রাষ্ট্র ও বিপ্লব: অধ্যায় ৩ (৫) — পরগাছা রাষ্ট্রের উচ্ছেদ

আমরা আগেই মার্কসের সংশ্লিষ্ট কথাগুলি তুলে দিয়েছি, তার সম্পূরণ করা উচিত।

মার্কস লেখেন, ‘….নতুন ঐতিহাসিক সৃষ্টির একটা সাধারণ ভাগ্য এই হয় যে, সমাজজীবনের সাবেকী এমনকি অপ্রচলিত যে রূপগুলোর সঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলির কিছুটা সাদৃশ্য থাকে, তাদেরই সমগোত্রীয় বলে তাদের ধরা হয়। এইভাবে সাম্প্রতিক রাষ্ট্রযন্ত্রকে যা ভাঙছে (bricht — ভেঙে ফেলছে) সেই কমিউনকেও ধরা হলো মধ্যযুগীয় কমিউনের পুনর্জন্ম বলে… ছোট ছোট রাষ্ট্রের (মঁতেস্ক্য ও জিরন্ডপন্থীরা[১]) জোট হিসাবে ….. অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতার বিরুদ্ধে সাবেকী সংগ্রামের অতিরঞ্জিত রূপ হিসাবে।

‘…পরগাছা উপবৃদ্ধি এই যে ‘রাষ্ট্রটা’ সমাজের ঘাড় ভেঙে খাচ্ছে ও তার স্বাধীন গতি রুদ্ধ করছে তা এতদিন পর্যন্ত যেসব শক্তিকে গ্রাস করছিল, কমিউন ব্যবস্থায় তা প্রত্যার্পিত হতো সমাজদেহে। শুধু এই একটা জিনিসেই এগিয়ে যেত ফ্রান্সের পুনরুজ্জীবন …

‘….কমিউন ব্যবস্থায় গ্রাম্য উৎপাদকেরা আসত প্রতিটি অঞ্চলের প্রধান প্রধান শহরের আত্মিক পরিচালনায় এবং সেখানে তাদের জন্য শহুরে শ্রমিকদের মধ্যে তাদের স্বার্থের স্বাভাবিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হতো। কমিউনের অস্তিত্বটাই ছিল, স্বতঃসিদ্ধ হিসেবে, স্থানীয় আত্মশাসনের সঙ্গে জড়িত, কিন্তু সেটা অতঃপর অবান্তর রাষ্ট্রক্ষমতার পাল্টা চাপ হিসেবে নয়।’

যা ছিল ‘পরগাছা উপবৃদ্ধি’ সেই ‘রাষ্ট্রক্ষমতার উচ্ছেদ’, তার ‘কর্তন’, তার ‘ধ্বংস’; ‘অতঃপর অবান্তর রাষ্ট্রক্ষমতা’—কমিউনের অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে মার্কস রাষ্ট্রের কথা বলেছেন এই সব ভাষায়।

এসবই লেখা হয়েছিল কিছু কম পঞ্চাশ বছর আগে। আর এখন ব্যাপক জনগণের চেতনায় অবিকৃত মার্কসবাদ পৌঁছে দেবার জন্য হুবহু খননকার্যই চালাতে হচ্ছে। মার্কস যা দেখে গেছেন সেই সর্বশেষ মহাবিপ্লবের পর্যবেক্ষণ থেকে টানা সিদ্ধান্তগুলো ভুলে বসা হলো ঠিক এমন সময় যখন পরবর্তী প্রলেতারীয় মহাবিপ্লবগুলির কাল ঘনিয়ে এসেছে।

‘….কমিউনের বহুবিধ ব্যাখ্যা ও তাতে অভিব্যক্ত বহুবিধ স্বার্থ থেকে প্রমাণ হয় যে, কমিউন ছিল অতিশয় স্থিতিস্থাপক একটি রাজনৈতিক রূপ, যেখানে আগেকার সমস্ত ধরনের সরকারই ছিল প্রকৃতিগতভাবে পীড়নমূলক। তার আসল রহস্য এই: এটা ছিল আসলে শ্রমিক শ্রেণির সরকার, দখলকারী শ্রেণির বিরুদ্ধে উৎপাদক শ্রেণির সংগ্রামের পরিণাম, এটি ছিল অবশেষে আবিষ্কৃত সেই রাজনৈতিক আধার যার মধ্য দিয়ে কার্যকরী হতে পারে শ্রমের অর্থনৈতিক মুক্তি….

