মার্কস লেখেন: ‘কমিউনকে হতে হতো পার্লামেন্টি নয়, কাজের সমিতি, একই সঙ্গে আইনদাতা ও কার্যনির্বাহক…
‘…প্রভু শ্রেণির কোন্ লোকটি পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে ও তাদের দমন করবে (ver-und zertreten), তিন বা ছয় বছরে একবার করে তা স্থির করার বদলে সর্বজনীন নির্বাচনাধিকার কমিউনে সংগঠিত জনগণের সেবায় লাগত নিজেদের প্রতিষ্ঠানটির জন্য শ্রমিক, সর্দার, হিসেবনবিশ খুঁজে নেবার জন্য, যেভাবে ব্যক্তিগত নির্বাচনাধিকার একই উদ্দেশ্যে যে-কোনো নিয়োগকর্তার কাজে লাগে।’
১৮৭১ সালে কৃত পার্লামেন্ট প্রথার এই চমৎকার সমালোচনাটিও প্রচলিত সোশ্যাল-শভিনিজম ও সুবিধাবাদের কল্যাণে মার্কসবাদের ‘বিস্মৃত বাণীর’ অন্তর্ভুক্ত। মন্ত্রী ও পেশাদার পার্লামেন্টিরা, প্রলেতারিয়েতের প্রতি বিশ্বাসঘাতক ও একালের ‘কেজো’ সমাজ-তন্ত্রীরা পার্লামেন্টপ্রথার সমালোচনাটা পুরোপুরি নৈরাজ্যবাদীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে, এবং এই আশ্চর্য বিচক্ষণ যুক্তিতে পার্লামেন্টপ্রথার সমস্ত সমালোচনাকেই ঘোষণা করেছে ‘নৈরাজ্যবাদ’!! অবাক হবার কিছুই নেই যে, পার্লামেন্টপ্রথার অগ্রণী দেশগুলিতে প্রলেতারিয়েত শেইদেমান, দাভিদ, লেগিন, সাম্বা, রেনোদেল, হেন্ডের্সন, ভান্দের্ভেলদে, স্তাউনিঙ, ব্রান্তিঙ, বিসসোলাতি কোং-র মতো সমাজতন্ত্রীদের দেখে ঘেন্নায় প্রায়ই দরদ দেখিয়েছে নৈরাজ্যবাদী-সিন্ডিক্যালিজমের জন্য, যদিও এটা সুবিধাবাদেরই সহোদর ভাই।
কিন্তু মার্কসের কাছে বৈপ্লবিক দ্বান্দ্বিকতা কখনোই একটা ফাঁপা, ফ্যাশনচল বুলি, একটা ঝুমঝুমি ছিল না, যা তাকে প্লেখানভ, কাউৎস্কি প্রভৃতিরা করে তুলেছেন। বিশেষ করে যখন স্পষ্টতই বৈপ্লবিক পরিস্থিতি নেই, তখন বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার ‘গোয়ালঘরটাকে’ও কাজে লাগাতে পারার অসামর্থের জন্য মার্কস নির্মমভাবে নৈরাজ্যবাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে পারতেন, কিন্তু সেই সঙ্গে পার্লামেন্টপ্রথার সত্যকার একটা বৈপ্লবিক-প্রলেতারীয় সমালোচনাও তিনি দিতে জানতেন।
প্রভু শ্রেণির কোন লোকটি পার্লামেন্টে জনগণকে দমিত ও দলিত করবে, কয়েক বছরে একবার করে তা স্থির করা—এই হলো বুর্জোয়া পার্লামেন্টপ্রথার আসল মর্মার্থ, এবং সেটা শুধু পার্লামেন্টি-নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রেই নয়, সর্বাধিক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রেও।
কিন্তু রাষ্ট্রের প্রশ্নটা যদি রাখি, এ ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতের কর্তব্যের দিক থেকে যদি রাষ্ট্রের একটা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পার্লামেন্টপ্রথাকে দেখি, তাহলে পার্লামেন্টপ্রথা থেকে বেরোবার উপায় কী, তাছাড়া চলবে কি করে?
