কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে রচিত একটি প্রাচীন গ্রন্থ

অর্থশাস্ত্র (সংস্কৃত: अर्थशास्त्र) হচ্ছে কৌটিল্য রচিত হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে একটি প্রাচীন গ্রন্থ। বিষ্ণুগুপ্ত বা কৌটিল্য নামে পরিচিত তক্ষশিলার অধিবাসী জনৈক ব্রাহ্মণকে এই গ্রন্থের রচয়িতা হিসেবে ধরা হয়। তিনি চাণক্য নামেও পরিচিত। বিশাখদত্ত রচিত মুদ্রারাক্ষস থেকে জানা যায় যে তিনি মগধে মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের (৩২২-২১৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। গ্রন্থটির রচনাকাল এবং রচয়িতা কৌটিল্য সম্পর্কে মতভেদ আছে।[১]

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের গুরুত্ব

অর্থশাস্ত্র গ্রন্থটি শুধু ধনসম্পদ সম্পর্কিত নয়, তাতে রাষ্ট্রনীতি, দণ্ডনীতি, আইন, প্রশাসন, সমাজতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হয়েছে। গ্রন্থকার আন্বীক্ষিকী, ত্রয়ী, বার্তা ও দণ্ডনীতি—এই বিদ্যা চতুষ্টয়ে তাঁর অধিকারের স্বাক্ষর ছাড়াও গ্রন্থটিতে তিনি শুল্কশাস্ত্র, বাস্তুবিদ্যা, ধাতুবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূগোল, ইতিহাস প্রভৃতি নানা জ্ঞানের ক্ষেত্রে গভীর বিদ্যাবত্তার পরিচয় দিয়েছেন।

কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে চন্দ্রগুপ্তের শাসনের বিস্তারিত বিবরণ আছে। এ গ্রন্থের গুরুত্ব ও তাৎপর্য্য এখানে যে, এর মধ্যে রাষ্ট্র শাসনের সর্ববিষয়ে সম্রাট তথা শাসকের করণীয় সম্পর্কে উপদেশ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। রাষ্ট্র বা শাসকের প্রকৃতি সম্পর্কে গ্রীক এরিস্টটলের ‘পলিটিকস’ এর ন্যায় তাত্ত্বিক আলোচনা না থাকলেও শাসকের করণীয় সম্পর্কে কৌটিল্যের উপদেশাবলী থেকে রাষ্ট্র ও শাসক সম্পর্কে তাঁর একটি ধারণারও আভাস পাওয়া যায়।

কৌটিল্যের মতে, শাসকের প্রধান কর্তব্য হচ্ছে রাষ্ট্র এবং নিজের শাসনকে রক্ষা করা। তার শাসনকে রক্ষা করার জন্য তাকে শত্রু মিত্রকে চিহ্নিত করতে হবে। সম্রাটের বিরুদ্ধে কোথাও কোনো ষড়যন্ত্র সৃষ্ট হচ্ছে কিনা, তা জানার জন্য তাকে গুপ্তচর নিয়োগ করতে হবে। শাসকের রাষ্ট্রের বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকতে হবে। তার কর্মচারীবৃন্দকে নির্দেশ দিতে হবে। ‘অস্ত্রশাস্ত্রের’ মধ্যে সম্রাটের দৈনন্দিন কার্যের বিভিন্ন ভাগ ও প্রহরকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র ও নিজের শাসনকে রক্ষা করার জন্য শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য সম্রাটকে প্রয়োজনে নির্মম হতে হবে। এ লক্ষ্যে কোনো কৌশল গ্রহণেই সম্রাটকে দ্বিধা করা চলবে না। সম্রাটের শাসনের লক্ষ্য হবে প্রজাদের সুশাসন করা। সম্রাটকে সুশাসনের জন্য শপথ গ্রহণ করতে হবে। এই শপথের মর্ম হবে আমি প্রজাদের নির্যাতন করলে মৃত্যুর পরে আমার যেন নরকবাস ঘটে।[২]