‘এই শেষ শর্তটি ছাড়া কমিউন ব্যবস্থা হতো অসম্ভব ও প্রতারণা…’

সমাজের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন চালাবার মতো রাজনৈতিক আধার ‘আবিষ্কারে’ ব্যস্ত ছিল ইউটোপীয়রা। নৈরাজ্যবাদীরা রাজনৈতিক আধারের প্রশ্নটা একেবারেই উড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সোশ্যাল ডেমোক্রাসির সুবিধাবাদীরা পার্লামেন্টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আধারগুলিকে সীমা হিসেবে নিয়েছে, সে তো আর পেরনো যায় না, মাথা ঠুকে এই ‘আদর্শের’ পূজা করে তারা এ আধারকে ভাঙার যে কোনো প্রচেষ্টাকেই নৈরাজ্যবাদ বলে ঘোষণা করছে।

সমাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সমস্ত ইতিহাস থেকে মার্কস সিদ্ধান্ত টানলেন যে, রাষ্ট্র অবশ্যই বিলুপ্ত হবে, আর বিলোপের উৎক্রমণ রূপ (রাষ্ট্র থেকে অ-রাষ্ট্রে উৎক্রমণ) হবে ‘শাসক শ্রেণি রূপে সংগঠিত প্রলেতারিয়েত’। কিন্তু এই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আধার আবিষ্কার করতে মার্কস যান নি। তিনি সীমাবদ্ধ থাকেন ফরাসি ইতিহাসের যথাযথ পর্যবেক্ষণে, তার বিশ্লেষণে, এবং ১৮৫১ সালে পৌঁছানো সিদ্ধান্তে: ব্যাপারটা যাচ্ছে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংসের দিকে।

এবং প্রলেতারিয়েতের গণবৈপ্লবিক আন্দোলন যখন ভেঙে পড়লো, তখন সে আন্দোলনের ব্যর্থতা সত্ত্বেও, তার ক্ষণস্থায়িত্ব ও সুপ্রকট দুর্বলতা সত্ত্বেও মার্কস অধ্যয়ন করতে লাগলেন কী আধার তা আবিষ্কার করেছে

কমিউন — এই হলো অবশেষে আবিষ্কৃত প্রলেতারীয় বিপ্লবের আধার, যার মধ্য দিয়ে কার্যকরী হতে পারে শ্রমের অর্থনৈতিক মুক্তি।

কমিউন — এই হলো প্রলেতারীয় বিপ্লবের পক্ষ থেকে বুর্জোয়া রাষ্ট্রযন্ত্র ধ্বংসের প্রথম প্রচেষ্টা এবং ‘অবশেষে আবিষ্কৃত’ সেই রাজনৈতিক আধার যা দিয়ে বিধ্বস্ত আধারটাকে বদল করা সম্ভব ও তা করতে হবে।

পরের আলোচনাগুলোয় আমরা দেখবো যে, ১৯০৫ ও ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব অন্য পরিস্থিতিতে, অন্য অবস্থায় কমিউনের কাজটাই চালিয়ে যাচ্ছে এবং সমর্থন করছে মার্কসের প্রতিভাদীপ্ত ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ।

ফুলকিবাজ সংস্করণের পাদটিকা:

১. জিরন্ডপন্থী — ১৮ শতকের শেষে ফরাসী বুর্জোয়া বিপ্লবের পর্বে বুর্জোয়াদের একটি রাজনৈতিক জোট। এরা নরমপন্থী বুর্জোয়াদের স্বার্থ প্রকাশ করত, বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লবের মধ্যে দোল খেত, রাজতন্ত্রের সঙ্গে চুক্তির পথ নেয়।
২. বর্তমান অনুবাদটি সামান্য সংস্কারকৃত এবং অনুবাদটি নেয়া হয়েছে প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, অনূদিত বাংলা সংস্করণ ১৯৭৬-এর পৃষ্ঠা ৫৪-৫৬ হতে।

🔗 লেনিন সংগ্রহশালা: গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী

Leave a Comment

error: Content is protected !!