‘অতপর একটি পোর্ট্রেট’ গল্পগ্রন্থটি পাঠককে ঘোরের জগতে নিয়ে যাবে

অনাবিলা অনা
অনাবিলা অনা, লেখক ও আলোচক

বইয়ের নাম: অতপর একটি পোর্ট্রেট,
প্রকাশক: নব সাহিত্য প্রকাশনী,
প্রথম প্রকাশকাল: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১,
প্রচ্ছদ: শিশির মল্লিক,
মূল্য: ২৩০ টাকা মাত্র

পূরবী সম্মানিত মানেই হলো লেখনীর মাধ্যমে সময়োপযোগী প্রতিবাদ বা সামাজিক মেসেজ তথা তথ্য দেয়া। তিনি প্রত্যেকটা গল্পেই ফুটিয়ে তোলেন সামাজিক পরিস্থিতি বা সমাজের বর্তমান দুরাবস্থা। গ্রামীণ মানুষের জীবন উপলব্ধি করাই পূরবী সম্মানিতের সহজাত প্রবৃত্তি। পূরবী সম্মানিত যিনি একজন প্রগতিবাদী যিনি মার্কসবাদী আদর্শে আদর্শিত।

নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পেশায় তিনি একজন শিক্ষক। তিনি মানুষের যাপিত জীবনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব সংঘাত-সংগ্রাম, নারী-জীবন নিয়ে বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা ও সাময়িকীতে গল্প লিখেন নিয়মিত। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ “আকালি বাড়ি যায়”।

আমাদের দেশে প্রায় অধিকাংশ নারীরাই স্বামী কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে থাকে। তবে শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টি সবার সামনে আসলেও মানসিক নির্যাতনের বিষয়টি অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়। আর সেই মানসিক নির্যাতন ধৈর্য্য ধরে সহ্য করে যায় “রাজকন্যার মৃত্যু” গল্পের রাজকন্যার মতো নারীরা। “রাজকন্যার মৃত্যু” গল্পের নায়িকার নামই রাজকন্যা। যে কিনা একাধারে লেখিকা, গায়িকা ও আবৃত্তিকার। তার দিন সন্ধ্যা অব্দি গড়াতো কোনো কবিতা কর্মশালা, নাটক, আবৃত্তি বা কোনো সাহিত্য সম্মেলনে। বিয়ে হয়েছিলো বাবার ব্যবসায়ী বন্ধুর সঙ্গে। গল্পের লেখিকার সঙ্গে সই পাতিয়েছিল এই রাজকন্যা। আর এই সইয়ের কাছেই সব সুখ-দুঃখের গল্প করতেন তিনি। তারপর প্রথম স্বামীর সাথে ডিভোর্সের পর বাবার ইচ্ছায় দ্বিতীয় বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ। তবু যেন হাজার সুখের মধ্যে রাজকন্যার ভেতরে বিষবাণে ভরাট হয়ে আছে। আর এমন রাজকন্যারা আমাদের সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত। যার বেশির ভাগই আমাদের চোখে পড়ে না।

আরো পড়ুন:  কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে রচিত একটি প্রাচীন গ্রন্থ

