প্রতিষ্ঠান বা অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান (ইংরেজি: Institution) হচ্ছে মানবিকভাবে তৈরি নিয়ম ও রীতিনীতির একটি কাঠামো যা সামাজিক আচরণকে গঠন করে এবং সীমাবদ্ধ করে। প্রতিষ্ঠানের সকল সংজ্ঞায় সাধারণত একটি স্তরের স্থায়িত্ব এবং ধারাবাহিকতা থাকার ফলকে দেখানো হয়। আইন, নিয়ম, সামাজিক রীতিনীতি এবং নিয়মাবলী সবই প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের আনুষ্ঠানিকতা এবং অনানুষ্ঠানিকতার স্তরে ভিন্ন হয়।[১]
প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে “স্থিতিশীল, মূল্যবান, আচরণের পুনরাবৃত্তিমূলক নমুনা” বা সামাজিক শৃঙ্খলার প্রক্রিয়া। প্রতিষ্ঠানগুলো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্যে একগুচ্ছ ব্যক্তির আচরণ পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাধারণত সামাজিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলি জীবিত আচরণ পরিচালনাকারী নিয়মকানুনসমূহের মধ্যস্থতা করার মাধ্যমে ব্যক্তি এবং উদ্দেশ্যকে অতিক্রম করে যায়। সমাজে কীভাবে কাজ করতে হয় সে সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রচুর জ্ঞান থাকে এবং এগুলিকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের তত্ত্বের সমতুল্য সামাজিক বিজ্ঞান হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠান মূলত সমাজতত্ত্বের একটি প্রত্যয়; নানা অর্থে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অক্সফোর্ড অভিধানে (OED) প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘প্রতিষ্ঠিত আইন, প্রথা, প্রচলন, ব্যবহার, সংগঠন অথবা লোকের রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক জীবনের উপাদান; নিয়ামক বিধিনিষেধ অথবা জনজীবনে অনুসৃত নানান প্রচলন কিংবা সভ্যতার কাঙিক্ষত বস্তু।’ সাধারণভাবে প্রত্যয়টির বিষয় হলো সামাজিক আচার-ব্যবহার যার পিছনে থাকে সুপ্রতিষ্ঠিত, সর্বজনগ্রাহ্য, সহজে নির্ণেয় এবং স্থায়ী কতকগুলি রীতিনীতি, মূল্যবোধ এবং সামাজিক অনুশাসন।
আরো পড়ুন
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- আনুগত্য হলো একটি দেশ, দর্শন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠা
- অভিজ্ঞতাবাদ সমস্ত জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে
- প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মানবিকভাবে তৈরি নিয়ম ও রীতিনীতির একটি কাঠামো
- ফ্যাসিবাদের শ্রেণি চরিত্র
- বর্ণবাদ কাকে বলে
- জাতি কাকে বলে?
- শ্রেণি উদ্ভব হবার কারণ ও বিলুপ্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- সমাজ হচ্ছে মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপের উৎপাদন
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব মানব প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে
- বিপ্লব সম্পর্কে তত্ত্ব কয়েক ধরনের তত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন
- হ্যারল্ড লাস্কি সাম্যের প্রশ্নে উদারনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সামাজিক সাম্যের পক্ষে
- আর্নেস্ট বার্কার সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী মতামত প্রদান করেন
- সাম্যের নয়া উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী মুক্ত বাজারী প্রতিযোগিতা
- সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা
- সাম্যের উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে আইন ও সাংবিধানিক সাম্য যা পুঁজিবাদ রক্ষাকারী
- উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী জান্তব মতবাদ
- সাম্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ হচ্ছে সাম্য ধারনাটির বিকাশের ধারাবাহিক ইতিহাস
- সাম্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে সাম্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক অনুশীলনে
- সাম্য কী? সাম্য সামাজিক বিকাশের চালিকাশক্তি, স্বাধীনতা ও অধিকারের গ্যারান্টি
- সাম্যের বিভিন্ন রকমের প্রকারভেদ হচ্ছে স্বাভাবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি
- সামাজিক সাম্য হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সমস্ত লোকের সমান অধিকার
- সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ
- আনন্দবাদ এমন এক চিন্তাধারা যাতে সকল আনন্দ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে
- জাঁ জ্যাক রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব হচ্ছে সামাজিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়
- সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ
- আদিম সাম্যবাদ হচ্ছে শিকার-সংগ্রহকারীদের উপহারের অর্থনীতিকে বর্ণনার উপায়
- হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব হচ্ছে শাসক চরম, অবিভাজ্য ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী
- প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবসের ধারণা হচ্ছে সমাজবিহীন অসভ্য নোংরা
- মানব প্রকৃতি সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা হচ্ছে স্বার্থপর, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক
- রাষ্ট্রদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রকৃতি ও বিকাশের আলোচনা
- সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকদের সম্মেলন
- হেগেলের সুশীল সমাজ সংক্রান্ত ধারণা মার্কস ও অন্যান্যদের প্রভাবিত করে
- ফ্রিডরিখ হেগেলের সুশীল সমাজ ধারণাটির সীমাবদ্ধতাসহ ব্যাখ্যা
- হেগেলের রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির স্থান নির্ণয়ের জন্য তাঁর ভাববাদী রাষ্ট্রতত্ত্বের বিশ্লেষণ
- সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও সরকার সম্পর্কে হেগেলের মতের বিস্তারিত আলোচনা
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হিসেবে স্বাধীনতা সম্পর্কে হেগেলের ধারণা
- হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন হয়েছে দর্শন, জার্মান ভাববাদসহ বেশ কিছু বিষয়ে
- হেগেলের আইনতত্ত্ব হচ্ছে আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে হেগেলের ধারণাগুলির মর্ম
- হেগেলীয় রাষ্ট্র হচ্ছে সর্বব্যাপী, সত্য, অভ্রান্ত, ঐশ্বরিক, জাতীয়, জৈব যুদ্ধংদেহী সত্তা
- হেগেলবাদী রাষ্ট্রতত্ত্ব হচ্ছে হেগেলের রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্পর্কে ভাববাদী মত
- হেগেলের জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা হচ্ছে জার্মান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উৎকর্ষ ও শ্রেষ্ঠ শক্তি
- হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বা দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে বস্তু ও সমাজ সম্পর্কিত অভীক্ষার পদ্ধতি
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
সমাজতাত্ত্বিকেরা অনেক সময়ে সামাজিক আচার-ব্যবহারের পরিবর্তে রীতিনীতি, মূল্যবোধ ইত্যাদির উপর গুরুত্ব দেন বেশি। অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানসমূহকে মোটামুটি পাঁচভাবে দেখা হয়: রাজনৈতিক (ক্ষমতা, অধিকার ইত্যাদির আলোচনা-সূত্রে), অর্থনৈতিক (উৎপাদন-সম্পর্ক নির্ধারণের নিরিখে), সাংস্কৃতিক (শিক্ষা, বিনোদন, অবসরযাপন প্রসঙ্গে), আমলাতান্ত্রিক (জনপরিষেবা অর্থে), জ্ঞাতি সম্পর্ক (kinship-অর্থাৎ পরিবার, আত্মীয়-পরিজন ইত্যাদি বিবেচনাকালে) এবং সমাজতাত্ত্বিক (বিবাহ, পরিবার ইত্যাদি সূত্রে)। অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের কোনও বিধিবদ্ধ প্রকৃতি কিংবা ক্রিয়াকলাপ থাকে না। তবে তার স্তরবিন্যাস দেখা যায়। সেগুলি সমাজজীবনের এক একটি ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজ-সংগঠনের নানাবিধ রকমফের অনুযায়ী সমাজতাত্ত্বিকেরা অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান প্রত্যয়টিকে শিথিলভাবে ব্যবহার করেন।[২]
তথ্যসূত্র:
১. অনুপ সাদি, ২০ অক্টোবর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “প্রতিষ্ঠান বা অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ব্যক্তির আচরণ পরিচালনাকারী সমাজতত্ত্বের প্রত্যয়”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/philosophy/institution/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, প্রথম সংস্করণ, জানুয়ারি ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১৭-১৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।