পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি (ইংরেজি:The Origin of the Family, Private Property, and the State: in the Light of the Researches of Lewis H. Morgan) হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত মার্কসবাদের অন্যতম মৌলিক একটি গ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রথম ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়।[১]
এই বইটি লিখে এঙ্গেলস মনে করেন যে, তিনি ‘কিয়ৎ পরিমাণে মার্কসের অন্তিম নির্দেশ পালন’ করতে পেরেছেন। ব্যাপারটি হচ্ছে এই যে মার্কস নিজে এরূপ একটি রচনার কথা ভেবেছিলেন, তার জন্য মালমসলাও সংগ্রহ করেছিলেন, কিন্তু লিখে যেতে পারেননি। পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থে এঙ্গেলস ওই সমস্ত মালমসলা ব্যবহার করেন, যার মধ্যে রয়েছে মর্গানের আদিম সমাজ গ্রন্থে মার্কসের করা সমালোচনামূলক মন্তব্য সমেত উদ্ধৃতি। গ্রন্থটিকে ভ্লাদিমির লেনিন ‘আধুনিক সমাজতন্ত্রের অন্যতম প্রধান রচনা’ বলে অভিহিত করেন।[২]
‘পরিবার’, ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ এবং রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদী সমাজের সমাজবিজ্ঞানীগণ মানুষের জীবনের অপরিহার্য এবং চিরন্তন সংস্থা বলে প্রচার করে আসছিল। মার্কসবাদ সর্বপ্রথম সমাজের এরূপ ব্যাখ্যাকে অস্বীকার করে। সমাজের বিকাশের মার্কসবাদী ব্যাখ্যার প্রকাশ ঘটেছে এঙ্গেলসের এই পুস্তকে। আমেরিকার বস্তুবাদী সমাজবিজ্ঞানী লিউস হেনরী মর্গানও তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রাচীন সমাজ’-এ মানুষের আদি অবস্থা থেকে তার সংগঠনগত বিকাশের পর্যায়সমূহকে প্রচুর তথ্য সহকারে তুলে ধরেছিলেন। উক্ত তথ্যসমূহের উপর ভিত্তি করে এবং আধুনিক বিজ্ঞানের অপরাপর গবেষণার সাহায্যে এঙ্গেলস তাঁর এই গ্রন্থে প্রথমে মানুষের আদিম সাম্যবাদী অবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করেছেন।[৩]
এঙ্গেলসের এই রচনায় মানবজাতির বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়গুলোতে মানবজাতির ইতিহাসের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে; আদি গোষ্ঠীগত সমাজের পতনের প্রক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত মালিকানার উপর স্থাপিত শ্রেণীগত সমাজের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে; এই সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো দেখানো হয়েছে; ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পারিবারিক সম্পর্কের বিকাশের বিশেষত্ব ব্যাখ্যাত হয়েছে; রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও সারমর্ম আবিষ্কৃত হয়েছে এবং শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজের চড়ান্ত বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রের বিলোপের ঐতিহাসিক অনিবার্যতা প্রতিপন্ন করা হয়েছে।
এই গ্রন্থের ১৮৮৪ সালের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় এঙ্গেলস তাঁর এই গ্রন্থ লেখার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানান যে, “মর্গান তাঁর নিজস্ব পদ্ধতিতে আমেরিকায় ইতিহাসের সেই একই বস্তুবাদী ধারণা পুনরাবিষ্কার করেন, যা মার্কস চল্লিশ বছর আগেই আবিষ্কার করেছিলেন, এবং বর্বরতা ও সভ্যতার তুলনামূলক বিচারে ঐ ধারণা থেকে তিনি প্রধান প্রধান বিষয়ে মার্কসেরই সমসিদ্ধান্তে পৌঁছন।”
মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার বিবাহ এবং পারিবারিক বন্ধনের রীতি প্রকৃতিও যে বিবর্তিত হয়েছে, সে তথ্য এঙ্গেলস এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন। প্রাচীন গ্রিক, রোমান এবং টিউটন সমাজের পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত দ্বারা এঙ্গেলস প্রাচীন গোত্রতান্ত্রিক সমাজের ক্ষয়ের ধারাকে বিশ্লেষণ করেছেন। মানুষের শ্রমের উৎপাদনী ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শ্রম বিভাগের মধ্য দিয়ে সমাজে দ্রব্যের বিনিময় প্রথা এবং তার পরিণামে ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব ঘটে। এই বিবর্তনে কৌম সমাজের ক্ষয় ঘটে এবং অর্থনীতিক শ্রেণীরও সৃষ্টি হয়। সমাজের অর্থনৈতিক উৎপাদনের বিকাশে যখন পরস্পর বিরোধী স্বার্থসম্পন্ন আর্থনীতিক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে, তখনি শাসক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার্থে আবশ্যক হয়েছে বিধিবিধান প্রণয়নকারী ও রক্ষাকারী এক সংস্থার। এই সংস্থার নাম রাষ্ট্র।
এঙ্গেলস এই গ্রন্থে মোট তিনটি সিদ্ধান্ত টেনেছেন। তাঁর মতে : ১. পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং রাষ্ট্র – এগুলি মানুষের সমাজে কোনো চিরন্তন সংস্থা নয়। অর্থনীতির বিকাশের একটা পর্যায়ে এই সমস্ত সংস্থার উদ্ভব ঘটেছে। ২. রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রভু শ্রেণির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার হওয়া। দ্বন্দ্বমান সমাজে প্রভু শ্রেণির প্রয়োজন জোর জবরদস্তির মারফত শোষিত শ্রেণিকে দমিত করে রাখা। রাষ্ট্রের আইন এবং পুলিশ, বিচার ব্যবস্থা-অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো হচ্ছে সেই জবরদস্তি কার্যকর করার মাধ্যম বা যন্ত্র। ৩. সমাজ অনড় এবং অপরিবর্তনীয় নয়। সমাজের অর্থনীতি বিকশিত হচ্ছে। শোষক এবং শোষিত হিসাবে মানুষের শ্রেণি বিভাগ ঐতিহাসিক ঘটনা হলেও তা অবিনশ্বর নয়। সমাজের বিকাশের পরিণামে একদিন শ্রেণি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। একদিন যেমন তার উদ্ভব ঘটেছিল, তেমনি আর একদিন তার বিলোপ ঘটবে। সমাজ আবার শোষক শোষিত শ্রেণি মুক্ত সাম্যবাদী সমাজে পরিণত হবে। সেদিন শোষক শ্রেণি থাকবে না এবং তার স্বার্থরক্ষার জন্য কোনো অত্যাচারমূলক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন থাকবে না। আর তাই সেদিন রাষ্ট্রও অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে। আস্তে আস্তে অত্যাচারমূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
আরো পড়ুন
- নিজকথায় লোককথায় হুমায়ুন আজাদ এবং নারী : প্রতিরোধ, সত্য ও ভাঙচুরের পাঠ
- নেত্রকোনার ইতিহাসে কয়েকটি প্রসঙ্গ গ্রন্থের সম্পাদকের কথা
- শাহেরা খাতুন স্মারক গ্রন্থ-এর একটি মূল্যায়ন
- সিমন দ্য বোভেয়া: ব্রিজিত বার্দো এবং ললিতা সিনড্রোম ও অন্ধ হয়ে আসা চোখ গ্রন্থের আলোচনা
- স্পার্টাকাস আমেরিকান লেখক হাওয়ার্ড ফাস্টের ১৯৫১ সালের উপন্যাস
- লু স্যুনের ছোটগল্প-এর চরিত্রগুলো সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছে
- ‘অতপর একটি পোর্ট্রেট’ গল্পগ্রন্থে মধ্যবিত্ত নারীর জীবনচিত্র ফুটে উঠেছে
- বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বই দুই বাংলার লেখকদের বিভিন্ন রচনার সংকলন
- অনুপ সাদি রচিত মার্কসবাদ বইয়ের ভূমিকা