পুনঃ ও পুনরপি এই কথাই বলতে হচ্ছে: কমিউন বিচারের ভিত্তিতে মার্কস যে শিক্ষা টেনেছিলেন তা এতই বিস্মৃতির গর্ভে যে, সাম্প্রতিক সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের (পড়া উচিত; সমাজতন্ত্রের সাম্প্রতিক বিশ্বাসঘাতকদের) কাছে পার্লামেন্টপ্রথার নৈরাজ্যবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীল সমালোচনা ছাড়া আর কিছুই বোধগম্য নয়।
পার্লামেন্ট প্রথা থেকে বেরোবার উপায় অবশ্যই প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচন ধ্বংস করে নয়, বরং প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানটিকে বাকসর্বস্ব মঞ্চ থেকে ‘কাজের’ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে। ‘কমিউনকে হতে হতো পার্লামেন্টি নয়, কাজের সমিতি, একই সঙ্গে আইনদাতা ও কার্যনির্বাহক।’
পার্লামেন্টি নয়, কাজের প্রতিষ্ঠান—একথাটা বলে সোশ্যাল ডেমোক্রাসির পার্লামেন্টজীবীদের ও পার্লামেন্টি ‘পোশাকি কুকুরদের’ মুখে জুতা মারা হয়েছে! আমেরিকা থেকে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ড, নরওয়ে ইত্যাদি যে কোনো পার্লামেন্টি দেশের দিকে চেয়ে দেখুন: সত্যকারের ‘রাষ্ট্রীয়’ কাজ চলে যবনিকার অন্তরালে এবং তা চালায় দপ্তর, চ্যান্সেলারি, জেনারেল স্টাফ। পার্লামেন্টগুলোয় কেবল বাক্যবিস্তার চলে ‘সাধারণ লোককে’ ধোঁকা দেবার বিশেষ উদ্দেশে। কথাটা এতটা সঠিক যে, এমনকি রুশ প্রজাতন্ত্রে, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে সত্যকার পার্লামেন্ট গড়ে উঠবার আগেই পার্লামেন্ট প্রথার এই সমস্ত পাপ তৎক্ষণাৎ ফুটে ওঠে। স্কবেলেভ ও সেরেতেলি, চের্নোভ ও আভক্সেন্তিয়েভদের মতো জরাজীর্ণ কূপমণ্ডূকতার বীরেরা এমনকি সোভিয়েতগুলিকেও শূন্যগর্ভ বাকসর্বস্ব মঞ্চে পরিণত করে জঘন্য বুর্জোয়া পার্লামেন্ট প্রথার কায়দায় তাদের কলুষিত করতে সক্ষম হয়। সোভিয়েতগুলিতে শ্রীমান ‘সমাজতান্ত্রিক’ মন্ত্রীরা বুলিবিস্তার ও প্রস্তাবাদি মারফত বিশ্বাসপ্রবণ চাষিদের ধোঁকা দিচ্ছেন। আর সরকারে চলছে অবিরাম কোয়াড্রিল নাচ, যাতে একদিকে সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি ও মেনশেভিকদের জন্যে বেশি করে মোটা টাকার মান্যগণ্য ‘পিঠেটির দিকে’ পালা করে ঘেঁসে আসা চলে এবং অন্যদিকে জনগণের ’মনোযোগ আটকে রাখা যায়’। আর ‘রাষ্ট্রীয়’ কাজ ‘করা হচ্ছে’ দপ্তরগুলোতে, জেনারেল স্টাফে!
