জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেলের ‘সুশীল সমাজ’ বা ‘নাগরিক সমাজ’ (Civil Society) সংক্রান্ত ধারণাটি আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। হেগেল নাগরিক সমাজকে রাষ্ট্র ও পরিবারের মধ্যবর্তী একটি স্বতন্ত্র পরিসর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা পরবর্তীকালে কার্ল মার্কস, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস এবং আন্তোনিও গ্রামসির মতো তাত্ত্বিকদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। মার্কসীয় দর্শনে নাগরিক সমাজকে অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বা ‘বেস’ (Base) হিসেবে দেখা হলেও, গ্রামসি একে সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ (Hegemony) নির্মাণের ক্ষেত্র হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করেছেন। এই তাত্ত্বিক বিবর্তনই প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে জনসমষ্টির এই সংঘবদ্ধ রূপটি রাজনৈতিক দর্শনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘সিভিল সোসাইটি’ বা অ-রাষ্ট্রীয় সমাজ কেবল একটি তাত্ত্বিক প্রত্যয় নয়, বরং এটি গণতন্ত্রের সুরক্ষা ও সুশাসন নিশ্চিত করার প্রধান হাতিয়ার। শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনকল্যাণমুখী ও জবাবদিহিমূলক করতে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। হেগেলীয় দর্শনে যা ‘চাহিদার ব্যবস্থা’ হিসেবে শুরু হয়েছিল, সমকালীন বিশ্বে তা উন্নয়ন ও মানবাধিকার রক্ষার এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হয়েছে। একটি কার্যকর জনকল্যাণধর্মী রাষ্ট্র বিনির্মাণে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে স্বাধীন ও সচেতন নাগরিক সমাজের কোনো বিকল্প নেই।
হেগেল বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করলেন খানিকটা ভিন্ন আঙ্গিকে। তিনি নাগরিক অধিকার সম্বন্ধে একটি নতুন ধারণা প্রদান করেন এবং সুশীল সমাজ শব্দটি ব্যবহার করেন। সুশীল সমাজ বলতে এমন একটি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন যা বিশ্লেষণ, প্রতিবিশ্লেষণ ও সংশ্লেষণের মাধ্যমে একটি বুর্জোয়ার রাষ্ট্রকে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিস্থাপর করবে।
হেগেলের সুশীল সমাজ ধারনাটির তিনটি প্রধান দিক হলো – ১. চাহিদার ব্যবস্থা, ২. ন্যায় বিচার এবং ৩. পুলিশ ও কর্পোরেশন। হেগেলের মতে সুশীল সমাজ রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যস্ততাকারী হিসেবে ভূমিকা রাখে। কিন্তু হেগেল মনে করেন সুশীল সমাজের মধ্যে সমৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও, এই সমাজের অসঙ্গতি ক্রমশই একে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। স্বাভাবিক ঐক্য বা শান্তি বলে এখানে কিছু নেই। দারিদ্র্য, বৈষম্য, বিরোধিতাই এই সমাজের স্বাভাবিক প্রবণতা। সুশীল সমাজ নিজের আভ্যন্তরীণ সম্ভাবনা বা সামর্থ দিয়ে এই দারিদ্র্য বা বৈষম্য রোধ করতে পারে না। কেমনভাবে সুশীল সমাজে অসঙ্গতি ও ব্যর্থতার মধ্য থেকে সৃষ্টি হয় নতুন সম্ভাবনা, নতুন শক্তি সেকথা বলেছেন হেগেল। সুশীল সমাজের মধ্যে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থাকে বটে কিন্তু এ রাষ্ট্রব্যবস্থা অর্থাৎ বিচার, প্রশাসন, আইন প্রভৃতি এখানে যুক্তির নির্দেশে কাজ করে না। প্রকৃত রাষ্ট্র হবে বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের মধ্যে সামাজিক প্রয়োজন বা ব্যবস্থাদি থাকবে কিন্তু সুশীল সমাজ ধারণাটি থাকবে না। নাগরিক বা সুশীল সমাজের গুণগুলি এই রাষ্ট্র গ্রহণ করবে এবং বজর্ন করবে এর দোষ ত্রুটিগুলি।
