মার্কসবাদে লেনিনের অবদান (ইংরেজি: Lenin’s contribution to Marxism) উল্লেখিত হয়েছে প্রধানত ছয়টি ক্ষেত্রে এবং আরো বহুমুখী বিষয়ে। মার্কসবাদকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের বহুমুখী অবদানকে জোসেফ স্তালিন সার সংকলন করেছিলেন। সেসব নিয়েই আমাদের এই আলোচনা।
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস বিপ্লব সংগঠনে দলের ভূমিকাকে অতটা গুরুত্ব না দিলেও লেনিন বিপ্লব সংগঠনের ক্ষেত্রে দলের ভূমিকাকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। মার্কসবাদ অনুসারে পুঁজিবাদী ও সাম্যবাদী সমাজের মধ্যবর্তী পর্বে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে কিন্তু লেনিনের আলোচনায় দেখা গেছে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি দলের নীতি ও কৌশলের ব্যাপক বিকাশ সাধন করছেন। সুবিধাবাদীদের চিন্তা অনুসারে শ্রমিক শ্রেণি রাজনৈতিক সচেতন না হলেও এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। লেনিন মনে করতেন শ্রমিক শ্রেণিকে নিয়ে শ্রমিক দল গঠিত হলেও তাদের শ্রেণি সচেতনতা থাকবেই এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
রাষ্ট্র বিপ্লব গ্রন্থে লেনিন বলেছেন যে, গণতন্ত্র অল্প কয়েকজনের গণতন্ত্র বলে সংখ্য গরিষ্ঠের অংশ গণতন্ত্রের স্বাদ ও সুযোগ গ্রহণে ব্যর্থ হয়। কিন্তু প্রলেতারিয়েত শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে সংখ্যালঘিষ্ঠের গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হবে। ফলে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মতাদর্শী অল্প কয়েকজনের নিজস্ব বিষয় থেকে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের হয়ে দাঁড়াবে।
জোসেফ স্তালিন মার্কসবাদের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদানের ছয়টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছেন। সেসব ছয়টি এলাকা হচ্ছে
১. পুঁজিবাদের নতুন পর্যায় হিসেবে একচেটে পুঁজিবাদের-সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন,
২. সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের প্রশ্ন,
৩. সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের আমলে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি দেশে সাফল্যের সাথে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার রূপ ও পদ্ধতির প্রশ্ন,
৪. বিপ্লবে, প্রতিটি জনপ্রিয় বিপ্লবে, জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব-উভয় ক্ষেত্রেই, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে-আধিপত্যের (Hegemony) প্রশ্ন,
৫. জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন এবং
৬. সর্বহারা শ্রেণির পার্টি সম্পর্কিত প্রশ্ন।
নানাভাবে লেনিনের রাজনৈতিক দর্শন সমালোচিত হলেও তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, গতিশীল ব্যক্তিত্ব, সাংগঠনিক ক্ষমতা রুশ বিপ্লবকে সফল করতে সাহায্য করেছিল। ১৯০৫ সালের বিপ্লবের থেকে তিনি যে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তাকে ১৯১৭ সালের বিপ্লবে প্রয়োগ করেছিলেন। রাশিয়ায় পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মার্কস-এঙ্গেলসের বক্তব্যের কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়াই, বিপ্লবের কাজে সফলভাবে ব্যবহার করেছিলেন লেনিন। এককথায় মার্কসবাদের পরিবর্তিত এবং বিকশিত রূপই লেনিনবাদ নামে পরিচিত যা মার্কসীয় আদর্শেরই সম্প্রসারণ।
আরো পড়ুন
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ১ (১) — রাষ্ট্র হলো শ্রেণি-বিরোধের অমীমাংসেয়তার ফল
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৫) — পরগাছা রাষ্ট্রের উচ্ছেদ
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৪) — জাতীয় ঐক্যের সংগঠন
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৩) — পার্লামেন্ট প্রথার বিলোপ
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (২) — ভেঙে-ফেলা রাষ্ট্রযন্ত্রের বদল হবে কী দিয়ে?
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (১) — কমিউনারদের প্রচেষ্টায় বীরত্ব কোনখানে?
- ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের রচনাবলী: কালানুক্রমিক তালিকা (১৮৯৩-১৯২৩)
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব বইয়ের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
- ভ্লাদিমির লেনিন-এর ঐতিহাসিক রেকর্ডকৃত ভাষণসমূহ: একটি পূর্ণাঙ্গ সংকলন
- ইহুদি নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে
- অবিলম্বে পৃথক ও রাজ্যগ্রাসী শান্তি চুক্তি সম্পাদনের প্রশ্নে থিসিসের পরিশেষ
- দুর্ভাগা শান্তি-সমস্যার ইতিহাস প্রসঙ্গে
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে লেনিনবাদী বলশেভিক পার্টির ভূমিকা
- অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের নীতি
- বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব প্রসঙ্গে লেনিনবাদ
- অক্টোবর বিপ্লবের চতুর্থ বার্ষিকী উপলক্ষে
- সিপিএসইউ (বি)-তে দক্ষিণ বিচ্যুতি
- এক লাইন, না দুই লাইন?
