কল্পনা ও শৌখিন কল্পনা সম্পর্কে স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের বিশ্লেষণ

কল্পনা (ইংরেজি: Imagination) এবং শৌখিন কল্পনা (ইংরেজি: Fancy) বা হালকা কল্পনা বা ভাসাভাসা কল্পনা হচ্ছে রোমান্টিক কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কল্পনা বিষয়টি সম্পর্কে একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ। আমরা দেখি, রোমান্টিক নন্দনতত্ত্বে ‘কল্পনা’র নিরঙ্কুশ অবস্থান ও গুরুত্ব রয়েছে। রোমান্টিক সাহিত্যিকদের কাছে ‘কল্পনা’ ছিলো এক ঐশী শক্তি, ব্যক্তিমানসের এক বিস্ময়কর সৃজনক্ষমতা, ভাববাদী বীক্ষার উৎসস্বরূপ। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ “The Prelude” কবিতায় এই শক্তিকে দেখেছিলেন এইভাবেঃ

‘An auxiliar light
Came from my mind, which on the setting sun
Bestowed new splendour’. 

The Prelude, Part 2, line no. 421-423

কোলরিজ শুরু করেছিলেন এটা উল্লেখ করে যে, জন মিলটন হচ্ছেন কাল্পনিক মনের কবি এবং আব্রাহাম কাউলি হচ্ছেন শৌখিন কল্পনার কবির উদাহরণ। দ্বিতীয়জন হচ্ছেন একজন দক্ষ নিম্ন শ্রেণীর পদ্য-লিখিয়ে, শব্দ এবং চিন্তাভাবনাগুলোকে আনন্দদায়ক নিদর্শন দ্বারা সাজানোর শিল্পে অত্যন্ত পারদর্শী। আর মিলটন অবশ্য একজন সৃজনশীল প্রতিভা যার এমন ক্ষমতা আছে যা আক্ষরিকভাবে অতিমানবিক।

অষ্টাদশ শতকে মানবমনকে দেখা হয়েছিলো নিষ্ক্রিয় এক টুকরো কাগজ (tabula rasa) হিসেবে। জন লকের দর্শন ও নিউটনীয় বিজ্ঞানের এই যুগে কবিতা ছিলো নিছক বৌদ্ধিক দীপ্তির (wit) অনুশীলন, ড্রাইডেন-পোপ-জনসনদের কাছে ‘কল্পনা’ নামক কোনো বস্তুর তাৎপর্য ছিলো না। নিও-ক্লাসিক নন্দনতত্বে কল্পনাকে দেখা হয়েছিলো বিভ্রম-সৃষ্টিকারী শক্তিরূপে যা ‘প্রজ্ঞা’ (Reason) বিরোধী। টমাস হবস কল্পনাকে বলেছিলেন ‘decaying sense,’ আর ড. জনসনের অভিধানে ‘কল্পনা’কে সংজ্ঞায়িত হয়েছিলো ‘শৌখিন কল্পনা’ রূপে ‘Fancy; the power of forming ideal pictures.’

বায়োগ্রাফিয়া লিটারারিয়া

কোলরিজ তার Biographia Literaria (১৮১৭) গ্রন্থে ‘কল্পনা’র একটি নতুন ধারণা উপস্থাপিত করেন ও ‘শৌখিন-কল্পনা’র (Fancy) সঙ্গে তার প্রভেদ নির্দেশ করেন। এই গ্রন্থের ত্রয়োদশ অধ্যায়ে কোলরিজ বললেন; ‘Fancy’ আর ‘imagination’-এর চরিত্রই আলাদা।