শাসক পার্টি সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের মুখপত্র ‘দেলো নারোদা’[১] তার প্রধান সম্পাদকীয়তে সম্প্রতি স্বীকার করেছে—‘সবাই’ যেখানে রাজনৈতিক গণিকাবৃত্তিতে ব্যাপৃত তেমন ‘উত্তম সমাজের’ লোকদের অতুলনীয় অকপটতায় স্বীকার করেছে যে, এমনকি যেসব মন্ত্রিদপ্তর ‘সমাজতন্ত্রীদের’ হাতে (মাপ করবেন কথাটা), এমনকি সেখানেও গোটা আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটা মূলত সাবেকীই থেকেই গেছে, আগের মতোই কাজ চালাচ্ছে, পুরোপুরি ‘অবাধে’ বিপ্লবী ব্যবস্থা বানচাল করছে। সত্যি, এ স্বীকৃতিটা না থাকলেও কি সরকারে সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারি ও মেনশেভিকদের অংশগ্রহণের বাস্তব ইতিহাস থেকেও তা প্রমাণ হতো না? এক্ষেত্রে বৈশিষ্ট্যসূচক শুধু এইটে যে, কাদেতদের সঙ্গে মন্ত্রিসমাজে থেকে শ্রীমান চের্নোভ, রুসানভ, জেঞ্জিনভরা ও ‘দেলো নারোদার’ অন্যান্য সম্পাদকরা এতই লজ্জা খুইয়েছেন যে প্রকাশ্যে, যেন একটা তুচ্ছ ব্যাপার এই ভাব করে, একটুকু লাল না হয়ে এ কথা বলতে তাঁদের সঙ্কোচ নেই যে, ‘ওঁদের’ মন্ত্রিদপ্তরগুলিতে সবই আগের মতো!! বৈপ্লবিক গণতান্ত্রিক বুলিটা গেঁয়ো ইভানদের জন্য, আর আমলাতান্ত্রিক, দপ্তরচারি, গড়িমসিটা পুঁজিপতিদের ‘হিতার্থে’—এ হলো সৎ কোয়ালিশনের মর্মার্থ।
বুর্জোয়া সমাজের ভাড়াটে, জরাজীর্ণ পার্লামেন্ট প্রথার স্থলে কমিউন এমনসব প্রতিষ্ঠান বসায় যেখানে মত ও আলোচনার স্বাধীনতা প্রতারণায় অধঃপতিত হয় না, কেননা পার্লামেন্ট সভ্যদের নিজেদেরই কাজ করতে হয়, নিজেদের আইন নিজেদেরই কার্যকরী করতে হয়, বাস্তবে কী দাঁড়াচ্ছে সেটা নিজেদেরই যাচাই করতে হয়, নিজেদের নির্বাচকদের সামনে সরাসরি জবাবদিহি করতে হয় নিজেদের। প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান থাকছে, কিন্তু একটা বিশেষ প্রথা হিসাবে, আইনপ্রণয়নী ও কার্যনির্বাহক শ্রমবিভাগ হিসাবে, পার্লামেন্ট সভ্যদের সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান হিসাবে পার্লামেন্ট প্রথা এখানে আর থাকছে না। প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়া আমরা গণতন্ত্র এমনকি প্রলেতারীয় গণতন্ত্রও কল্পনা করতে পরি না, কিন্তু পার্লামেন্ট প্রথা ছাড়া তা কল্পনা করতে পারি এবং করতে হবে, যদি বুর্জোয়া সমাজের সমালোচনাটা আমাদের কাছে ফাঁকা কথা না হয়, যদি বুর্জোয়া প্রভুত্ব উচ্ছেদের আকাঙ্ক্ষাটা মেনশেভিক ও সোশ্যালিস্ট রেভলিউশনারিদের মতো, শেইদেমান ও লেগিন, সাম্বা ও ভান্দের্ভেলদের মতো শ্রমিকদের ভোট জোগাড়ের ‘নির্বাচনী’ বুলি না হয়ে আমাদের কাছে হয় একটা গুরুতর ও আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা।
