দোলন প্রভা (জন্ম: ০৮ জানুয়ারি, ১৯৮৯) বাংলাদেশের একজন প্রগতিশীল লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং প্রকৃতিপ্রেমী আলোকচিত্রী। তাঁর লেখনীর প্রধান উপজীব্য হলো সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, মার্কসবাদ, সাহিত্য, জীবনী, চলচ্চিত্র এবং পরিবেশ। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের মার্কসবাদী ও সাম্যবাদী আন্দোলনের সাথে নিজেকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তাঁর সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনেই, বিভিন্ন ছোটকাগজে নিয়মিত লেখালেখির মাধ্যমে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পরই তাঁর প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিবেশ ও প্রকৃতি বিষয়ক গভীর গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ রচনা করে আসছেন। এশীয় জীবনধারা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে তিনি বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল ভ্রমণ করেছেন। এই তিন দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে কাছ থেকে দেখার প্রয়াস এবং সাধারণ মানুষের সাথে মেশার বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা ও লেখনীর জগতে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
জন্ম, শৈশব ও শিক্ষাজীবন
দোলন প্রভা ১৯৮৯ সালের ৮ জানুয়ারি দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানার অন্তর্গত রেলওয়ে আবাসিক এলাকা ‘নিউ কলোনি’-তে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দাউদ হোসেন এবং মাতা গুলশান আরা। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তাঁর শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি হয় ১৯৯৬ সালে মুজিবাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির মাধ্যমে; যেখান থেকে ২০০০ সালে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে তিনি পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং ২০০৬ সালে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন।
এসএসসির পর তিনি ২০০৭ সালে পার্বতীপুর ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন এবং ২০০৮ সালে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত দিনাজপুর সরকারি কলেজে বিএ (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আনন্দমোহন সরকারি কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
রাজনৈতিক জীবন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড
দোলন প্রভার আদর্শিক ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ ঘটে তাঁর কলেজ জীবনে। দিনাজপুর সরকারি কলেজ ও আনন্দমোহন সরকারি কলেজে অধ্যয়নকালীন তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ‘সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট’-এর রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে তিনি অসংখ্য রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত সাংস্কৃতিক কর্মী; কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য, সংগীত এবং মঞ্চ নাটকে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল প্রশংসনীয়।
২০১৩ সালে তিনি আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের নাট্য সংগঠন ‘বাংলা নাট্যাঙ্গন’-এর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর নেতৃত্বমূলক ভূমিকার আরও একটি অনন্য উদাহরণ হলো ‘উত্থান সাংস্কৃতিক সংগঠন’, যেখানে তিনি ২০১৪ সালের ৯ মার্চ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ২০১৫ সালে তিনি ‘বেস্ট’ (BEST) নামক একটি স্টাডি গ্রুপ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তরুণদের মাঝে জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটান। ২০১৭ সাল থেকে তিনি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘রোদ্দুরে.কম’ এবং ২০২১ সাল থেকে ‘ফুলকিবাজ.কম‘-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সাহিত্যকর্ম, গবেষণা ও প্রকাশনা
দোলন প্রভা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে’ এবং ‘ফুলকির জন্য অপেক্ষা’ পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত। মৌলিক রচনার পাশাপাশি তিনি গবেষণাধর্মী কাজেও সম্পৃক্ত। অনুপ সাদি ও দোলন প্রভার যৌথ গবেষণায় প্রকাশিত হয়েছে ‘নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ’ এবং তাঁদের সম্পাদিত ‘শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ’।
তাঁর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লেখালেখির যাত্রা শুরু হয়েছিল ব্লগিংয়ের মাধ্যমে। ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি তাঁর ‘সূর্যস্নান’ ব্লগে কবিতা, সাহিত্য এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে.কম’-এর নিয়মিত লেখক হিসেবে পরিবেশ ও কবিতা বিষয়ে লিখে চলেছেন। এছাড়া ‘ফুলকিবাজ.কম’ সাইটে তাঁর শিক্ষামূলক, রাজনৈতিক, চলচ্চিত্র বিষয়ক এবং সমালোচনামূলক প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়। এর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য সাহিত্য পত্রিকায় কবি হিসেবে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে।
উইকিপিডিয়া ও মুক্ত তথ্য ভাণ্ডারে অবদান
“দোলন প্রভা ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই বাংলা উইকিপিডিয়ায় তাঁর স্বেচ্ছাসেবী যাত্রার সূচনা করেন। প্রথম দিন থেকেই তিনি তথ্যমূলক নিবন্ধ সম্পাদনায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছেন। ২০২৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি উইকিপিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্পে ৩৫,০০০-এরও বেশি নিবন্ধ সম্পাদনা করেছেন এবং উইকিমিডিয়া কমন্সে প্রায় দেড় সহস্রাধিক আলোকচিত্র যুক্ত করেছেন। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত তাঁর তৈরি করা মৌলিক নিবন্ধের সংখ্যা ৪৫০-এর কাছাকাছি।
বাংলা উইকিপিডিয়ার একজন সক্রিয় প্রতিনিধি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ভারতে অনুষ্ঠিত দুটি উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘নারী উইকি ক্যাম্প-২০২৩’-এ তিনি তাঁর বিশেষ অবদানের জন্য ‘সেলেব্রেটেড উইকিপিডিয়ান’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এছাড়া তিনি স্থানীয় পর্যায় ময়মনসিংহে উইকিপিডিয়া সম্প্রদায় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন।
আরো পড়ুন
🔗 সংশ্লিষ্ট পাঠ: চৌদ্দ জন লেখকের কলমে দোলন প্রভার মূল্যায়ন ও স্মৃতিচারণ 📝
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