জন কিটস ছিলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি

জন কিটস বা জন কীটস (ইংরেজি: John Keats, ৩১ অক্টোবর, ১৭৯৫- ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮২১) হলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি। কবি কিটস মাত্র ২৬ বছর জীবিত ছিলেন এবং মাত্র ৫-৬ বছর কাব্য চর্চা করেছিলেন, কিন্তু এই ৫-৬ বছরেই তিনি কবিতার ক্ষেত্রে যে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তাতে আজও সাহিত্য পিপাসু মানুষ তাঁর কবিতা পড়ে আপ্লুত হন। তাঁর সমকালে এবং পরবর্তীকালেও দেশ বিদেশের বহু কবি তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কবিতার চর্চা করেছেন।

স্বল্পায়ু ইংরেজ কবি জন কিটস ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের লন্ডনের মুরগেট এলাকায় এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তাঁর পিতা থমাস কীটস একটি সরাইখানার ম্যানেজার ছিলেন। থমাস কীটসের চার সন্তানের মধ্যে জন ছিলেন বড়ো। কবি স্বল্পায়ু হলেও সারাজীবন তাকে ভাগ্যের সাথে লড়াই করতে হয়। জন কীটসের বাবা ১৮০৪ খ্রীস্টাব্দে ঘোড়া থেকে পড়ে মারা যান। অল্পবয়সে পিতৃহারা হলে তাঁর মা দ্বিতীয় বিবাহ করে পুত্র-কন্যাসহ চলে যান এডমানটনে। সেখানেই যক্ষ্মারোগে মায়ের মৃত্যু হয় ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে।

ফলে কবি মামার বাড়িতে ট্রাস্টি অভিভাবকের অধীনে বড় হন। তিনি ক্লার্কের স্কুলে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করে অভিভাবকের ইচ্ছায় ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে ডাক্তারি পড়তে শুরু করেন। পরেব বছর এডমানটনেই জনৈক চিকিৎসকের শিক্ষানবিশের কাজে যোগ দেন কীটস। কিন্তু ডাক্তারী তার ভালো লাগত না জন্য তিনি তিনি সাহিত্য চর্চা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং একজন বড়মাপের কবি হয়ে ওঠেন।

এনফিল্ডে ছাত্রাবস্থায় জন আকৃষ্ট হয়েছিলেন গ্রীক পুরাণের প্রতি। পড়েছিলেন ভাজিলের মহাকাব্য ‘ঈনিড’ (Aeneid)। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে নানা অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং বেশ কয়েকজন গুণী বন্ধুর সাহচর্য পেয়েছিলেন। ক্লার্কের স্কুলে পড়ার সময় হেডমাস্টারের ছেলে চার্লস কাউডেন ক্লার্কের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়। সর্বোপরি বন্ধু ক্লার্কের উৎসাহ ছিলো জনের অনুপ্রেরণা। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ক্লার্কই অগ্নিসংযোগ করেছিলেন জনের কবি হবার বাসনায়, তাঁকে স্পেনসারেব ‘ফেয়ারি কুইন’-এর সঙ্গে পরিচিত করে।

ক্লার্কের বন্ধুত্বের সূত্রেই লে হ্যান্ডের সাথে তার পরিচয় হয়। এরপর একে একে হ্যাজলিট, শেলি, চিত্রকর হেডেনের সাথেও তিনি পরিচিত হন। হেডেনের গৃহেই তাঁর পরিচয় হয় রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের পুরোধাপুরুষ ওয়ার্ডসওয়ার্থের সাথে। মূলত এদের সাথে পরিচয় হওয়ার পর ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি কবিতা রচনার প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে কিটস লিখলেন তার প্রথম কবিতা ‘Lines in Imitation of Spenser’। ১৮১৪-তেই কীটস, আসেন লণ্ডনে এবং চিকিৎসাশাস্তে তার অনুশীলন পুনরারম্ভ করেন। ১৮১৬-তে এ বিষয়ে ডিপ্লোমা পান তিনি। কিন্তু সাহিত্য সেবার তাগিদে চিকিৎসকের পেশা ছেড়ে দেন ঐ বছরেরই শেষাশেষি। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে কিটস লিখেছিলেন ‘To Hope’ এবং ‘To Apollo’ নামে দুটি ‘ওড’, এবং কয়েকটি চতুর্দশপদী কবিতা। ঐ সময় থেকেই তাব ওয়ার্ডসওয়ার্থ পাঠের  শুরু, যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় তার সনেট ‘O solitude’-এ। লেই হান্ট সম্পাদিত ‘The Exminer’-এ এই কবিতাটি প্রকাশিত হলে বন্ধু ক্লার্ক মারফৎ কিটস পরিচিত হন হান্টের সঙ্গে। হান্ট তাকে ক্রমে পরিচিত করান বেঞ্জামিন হেডন, এল হ্যাজলিট প্রমুখ শিল্পী সাহিত্যিকদের সঙ্গে।