হেগেলের বিবেচনায়, মানবিক ও সামাজিক বিকাশের এই ধারায় রাষ্ট্র হচ্ছে পরম স্তর। আর ‘সিভিল সোসাইটি’ টিকে আছে রাষ্ট্রের পরিসরে। কেবল ‘সিভিল সোসাইটি’ কখনোই সর্বজনীন স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না। এজন্য দরকার রাষ্ট্রের। রাষ্ট্র ‘সিভিল সোসাইটি’র অন্বিষ্ট সর্বজনীন গুণাবলি টিকিয়ে রাখে। ‘সিভিল সোসাইটি’ হলো সর্বজনীনতার পরিসরে এমন ব্যক্তিবর্গের সংঘবদ্ধতা, যারা কেবল নিজ নিজ জীবন ধারণে সক্ষম।
কার্ল মার্কস হেগেলের রাষ্ট্র আর ‘সিভিল সোসাইটি’র পারস্পরিক সম্পর্ককে অনেকটা উল্টো দিক থেকে দেখেছেন। মার্কসের কথা হচ্ছে, রাষ্ট্র ‘সিভিল সোসাইটি’র ওপর নির্ভরশীল। কারণ প্রতিটি সমাজের শ্রেণি বিভাজনের প্রভাব রাষ্ট্রের গঠনে পরিষ্কারভাবে ফুটে থাকে। এ বিবেচনায় অর্থনৈতিক বিষয়াদির সঙ্গেও ‘সিভিল সোসাইটি’র সম্পর্ক সরাসরি। আরও এগিয়ে মার্কস রাষ্ট্রের বাইরের সবকিছুকেই ‘সিভিল সোসাইটি’র অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাই সর্বহারার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান ‘সিভিল সোসাইটি’র ধ্বংসও জরুরি বলে ঘোষণা করেন মার্কস। যে ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত ছিলেন মার্কসের চিন্তা-দোসর এঙ্গেলস।
মার্কস-এঙ্গেলসের বিশ্লেষণের পর রাষ্ট্রনৈতিক আলোচনায় ‘সিভিল সোসাইটি’র প্রসঙ্গ অনেক দিন স্তিমিত থাকে। বস্তুত বিগত শতাব্দীজুড়েই মার্কসীয় চিন্তাধারা আধিপত্য বিস্তার করেছিল রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতিসহ মানব ও সমাজ বিদ্যার প্রায় সব শাখায়। মানবীয় চিন্তন প্রক্রিয়ায় এই নতুন দৃষ্টিকোণ ও পটভূমি বিশ্বকে যতটুকু আলোড়িত করেছিল, তেমনটি ছিল অভূতপূর্ব। এমন কি সমাজ বিশ্লেষণে মার্কসীয় ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘সিভিল সোসাইটি’র কোনো বিকল্প বা ভিন্নতর রূপ ও চরিত্র ব্যাখ্যার প্রয়াসও সে সময় কার্যকর হয়নি। পরিস্থিতি এমনই ছিল যে, একটি ঘোরতর মার্কসীয় চিন্তাবলয় মানুষের ভাবনার জগতকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল এবং ক্ষেত্র বিশেষে সেই সত্যমুখী চিন্তাস্রোত প্রচ্ছন্নে গোঁড়ামির দিকেও চলে গিয়েছিল। এ পরিস্থিতির অবসান ঘটে বিগত শতাব্দীর ৮০ দশকে। তখন পূর্ব ইউরোপের প্রতিক্রিয়াশীল সলিডারিটি আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্রায়নের দাবির মুখে সমাজ অভিমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার অবসানের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে মার্কসবাদ এবং সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা সৃষ্টি হয়। সেই সঙ্গে নবতর প্রেক্ষাপটে আবারও আলোচনায় ফিরে আসে ‘সিভিল সোসাইটি’ প্রসঙ্গ। যে চিন্তা-ভাবনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা আন্তোনিও গ্রামসির।
গ্রামসি মার্কসীয় ধারণার মধ্যে থেকেই খুঁটিনাটি বিশ্লেষণে ‘সিভিল সোসাইটি’র এমন কিছু দিক সামনে নিয়ে এসেছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে চলমান নানা ধরণের ‘সিভিল সোসাইটি’ সংক্রান্ত আলোচনায় প্রাসঙ্গিক। ‘সিভিল সোসাইটি’র অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এবং এ নিয়ে নানা মতলবের মধ্য থেকে মৌল ধারণাটিও পাওয়া সম্ভব গ্রামসির মাধ্যমে। ভাবনাটি গ্রামসি শুরু করেছেন বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে। বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা ও স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গ্রামসি দেখেছেন, সমাজের উপরিতলে দুটি স্তর রয়েছে – ১. ‘সিভিল সোসাইটি’ বা সাধারণভাবে ব্যক্তিগত বলে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমাবেশ সেখানে; ২. পলিটিক্যাল সোসাইটি বা রাষ্ট্র।
