অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র হচ্ছে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের নীতি

অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র বা অভ্যন্তরীণ-দলীয় গণতন্ত্র (ইংরেজি: Inner-Party Democracy বা Intra-Party Democracy) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সর্ববিধ আভ্যন্তরিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণ করবার গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের প্রণালী। বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশের পার্টির সঙ্গে যুক্ত সরকারি সংগঠন, যুব, শ্রমিক এবং অন্যান্য সংস্থা ও সংগঠনের ক্ষেত্রেও এই কর্মপ্রণালী প্রযোজ্য। এই কর্মপ্রণালীর প্রবর্তন করেছিলেন ভি আই লেনিন

পার্টির ভিতরে রাজনৈতিক বিষয়ে অবাধ আলোচনা, কর্মকর্তা নির্বাচনে স্বাধীন সুযোগ, ক্রমোচ্চ স্তর বিন্যস্ত দলীয় কাঠামোয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা এই কর্মপ্রণালীর মূল বৈশিষ্ট্য। সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক বা কমিন্টার্নের (১৯১৯-৪৩) সময়ে এটা স্পষ্টই ছিল যে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যনির্বাহ সার্থক ও সফল হতে পারে যদি তার সংগঠনে যথাসম্ভব কেন্দ্রীকতা থাকে এবং যদি লৌহকঠোর শৃঙ্খলা সবাই মেনে চলে, দলের কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব সবার আস্থাভাজন হয় এবং তার অধিকার ও ক্ষমতা অটুট থাকে। কেন্দ্রীকতার অর্থ হলো কেন্দ্রীয় পার্টির হাতে যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা এবং সর্বস্তরের যাবতীয় পরিবার, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গঠন ও বিকাশের জন্য সেই সংগঠন বা পার্টির দায়ী থাকা।

এই কেন্দ্রিকতাবাদ এই হিসাবে কিছুটা গণতন্ত্রসম্মত যে তা জনহিতার্থে ক্রিয়াশীল থাকে, যথা ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটায়, পার্টির মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বজায় রাখে, যার ফলে দলীয় কাঠামোর প্রতিটি স্তর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়। তবে যথার্থ কেন্দ্রিকতাবাদ ও যথার্থ গণতন্ত্রে দলের ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের প্রয়োজনে প্রথমটির আধিপত্য বেশি। তা হলেও মোটামুটি ভাবে অন্তর্দলীয় গণতন্ত্রে দলের কর্মপন্থা নির্ধারণ ও রূপায়ণে দলীয় সদস্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। 

গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতাবাদ প্রণালীতে দলের অধীন সমস্ত ধরনের সংস্থা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়। সেগুলি দলের উচ্চতর সাংগঠনিক স্তরে নিয়মিত রিপোর্ট দাখিল করে। সদস্যদের সৃজনশীল কাজের উদ্যম, কঠোর শৃঙ্খলাপরায়ণতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে সংখ্যালঘিষ্ঠের আনুগত্য প্রত্যাশা করা হয়। অর্থাৎ সংগঠনের উপরিস্থ কর্তৃত্বের সিদ্ধান্ত রূপায়িত করার দায়িত্ব থাকে নিম্নস্তরের সংগঠন ও দলীয় অন্যান্য সংস্থার উপর। এটাকেই বলা হয় অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র; সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার নীতি।

সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার নীতি

কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনের উপরিস্থ কর্তৃত্বের সিদ্ধান্ত রূপায়িত করার দায়িত্ব থাকে নিম্নস্তরের সংগঠন ও দলীয় অন্যান্য সংস্থার উপর। এটাকেই বলা হয় অন্তর্দলীয় গণতন্ত্র যেটার ভিত্তি হচ্ছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার নীতি। এই প্রসঙ্গে মালেনকভ ১৯৫২ সাধারণাব্দের ১৯তম পার্টি কংগ্রেসের প্রতিবেদনে পার্টি সংক্রান্ত আলোচনায় এক বিস্তারিত আলোচনা করেন। 

কমরেড মালেনকভ মনে করেন, পার্টির ভুল, ত্রুটি, দুর্বলতা ও ব্যাধির স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রধান উপায় হিসাবে আত্মসমালোচনা, বিশেষ করে নীচে থেকে সমালোচনাকে সমস্ত পার্টি সংগঠনে গড়ে তোলা হচ্ছে প্রধান কর্তব্য যা পূর্ণমাত্রায় গড়ে তোলা দরকার।

১৯৫২ সালের প্রেক্ষাপটে তিনি উল্লেখ করেন, পার্টি ও রাষ্ট্রের জীবনে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার গুরুত্ব কিছু কিছু পার্টি সংগঠন পুরোপুরি উপলব্ধি করে না। সমালোচনার জন্য নির্যাতন ও শাস্তিদানের দৃষ্টান্তও দেখতে পাওয়া যায়। এমন কর্মীর দৃষ্টান্ত এখনো বিরল নয়, যারা পার্টি’র প্রতি তাদের আনুগতোর কথা শোনাতে কখনো ক্লান্তি বোধ করে না, অথচ তারা কার্যক্ষেত্রে নীচের দিক থেকে আসা সমালোচনা বরদাস্ত করতে পারে না, সেই সমালোচনার কণ্ঠরোধ করে এবং সমালোচকদের উপর আক্রোশের ঝাল ঝাড়ে। সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা সম্পর্কে এমন অসংখ্য আমলাতান্ত্রিক মনোভাবের দৃষ্টান্তের কথা আমরা জানি যা পার্টি’র কাজের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর যা পার্টি’র সংগঠনগুলির কর্মোদ্যোগ বিনষ্ট করে, পার্টি’ সদস্যদের কাছে নেতৃত্বের মর্যাদা ক্ষুন্ন করে এবং পার্টি’র চিরশত্রু আমলাতন্ত্রীদের পার্টি বিরোধী রীতিনীতি কোনো কোনো পার্টি’ সংগঠনে সংক্রামিত হয়। 

আরো পড়ুন

একথা পার্টি উপেক্ষা করতে পারে না যে, সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা যখন দমন করা হয়, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উপর যখন গণনিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা হয়, তখন তার অবধারিত পরিণাম আমলাতন্ত্র ও অধঃপতনশীলতা, এমন কি এর ফলে পার্টি’ সংগঠনের কোন কোন বিচ্ছিন্ন অংশে দুর্নীতির প্রাদুর্ভাবও অনিবার্যভাবে দেখা যায়। কমরেড মালেনকভের মতে ‘যে সকল ত্রুটি, বিচ্যুতি ও অস্বাস্থ্যকর রীতিনীতি পার্টির স্বাস্থ্যকে ব্যাহত করে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বহু পরীক্ষিত ও বহু প্রযুক্ত হাতিয়ার হচ্ছে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা’। ফলে অভ্যন্তরীণ পার্টি গণতন্ত্র হচ্ছে লেনিনবাদী নীতি।  

তথ্যসূত্র:

১. গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্রমোহন. রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, জানুয়ারি ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১৮-১৯।

২. কমরেড মালেনকভ, ১৯৫২, সিপিএসইউ’র ১৯তম কংগ্রেসের উপস্থাপিত প্রতিবেদন, পার্টি প্রসঙ্গে, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স, ঢাকা, মে ১৯৮২, পৃষ্ঠা ৯-১০।

Leave a Comment

error: Content is protected !!