- সংশোধনবাদ প্রসঙ্গে লেনিনবাদী মত এবং তা কেন প্রতিরোধ করতে হবে
- লেনিনবাদী সংগ্রামের রূপ হচ্ছে লেনিন কর্তৃক রচিত সংগ্রামের বিভিন্ন সূত্রাবলি
- লেনিনবাদী বলশেভিকবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হচ্ছে সাম্যবাদ অভিমুখী সংগঠন
- ভ্যানগার্ডবাদ বা ভ্যানগার্ড পার্টি গঠন সম্পর্কে লেনিনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি
- মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান
- মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে
- সাম্যবাদী প্রচারণা হচ্ছে রাজনৈতিক সচেতনতা ও প্রভাব বৃদ্ধির প্রক্রিয়া
- পার্টি শৃঙ্খলা সম্পর্কে লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও সে সম্পর্কিত ধারণা
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ প্রণালী
- গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ লেনিনবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত নীতি
- অর্থনীতিবাদ বিরোধী সংগ্রাম হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য
- অর্থনীতিবাদ শ্রমিক আন্দোলনে রাজনীতি বাদ দিয়ে আর্থিক দাবি আদায়ের প্রবণতা
- রাষ্ট্র ও বিপ্লব হচ্ছে ১৯১৭ সালে লেনিন লিখিত বই যাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা আলোচিত
- রাষ্ট্র সম্পর্কে লেনিনবাদী ধারণা হচ্ছে রাষ্ট্রের উদ্ভব ও বিকাশের দ্বন্দ্ববাদী বিশ্লেষণ
- এপ্রিল থিসিস ছিল বলশেভিক নেতা ভ্লাদিমির লেনিন প্রদত্ত দিকনির্দেশক প্রতিপাদ্য
- বস্তুবাদ ও প্রত্যক্ষ-বিচারবাদ বা বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা বই সম্পর্কে
- নারীমুক্তির প্রশ্নে লেনিনবাদ শোষণ ও অধীনতা থেকে মুক্তির কথা বলে
- লেনিনবাদ হচ্ছে ভ্লাদিমির লেনিন বিকশিত একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ
- মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দর্শনের বিষয়বস্তু প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বিষয়
- পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে
- সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় লেনিন রচিত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ
- কী করতে হবে হচ্ছে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন রচিত সাম্যবাদী রাজনৈতিক গ্রন্থ
- লেনিনের বই রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা
- বলশেভিকবাদ রাষ্ট্রচিন্তা এবং রাষ্ট্রশাসন প্রণালীর বিপ্লবী মার্কসবাদী ধারা
- লেনিন ছিলেন বিশ শতকের ইউরোপের মহত্তম মানব এবং মার্কসবাদের উত্তরসূরি
- শ্রেণিহীন সমাজ হচ্ছে এমন সমাজ যেখানে কেউ সামাজিক শ্রেণিতে থাকে না
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
মার্কসবাদে লেনিনের অবদান মূল্যায়ন
মার্কসবাদে লেনিনের অবদান শুধুমাত্র দল, বিপ্লব বা রাষ্ট্র-সম্পর্কিত আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় লেনিনের অবদানকে সম্মুখভাবে বুঝতে হলে তার রচিত বিভিন্ন গ্রন্থের মাধ্যমে মার্কসবাদী আদর্শের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মার্কসবাদের প্রয়োগের উপর নির্ভর করতে হবে অর্থাৎ শুধুমাত্র সনাতনী মার্কসবাদ নয় বাস্তবে মার্কসবাদের প্রয়োগ, প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা এবং সেই সমস্যার সমাধান কল্পে লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি আলোচনার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক দর্শনকে অনুধাবন করা সম্ভব হবে। তাঁর রাষ্ট্রসম্পর্কিত আলোচনায় নতুনত্ব বা মৌলিকতা তেমনভাবে পাওয়া না গেলেও দল সম্পর্কিত আলোচনার ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অভিনব। যা তৎকালীন পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে উপযুক্ত ছিল। তাই বর্তমান সময়ে মার্কসবাদের আলোচনা শুধুমাত্র মার্কস বা এঙ্গেলস এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র
১. গোবিন্দ নস্কর, Political thought, ডাইরেক্টরেট অফ ডিসট্যান্ট এডুকেশন, ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৬, দিল্লি, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।