এপ্রিল থিসিস কী? রুশ বিপ্লবে লেনিনের ঐতিহাসিক ১০ দফার গুরুত্ব

এপ্রিল থিসিস (ইংরেজি: April Theses, রুশ: апрельские тезисы) ছিল বলশেভিক পার্টির প্রধান নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন কর্তৃক ঘোষিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্দেশক রাজনৈতিক প্রস্তাবনা। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের অবসান ঘটলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটেনি। এমন এক জটিল সন্ধিক্ষণে সুইজারল্যান্ডে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ১৯১৭ সালের ৩রা এপ্রিল রাতে লেনিন ফিনল্যান্ড স্টেশনে এসে পৌঁছান। সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে আসা হাজার হাজার বিপ্লবী শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের সামনে তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা রাশিয়ার পরবর্তী রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

সেই রাতে পেত্রোগ্রাদের সেই জমায়েতে লেনিন তৎকালীন অস্থায়ী সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপান্তর করার ডাক দেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয় ছাড়া রাশিয়ার সাধারণ মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু শক্তিশালী বক্তৃতাই মূলত ‘এপ্রিল থিসিস’ এর প্রাথমিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। লেনিনের এই নতুন কৌশল বলশেভিক কর্মীদের মধ্যে এক নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল।

তার ঠিক পরদিন অর্থাৎ ৪ঠা এপ্রিল, লেনিন প্রথমে বলশেভিকদের একটি নিজস্ব সভায় এবং পরবর্তীতে বলশেভিক ও মেনশেভিকদের একটি যৌথ সম্মেলনে তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট আকারে পেশ করেন। এই রিপোর্টে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করা, কৃষকদের হাতে জমি তুলে দেওয়া এবং সমস্ত ক্ষমতা ‘সোভিয়েত’ বা শ্রমিক পরিষদের হাতে অর্পণ করার প্রস্তাব দেন। ইতিহাসবিখ্যাত এই রিপোর্টটিই মূলত ‘এপ্রিল থিসিস’ নামে পরিচিত, যা অক্টোবর বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করেছিল এবং বলশেভিকদের রাশিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মূল মন্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল।[১]

এপ্রিল থিসিস-এর মূল বিষয়

ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন তাঁর ‘এপ্রিল থিসিস’-এর মাধ্যমে বলশেভিক পার্টি এবং তৎকালীন প্রলেতারিয়েত বা সর্বহারা শ্রেণির সামনে এক সুনির্দিষ্ট ও তাত্ত্বিক সংগ্রামের রূপরেখা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, রাশিয়ার বিপ্লবকে কেবল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক স্তরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং একে ধাপে ধাপে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। লেনিনের এই পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত মূর্ত এবং দূরদর্শী, যা তৎকালীন রাশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে শ্রমিক শ্রেণির জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।

এই থিসিসের অন্যতম বৈপ্লবিক দিক ছিল ‘সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার ডাক। লেনিন প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে সোভিয়েত বা শ্রমিক-সৈনিক-কৃষকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত শাসনব্যবস্থাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি ‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েতের হাতে’—এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন ধাঁচের রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যেখানে সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে।

লেনিন কেবল এপ্রিল থিসিস ঘোষণার মাধ্যমেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননি, বরং পরবর্তী সময়ে তাঁর এই বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি ‘রণকৌশল সম্পর্কে পত্রাবলি’ (Letters on Tactics), ‘আমাদের বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির কর্তব্য’ এবং ‘রাশিয়ার রাজনৈতিক দলসমূহ ও প্রলেতারিয়েত শ্রেণির কর্তব্য’ নামক গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধগুলোতে এই লড়াইয়ের কৌশলগুলো নিয়ে নিবিড় আলোচনা করেন। এই নিবন্ধগুলো মূলত এপ্রিল থিসিসের সারমর্মকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে এবং বলশেভিকদের রাজনৈতিক আদর্শকে আরও সুসংহত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।[১] এপ্রিল থিসিসেই লেনিন সর্বপ্রথম পার্টির নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব করেন। এ প্রসঙ্গে পাদটীকায় তিনি বলেন,