আমাদের বর্তমান সমাজ এতোটা নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে যে যেসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা মাথা ঘামানোর কথা না সেসব বিষয়েও নাক গলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। “যুবতীটি শহরের প্রধান সড়কে” গল্পে এক নারী যে কিনা রাস্তায় শুয়ে দিব্যি নিশ্চিন্তে পা নাড়াচ্ছে, রাতে ঘুমোচ্ছে, সবকিছু করছে। বলতে গেলে একজন স্বাধীনচেতা উন্মাদ। যার এসব কান্ড দেখে শহরে চলছে হুলস্থুল কান্ড। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত ধর্ষিত হচ্ছে হাজার হাজার নারী, নির্যাতিত হচ্ছে মা-বোনেরা। কিন্তু হচ্ছে না কোনো বিচার, করছে না কেউ প্রতিবাদ। প্রতিবাদ হলেও সেটা চিরস্থায়ী হয় না। যে দেশের সুশীল সমাজ পাঁচ বছরের বাচ্চা শিশুকে দেখেও প্রতি ইঞ্চি শরীরের ভাঁজ ও সমতলে চোখ রাখে সে দেশে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বিচার না হওয়াটাই স্বাভাবিক। আর সেইসব ঘটনার বুলেট প্রতিবাদ নিয়েই “যুবতীটি শহরের প্রধান সড়কে” গল্পের যুবতীটি রাস্তায় নেমে এলো। সে প্রমাণ করে দিলো যে দেশে কোন ঘর, যানবাহন, পার্ক-বিনোদন কেন্দ্র, ছাত্রাবাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি কোন আবদ্ধ স্থানই আর প্রকাশ্যে রাস্তার চেয়ে নিরাপদ নয়। এই যুবিতীর কর্মকাণ্ডে যেখানে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনা চলছিল সেখানে তার আত্মরক্ষার এমন অভিনব কৌশলে উদ্বুদ্ধ হতে থাকল ভিন্ন বয়সের নারীরা।

বাংলাদেশের হিন্দু আইনে বিবাহ-বিচ্ছেদ বা ডিভোর্সের ব্যবস্থা নেই, তবে আলাদা থাকার ব্যবস্থা আছে। তবে ব্যবস্থা যদি খুবই সঙ্গী হয় যে স্বামী-স্ত্রীর আর এক সঙ্গে বসবাস করা চলে না তখন। আর সে কাহিনীই উঠে এসেছে “আইনতঃ ধর্মতঃ স্ত্রী”। যেখানে রয়েছে হিন্দু নারীদের ডিভোর্স, সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার না থাকায় সৃষ্ট জটিলতার গল্প।

পূরবী সম্মানিতের বই সম্পর্কে আলোচনা দেখুন

আলোচনা করছেন লেখক অনুপ সাদি

“তামস গহ্বর” গল্পে দেখানো হয়েছে কিভাবে নিলুফারের মতো প্রেম-ভালোবাসা নামক ফাঁদে পড়ে কালসাপের ছোবলে নিঃস্ব হয়। যখন হঠাৎ ঝড় এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়, তখন মাহিনের মতো ছেলেরা এসে জীবনের বাঁক বদলে দেয়। এদেশে মাহিনের মতো যুবকরাও আছে যারা নারীদের শরীর নিয়েই মেতে থাকে না। কুসংস্কারের থাবা কিংবা সামাজিক বেড়াজাল উপড়ে ফেলতেও জানে। মাহিন হলো “ অতঃপর একটি পোট্রের্ট” গল্পের একটি চরিত্র। যে গল্পে রয়েছে নতুনত্বের হাতছানি। শেষ গল্প “প্যারাডাইস কুইন” পড়ে রীতিমতো শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। নিয়তির মতো মেয়েদের জীবনসংগ্রামের মাঝপথে এসে ইমতিয়াজ আহমেদের মতো দানবেরা থামিয়ে দেয়। উঠতে দেয় না সফলতার চরম শিখরে। বিভিন্ন ইস্যুর মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয় নিয়তির মতো মেয়েদের।

আরো পড়ুন:  গোথা কর্মসূচির সমালোচনা হচ্ছে কার্ল মার্কসের প্রস্তুত করা একটি দলিল

পূরবী সম্মানিতের লেখা “অতপর একটি পোর্ট্রেট” বইটি মূলত সমাজের নারীদের নিয়ে লেখা। বর্তমান সমাজে প্রত্যেকটা নারীই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতিত হয়। সেই নারীরা কিভাবে নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত হয় বা হচ্ছে তারই বাস্তব-অবাস্তব, সত্য-মিথ্যার বৈচিত্র্যময় মিশ্রণ ঘটিয়েছেন পূরবী সম্মানিত তাঁর এই গ্রন্থে। আঠারোটি গল্পের এই গল্পগ্রন্থটি এতোটাই চমৎকার আর মনোমুগ্ধকর যে বইটি পাঠককে ঘোরের জগতে নিয়ে যাবে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!