আনুগত্য (ইংরেজি: Loyalty) হলো একটি দেশ, দর্শন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠা। আনুগত্যের বিষয় কী হতে পারে তা নিয়ে দার্শনিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, কারণ কেউ কেউ যুক্তি দেন যে আনুগত্য সম্পূর্ণরূপে আন্তঃব্যক্তিক এবং কেবলমাত্র অন্য একজন মানুষই আনুগত্যের বিষয় হতে পারে। আইন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে আনুগত্যের সংজ্ঞা হচ্ছে একজন ব্যক্তির একটি জাতির প্রতি আনুগত্য, তা সে তার জন্মভূমির জাতি হোক বা শপথের মাধ্যমে প্রাকৃতিকীকৃত ঘোষিত স্বজাতি হোক।[১]
আনুগত্য শব্দটির মমার্থ হলো এমন এক মানসিকতা যার মধ্য দিয়ে কারও কোনও কিছুর প্রতি বিশ্বস্ততা, অনুরাগ ও সমর্থন ফুটে ওঠে; সেটা পরিবার, চাকুরির ক্ষেত্রে নিয়ােগকর্তা, ধর্মীয় অথবা বহুত্ববাদী সমাজে যে-কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রতি প্রদর্শিত হয়। আনুগত্য স্বভাবতই আত্মস্বার্থ বহির্ভুত একটি আসক্তি।
রাজনীতিতে আনুগত্য হলো দেশভক্তি ও রাষ্ট্রিক বাধ্যতার অন্তর্গত। নিজ দল বা গােষ্ঠীর অন্ধ প্রশংসা এবং অন্যদের সমালােচনা আনুগত্যের অঙ্গ। আনুগত্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো দেশ, দল বা গােষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মতা।
প্রাচীন গ্রিক ও রােমান তাত্ত্বিকেরা আনুগত্যকে রাজনীতির সর্বোচ্চ পুণ্য হিসেবে দেখতেন; এবং সেখানে সীমিত সংখ্যক যাঁরা নাগরিকত্বের অধিকারী হতেন, তাঁদের প্রথমে আনুগত্যের পাঠ নিতে হতো। রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যপালন ছিল শ্রেষ্ঠ পুণ্যকর্ম এবং আনুগত্যের উপর সর্বাধিক মূল্যবত্তা নির্দেশিত হয়। প্লাতাে, আরিস্তোতল প্লুটার্ক, থুকিডাইডিস আনুগত্যের উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরােপ করেন। মধ্যযুগের ইউরােপে জাতিরাষ্ট্র গড়ে ওঠার সময়ে একমাত্র সামন্ত প্রভুদের কাছেই সাধারণ লােকের আনুগত্যের প্রশ্ন দেখা দিত।
আধুনিক ধারণা
মাকিয়াভেলি রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে দেখেন; সমসাময়িক যুগে আনুগত্যের মনােভাব হয়ে পড়েছিল স্তিমিত। ফরাসি বিপ্লবের সময়ে আনুগত্যের বিষয়টি বড় আকারে দেখা দেয়। জা জ্যাক রুশো আনুগত্যকে আবেগমণ্ডিত করে তােলেন।
উনিশ শতকের গােড়া থেকে আনুগত্যের বিষয়টি জটিল ও স্ববিরােধী হয়ে পড়ে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিকতার আদর্শ প্রসারিত হবার ফলে বিশ শতকে সর্বনিয়ন্ত্রণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভবের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক দল, নেতা ও আদর্শের প্রতি লােকের অবিচল আনুগত্য দাবি করা হয়। আন্তজাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সােভিয়েত দেশ কিংবা চীনের প্রতি আনুগত্য ছিল স্বাভাবিক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমাবধি আনুগত্যের প্রশ্নটি গুরুত্ব পায়। আদিপর্বে সেখানকার অধিবাসীদের ছিল ইংরেজ রাজশক্তির প্রতি আনুগত্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্যবাদী মতাদর্শের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে নিজেদের অন্তর্ঘাতের আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার দেশের জনগণকে আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ জনগণের উপর নানা বিধিনিষেধ আরােপ করে।[২]
আরো পড়ুন
- আনুগত্য হলো একটি দেশ, দর্শন, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠা
- অভিজ্ঞতাবাদ সমস্ত জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে
- প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মানবিকভাবে তৈরি নিয়ম ও রীতিনীতির একটি কাঠামো
- অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতা বা অধিকারের আইনি, সামাজিক, অথবা নৈতিক নীতি
- ফ্যাসিবাদের শ্রেণি চরিত্র
- বর্ণবাদ কাকে বলে
- জাতি কাকে বলে?
