পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে

নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা 

নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তারা কত কথা বলে! এবং কত কম গুরুত্ব আছে এটার। কীভাবে তারা বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অবলম্বন করে সাধারণ বাক্যাংশ, আড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা, জাঁকজমকপূর্ণ ‘প্রকল্প’ যেগুলির অভিলক্ষ চিরকালের মতো শুধু প্রকল্পই থেকে যাওয়ার।

এখন বিষয়টি হলো যে যদি না বাণিজ্যসংক্রান্ত এবং ব্যাঙ্কের গোপনীয়তা রহিত করা হয়, যদি না অবিলম্বে আইন করে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির হিসাবের খাতাগুলি ট্রেড ইউনিয়নদের জন্য প্রকাশ করে না দেওয়া হয়, সমস্ত নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বাক্যাংশ এবং প্রকল্পই হবে প্রচণ্ড অর্থহীন বাগাড়ম্বর।

এখানে একটি ছোট কিন্তু শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত দেখানো হলো। একজন কমরেড যিনি একজন ব্যাঙ্ক কর্মচারী, দাপ্তরিক বিবরণীতে কীভাবে মুনাফা গোপন করা হয় সে বিষয়ে কিছু তথ্য পাঠিয়েছেন।

৭ মে, ১৯১৭, ভেস্তনিক ফিনান্সভ-এর ১৮নং সংখ্যায়[১] একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় পেত্রোগ্রাদ ঋণ এবং দস্তুরি (ডিসকাউন্ট) ব্যাঙ্কের বিষয়ে। প্রতিবেদনে ব্যাঙ্কের মুনাফার পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১,৩০,০০,০০০ রুবল (সঠিক পরিমাণ হলো ১,২৯,৬০,০০০ রুবল; আমরা লেখার ক্ষেত্রে পূর্ণ সংখ্যা ব্যবহার করব এবং প্রথম বন্ধনীতে সঠিক পরিমাণ দিয়ে দেব)।

পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তে, একজন উত্তমরূপে ওয়াকিবহাল ব্যক্তি একবারেই দেখতে পাবেন যে এটা কোনওভাবেই সম্পূর্ণ মুনাফা নয় এবং একটা যথেষ্ট পরিমাণ অংশ অন্যান্য বিষয়ের তলায় চালাকির সাথে গোপন রাখা হয়েছে, যাতে কোনও ‘কর’, ‘আবশ্যিক ঋণ’, এবং সাধারণভাবে, কোনও আর্থিক পরিমাপনই এটাকে বাইরে নিয়ে আসবে না যদি না বাণিজ্য সংক্রান্ত এবং ব্যাঙ্কের গোপনীয়তা সম্পূর্ণভাবে রহিত করা হয়। বস্তুত ৫৫,০০,০০০ রুবল সঞ্চিত পুঁজি হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। মুনাফা বেশ প্রায়ই গোপনীয়তার জন্য নিবদ্ধ করা হয় তথাকথিত সঞ্চয়, অথবা সঞ্চিত পুঁজি হিসেবে। আমি যদি একজন ধনকুবের হই যে ১,৭০,০০,০০০ রুবল মুনাফা কামিয়েছে এবং ৫০,০০,০০০ সঞ্চয় করতে চাই, আমাকে তাহলে শুধুমাত্র ৫০,০০,০০০-কে সঞ্চিত পুঁজি হিসেবে নিবন্ধ করতে হবে চালাকিটা করার জন্য! এইভাবে আমি এড়িয়ে যেতে পারব সমস্ত বিভিন্ন ধরনের ‘রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ’, ‘মুনাফার উপর রাষ্ট্রীয় করারোপণ’ এবং ইত্যাদি।

আরো পড়ুন:  মার্কসবাদে লেনিনের অবদান সৃজিত হয়েছে ছয়টি প্রধান ক্ষেত্রে

আবার, এই প্রতিবেদন ইঙ্গিত করে ১০,০০,০০০ রুবলের থেকে কিছুটা কম (৮,২৫,০০০) সুদ এবং দস্তুরি হিসেবে কামানো অর্থ হিসেবে। “প্রশ্নটা হলো,” ব্যাঙ্ক কর্মচারী লিখেছেন, “পরিমাণটা কত যেটা অধিকোষের মুনাফা সৃষ্টি করে, যখন সুদে কামানো অর্থকে মুনাফার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি?”

তদুপরি, পূর্ব বছরের অবশিষ্ট মুনাফা তালিকাভুক্ত, ৩,০০,০০০ রুবল, সর্বমোট মুনাফার মধ্যে শামিল করা হয়নি! একই সাথে, তারপর, পূর্ববর্তী দফার সাথে আরও টাটকা দশ লক্ষ মুনাফার মধ্যে থেকে লুকিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে, ‘অংশীদারীদের অপরিশোধিত লভ্যাংশ’ ২,২৪,০০০ রুবল সর্বমোট মুনাফার মধ্যে অনুপস্থিত, যদিও সকলেই জানে, যে লভ্যাংশ পরিশোধ করা হয়, তা মূল লাভ থেকেই দেওয়া হয়।

তদ্ব্যতীত, প্রতিবেদনে ৩৮,০০,০০০ রুবল নথিভুক্ত করা হয়েছে ‘উদ্বর্ত [carry-overs] হিসেবে। “যে কেউ সরাসরি ব্যবসায় অংশ নেয়নি, এই উদ্বর্তগুলি কী সেটা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমস্যার সম্মুখীন হবে।” কমরেড লিখেছেন “একটা বিষয় নিশ্চিত: একটি বিবরণী তৈরি করতে গিয়ে, একজন খুব সহজেই মুনাফার একটা অংশ গোপন করে ফেলতে পারে সেটাকে ‘উদ্বর্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং স্থানান্তর করে দিতে পারে জায়গা মতো।”

মূল্যায়ন এবং সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। মুনাফাকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে ১,৩০,০০,০০০ রুবল হিসেবে, কিন্তু, বাস্তবিকই, এটা হওয়া উচিত ১,৯০,০০,০০০ থেকে ২,৪০,০০,০০০ অথবা ৩,০০,০০,০০০ পুঁজির উপর ভিত্তি করে প্রায় ৮০ শতাংশ।

এটা কী সুস্পষ্ট নয় যে পুঁজিপতিদের প্রতি সরকারের হুমকি, শ্রমিকদের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি, বৃহৎ পুঁজিপতিদের মুনাফার ৯০ শতাংশ নিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের আইনের খসড়া, আইন হলো অর্থহীন, অকার্যকর, একেবারেই অকার্যকর, যতক্ষণ বাণিজ্য সংক্রান্ত এবং ব্যাঙ্কের গোপনীয়তা রয়েছে?[২]

টীকা:

১. ভেস্তনিক ফিনান্সভ, প্রমুশিয়েনেস্তি ই তারগবলে (অর্থায়ন, শিল্প, বাণিজ্য বার্তাবহ), অর্থ মন্ত্রক দ্বারা সেন্ট পিটার্সবার্গে নভেম্বর ১৮৮৩ থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক নিবন্ধ, এবং নিরীক্ষা প্রকাশ করত।
২. ভি আই লেনিন, পুঁজিপতিরা কীভাবে তাদের মুনাফা গোপন করে লেখাটি ১২ জুলাই, ১৯১৭ তারিখে রচনা করেন। এই অনুবাদটি করেছেন ‘সাদিত’ এবং নয়া দিশা জুন ২০২১ সংখ্যার ২২-২৩ পৃষ্ঠা থেকে সংগৃহীত। ফুলকিবাজে প্রকাশ করার সময় কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!