মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বিবর্তন: লেনিন থেকে স্তালিন যুগের ইতিহাস

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ (Marxism-Leninism) মূলত সর্বহারা তথা সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির মুক্তির একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ। শোষিত ও সর্বহারা শ্রেণি তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ভ্লাদিমির লেনিন এবং জোসেফ স্তালিনের বৈপ্লবিক শিক্ষাদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয়। এই মহান নেতা ও দার্শনিকরা শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির জন্য একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক হাতিয়ার নির্মাণ করেছেন। তাঁদের হাত ধরেই মূলত সর্বহারা শ্রেণির এই বিপ্লবী তত্ত্ব সৃষ্টি ও বিকশিত হয়েছে।

পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণির প্রতিটি সংগ্রামে মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ একটি সঠিক পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের যে প্রান্তেই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন হোক না কেন, শোষিত ও শ্রেণি-সচেতন শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো এই মতবাদ। শুধু বিপ্লব জয় করাই নয়, সর্বহারা বিপ্লব সফল হওয়ার পর সমাজতন্ত্রের শত্রুদের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতেও এটি শ্রমিক শ্রেণিকে পথ দেখায়। একটি পূর্ণাঙ্গ সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য যে সঠিক কর্মনীতি প্রয়োজন, তা এই তত্ত্ব থেকেই পাওয়া যায়। আর এই সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে শ্রমিক শ্রেণি মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রকে (Marxist Political Economy) অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগায়।

বলশেভিক পার্টির প্রথম খসড়া কর্মসূচীর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ত্রিশ বছরেরও পূর্বে লেনিন লিখেছিলেন যে, মার্কসীয় তত্ত্ব

“…….. প্রথমবারের মতো সমাজতন্ত্রকে কল্পলৌকিকতা থেকে বিজ্ঞানে রূপান্তরিত করে, এই বিজ্ঞানের জন্যে এক দৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং যে পথ ধরে এই বিজ্ঞানকে তার সর্বদিক দিয়ে আরো অধিক বিকশিত ও উন্নত করার কাজে অগ্রসর হওয়া যায় সেই পথ নির্দেশ করে। মজুরী দিয়ে শ্রমিক খাটানো, শ্রম-শক্তির ক্রয়, কিভাবে জমি, কারখানা, খনি ইত্যাদির মালিক ক্ষুদ্র এক দল পুঁজিপতিদের দ্বারা লক্ষ-কোটি বিত্তহীন মানুষের দাসত্ব আড়াল করে রাখে, তার ব্যাখ্যা দান করে তা আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্তর্বস্তুকে উদ্ঘাটন করে দেয়। তা দেখিয়ে দেয় আধুনিক পুঁজিবাদের। সামগ্রিক বিকাশ কিভাবে বড় বড় প্রতিষ্ঠান দ্বারা ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস সাধনের দিকে ঝোঁক প্রদর্শন করে, সৃষ্টি করে এমন এক অবস্থা যা সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতির এক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব ও জরুরী করে তোলে। প্রচলিত আচার-পদ্ধতি, রাজনৈতিক কূট-কৌশল, ভণ্ডামিপূর্ণ আইন-কানুন ও বিভ্রান্তিময় শিক্ষা-দীক্ষার পর্দান্তরালে তা চিনতে শেখায় শ্রেণি-সংগ্রামকে, সকল ধরনের বিত্তবান শ্রেণিসমূহের সাথে বিত্তহীন জনগণের তথা সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রামকে, যে শ্রেণি সকল বিত্তহীন জনগণকে নেতৃত্ব দেয়। বিপ্লবী, সমাজতন্ত্রী পার্টিগুলোর প্রকৃত করণীয় তা সুস্পষ্ট করে দেয়? সমাজের পুনর্গঠনের জন্যে পরিকল্পনার ফানুস তৈরি করা নয়, শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি বিধানের জন্যে পুঁজিপতি শ্রেণি ও তাদের অনুগত ভৃত্যদের ধর্মোপদেশ শোনানো নয়, ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আঁটা নয়, বরং সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রাম ও এই সংগ্রামের নেতৃত্ব সংগঠিত করা, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো –  সর্বহারাশ্রেণীর রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা।”[১]

