হেগেলবাদী রাষ্ট্রতত্ত্ব হচ্ছে হেগেলের রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্পর্কে ভাববাদী মত

হেগেলবাদী রাষ্ট্রতত্ত্ব বা হেগেলীয় রাষ্ট্রের স্বরূপ বা রাষ্ট্র সম্পর্কে হেগেলের ভাববাদী মত (ইংরেজি: Hegel’s Idealistic theory of state) বা “রাষ্ট্র একটি ঐশ্বরিক ধারণা” হচ্ছে হেগেলীয় রাষ্ট্র সম্পর্কিত সামগ্রিক ধারণা যাতে তিনি দ্বন্দ্ববাদ, ইতিহাসবাদ বা যুক্তিবাদকে তাঁর দর্শনের শক্তি বা প্রেরণা হিসেবে উপস্থিত করেছেন। হেগেলবাদী চিন্তাধারার কার্যকারিতা প্রমাণ করা সম্ভব তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্বে। স্বাধীন ইচ্ছা যা পরম শক্তি বা ঈশ্বরের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে তা কার্যকর হবে তখনই যখন তার অভিব্যক্তি ঘটবে সঠিক যুক্তি দ্বারা পরিচালিত ধারণার মধ্যে। স্বাধীনতার স্পষ্ট উপলব্ধির মধ্যেই আছে স্বাধীন ইচ্ছার কার্যকর প্রকাশ। কেমন করে স্বাধীনতার বাস্তব উপলব্ধি সম্ভব? হেগেলের মতে আইন ও নৈতিকতার মাধ্যমেই তা সম্ভব। আইন ও নৈতিকতার সার্থক প্রকাশ ঘটে রাষ্ট্রের মধ্যে। 

ফ্রিডরিখ হেগেল মনে করেন যুক্তির দ্বান্দ্বিক প্রকাশ ঘটে যে ইতিহাসের মধ্যে সেটাই হলো চূড়ান্ত বাস্তব। যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা রূপ লাভ করে এবং ইতিহাস সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় তার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্র হেগেলের কথায় ‘বিশ্বের শক্তির মূর্ত রূপ’ সেই ঐশ্বরিক ভাব যা পৃথিবীতে বর্তমান। প্রত্যক্ষভাবে রীতি নীতির মধ্যে এবং পরোক্ষ মানুষের চেতনা, জ্ঞান ও কার্যকলাপের মধ্যে রাষ্ট্রের অবস্থান। হেগেল রাষ্ট্র বলতে যা বুঝেছেন তা হলো:

“The state in and by itself is the ethical whole, the actualization of freedom; and it is an absolute end of reason that freedom should be actual. The state is mind on earth and consciously realizing itself there… the march of God in the world, that is what the state is. The basis of the state is the power of reason actualizing itself as will”.

রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ে হেগেল চুক্তিবাদীদের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন না। চুক্তিই রাষ্ট্র সৃষ্টির উপায় একথা তিনি মানেন না। তাঁর মতে এক স্বাভাবিক জৈব প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের উৎপত্তি এবং রাষ্ট্র এক স্বাভাবিক জৈব সত্তা (Natural Organism)। ভাব জগতের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় (Dialectical Process) রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটে। হেগেল মনে করেন প্রতিটি যুগ আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল এবং সেই যুগের যাবতীয় সংগঠনে এর প্রভাব লক্ষণীয়। প্রতিটি ভাবের মধ্যে স্ববিরোধ বর্তমান; এই স্ববিরোধ কোনো ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নয় এবং পরস্পর বিধ্বংসী নয়। ভাবের মধ্যে স্ববিরোধ ধ্বংস নয়, পরস্পর ভারসাম্য এবং  নব ভাবের বিকাশের সহায়ক। রাষ্ট্রের মধ্যে এই ভাবের বিকাশ ঘটে।

আরো পড়ুন:  সরল পণ্য উৎপাদন হচ্ছে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃক বানানো একটি শব্দ