আরো পড়ুন:  কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা

অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু

গ্রন্থটি ‘অধিকরণ’ নামে ১৫টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত এবং এক একটি অধিকরণ কিছু সংখ্যক প্রকরণে বিভক্ত। মোট ১৮০টি প্রকরণ আছে। প্রকরণগুলি ১৫০টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। ৬০০ শ্লোকে গ্রন্থখানি রচিত। পরিচ্ছেদগুলির শেষে আলোচিত বিষয়বস্তুর সার প্রদত্ত হয়েছে। গ্রন্থটি ভাষ্য ও সূত্রাকারে রচিত। মাঝে মাঝে কিছু শ্লোক অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শ্লোকের সংখ্যা মোট ছয় হাজর। গ্রন্থকার বৃহস্পতি, শুক্র প্রমুখ পূর্বসূরিদের কাছে তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। ভাষা সহজ, কিন্তু স্থানবিশেষে দুর্বোধ্য। অর্থশাস্ত্রের একাধিক টীকা আছে। অধিকরণগুলিতে আলোচিত বিষয়সমূহের কয়েকটির সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নীচে দেওয়া হলো। তবে আলোচনার সুবিধার্থে সুবিশাল এই গ্রন্থের বিভিন্ন অধিকরণকে মোটামুটি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যেতে পারে।

রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব

সপ্তাঙ্গ মতবাদ বা সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব (ইংরেজি: Saptanga Theory of State) হচ্ছে কৌটিল্যের রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পর্কিত রাজনৈতিক চিন্তাধারা। কৌটিল্য তাঁর গ্রন্থ অর্থশাস্ত্রের শুরুর দিকে আলোচনা করেছেন রাজধর্ম তথা রাজার কর্তব্য বিষয়ে। তিনি রাষ্ট্র ব্যবস্থার সপ্ত প্রকৃতি বা সাতটি প্রকৃতির কথা উল্লেখ করেছেন। মানব শরীরে যেমন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থাকে, তেমনি সাতটি অঙ্গের সম্মিলিত ফলই রাষ্ট্রশরীর। এই সপ্তাঙ্গ তত্ত্বের মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রত্যয় সম্পর্কে আধুনিক যে সব লক্ষণের কথা বলা হয় অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব, সরকার, ভূখণ্ড, জনসংখ্যা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

মূল নিবন্ধ: রাষ্ট্রের সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব

রাষ্ট্রের তথা সমাজের উৎপত্তি সম্পর্কে একটি কথোপকথনের মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে যে জঙ্গলের রাজত্ব থেকে পরিত্রাণের জন্য দ্রব্যাদির বিনিময়ে মনু নামক রাজার আধিপত্য স্বীকৃতি পায়। সার্বভৌমত্বের অধিকারী রাজার দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও অনেক কথা বলা হয়েছে। রাজাকে প্রদেয় ভূমিরাজস্বের হারও নির্ধারিত করা হয়। মনু প্রবর্তিত আইন ও বিধিনিষেধ অযৌক্তিক প্রতিপন্ন হলে যুক্তিগ্রাহ্য আইন অনুসরণ করা বিধেয়। জনসাধারণের সুখ ও শান্তি রাজার কল্যাণ বিধান করে। দণ্ড শব্দটি অর্থশাস্ত্রে শাসনশক্তির যষ্টিসদৃশ প্রতীক এবং শাস্তি—উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

আরো পড়ুন:  মানবেন্দ্রনাথ রায়ের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে সমাজতন্ত্র, জাতীয় মুক্তি ও নবমানবতাবাদ

কৌটিল্য রাজনীতিকে মেকিয়াভেলির মতো ধর্ম ও নৈতিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত রাখেন। শুভ লক্ষ্যে পৌছতে অশুভ মাধ্যম অনুসরণে কোনও আপত্তি নেই। তবে দেশে মাৎস্যন্যায় দেখা দিলে রাজদণ্ডের কঠোর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। রাজার প্রাত্যহিক এবং দিবসব্যাপী ইতিকর্তব্য, যথা প্রজাপালন চিন্তা, আয়ব্যয়ের হিসাবরক্ষণ, স্নানাহার, রাজধানী পরিদর্শন, পড়াশোনা, সভাসদদের সঙ্গে মিলিত হওয়া, বিনোদন, সৈনাবাহিনী পরিদর্শন, গুপ্তচরদের সঙ্গে সংযোগ ইত্যাদি।