“যে সমাজ গণতন্ত্রের সরকারি নেতারা দুনিয়ার সর্বত্র সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং বুর্জোয়াদের স্বপক্ষে দলত্যাগ করেছে, … সেই সমাজ গণতন্ত্রের বদলে আমাদের এখন অবশ্যই নিজেদের অভিহিত করতে হবে কমিউনিস্ট পার্টি বলে”।[২]  

এপ্রিল থিসিসের মধ্য দিয়েই তিনি মুলত তৎকালীন বলশেভিক পার্টির রাজনৈতিক অবস্হান ও পরবর্তিতে করণীয়গুলো বিশদভাবে তুলে ধরেন। সুতরাং এপ্রিল থিসিস ছিল লেনিন কর্তৃক একটি বিশদ কর্মপরিকল্পনা। আর এ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণার পরপরই লেনিনের প্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

এপ্রিল থিসিসের মুল বিষয়গুলোকে ব্যাখ্যা করে লেনিন বলেন, ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার বিপ্লবের প্রথম পর্বের সমাপ্তি হয়েছে। এ পর্বে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণী চেতনা ও সংগঠন না থাকায় দেশে ক্ষমতা বুর্জোয়াদের হাতে পড়েছে এবং এখানেই এ পর্বের শেষ। বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়ে গেছে। দ্বিতীয় পর্বে গরিব কৃষকের সংগে মৈত্রীবদ্ধ প্রলেতারিয়েতের হাতে ক্ষমতা আসলে এই পর্ব শেষ হবে।

সংক্ষিপ্ত রূপে এপ্রিল থিসিস

থিসিসসমূহে লেনিন বলেন,

১. সাময়িক সরকার পুঁজিবাদী চরিত্রের কারণে বুর্জোয়া সরকার এবং সেই সরকারকে সামান্যতম সমর্থন করা চলবে না। সরকারকে সামান্যতম ছাড় দেওয়া চলবে না। বরং সাময়িক সরকারের পরদেশ দখল সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি ডাহা মিথ্যা তা স্পষ্ট করে দিতে হবে। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পররাজ্যগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ হিসেবে অভিযুক্ত করেন।

২. রাশিয়ায় বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো এই যে, প্রলেতারিয়েতের শ্রেণীচেতনা ও সংগঠন যথেষ্ঠ শক্তিশালী না থাকার কারণে বিপ্লবের প্রথম পর্বে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে বুর্জোয়াদের হাতে, এই পর্যায় অতিক্রম করে দেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্বে, এই পর্বে ক্ষমতা অবশ্যই প্রলেতারিয়েত এবং কৃষকদের সবচেয়ে গরিব অংশগুলোর হাতে হস্তান্তরিত হবে।

৩. এই বাস্তব অবস্থাটা উপলব্ধি করতে হবে যে, শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলির বেশির ভাগের মধ্যে আমাদের পার্টি সংখ্যালঘু, এখন অবধি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু, আর আমাদের বিরুদ্ধে রয়েছে একটা জোট যেটার মধ্যে আছে সমস্ত পেটি-বুর্জোয়া সুবিধাবাদীরা, জনপ্রিয় সমাজতন্ত্রী এবং সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারি থেকে শুরু করে অরগানাইজিং কমিটি (চখেইজে, সেরেতেলি আরও সব), স্তেকলোভ, আরও অনেকে, যারা বুর্জোয়াদের প্রভাবের কাছে বশ্যতাস্বীকার করেছে এবং এই প্রভাবকে প্রলেতারিয়েতের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে।

