দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (ইংরেজি: Dakshinaranjan Mitra Majumdar; ১৫ এপ্রিল, ১৮৭৭ – ৩০ মার্চ, ১৯৫৭) বাংলা ভাষার রূপকথার গল্প ও শিশুসাহিত্যের একজন লেখক ছিলেন। বাংলা শিশুসাহিত্যে রূপকথার যাদুকর আখ্যায় ভূষিত দক্ষিণারঞ্জনের জন্ম ঢাকার উলাইল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার পিতার নাম রমদারঞ্জন মিত্র মজুমদার। গ্রামের স্কুলে পড়া শেষ করে তিনি পিতার কর্মস্থল মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। এখানে বাসকালেই, তিনি প্রদীপ ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখা আরম্ভ করেন। পরে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে সুধা নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেন। মুর্শিদাবাদে পাঁচ বছর থাকার পর দক্ষিণারঞ্জণ ময়মনসিংহে চলে আসেন। এখানে ছিল তার পিসীমার বাড়ি। তার বিশাল জমিদারি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পড়ে দক্ষিণারঞ্জনের ওপরে।
জমিদারি কাজের সুযোগেই পল্লী প্রকৃতি ও গ্রামের সাধারণ মানুষের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যলাভের সুযোগ ঘটে। বাংলার পল্লীগ্রামে প্রচলিত লোককাহিনী, ছড়া, গান ইত্যাদির সহজ সরল কথা ও সুরের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে।
তিনি লক্ষ করেন মানুষের মুখে মুখে ফেরে যে সব গল্প-কথা তার আকর্ষণ এমনই যে প্রতি সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে বয়োবৃদ্ধদের ঘিরে বসে আসর, সেখানে মন্ত্রমুগ্ধের মত সকলে উপভোগ করে রূপকাহিনীগুলি। এসব লোকসাহিত্যের কোনো লিখিত রূপ নেই। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে কালের স্রোতে সেসব কাহিনীও হারিয়ে যায়।
কর্মজীবনে দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
দক্ষিণারঞ্জন বাংলার লুপ্তপ্রায় লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজে উদ্বুদ্ধ হন। দীর্ঘ দশ বছর ধরে ঘুরে ঘুরে তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ করেন। তার এই সংগ্রহ চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো, রূপকথা, গীতিকাব্য, রসকথা ও ব্রতকথা। এর সবই পূর্ববঙ্গের পল্লী অঞ্চলের লুপ্তপ্রায় কথাসাহিত্য।
দীনেশচন্দ্র সেনের উপদেশে দক্ষিণারঞ্জণ এই কাহিনীগুলিকে স্থায়ী রূপদান করেন বিভিন্ন নামে। রূপকাহিনীগুলি স্থান পায় ঠাকুরমার ঝুলি গ্রন্থে। গীতিকাহিনীগুলি নিয়ে রচিত হয় ঠাকুরদার ঝুলি, রসকথা স্থান পায় দাদামশায়ের থলে গ্রন্থে এবং প্রচলিত ব্রতকথা নিয়ে লিখিত হয় ঠানদিদির থলে। সেই প্রথম বাংলার লোক কাহিনীগুলি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় এবং সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিপুলভাবে সমাদর লাভ করে।
দক্ষিণারঞ্জণ ছোটদের জন্য আরও যেসব বই লিখে বাংলার শিশুসাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চারু ও হারু, ফার্স্টবয়, লাস্টবয়, বাংলার সোনার ছেলে, সবুজ লেখা, আমার দেশ প্রভৃতি।
দক্ষিণারঞ্জন কর্মসূত্রে বঙ্গীয় বিজ্ঞান-পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তিনি এই সংস্থার সহকারী সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন এবং মুখপত্র পথ-এর সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী কালে পরিষদের বৈজ্ঞানিক পরিভাষা সমিতির সভাপতি রূপে বাংলায় বিজ্ঞানের বহু পরিভাষা রচনা করেন।
দক্ষিণারঞ্জন স্মরণীয় হয়ে আছেন তার শিশু সাহিত্যের অবদানের জন্য বিশেষ করে ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদার থলে প্রভৃতি গ্রন্থগুলির জন্য। রূপকাহিনীগুলিকে তিনি এমন মনোরম সুরেলা ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যে তার আকর্ষণ অপ্রতিরোধ্য। পল্লীগ্রামে প্রচলিত এমন অনেক শব্দও কথা তিনি হুবহু প্রয়োগ করে তার লেখনীকে আরও সমৃদ্ধ ও মনোগ্রাহী করে তুলেছেন।
আরো পড়ুন
- কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী: এক অকুতোভয় নকশালবাদী বিপ্লবীর জীবনগাথা
- অমর্ত্য সেন হচ্ছেন ভারতে শৌচাগার উন্নয়নের অর্থনীতিবিদ
- সমীরণ মজুমদার পশ্চিমবঙ্গের বিপ্লবীধারার লেখক, গবেষক, প্রাবন্ধিক
- হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রদূত
- রেবতী মোহন বর্মণ ছিলেন বিশ শতকের সাম্যবাদী ধারার লেখক ও বিপ্লবী
- রাজা রামমোহন রায় ছিলেন একজন ভারতীয় সমাজ সংস্কারক
- আশাপূর্ণা দেবী ছিলেন একজন বিশিষ্ট ভারতীয় উপন্যাসিক এবং বাংলা ভাষায় কবি
- জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ছিলেন বিংশ শতকের কবি, লেখক, গীতিকার
- দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার বাংলা রূপকথার গল্প ও শিশুসাহিত্যের একজন লেখক
- রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক এবং যাদুঘর বিশেষজ্ঞ
- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক
- উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন একজন বাঙালি লেখক এবং চিত্রশিল্পী
- শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক
- অনিল ভট্টাচার্য ছিলেন বিশ শতকের গীতিকার ও সুরকার
- জওহরলাল নেহরু ভারতের জনগণ, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রু সন্ত্রাসবাদী
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- কবি সমর সেন বাঙালি ভাবালু মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর
- কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা
- মুজফফর আহমদ ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সুবিধাবাদী নেতা
- সুনির্মল বসু ছিলেন বাংলা ভাষার শিশু সাহিত্যিক, লেখক ও সম্পাদক
- সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সাহিত্যিক, ভাষাতাত্ত্বিক ও উগ্রজাতীয়তাবাদী
- শিবনাথ শাস্ত্রী ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্য সাধক, সমাজসেবীও রাজনৈতিক সংগঠক
- অতুলপ্রসাদ সেন ছিলেন একজন দুর্দান্ত বাঙালি সুরকার, গীতিকার এবং গায়ক
- মুকুন্দ দাস ছিলেন বাংলার চারণ কবি, লেখক, পালাগায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী
- সত্যজিৎ রায় ছিলেন সাহিত্যিক, চিত্রশিল্পীও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্রকার
- সুকুমার রায় ছিলেন বাংলা শিশু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক
- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন
- অরবিন্দ ঘোষ ছিলেন অগ্নিযুগের মহানায়ক ও সিদ্ধযোগী একজন কবি ও গুরু
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
- আবুল ফজল ছিলেন আকবরের এক নবরত্ন, সুপণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও রাজনীতিক
- মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন ভারতের মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণির নেতা
- মানবেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক
- জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি
তথ্যসূত্র
১. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৫৪-৫৫।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।