শৌখিন কল্পনা

কোলরিজের মতে ‘Fancy’ এক যান্ত্রিক শক্তি বা প্রক্রিয়া যার কাজ ইন্দ্রিয়লদ্ধ বা অভিজ্ঞতালব্ধ ছবিগুলি (images) কে একত্রিত করা অর্থাৎ এতে নতুন সৃজনের কোনো শক্তি নেই। Fancy বা শৌখিন কল্পনা শুধু স্থায়ী এবং নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে কাজ করে। আসলে শৌখিন কল্পনা স্মৃতিরই একটা বিশেষ ধরণ, তবে তা স্থানকালের গণ্ডি থেকে মুক্ত। সেইসঙ্গে তাকে পরিমার্জিত করছে অভিজ্ঞতালব্ধ ইচ্ছাশক্তি, যাকে তখন ‘চয়েস’ বলা হত। কিন্তু ঠিক সাধারণ স্মৃতিশক্তির মতোই ‘fancy’-ও জোড় বাঁধার নিয়ম বা Association of ideas থেকেই তার যাবতীয় উপাদান খুঁজে পায়। জোড়বাঁধার তত্ত্বে কল্পনা সম্পর্কে যা কিছু ধারণা ছিল, তার সবটুকুকেই কোলরিজ শৌখিন কল্পনার পর্যায়ে ফেলেছেন। সেই মৌলিক অংশ, যাদেরকে কোলরিজ বলছেন স্থায়ী এবং নির্দিষ্ট, যেগুলোর জন্ম অনুভূতিতে, যেগুলো স্মৃতি থেকে পৃথক স্থান-কালের পর্যায় অনুসরণ করে, আর তাদের চয়ন করে নেয় বাছাই করার ক্ষমতা বা judgment।

আরো পড়ুন:  পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি

সৃজনশীল কল্পনা

অন্যদিকে কোলরিজের মতে ‘Imagination’ এক সৃষ্টিশীল শক্তি। এই সৃজনশীল কল্পনা ‘dissolves, diffuses, dissipates[১] , in order to re-create’. কোলরিজ একে আখ্যা দিলেন এক ‘esemplastic power’ বা ‘একীকরণ শক্তি’ রূপে। এই একীকৃত সঞ্জীবনী শক্তির কাজ পরস্পর বিরোধী উপদানসমূহের সার্থক সমন্বয়, ‘the balance or reconciliation, of opposite or discordant qualities’. এই ‘বৈপরীত্যের মিলন’ তথা “Union of opposites” ফ্রিডরিখ শ্লেগেলের হাতে পরিণত হয়েছিলো জার্মান রোমান্টিকতার মূলসূত্রে। কোলরিজ এই জার্মান ভাব-উপাদানগুলিকে আত্মস্থ করেছিলেন।[২]

কিন্তু এসবের পরেও কোলরিজ খুঁজে পাচ্ছেন এক শেষতম মানসিক ক্ষমতা, যা অংশগুলোকে ভেঙে ফেলে, ছড়িয়ে দেয়, ছিন্ন-ভিন্ন করে নষ্ট করে দেয় নতুন করে গড়ার জন্য। আর যেখানে এই পদ্ধতি কাজ করে না, সেখানেও নিরন্তর চেষ্টা করে যায় সেগুলিকে আদর্শায়িত করার জন্য, ঐক্যবদ্ধ করার জন্য। বিষয়গুলো যত প্রাণহীন এবং অনড় হোক না কেন, এই ক্ষমতাটা কিন্তু অপরিহার্যভাবেই সজীব। এই ক্ষমতাই কোলরিজের মতে সৃজনশীল কল্পনা (imagination)।