এটা খুবই শিক্ষাপ্রদ যে, কমিউন ও প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের জন্য যেসব আমলাদের দরকার তাদের কাজের কথা বলতে গিয়ে মার্কস তুলনার জন্য নিয়েছেন ‘অন্য যে-কোনো নিয়োগকর্তার’ কর্মচারীদের, অর্থাৎ ‘শ্রমিক, সর্দার, হিসেবনবিশ’ সমেত চলতি পুঁজিবাদী উদ্যোগ।
‘নতুন’ সমাজকে মন থেকে গড়া, কল্পনা থেকে বানানোর দিক দিয়ে বিন্দুমাত্র ইউটোপীয়াপনা মার্কসের নেই। পুরানো থেকে নতুন সমাজের জন্ম, প্রথমটা থেকে দ্বিতীয়ে উৎক্রমণের রূপগুলো মার্কস বিশ্লেষণ করেছেন একটা প্রাকৃতিক-ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসাবে। গণপ্রলেতারীয় আন্দোলনের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতাটা তিনি নিয়েছেন এবং তা থেকে বাস্তব শিক্ষা নিষ্কাশনের চেষ্টা করেছেন। ‘কমিউনের’ কাছ থেকে তিনি ‘শিখেছেন’, সমস্ত মহান বৈপ্লবিক চিন্তানায়কেরাই যেভাবে নিপীড়িত শ্রেণির মহা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে ভয় পান নি, কখনোই তাদের প্রতি একটা পণ্ডিতি চালের ‘হিতোপদেশ’ দানের মনোভাব নেন নি (যেমন করেছিলেন প্লেখানভ: ‘অস্ত্র ধরা উচিত হয় নি’ অথবা সেরেতেলি: ‘শ্রমিক শ্রেণির উচিত ছিল নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা’)।
আমলাতন্ত্রকে তৎক্ষণাৎ, সর্বত্র ও সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করার কথাই উঠতে পারে না। এটা ইউটোপীয়। কিন্তু পুরনো আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে চূর্ণ করা ও তৎক্ষণাৎ এমন একটা নতুন যন্ত্র নির্মাণ শুরু করা যাতে ক্রমশ সমস্ত আমলাতন্ত্রকেই শূন্যে পরিণত করা সম্ভব হবে—এটা ইউটোপীয় নয়, এটা কমিউনের অভিজ্ঞতা, এটা হলো বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের প্রত্যক্ষ ও উপস্থিত কর্তব্য।
‘রাষ্ট্র’ পরিচালনার কাজগুলো পুঁজিবাদ সরল করে দেয়, ‘হুজুরগিরি’ ছুঁড়ে ফেলে সমস্ত ব্যাপারটাকে প্রলেতারিয়েতের (শাসক শ্রেণি হিসেবে) এমন সংগঠনে পর্যবসিত করা সম্ভব করে তোলে, যা ‘শ্রমিক, সর্দার, হিসাবনবিশ’ বহাল করবে।
আমরা ইউটোপীয় নই। কী করে তৎক্ষণাৎ কোনো রকম প্রশাসন ছাড়া, কোনো রকম আজ্ঞাপালন ছাড়াই চালানো যায়, তা নিয়ে আমরা ‘স্বপ্ন দেখি’ না; ওগুলো নৈরাজ্যবাদী স্বপ্ন, প্রলেতারীয় একনায়কত্বের কর্তব্য না বোঝা তার ভিত্তি, মার্কসবাদের কাছে তা সমূহ বিজাতীয়, এবং কার্যক্ষেত্রে তাতে লোকে অন্যরকম না হয়ে ওঠা পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে মুলতবী রাখা হয়। না, আমরা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব চাই এমন লোকেদের নিয়ে যারা এখন বর্তমান, যারা আজ্ঞাপালন ছাড়া, তদারকি ছাড়া, ‘সর্দার ও হিসাবনবিশ’ ছাড়া পারে না।