আরো পড়ুন:  স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ ছিলেন ইংরেজ কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং দার্শনিক

১৮১৬-র নভেম্বর ‘The Examiner’-এ প্রকাশিত হলো কিটসের বিখ্যাত সনেট ‘On First Looking into Chapman’s Homer’। মার্চ, ১৮১৭-তে বেরোল কীটসের আত্মপ্রকাশ সংকলন ‘Poems’, যাতে ছিলো I Stood Tiptoe Upon a Little Hill’ এবং ‘Sleep and Poetry’, কাব্যসংকলনটি পাঠক ও সমালোচক মহলে বিশেষ সমাদর লাভ করেনি। কিন্তু অনুদার ও বিরুপ সমালোচনা কবিকে নিরুৎসাহ করেছিলো এমন নয়। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল থেকে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল পর্যন্ত শ্যাঙ্কলিন, হ্যামপেস্টেড প্রভৃতি স্থানে বসবাসের সময় কিটস রচনা করলেন তাঁর দীর্ঘ আখ্যানকাব্য ‘এন্ডিমিওন’ (Endymion)। এই সময়ই কিটস লিখেছিলেন কবিতা, প্রেম, জীবনদর্শন বিষয়ক তাঁর অসামান্য পত্রগুচ্ছ; ভাই, বন্ধু ও আত্মীয়-পরিজনদের কাছে লেখা এই সমস্ত চিঠিপত্র পরে ১৮৪৮ এবং ১৮৭৮-এ প্রকাশিত হলে মূল্যবান আত্মজৈবনিক তথ্য সাহিত্যিক ধারাভাষ্যরপে গহীত হয়।

গ্রিক মিথোলোজি থেকে কাহিনি নিয়ে জন কিটস তাঁর ‘এন্ডিমিয়ন’ কাব্যটি রচনা করেন। এ কাব্যে এন্ডিমিয়ন একজন মেষপালক। নাটমাকব-এ তার বাস। সৌন্দর্যের দেবী সিথিয়া তার প্রেমে পড়েছেন এবং তারই কৌলিন্যে তাদের মিলন হয়। এরপরেই এন্ডিমিয়ন অমরত্ব লাভ করেন। এই হলো এই কাব্যের মূল বিষয়। শেকসপিয়রের ‘রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট’ নাটকের অনুসরণে জন কীটস তার ‘ইভ অব সেন্ট অ্যাগনেস’ কাব্যটি রচনা করেছেন। তবে এই কাব্যটির পরিণতি শেকসপিয়রের রচনাটির মত বেদনাবিধুর নয়। এখানে কীটস উষ্ণ প্রেমের রোমাঞ্চকর মিলন দেখিয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবনেও জন কীটস কে নানা কষ্টভোগ করতে হয়। ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বড় ভাই জর্জ বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে আমেরিকায় চলে যান, আর ছোট ভাই টম মারাত্মক ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়। কবি অনেক চেষ্টা করেও টমকে বাঁচাতে পারেন নি।

১৮১৭-১৮ খ্রিস্টাব্দের শীত ঋতুতে কিটস ল্যাব, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, হ্যাজলিট প্রমুখের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন জন রেনল্ডস ও চার্লস আর্মিটেজ ব্রাউন, আর ছিলেন অসুস্থ কবিভ্রাতা টম যার শুশ্রুষায় দিন কাটতে থাকে জনের। পারিবারিক যক্ষ্মা রোগের লক্ষণগুলি এই সময় থেকেই কবির শরীরে দেখা দিতে থাকে। বন্ধু রেনল্ডসের সঙ্গে যৌথভাবে বোক্কাচিওর কাহিনীগুলি অবলম্বনে একটি গাথাকাব্য সংকলনের পরিকল্পনা করেন কিটস, ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে গোড়ায়। সেই পরিকল্পনা মাফিক ঐ বছরেরই মার্চ-এপ্রিলে তিনি লিখলেন ‘Isabella, or the Pot of Basil’। কবি তখন নিজে রীতিমতো অসুস্থ; অন্যদিকে সেবা করে চলেছেন প্রিয় অনুজ মত্যুপথযাত্রী টমের।

আরো পড়ুন:  দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার বাংলা রূপকথার গল্প ও শিশুসাহিত্যের একজন লেখক

 ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে কিটস, বিশেষ আঘাত পেলেন যখন কবিভ্রাতা জর্জ বিয়ে করে চলে গেলেন আমেরিকায়। বন্ধু, ব্রাউনকে সঙ্গী করে কিটস ঘুরে বেড়ালেন ইংলণ্ডের লেক অঞ্চল, স্কটল্যাড ও আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তে। লণ্ডনে ফিরে অসস্থ টমের সেবা চালাতে লাগলেন; তাঁর নিজের স্বাস্থ্যও খারাপের দিকে যাচ্ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হলো তাঁর ‘Eadymion’ ও পূর্ববর্তী কবিতাগুলি সম্পর্কে ‘Blackwood’s Magazine’ ও ‘The Quarterly Review’ পত্রিকায় বিরূপ সমালোচনা ও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ। মর্মাহত কবি এই সময় লেখা ছেড়ে দেবার কথা ভাবলেও কার্যত এর পরেই তিনি ‘Hyperion’ রচনা শুরু করেন, যদিও ১৮১৯-এ এই মহাকাব্যোপম রচনাটি অপূর্ণ অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়।

১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের শেষে টমের মৃত্যু হলে কিটস চলে আসেন হ্যাম্পস্টেডে ব্রাউনের বাড়িতে। এখানেই ফ্যানি ব্রনের সঙ্গে কবির পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। অচিরেই বাগদান পর্বও সমাধা হয়। কিন্তু এ সম্পর্ক স্থায়ীরূপ পায় নি। অসুস্থতা, আর্থিক অস্বচ্ছলতা প্রেমে ব্যর্থতা কবিকে পৌঁছে দেয় দুর্দশা ও উদ্বেগের এক অসহনীয় পর্যায়ে।

১৮১৯-এর মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে কিটস লিখলেন তার অবিস্মরণীয় ওডগুলি; ‘On lndolence’, ‘On a Grecian Urn’, ‘To Psyche’, ‘To Nightingale’ এবং ‘On Melancholy’। এর ঠিক আগেই রচিত হয়েছিলো ‘The Eve of St Agnes’ এবং অসমাপ্ত ‘Eve of St. Mark’. ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দেই কিটস লিখেছিলেন প্রেম ও প্রতারণার বিষয়ে এক অতিপ্রাকৃত গাথাকবিতা La Belle Dame sans Merci, এবং নাগিনী-কন্যার কাহিনী ‘Lamia’.

এর পরেই লেখা হলো আঙ্গিকগতভাবে তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ওড ‘To Autumn’। ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দের শেষে অসম্পূর্ণ ‘Hyperion’-কে নতুন রূপ দিলেন কীটস, ‘The Fall of Hyperion’ নামে। ‘Ortho the Great’ এবং ‘King Stephen’ নামে দুটি নাটক এবং অসমাপ্ত ব্যঙ্গকবিতা ‘Cap and Bells’-ও ১৮১৯ খ্রীস্টাব্দেই রচনা করেছিলেন কীটস।

১৮২০ খ্রিস্টাব্দে কিটসের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘Lamia, Isabella, The Eve of St. Agnes and other Poems’ প্রকাশিত হয়। ঐ বছরেরই সেপ্টেম্বরে কবি ইতালী যাত্রা করেন বন্ধু যোসেফ সেভার্নের সঙ্গে। শেলীর পাঠানো পিসা বাসের আমন্ত্রণ উপেক্ষা করে রোমে পৌঁছেন এবং সেখানেই কীটসের মত্যু হয়। ভাই টমের সেবা করতে গিয়েই সম্ভবত কবিও ক্ষয় রোগাক্রান্ত হন এবং মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৮২১ খ্রিস্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আরো পড়ুন:  মার্ক টোয়েন ছিলেন একজন আমেরিকান লেখক, কৌতুকবিদ, উদ্যোক্তা, প্রকাশক

মৃত্যুর পূর্বে প্রায় এক বছর কবি কিটস সাহিত্যচর্চা করতে পারেন নি। মৃত্যুর পর তার সমাধির উপর তাঁরই লেখা সমাধিলিপি উৎকীর্ণ করা হয়— “Here lies a man whose name was write in water.” এ দেখে মনে হয় কবি তাঁর জীবনের সকরুণ পরিসমাপ্তি আগে থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন। তবে বিশ্ববাসীর মনে তাঁর নাম জলের অক্ষরে লেখা হয়নি এখনও আলোর অক্ষরে লেখা আছে।

তথ্যসূত্র

১. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১৪৭-১৪৯।  

Leave a Comment

You cannot copy content of this page