গ্রামসির মতে, ‘সিভিল সোসাইটি’ পলিটিক্যাল সোসাইটি বা রাষ্ট্রের ঢালস্বরূপ। গ্রামসির বক্তব্য থেকে সিভিল সোসাইটি সম্পর্কে তার ধারণা সরল সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। আসলে বৃহত্তর অর্থে সমাজ ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক প্রভাব এবং অবিরাম লেনদেনের কথা বিবেচনা করে সিভিল সোসাইটি ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট এবং সীমাচিহ্নিত সম্পর্ক নির্দেশ করা খুবই দুরূহ। কেননা, প্রচলিত অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যক্তি প্রায়শই এই বিভাজন রেখা ভেদ করে যায়। অর্থাৎ সিভিল সোসাইটিতে থেকেও পলিটিক্যাল সোসাইটিতে তার দ্বৈত উপস্থিতি সৃষ্টি করে ক্ষমতা ও আধিপত্যে অংশগ্রহণ করার উদ্দেশ্যে। ফলে একদিকে সে আধিপত্যের আওতাধীন। আবার সে-ই হয়ে ওঠে আধিপত্যশীল। সিভিল সোসাইটি থেকে ব্যক্তি তার ক্ষমতালিপ্সার তাড়নায় প্রবেশ করতে পারে পলিটিক্যাল সোসাইটিতে।
আরো পড়ুন
- প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন: আধুনিক ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় দর্শনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: রাষ্ট্রদর্শন, প্রগতি এবং নৈতিক সংহতির নবদিগন্ত
- হেগেলীয় রাজনৈতিক চিন্তা: জার্মান ভাববাদের বিস্তার এবং ফরাসি বিপ্লবোত্তর দোদুল্যমানতা
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ ও এর বৌদ্ধিক উত্তরধিকার: মার্কস থেকে গ্রামসি পর্যন্ত বিবর্তন
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ (Civil Society): চাহিদার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সংহতির মধ্যবর্তী স্তর
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির অবস্থান: পরম সত্তার বিবর্তনে ব্যষ্টি ও সমষ্টির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
- হেগেলীয় রাজনৈতিক কাঠামো: সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের জৈব ঐক্য
- হেগেলীয় স্বাধীনতা তত্ত্ব: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংহতির নৈতিক রূপায়ণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন: জীবনতত্ত্বের আঙ্গিক একত্ব ও উচ্চতর সত্তার সংশ্লেষণ
- হেগেলের আইনতত্ত্ব: পরম সত্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সমাজ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের স্বরূপ: সার্বভৌম নৈতিক সত্তা, বিশ্ব-আত্মার মূর্তায়ন ও পরম লক্ষ্য
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শন: পরম ইচ্ছার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং আইন ও নৈতিকতার সংশ্লেষণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তা: জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক নিয়তি এবং বিশ্ব-আত্মার মূর্ত প্রকাশ
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিবর্তন: সক্রেটিস, হেগেল এবং মার্কসীয় বস্তুবাদী রূপান্তরের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
তথ্যসূত্র
১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৪০২-৪০৩।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।
হেগেলের দৃষ্টিতে পৌর সমাজ বা সুশীল সমাজ হল পরিবারের এন্টি থিসিস। তিনি দ্বান্দ্বিক উপায়ে দেখান পরিবারে যেহেতু ব্যক্তির সকল চাহিদা পূরণ হয় না সেহেতু সুশীল সমাজের প্রয়োজন ব্যক্তির চাহিদাগুলি পূরণের জন্য। সুশীল সমাজে ব্যক্তি পরিবারের তুলনায় উৎকৃষ্টতর স্বাধীনতা ভোগ করে। মার্ক্সের দৃষ্টিতে এটি সম্পূর্ণ নেতিবাচক প্রতিষ্ঠান অসাম্য দ্বারা মন্ডিত। এটিকে তিনি হবসের ‘state of nature’ এর সাথে তুলনা করেছেন।
লেখাটি ভালো লাগলো না পড়ে। ভীষণই অস্পষ্ট ও খাপছাড়া।