কবি
- দোলন প্রভা বাংলাদেশের কবি, লেখক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পর্যটক
- দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার বাংলা রূপকথার গল্প ও শিশুসাহিত্যের একজন লেখক
- রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক এবং যাদুঘর বিশেষজ্ঞ
- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক
- কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ লেখক, নাট্যকার ও সমাজসেবী
- নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি ও লেখক
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় উনবিংশ শতকের কবি, সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা
- গিরিশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন নাট্যকার, কবি, অভিনেতা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ইংরেজি সাহিত্যের কবি
- পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি
- জন কিটস ছিলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি
- ডি এইচ লরেন্স ইংরেজ কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক
- আর্নেস্ট হেমিংওয়ে মার্কিন সাংবাদিক, উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও ক্রীড়াবিদ
টিকা
১. ফয়জুর রহমান, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৪, ফজলে রাব্বি অনূদিত ওকোনকো, চিনোয়া আচেবে, একাডেমিক পাবলিশার্স, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৪, v-vii
২. লেখাটি ২২ মার্চ ২০১৩ তারিখে “আফ্রিকান সাহিত্য জগতের খ্যাতিমান পুরুষ চিনুয়া আচেবে” শিরোনামে প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে কিছুটা বর্ধিত আকারে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।