- অনুপ সাদির কবিতা তুলে এনেছে শ্রমঘনিষ্ঠ রাজনীতির স্বপ্নকাহন
- কবি অনুপ সাদি বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সমাজের মূর্ত ছবি আঁকেন
- তানিয়া ছিলেন রাশিয়ান সাম্যবাদী লীগের একজন তরুন বিপ্লবী
- ‘অতপর একটি পোর্ট্রেট’ গল্পগ্রন্থটি পাঠককে ঘোরের জগতে নিয়ে যাবে
- বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা হচ্ছে অনুপ সাদি সম্পাদিত গণতন্ত্র বিষয়ক গ্রন্থ
- অনুপ সাদি গ্রন্থাবলী বা অনুপ সাদি রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে বারোটি বই
- প্লেটোর রচনাবলী বা প্রকাশনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব হচ্ছে ১৯১৭ সালে লেনিন লিখিত বই যাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচিত
- বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ বা বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা বই সম্পর্কে
- ‘আকালি বাড়ি যায়’ পূরবী সম্মানিত’র গল্পগ্রন্থের আলোচনা
- আবুল কাসেম ফজলুল হকের গ্রন্থপঞ্জি হচ্ছে এই দার্শনিক রচিত গ্রন্থসমূহ
- সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় লেনিন রচিত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ
- কী করতে হবে হচ্ছে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন রচিত সাম্যবাদী রাজনৈতিক গ্রন্থ
- স্যামসন অ্যাগনিসটিজ জন মিল্টনের লেখা একটি ট্রাজেডি নাটক
- এ্যান্টি-ডুরিং হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস রচিত একখানি গ্রন্থের প্রচলিত নাম
- গোথা কর্মসূচির সমালোচনা হচ্ছে কার্ল মার্কসের প্রস্তুত করা একটি দলিল
- শিবদাস ঘোষ, জাসদ বাসদ রাজনীতি ও ভাঙন প্রসঙ্গ গ্রন্থের মূল্যায়ন
- লেনিনের বই রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা
- মাও সেতুঙের শেষ জীবনের উদ্ধৃতি গ্রন্থের প্রথম সংস্করণে প্রকাশকের ভূমিকা
- মাও সেতুঙের শেষ জীবনের উদ্ধৃতি গ্রন্থের একটি পর্যালোচনা বা ভূমিকা
- পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থ প্রসঙ্গে আলোচনা
- চার্বাক সুমনের ব্যঙ্গ উপন্যাস ‘সদর ভাইয়ের অমর কাহিনি’র একটি পর্যালোচনা
- কামন্দকীয় নীতিসার একটি প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ যা রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থা বর্ণনা করে
- গ্রন্থাগার তুলে ধরে মানব সমাজের হাজার বছরের চিন্তা ও অনুশীলনের মহাকল্লোল
- মার্কসবাদ নামের বই লেখা হয়েছে বিপ্লবী বৈশিষ্ট্যসমূহ তুলে ধরতে
- কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে রচিত একটি প্রাচীন গ্রন্থ
- মেকিয়াভেলি রচনাবলী হচ্ছে তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ
- কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার মার্কস ও এঙ্গেলস রচিত মুক্তির নির্দেশনা
- আইন-ই-আকবরী হচ্ছে আবুল ফজল রচিত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ৭ মে ২০১৮, “পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থ প্রসঙ্গে”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/book/origin-of-family-private-property-and-state/
২. ইয়েভগেনিয়া স্তেপানভা, এঙ্গেলস, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ, সেপ্টেম্বর ২০১২, পৃষ্ঠা ১৭৫-১৭৬
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ৩০০।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।