অরগ্যানিক তত্ত্বের সমর্থক হিসেবে কোলরিজ সৃজনশীল কল্পনাকে জৈবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনের (growth and production) শক্তির মতো প্রাণময় (vital) ক্ষমতা হিসেবেই দেখেছেন, কারণ এই কল্পনা সম্পূর্ণ নতুন এবং নিজস্ব বস্তু নির্মাণ করে। স্মৃতিকে কোলরিজ অত্যন্ত যান্ত্রিক একটা ব্যাপার বলেছেন। আর শৌখিন কল্পনা ‘একধরণের সমষ্টিসাধক ক্ষমতা, যা সংলগ্ন করে রাখতে পারে। পক্ষান্তরে সৃজনশীল কল্পনা পুনঃসৃজন করে অনেকটা জীবদেহের পরিপাকের (assimilation) ভঙ্গিতে। সন্তর্পণে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে বিমিশ্রিত, দ্রবীভূত করে মিলনসাধন করে। নিও-ক্ল্যাসিক তত্ত্বে যাকে ‘reason’ বলা হয়েছিল, তাকে সৃজনশীল কল্পনার সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন কোলরিজ। একই সঙ্গে নিও-ক্ল্যাসিক তত্ত্বের জ্ঞান (knowledge) মিশে গেল বৃদ্ধির (growth) সঙ্গে।

মোটের উপর কোলরিজ বললেন, গাছের আগে যেমন বীজ, তেমনি অংশের আগে থাকে সমগ্র। অংশ নয়, সমগ্রই শ্রেষ্ঠ। বৃদ্ধির পথে গাছ যেমন বাইরের জলহাওয়াকে আপন করে নেয়, তেমনি শিল্পবস্তু বা ইমেজও মনের খাদ্য। পূর্বের অস্তিত্ব হারিয়ে সংশ্লেষের ফলে তা নতুন সমগ্রে পরিণত হয়। গাছের বৃদ্ধির পিছনে যেমন স্বতঃস্ফূর্ত গোপন প্রাকৃতিক শক্তি ক্রিয়াশীল, তেমনি সৃষ্টিও এক নিজস্ব গোপন শক্তি দ্বারা চালিত হয়। ফলে ইমেজগুলির অন্তর্নিহিত আকর্ষণ-বিকর্ষণ, আদান-প্রদান ও সাদৃশ্যের কারণে তারা নিজেরাই তাদের নতুন করে সৃষ্টি করে। অতএব ইমেজগুলি দিয়ে শিল্পনির্মাণ করছে কে বা কোন শক্তি—সে প্রশ্ন আর রইল না।

আরো পড়ুন:  মহাকাব্য জাতীয় বা বীরত্বব্যঞ্জক বিষয়ে বিশাল পটভূমিতে বিধৃত বর্ণনামূলক কাব্য

উদ্ভিদের সমগ্র এবং অংশ যেহেতু অস্তিত্বরক্ষার জন্য পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল, তাই কোলরিজ কান্টের উদ্দেশ্যবাহী দর্শন সমর্থন করে বললেন, সৃষ্টির প্রতিটি অংশই একই সঙ্গে উপায় এবং উদ্দেশ্য। আর ফ্রিডরিখ শেলিং-এর অনুসরণে থিসিস-অ্যান্টিথিসিসের দ্বিমেরু তত্ত্বের অবতারণা করে বললেন, সৃষ্টি মানে সামগ্রিক উপায়ে দুটি অংশের গাণিতিক যোগাযোগমাত্র নয়। সৃষ্টিতে দুটি অংশ পরস্পরের অন্দরে প্রবেশ করে আর দুইয়ে মিলে একটা তৃতীয় উচ্চতর সত্তার (higher third) জন্ম হয় যার মধ্যে দুইয়েরই অস্তিত্ব বর্তমান থাকে। সামগ্রিক সত্তার নির্মাণের জন্য দুই বৈপরীত্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের এই যে প্রক্রিয়া, একেই কোলরিজ বলছেন নান্দনিক ব্যাপার, অর্থাৎ সৃজনশীল কল্পনা (imagination)। সে এক বৈচিত্র্যময় যাদুকরী শক্তি (synthetic and magical power)। জৈবিক সংশ্লেষণ ক্রিয়ার মতোই দুই বিপরীত অথবা বিসদৃশ ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য অথবা মিলন বজায় রাখাই তার কাজ। অর্থাৎ ‘fancy’-কে তিনি বলছেন যান্ত্রিক ব্যাপার। তার যোগ অনুধাবন (understanding) এবং বাছাইয়ের (choice) মতো দ্বিতীয় শ্রেণির মানসিক ক্ষমতার সঙ্গে। ‘fancy’ তাই ধীশক্তির (talent) বিশেষত্ব। ‘imagination’ কিন্তু জৈবিক। এর যোগ প্রজ্ঞা (reason) আর ইচ্ছাশক্তির (will) মতো প্রথম শ্রেণির বিশিষ্ট অনুভূতির সঙ্গে। এটি তাই প্রতিভার (genius) সঙ্গে সংলগ্ন। প্রথমটি নির্মিতি (manufactured), আর দ্বিতীয়টি অলৌকিক ক্ষমতা (gift)। একটি নির্মাণ, অপরটি সৃজন। আগেই বলেছি, সৃজনে নির্মিতির ভূমিকাকে তিনি অস্বীকার করেননি। কারণ শিল্পীকে অবশ্যই সচেতনভাবে শিল্পবস্তু চয়ন করতে হবে। শিল্পসৃষ্টি তাঁর কাছে অচেতন প্রক্রিয়া ও অচেতন বৃদ্ধির যোগফল।