রাজ্যের প্রশাসন

অর্থশাস্ত্রের আলোচনায় দ্বিতীয় বিষয় হলো রাজ্যের প্রশাসন। আমলাবর্গ, যাদের নামকরণ করা হয়েছে অধ্যক্ষ, তাদের দায়দায়িত্ব এবং সেইসঙ্গে ভূমিব্যবস্থা, রাজস্ব, রাজকোষ, পণ্যাদি উৎপাদন, বাণিজ্য, কৃষি, সামরিক বাহিনীর বর্গবিন্যাস, নগরের স্বায়ত্তশাসন ইত্যাদির অনুপুঙ্খ আলোচনা দেখা যায় দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম অধিকরণে। বিবাহ, উত্তরাধিকার, ঋণ, সঞ্চয়, দাস মালিকানা; অপরাধীকে কারারুদ্ধ করা ও শাস্তিদান; শাস্তি অথবা অঙ্গচ্ছেদের পরিবর্তে জরিমানা আদায়; আইন ও রীতিনীতি ভঙ্গের দায়ে দণ্ডবিধান ইত্যাদি বিষয় এই পর্যায়ে সবিস্তারে বলা হয়েছে।

যুদ্ধ ও কূটনীতি

তৃতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অধিকরণের বিষয় হলো যুদ্ধ ও কূটনীতি। সপ্তম অধিকরণে কৌটিল্য ছয় ধরনের বিষয়সংক্রান্ত কর্মপন্থার কথা বলেছেন, যথা শান্তি, যুদ্ধনিরপেক্ষতা, অভিযানপ্রস্তুতি, জোটবদ্ধতা ও নিরাপত্তার চুক্তি, সন্ধি ও সংগ্রাম। নবম অধিকরণে আক্রমণকারীর মতিগতি ও শক্তির বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দশম অধিকরণে যুদ্ধ, রণসজ্জা, শিবির স্থাপন, সৈন্যবাহিনীর প্রকৃতি অনুযায়ী রণকৌশল, নিরাপত্তা বিধান। দ্বাদশ অধিকরণে শক্তিশালী শত্রুপক্ষ, ত্রয়োদশ অধিকরণে দুর্গ দখলসুত্রে শক্রশিবিরে বিভেদ, গোপন কৌশলে পররাজ্যের নৃপতিদের প্রলোভন দেখানো, গুপ্তচর পাঠানো, অধিকৃত দেশে শান্তিস্থাপন; চতুর্দশ অধিকরণে শত্রুপক্ষের সঙ্গে গোপন আচরণ, ছলে বলে কৌশলে পর্যদস্ত করা, নিজ সৈন্যবাহিনীর আহতদের নিরাময় ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে।[৩]

‘অর্থশাস্ত্রে’ শাসনের যে কূটনীতির বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় তাতে এই গ্রন্থকে সমসাময়িক গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিস্টটলের ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থের কোনো কোনো আলোচনার সঙ্গে সাদৃশ্যের ভিত্তিতে তুলনা করা চলে। শাসককে নিজের শাসন রক্ষা করার জন্য কোনো কৌশল গ্রহণেই দ্বিধা করলে চলবে না-অর্থশাস্ত্রের এরূপ উপদেশ ইউরোপের পঞ্চদশ শতকের মেকিয়াভেলিকে ই্উরোপের কৌটিল্য বলে আখ্যায়িত করা চলে। অর্থশাস্ত্রের বিধিবিধানের ফলে দেশে সমকালে একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠেছিল—একথা বললে অত্যুক্তি হয় না।

আরো পড়ুন:  সমাজতন্ত্র সম্পর্কে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতামত

দ্রষ্টব্য. কামন্দকীয় নীতিসার; রাজধর্ম ; মনুস্মৃতি।

চিত্রের ইতিহাস: কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের ১৯১৫ সালে ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রকাশিত প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ।

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ২২ অক্টোবর, ২০১৮, “কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র হচ্ছে হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে একটি প্রাচীন গ্রন্থ”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/book/on-arthasastra/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৫১-২৫২।
৩. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২২-২৩।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page