কিন্তু আজ্ঞা পালন করতে হবে সমস্ত শোষিত ও মেহনতিদের সশস্ত্র অগ্রবাহিনী প্রলেতারিয়েতের। রাষ্ট্রীয় আমলাদের বিশেষ ধরনের ‘হুজুরগিরিকে’ তৎক্ষণাৎ রাতারাতি ‘সর্দার ও হিসাবনবিশদের’ সরল কাজ দিয়ে খারিজ করা যায় ও করতে হবে, এ কাজগুলো ইতিমধ্যেই পুরোপুরি সাধারণ নাগরিকদের বিকাশ মাত্রায় আওতাধীন এবং পুরোপুরি ‘মজুরদের বেতনে’ পালন করা যায়।
নিজেদের কাজের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে, সশস্ত্র শ্রমিকদের রাষ্ট্রশক্তির সমর্থনে কঠোরতম লৌহশৃঙ্খলা প্রবর্তন করে পুঁজিবাদ ইতিমধ্যেই যা গড়ে দিয়েছে তার ভিত্তিতে বৃহৎ উৎপাদন সংগঠিত করব আমরা মজুরেরা নিজেরাই, রাষ্ট্রীয় আমলাদের টেনে আনবো নিতান্ত আমাদের নির্দেশ-পালক, জবাবদিহিতে বাধ্য, অপসারণীয়, পরিমিত বেতনের ‘সর্দার ও হিসাবনবিশদের’ (অবশ্য নানা রকম ধরন ও স্তরের টেকনিশিয়ান সহ) ভূমিকায়—এই হলো আমাদের প্রলেতারীয় কর্তব্য, প্রলেতারীয় বিপ্লব সম্পন্নের পর এইটে থেকে শুরু করা সম্ভব ও করতে হবে। বৃহৎ উৎপাদনের ভিত্তির ওপর এই রকমের শুরু আপনা থেকেই পৌঁছয় সর্ববিধ আমলাতন্ত্রের ক্রমিক ‘শুকিয়ে মরায়’, এমন একটা শৃঙ্খলায়, উদ্ধৃতি চিহ্ন ছাড়া শৃঙ্খলা, মজুরি দাসত্বের সঙ্গে সাদৃশ্য নেই এমন একটা শৃঙ্খলায়, যখন তত্ত্বাবধান ও হিসেবের ক্রমসরল কাজগুলো সবাই চালাবে পালা করে, তারপর তা হয়ে উঠবে অভ্যাস ও শেষ পর্যন্ত বিশেষ এক স্তর লোকের বিশেষ কাজ হিসাবে মরে যাবে।
গত শতকের ৭০-এর দশকের একজন রসিক জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রাট ডাক ব্যবস্থাকে বলেছিলেন সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নমুনা। কথাটা খুবই ঠিক। আজকাল ডাক ব্যবস্থা এমন একটা কারবার যা রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদী একচেটিয়ার ধরনে সংগঠিত। সমস্ত ট্রাস্টকেই সাম্রাজ্যবাদ ক্রমাগত এই ধরনের সংগঠনে রূপান্তরিত করছে। খাটুনিতে ও খিদেয় নেতিয়ে পড়া ‘সাধারণ’ মেহনতিদের ওপর এখানেও রয়েছে সেই একই রকম বুর্জোয়া আমলাতন্ত্র। কিন্তু সামাজিক পরিচালনার যন্ত্র ব্যবস্থাটা এখানে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে। পুঁজিপতিদের উচ্ছেদ করে, সশস্ত্র শ্রমিকদের লৌহ বাহুতে এই সব শোষকদের প্রতিরোধ চূর্ণ করে আধুনিক রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক যন্ত্রটাকে ধ্বংস করলেই আমরা পাচ্ছি ‘পরগাছা’ থেকে মুক্ত উচ্চ টেকনিকে সুসজ্জিত এমন একটি যন্ত্রব্যবস্থা, যা টেকনিশিয়ন, সর্দার, হিসেবনবিশদের নিয়োগ করে, সমস্ত ‘রাষ্ট্রীয়’ পদাধিকারীদের মতো তাদেরও সবাইকে শ্রমিকদের সমান পারিশ্রমিক দিয়ে ঐক্যবদ্ধ শ্রমিকেরা নিজেরাই চালু করতে পুরোপুরি সক্ষম। এই হলো সমস্ত ট্র্রাষ্টের ক্ষেত্রেই মূর্ত-নির্দিষ্ট, ব্যবহারিক, তৎক্ষণাৎ সাধনীয় কর্তব্য যা শোষণ থেকে মেহনতিদের মুক্ত করছে ও কমিউন কর্তৃক কার্যক্ষেত্রে সূচিত (বিশেষ করে রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে) অভিজ্ঞতার হিসেব নিচ্ছে।