- শ্রেণি উদ্ভব হবার কারণ ও বিলুপ্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ
- সমাজ হচ্ছে মানুষের পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপের উৎপাদন
- বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দর্শন হচ্ছে মার্কসবাদ
- কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতার তত্ত্ব মানব প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করে
- বিপ্লব সম্পর্কে তত্ত্ব কয়েক ধরনের তত্ত্ব প্রসঙ্গে আলোচনা
- বিপ্লব কেন হয় বা বিপ্লব সংঘটিত হবার কারণ প্রসঙ্গে
- বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন
- হ্যারল্ড লাস্কি সাম্যের প্রশ্নে উদারনীতি ও রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সামাজিক সাম্যের পক্ষে
- আর্নেস্ট বার্কার সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী মতামত প্রদান করেন
- সাম্যের নয়া উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদী মুক্ত বাজারী প্রতিযোগিতা
- সাম্যের মার্কসবাদী ভাবনা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা
- সাম্যের উদারবাদী ভাবনা হচ্ছে আইন ও সাংবিধানিক সাম্য যা পুঁজিবাদ রক্ষাকারী
- উদারতাবাদ বা উদারনীতিবাদ জনগণ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাবিরোধী জান্তব মতবাদ
- সাম্যের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ হচ্ছে সাম্য ধারনাটির বিকাশের ধারাবাহিক ইতিহাস
- সাম্যের গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে সাম্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক অনুশীলনে
- সাম্য কী? সাম্য সামাজিক বিকাশের চালিকাশক্তি, স্বাধীনতা ও অধিকারের গ্যারান্টি
- সাম্যের বিভিন্ন রকমের প্রকারভেদ হচ্ছে স্বাভাবিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি
- সামাজিক সাম্য হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সমস্ত লোকের সমান অধিকার
- সুখবাদ মানুষের সর্বোচ্চ মঙ্গলার্থক শব্দ হিসাবে নীতিশাস্ত্রের একটি মতবাদ
- আনন্দবাদ এমন এক চিন্তাধারা যাতে সকল আনন্দ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে
- নারীবাদ পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদপুষ্ট একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন
- নারীমুক্তি হচ্ছে সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন
- জাঁ জ্যাক রুশোর সাধারণ ইচ্ছা তত্ত্ব হচ্ছে সামাজিক চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয়
- বস্তুবাদ হচ্ছে দর্শনের ধারণা, যাতে বোঝায় জাগতিক যাবতীয় অস্তিত্বের আধার বস্তু
- সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ
- আদিম সাম্যবাদ হচ্ছে শিকার-সংগ্রহকারীদের উপহারের অর্থনীতিকে বর্ণনার উপায়
- হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব হচ্ছে শাসক চরম, অবিভাজ্য ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী
- প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে হবসের ধারণা হচ্ছে সমাজবিহীন অসভ্য নোংরা
- মানব প্রকৃতি সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা হচ্ছে স্বার্থপর, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক
- রাষ্ট্রদর্শন বা রাজনৈতিক দর্শন রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রকৃতি ও বিকাশের আলোচনা
- সুশীল সমাজ বা নাগরিক সমাজ হচ্ছে বেসামরিক নাগরিকদের সম্মেলন
- হেগেলের সুশীল সমাজ সংক্রান্ত ধারণা মার্কস ও অন্যান্যদের প্রভাবিত করে
- ফ্রিডরিখ হেগেলের সুশীল সমাজ ধারণাটির সীমাবদ্ধতাসহ ব্যাখ্যা
- হেগেলের রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির স্থান নির্ণয়ের জন্য তাঁর ভাববাদী রাষ্ট্রতত্ত্বের বিশ্লেষণ
- সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও সরকার সম্পর্কে হেগেলের মতের বিস্তারিত আলোচনা
- ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হিসেবে স্বাধীনতা সম্পর্কে হেগেলের ধারণা
- হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন হয়েছে দর্শন, জার্মান ভাববাদসহ বেশ কিছু বিষয়ে
- হেগেলের আইনতত্ত্ব হচ্ছে আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে হেগেলের ধারণাগুলির মর্ম
- হেগেলীয় রাষ্ট্র হচ্ছে সর্বব্যাপী, সত্য, অভ্রান্ত, ঐশ্বরিক, জাতীয়, জৈব যুদ্ধংদেহী সত্তা
- হেগেলবাদী রাষ্ট্রতত্ত্ব হচ্ছে হেগেলের রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্পর্কে ভাববাদী মত
- হেগেলের জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা হচ্ছে জার্মান রাষ্ট্রের চূড়ান্ত উৎকর্ষ ও শ্রেষ্ঠ শক্তি
- সর্বহারা একনায়কত্ব থেকেই নির্মিত হয়েছে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পথ
- হেগেলের দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি বা দ্বন্দ্ববাদ হচ্ছে বস্তু ও সমাজ সম্পর্কিত অভীক্ষার পদ্ধতি
- রাজনৈতিক অর্থনীতি অধ্যয়নের পরিধি পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ অবধি
- পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রেণি-পার্থক্য হচ্ছে একটি চরম, পরম ও অনিবার্য সত্য
- মার্কসবাদ-লেনিনবাদ হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ
- মার্কসীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির ভূমিকা এক যুদ্ধরত পার্টি বৈশিষ্ট্যধারী শ্রেণি-বিজ্ঞান
চিত্রের ইতিহাস: পোল্যান্ডের ক্রাকাউতে ডজক নামের কুকুরের আনুগত্যের ভাস্কর্য, আলোকচিত্র: Wizzard
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ১৩ নভেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আনুগত্য কাকে বলে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/loyalty/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৩৩-৩৪।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।