মানব জাতির ইতিহাস অধ্যয়নের প্রতি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গী মার্কসবাদই সর্বপ্রথম তুলে ধরে। বুর্জোয়া বিজ্ঞানীরা সমাজ-বিকাশের নিয়মাবলী ব্যাখ্যা করতে অক্ষম। সমাজের ইতিহাসকে তারা নিছক বিরামহীন দৈব-ঘটনা পরম্পরা হিসেবে তুলে ধরেন যেখানে সেগুলোকে সংযোগকারী কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। মার্কসই প্রথম দেখিয়ে দেন যে, সমাজ-বিকাশ প্রাকৃতিক বিকাশের মতই নির্দিষ্ট অভ্যন্তরীণ নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু, প্রকৃতির নিয়মাবলীর বৈসাদৃশ্যে, মানব সমাজের বিকাশের নিয়মাবলী মানুষের ইচ্ছা ও কর্ম-নিরপেক্ষভাবে নয়, বরং, তার বিপরীতে, ব্যাপক জনসাধারণের কর্মতৎপরতার মধ্য দিয়েই কার্যকর হয়। মার্কসবাদ আবিষ্কার করে যে, পুঁজিবাদের ধ্বংস আপনা-আপনি আসবে না, বরং তা কেবল আসতে পারে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণির তিক্ত শ্রেণি সংগ্রামের ফলশ্রুতিতেই। যেহেতু সমাজ নির্দিষ্ট নিয়মাবলী অনুযায়ী বিকাশ লাভ করে বলে ধরে নেয়া যায়, সেহেতু শ্রমিক শ্রেণি হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে এবং এই নিয়মাবলী পুঁজিবাদের স্থলে যাতে সমাজতন্ত্র নিয়ে আসে তার জন্যে বসে থাকতে পারে –  এই স্যোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক তত্ত্ব হচ্ছে মার্কসবাদের এক নির্জলা বিকৃতি। সমাজ বিকাশের নিয়মাবলী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না। সমাজে নিয়ত ঘটমান শ্রেণি-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সেগুলো ধীরে ধীরে পথ করে নেয়। 

লেনিন-পরবর্তী যুগে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং স্তালিনের ভূমিকা

১৯২৪ সালে লেনিনের মৃত্যুর পর, জোসেফ স্তালিন এবং তাঁর সমর্থকরা যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির (CPSU) নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন, তখন মার্কসবাদ-লেনিনবাদ (Marxism–Leninism) একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র আন্দোলন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হিসেবে পশ্চিমা মার্কসবাদীরা যে ‘বিশ্ব বিপ্লব’-এর ধারণা পোষণ করতেন, স্তালিন তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে তিনি ‘এক দেশে সমাজতন্ত্র’ (Socialism in one country) তত্ত্বের পক্ষে অবস্থান নেন। মূলত প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং ১৯৩৬ সালের সোভিয়েত সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণের এই রূপান্তরটি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে, স্তালিন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি, সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’-এ একটি সুনির্দিষ্ট আদর্শিক একতা প্রতিষ্ঠা করেন, যেন বিশ্বব্যাপী মার্কসবাদী-লেনিনবাদী অনুশীলনকে একক রূপ দেওয়া যায়। স্তালিন এবং তাঁর সহযোগীদের দ্বারা দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের যে সোভিয়েত সংস্করণ তৈরি হয়েছিল—যেমন স্তালিনের বিখ্যাত বই ‘ডায়ালেকটিক্যাল অ্যান্ড হিস্টোরিক্যাল মেটেরিয়ালিজম’ (Dialectical and Historical Materialism)—তা মার্কসবাদের আনুষ্ঠানিক সোভিয়েত ব্যাখ্যা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশের মার্কসবাদী-লেনিনবাদীরাও এটিকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং এই লেখাটিই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল দার্শনিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে স্তালিনের লেখা পাঠ্যপুস্তক ‘হিস্ট্রি অব দ্য কমিউনিস্ট পার্টি অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন (বলশেভিক)’ এই মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তত্ত্বটিকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে।

মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শিক্ষায় সজ্জিত সর্বহারা শ্রেণি নিশ্চয়তার সাথেই সমাজতন্ত্রের জন্যে সংগ্রাম পরিচালনা করে। সমাজ-বিকাশের নিয়মাবলী সে জানে; তার সংগ্রাম, তার কাজ-কর্ম, তার কর্মতৎপরতায় সে এসব নিয়মাবলী মেনে চলে, যা পুঁজিবাদের অনিবার্য ধ্বংস আর সমাজতন্ত্রের বিজয়ের দিকে চালনা করে।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদ নিপীড়কদের বিরুদ্ধে বঞ্চিতদের শ্রেণি-সংগ্রামকে উদ্ঘাটন করার শিক্ষা দেয়। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ শিক্ষা দেয় যে, বুর্জোয়া শ্রেণির ক্ষমতার উচ্ছেদ আর তার নিজের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্যে, সমাজতন্ত্র অভিমুখী একমাত্র পথটি চালিত হয় সর্বহারা শ্রেণির দৃঢ়প্রতিজ্ঞ শ্রেণি-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই।[৩]

🔗 লেনিন সংগ্রহশালা: গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ২য় খণ্ড, “আমাদের কর্মসূচী”, পৃঃ ৪৯১, রুশ সংস্করণ
২. এ লিয়নতিয়েভ, মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্র, সেরাজুল আনোয়ার অনূদিত, গণপ্রকাশন, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৫, পৃষ্ঠা ১-২।

💡 লেখকের নোট: প্রবন্ধটি প্রথম ৬ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে ফুলকিবাজ.কম-এ প্রকাশ করা হয়েছিল। আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে কন্টেন্টটি আরও তথ্যসমৃদ্ধ ও উন্নত করে পুনরায় আপডেট করা হলো।

Leave a Comment