কল্পনার দুই রূপ

সৃজনশীল ‘কল্পনা’র দুটি রূপের কথাও বলেছিলেন কোলরিজ ‘Primary’ ও ‘Secondary’। প্রথমটি এক অসচেতন ক্রিয়া যার দ্বারা মন বিভিন্ন বস্তুর প্রত্যক্ষ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞান লাভ করে। অন্যপক্ষে, ‘Secondary imagination’ এক সচেতন শক্তি যা ব্যক্তিমানস ও আত্মার সকল ক্রিয়াকে সমন্বিত করে নতুন সৃষ্টি বা নতুন সৃজনের লক্ষ্যে। সূত্রাকারে বলতে গেলে কোলরিজের ‘কল্পনা’ হলো ‘বোধ’ (perception), ‘স্মৃতি’ (Memory ), ‘অনুষঙ্গ’ (Association ), ‘অনুভূতি’ (Feeling) ও ‘বুদ্ধি’ (Intellect)-র সংশ্লেষণ। কোলরিজের এই তত্ত্বের প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিলো ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা, যাতে গভীর অনুভব ও প্রগাঢ় মননশীলতার সমন্বয় লক্ষ্য করেছিলেন সুহৃদ কোলরিজ। 

আরো পড়ুন:  She Dwelt Among the Untrodden Ways কবিতার মূল বক্তব্য ও মূল্যায়ন

কোলরিজ কল্পনা তত্ত্ব অধ্যয়নের বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। তিনিই প্রথম সমালোচক যিনি কল্পনার প্রকৃতিটি অধ্যয়ন করেন এবং সৃজনশীল ক্রিয়াকলাপে এর ভূমিকা পরীক্ষা করেন। সমালোচকদের বেশিরভাগই কাল্পনিকতা এবং কল্পনা প্রত্যয়টিকে প্রায় প্রতিশব্দ হিসাবে ব্যবহার করেন, কোলরিজ হলেন প্রথম সমালোচক যা তাদের মধ্যে পার্থক্য করে এবং তাদের নিজ নিজ ভূমিকার সংজ্ঞা দেন। তিনি প্রাথমিক এবং গৌণ কল্পনা মধ্যে পার্থক্য করেন। কোলরিজের বিষয়টির বর্ণনাকে বৃহত্তর গভীরতা, অনুপ্রবেশ এবং দার্শনিক সূক্ষ্মতা দ্বারা চিহ্নিত করেছিলেন। সাহিত্য তত্ত্বের ক্ষেত্রে এটি তাঁর অনন্য অবদান।

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. দ্রবীভূত করে, বিস্তৃত করে, ছড়িয়ে দেয়।
২. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস, জে এন ঘোষ এন্ড সন্স, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, জানুয়ারী ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১১৬-১১৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!