জনগণকে এটা উপলব্ধি করাতে হবে যে, বর্তমান মুহুর্তে শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলিই হচ্ছে বিপ্লবী সরকারের একমাত্র সম্ভাব্য রূপ, সুতারাং যতদিন এই সরকার বুর্জোয়াদের প্রভাবের কাছে বশ্যতাস্বীকার করছে ততদিন আমাদের কাজ হলো ধৈর্যসহকারে অবিচলিত চিত্তে এবং অধ্যবসায়ের সাথে তাদের কর্মকৌশলের ভ্রান্তিগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরা, যে ব্যাখ্যা জণগণের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব প্রয়োজনগুলোর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।

৪. শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলি থেকে পার্লামেন্টারি প্রজাতন্ত্রে ফিরে যাওয়া হবে একটা পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ-আমরা চাই সারা দেশে তৃণমুল থেকে উপর পর্যন্ত শ্রমিক, ক্ষেতমজুর আর কৃষক প্রতিনিধি সোভিয়েতগুলির প্রজাতন্ত্র।

৫. পুলিশ, সেনাবাহিনী এবং আমলাতন্ত্রের বিলোপসাধন। সকল কর্মকর্তা নির্বাচিত হওয়া চাই, তারা সবাই হবেন যেকোন সময় অপসারণযোগ্য, তাদের কারও বেতন একজন দক্ষ শ্রমিকের গড় মজুরি অতিক্রম করতে পারবে না।

৬. ভূমিবিষয়ক কর্মসূচীতে গুরুত্বের ভরকেন্দ্রটা ক্ষেতমজুর প্রতিনিধি সোভিয়েতের হাতে তুলে দিতে হবে। জমিদারদের সকল ভূসম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

দেশের সমস্ত ভূমির রাষ্ট্রীয়করণ সম্পন্ন করতে হবে, ভূমির বিলিব্যবস্থা স্থানীয় ক্ষেতমজুর এবং কৃষক সোভিয়েতগুলির হাতে হস্তান্তর করতে হবে। পৃথক পৃথক গরিব কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েতগুলির নিয়ন্ত্রণাধীনে এবং সরকারী খরচে প্রত্যেকটা বৃহৎ ভূসম্পত্তিতে একটা আদর্শ খামার স্থাপন করতে হবে।

৭. অবিলম্বে দেশের সকল নিয়ন্ত্রণ থাকবে শ্রমিক প্রতিনিধি সোভিয়েতের হাতে।

৮. দেশের সকল ব্যাংকের একত্রীকরণ সন্নিহিত করা এবং সেগুলোর সমন্বয়ে একটি একক জাতীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হবে। ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ থাকবে সোভিয়েত শ্রমিকদের ডেপুটিদের কাছে।

৯. পার্টির করণীয়‍ হিসেবে বলেন, (ক) অবিলম্বে পার্টি কংগ্রেস ডাকা; (খ) পার্টি কর্মসূচীতে রদ বদল আনা, প্রথমত সম্রাজ্যবাদ এবং সম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সংক্রান্ত প্রশ্নে; দ্বিতীয়ত “কমিউন রাষ্ট্র” প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে, তৃতীয়ত সেকেলে সর্বনিম্ন কর্মসূচী সংশোধন প্রশ্নে এবং চতুর্থত, পার্টির নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে।

১০. একটা বিপ্লবী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা করা হবে যা পরে Comintern বা তৃতীয় আন্তর্জাতিক হিসেবে ১৯১৯ সালে গঠিত হয়।[৩]

🔗 লেনিন সংগ্রহশালা: গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী

তথ্যসূত্র:

১. ভি. আই. লেনিন; সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কী; সেরাজুল আনোয়ার অনূদিত, গণপ্রকাশন, ঢাকা; ডিসেম্বর, ১৯৯০
২. লেনিন, সম্পূর্ণ রচনাবলী, ২৪ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪
৩. ভি. আই. লেনিন; এপ্রিল থিসিস, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৫-৯।

Leave a Comment