সমস্ত জাতীয় অর্থনীতিকে ডাক ব্যবস্থার মতো এমনভাবে সংগঠিত করা যাতে সশস্ত্র প্রলেতারিয়েতের নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনাধীনে সমস্ত পদাধিকারীদের মতো টেকনিশিয়ন, সর্দার, হিসেবনবিশরা ‘মজুরের বেতনের’ চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক না পায়—এই হলো আমাদের আশু লক্ষ্য। আমাদের দরকার এই ধরণের রাষ্ট্র এবং এই ধরণের অর্থনৈতিক ভিত্তিতে। সেটা পাওয়া যায় পার্লামেন্টপ্রথার বিলোপ ও প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের সংরক্ষণে। বুর্জোয়াদের হাতে এই সব প্রতিষ্ঠানের গণিকাবৃত্তি থেকে মেহনতি শ্রেণিরা উদ্ধার পাবে এইটাতেই।[২]
- 📖 পরের অংশ পড়ুন: জাতীয় ঐক্যের সংগঠন।
- 📖 রাষ্ট্র ও বিপ্লব — সম্পূর্ণ সূচিপত্র ও অধ্যায়ভিত্তিক পাঠ।
ফুলকিবাজ সংস্করণের পাদটিকা:
১. ‘দেলো নারোদা’ (জনব্রত) সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশানারি পার্টির মুখপত্র দৈনিক কাগজ, পেত্রগ্রাদ থেকে প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালের মার্চ থেকে ১৯১৮ সালের জুলাই পর্যন্ত, কয়েক বার কাগজের নামটা বদল করা হয়। প্রতিরক্ষাবাদী ও আপোসপন্থী মতামত পোষণ করত কাগজটি, সাময়িক বুর্জোয়া সরকারকে সমর্থন করে। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে সামারা থেকে (চারটি সংখ্যা) এবং ১৯১৯ সালের মার্চে মস্কো থেকে (দশটি সংখ্যা) কাগজটি পুনঃপ্রকাশিত হয়। প্রতিবিপ্লবী ক্রিয়াকলাপের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় কাগজটিকে।
২. বর্তমান অনুবাদটি সামান্য সংস্কারকৃত এবং অনুবাদটি নেয়া হয়েছে প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, অনূদিত বাংলা সংস্করণ ১৯৭৬-এর পৃষ্ঠা ৪৫-৫১ হতে।
🔗 লেনিন সংগ্রহশালা: গুরুত্বপূর্ণ রচনাবলী
- 📖 আরও পড়ুন: ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের রচনাবলী: কালানুক্রমিক তালিকা (১৮৯৩-১৯২৩)✊
- 📜 মূল পাঠ: লেনিনের এপ্রিল থিসিসের পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ ✊
- 🔍 বিশ্লেষণ: রাষ্ট্র ও বিপ্লব: একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তক সমালোচনা।📜
- 🚩 বিশেষ সংকলন: লেনিনের একটি প্রবন্ধ: মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান।📜

ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিন (২২ এপ্রিল, ১৮৭০ – ২১ জানুয়ারি, ১৯২৪) ছিলেন লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতা, একজন মার্কসবাদী রুশ বিপ্লবী এবং সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ। লেনিন ১৯১৭ সালে সংঘটিত মহান অক্টোবর বিপ্লবে বলশেভিকদের প্রধান নেতা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান।