দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বা ডি এল রায় (ইংরেজি: Dwijendralal Ray; ১৯ জুলাই ১৮৬৩ – ১৭ মে ১৯১৩) ছিলেন একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি, নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা। তিনি প্রায় ৫০০ গান রচনা করেছেন। এছাড়াও সাহিত্য জগতে তাঁর অনেক অবদান আছে। কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস রচনা করেছে। ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ আকর্ষন ছিলো। বিলেতে লেখাপড়া শেষে স্বদেশে এসে সরকারি চাকরির নানা পদে থেকেও সঙ্গীত সাধনা চালিয়ে গিয়েছেন।[১]
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-এর প্রথম জীবন:
তাঁর জন্ম ১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। অল্পবয়সেই দ্বিজেন্দ্রলালের গীতিপ্রতিভা স্ফুরিত হয়। তার পিতা কার্তিকেয় চন্দ্র ছিলেন রাজবংশের দেওয়ান। গায়ক ও গীতিকার রূপেও তার খ্যাতি ছিল। বাল্যবয়সেই পিতার যত্নে ও সাহচর্যে সংগীতের প্রতি দ্বিজেন্দ্রলালের আগ্রহ জন্মে।
পারিবারিক পরিবেশে ছিল সাহিত্য ও সঙ্গীতের আবহাওয়া। তার দুই দাদা রাজেন্দ্রলাল ও হরেন্দ্রলাল সাহিত্যিকরূপে পরিচিত ছিলেন। এক বৌদি মোহিনী দেবীও সাহিত্য রচনায় খ্যাতিলাভ করেছিলেন। স্বভাবতই এই পরিমণ্ডলের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল।
শিক্ষাজীবন:
১৮৭৮ সালে তিনি বৃত্তিসহ এণ্ট্রান্স ১৮৮০ সালে কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে এফ. এ. ১৮৮২ সালে হুগলী কলেজ থেকে বি.এ. ১৮৮৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরাজি এম. এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান পান। এম এ পাশের পর প্রবেশ করেন কর্মক্ষেত্রে। স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরি করার সময়েই সরকারী বৃত্তি নিয়ে কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য বিলাত যাত্রা করেন।
বিলেতে তিন বছর ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। সেকালে সামাজিক গোঁড়ামি এমন ছিল যে কেউ বিলেত গেলে তাকে ম্লেচ্ছ দেশে যাবার অপরাধে ফিরে এসে প্রায়শ্চিত্ত করতে হত।
দ্বিজেন্দ্রলাল সমাজপতিদের এই ব্যবস্থা মানতে রাজী না হওয়ায় তাকে যথেষ্ট সামাজিক উৎপীড়ন সহ্য করতে হয়। তার এই সময়কার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পায় তার একঘরে পুস্তকে।
বিলেতে থাকা অবস্থায় বিলাতি গান শুনে আকৃষ্ট হন এবং দক্ষিণা দিয়ে রীতিমাফিক বিলাতি শেখেন ও কণ্ঠমার্জনা করেন। পরবর্তীকালে তার ওজস্বী কণ্ঠ ও অনায়াস সুরের চলন গায়করূপে তাকে প্রতিষ্ঠা এনে দেয়।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-এর কর্মজীবন:
১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে সরকারী চাকুরি নিয়ে দ্বিজেন্দ্রলালকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার কাজের দায়িত্ব বহন করতে হয়। কখনো সেটেলমেন্ট অফিসার, কখনো ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, কখনো আবগরি বিভাগের প্রধান পরিদর্শক, কখনো কৃষি রাজস্ব বিভাগে সহকারী প্রধানের কাজ করতে হয়েছে।
স্বভাবত স্বাধীনচেতা হওয়ায় সরকারী চাকুরিতেও তাকে নানান ঝামেলা সামলাতে হয়েছে। চাকরি থেকে অবসর নেবার পর ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষিত ও সংস্কৃতিসেবী বাক্তিদের নিয়ে তিনি পূর্ণিমা সম্মেলন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সময়ে তিনি ইভিনিং ক্লাব নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যুক্ত হন। ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে তিনি প্রকাশ্য অভিনয়েও অংশগ্রহণ করেন।
সাহিত্য সাধনা
হুগলী কলেজে বি.এ ক্লাশে পড়ার সময়েই দ্বিজেন্দ্রলালের রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ আর্য্যগাথা প্রকাশিত হয় ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে। দ্বিজেন্দ্রলালের সাহিত্যিক অগ্রজের সম্পাদনায় প্রকাশিত হত সাপ্তাহিক পত্রিকা পতাকা। এই কাগজে তিনি প্রবাসবাসের কাহিনী লিখতেন।
১৯০৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দ্বিজেন্দ্রলালের মোট বারোটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রধানত কবিতাই ছিল তার সাহিত্যচর্চার বাহন। রচনা করেছেন প্রহসন, কাব্যনাট্য, ব্যঙ্গ ও হাস্যরসাত্মক কবিতা।
এরপর তিনি আত্মনিয়োগ করেন নাটক রচনায়। বিলেত বাসকালে সেখানকার প্রসিদ্ধ অভিনেতাদের অভিনয় দেখার সুযোগ হয়েছিল। রঙ্গালয়ের কলাকৌশল বিষযেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তার এই অভিজ্ঞতা বিশেষরূপে সহায়ক হয়েছিল।
জীবনের শেষ দশ বছর প্রধানত নাটক রচনাতেই ব্যাপৃত ছিলেন। পৌরাণিক, সামাজিক, ঐতিহাসিক সব রকম নাটক রচনাতেই তাঁর দক্ষতা ছিল। তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে জাতীয় চেতনা ও স্বদেশীকতার প্রেরণা মূর্ত হয়ে উঠেছে।
দ্বিজেন্দ্রলাল সর্বমোট ১৬টি নাটক রচনা করেন। ভারতবর্ষ নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ সম্পূর্ণ করেছিলেন। কিন্তু প্রথম সংখ্যা প্রকাশের আগেই তিনি পরলোক গমন করেন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ এপ্রিল।[৩]
আরো পড়ুন
- অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব
- হাসান ফকরী: প্রগতিশীল সাহিত্যের ধ্রুবতারা ও এক অকুতোভয় সাম্যবাদী কণ্ঠস্বর
- কবি শামসুল ফয়েজ: সাম্যবাদী জীবনাকাঙ্ক্ষা ও দ্রোহের এক তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর
- জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ছিলেন বিংশ শতকের কবি, লেখক, গীতিকার
- কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ লেখক, নাট্যকার ও সমাজসেবী
- নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি ও লেখক
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় উনবিংশ শতকের কবি, সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা
- গিরিশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন নাট্যকার, কবি, অভিনেতা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- খোন্দকার আশরাফ হোসেন: উত্তরাধুনিক বাংলা কবিতার এক অনন্য রূপকার
- কমরেড এম. এ. মতিন — এক আজীবন বিপ্লবী ও মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওবাদী বুদ্ধিজীবীর জীবনদর্শন
- শিবরাম চক্রবর্তী ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি রম্যলেখক ও শিশু সাহিত্যিক
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- আল্লামা মহম্মদ ইকবাল ছিলেন একজন মুসলিম লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ
- কবি সমর সেন বাঙালি ভাবালু মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর
- সুনির্মল বসু ছিলেন বাংলা ভাষার শিশু সাহিত্যিক, লেখক ও সম্পাদক
- মুকুন্দ দাস ছিলেন বাংলার চারণ কবি, লেখক, পালাগায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
- জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- পাবলো নেরুদা হচ্ছেন চিলির জাতীয় এবং সাম্যবাদী বিপ্লবের কবি
- সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি
তথ্যসূত্র:
১. দোলন প্রভা, ০৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ “দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বিশিষ্ট বাঙালি নাট্যকার ও সংগীতস্রষ্টা”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/dwijendralal-ray/
২. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৭১-১৭২।
৩. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; ২য় প্রকাশ আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৪৭-৪৯।
জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৯৮৯। বাংলাদেশের ময়মনসিংহে আনন্দমোহন কলেজ থেকে বিএ সম্মান ও এমএ পাশ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “স্বপ্নের পাখিরা ওড়ে যৌথ খামারে”, “ফুলকির জন্য অপেক্ষা”। যুগ্মভাবে সম্পাদিত বই “শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ” এবং যুগ্মভাবে রচিত বই “নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ”। বিভিন্ন সাময়িকীতে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি ফুলকিবাজ এবং রোদ্দুরে ডটকমের সম্পাদক।