হেগেল রুশোর নৈতিক স্বাধীনতার ধারণাটি গ্রহণ করে বলেন এই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই সম্ভব। ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের ইচ্ছার সমন্বয়েই নৈতিক স্বাধীনতার সার্থকতা। হেগেল বলতে চান ব্যক্তি তার স্বাভাবিক সত্তাকে (যা তার ব্যক্তিগত আবেগ ও স্বার্থ দ্বারা গঠিত) তার চিন্তার সত্তার (তার যুক্তিবোধ) সঙ্গে মেলাতে পারলেই পাবে প্রকৃত স্বাধীনতা। ব্যক্তি আইনের প্রতি অনুগত হলে, সামাজিক নৈতিকতার নিয়মের অধীন হলেই তার স্বাধীনতাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে। হেগেলের কথায় “State is the highest and most perfect embodiment of social morality”. রাষ্ট্র ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা বা স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিত্বকে যেমন বহন করে বা পালন করে, তেমনি ব্যক্তিকে এই ব্যক্তিসত্তা ছেড়ে বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি অনুগত হতেও বাধ্য করে।

কান্ট মনে করেন স্বাধীনতা হলো নৈতিক ইচ্ছার কাছে নিজেকে সমর্পণ। হেগেল বলেন স্বাধীনতা হলো সামাজিক নৈতিকতার নির্দেশের প্রতি আনুগত্য। রাষ্ট্র এই সামাজিক নৈতিকতাকেই ঘনীভূত হতে সাহায্য করে, জনসমাজের নৈতিক ইচ্ছাকে প্রকাশ করে। রাষ্ট্রের নিজের ইচ্ছা আছে, ব্যক্তিত্ব আছে, উদ্দেশ্য আছে। রাষ্ট্র শুধু বর্তমানের মানুষকে নয়, তার এলাকায় নিয়ে আসে অতীত এবং ভবিষ্যতের মানুষকে। রাষ্ট্রের নিজেরই এক ভবিষ্যৎ আছে এবং এই ভবিষ্যৎ ব্যক্তির ভবিষ্যতের চেয়ে বড় । রাষ্ট্র বিমূর্ত ভাব বা আদর্শ নয়, এক জীবন্ত প্রকাশ।

হেগেল কান্টের মত ব্যক্তিগত বিবেককে শ্রেষ্ঠ বিচারক বলতে চান না। কারণ ব্যক্তিগত বিবেক একমত হতে পারে না, ভালো মন্দ বুঝলেও কোনটি চিরন্তন বা সার্বজনীন ভালো বা মন্দ তা বলতে পারে না। ব্যক্তির বিবেক সময়, স্থান অনুসারে পরিবর্তিত হতে পারে। হেগেল তাই জনসমাজের বিবেককে বেশি গুরুত্ব দেন। জনসমাজের বিবেকই হলো সত্যিকারের নৈতিকতা। এটাই সমাজের শক্তি, প্রেরণা। রুশো যেমন “সর্বসাধারণের ইচ্ছার মধ্যে পেয়েছেন সমাজের বিবেক বা ইচ্ছাকে, হেগেল তেমনি রাষ্ট্রকে করেছেন সামাজিক পুণ্য, ন্যায়পরায়ণতার আশ্রয়স্থল।

আরো পড়ুন:  হেগেলের সুশীল সমাজ সংক্রান্ত ধারণা মার্কস ও অন্যান্যদের প্রভাবিত করে

হেগেল স্বাভাবিক অধিকার বা চুক্তি সিদ্ধ সরকারের ধারণায় বিশ্বাস করেন না। রাষ্ট্র যেহেতু নৈতিক জীবদেহ যা ছাড়া ব্যক্তির কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই, সেহেতু ব্যক্তির ইচ্ছা রাষ্ট্র সৃষ্টি নয়, রাষ্ট্র হলো সার্বিক যুক্তির কার্যকর প্রকাশ। অধিকারের সঙ্গেই কর্তব্য যুক্ত এবং এই কর্তব্যকে নির্দিষ্ট করে দেয় রাষ্ট্র। হেগেল সম্ভবত স্বাভাবিক অধিকারের বিকল্প হিসেবে সামাজিক অধিকারের ধারণাকেই উপস্থিত করতে চেয়েছেন।

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৮৩-৩৮৪।

Leave a Comment

error: Content is protected !!