ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হিসেবে স্বাধীনতা সম্পর্কে হেগেলের ধারণা

ব্যক্তিবাদ বা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হিসেবে স্বাধীনতা সম্পর্কে হেগেলের ধারণা (Hegel’s concept of freedom) হচ্ছে রাষ্ট্রের সকলের কল্যাণের জন্য ব্যক্তির আত্মোৎসর্গের নামই স্বাধীনতা। জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল ভাববাদী দার্শনের গুরু হিসেবে তিনি স্বাধীনতাতে প্রয়োজনের স্বীকৃতি ও প্রয়োজনের রূপান্তর হিসেবে দেখেননি।

ফ্রিডরিখ হেগেলের রাষ্ট্র সম্বন্ধীয় মতামত আলোচনা করলে দেখা যায় তার এ তত্ত্ব স্বাধীনতার ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাঁর মতে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে আইনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যক্তির নিজেকে উৎসর্গ করা। রাষ্ট্র্রিয় আইনের বন্ধনের মধ্যেই মানুষের স্বাধীনতা নিহিত। ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্যের অধিকারের মধ্যে স্বাধীনতার ধারণা নিহিত নয়। নিম্নে হেগেলের স্বাধীনতা সম্পর্কিত মতবাদ ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ও উদারতাবাদী মত প্রত্যাখ্যান:

স্বাধীনতা সম্পর্কিত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী ও উদারতাবাদী মতকে হেগেল প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ এসব মতকে তিনি অপ্রাকৃত ও অবাস্তব বলে মনে করতেন। তিনি বলেছেন, মানুষের ক্রিয়াবলির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে আইন স্বাধীনতাকে সীমিত করে না, বরং মানুষকে অতি দ্রুত স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কাজেই মানুষের স্বাধীনতা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিই যথেষ্ট।

২. রাষ্ট্রীয় বন্ধন:

মানুষ যদি তার স্বাধীনতার স্থায়িত্ব চায়, যদি তার আচরণকে বাঞ্ছিত ও নিদিষ্ট পথে পরিচালিত করতে চায়, তবে রাষ্ট্র নির্ধারিত নীতির বন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ তাকে মানতেই হবে। Sabine তাঁর ‘The Modern state’ (পৃষ্ঠা ৬৫৩) গ্রন্থে বলেছেন, “ব্যক্তিকে অবশ্যই সমাজের একজন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে তাঁকে রাষ্ট্রের একজন সদস্য হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।” (Individual must be regarded as a member of the society. But in the modern world be must regarded also as a member of the state.)

৩. স্বাধীনতার লক্ষ্যের গুরুত্ব:

হেগেল স্বাধীনতার লক্ষ্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, স্বাধীনতা লাভ করাই সবচেয়ে বড় কথা। তিনি যে কোনো উপায়ে হোক না কেন, তা অর্জন করার কথা বলেছেন। তাঁর কাছে পদ্ধতির বিষয়টা গৌণ। তিনি বলেছেন, মানুষ স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে, আবার রাষ্ট্রীয় নীতির দ্বারা ব্যক্তিকে আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য করেও তা অর্জন করা যেতে পারে।

৪. সত্তার প্রাণ:

হেগেল স্বাধীনতাকে সত্তার প্রাণ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিশ্বের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে, তা মূলত মানব স্বাধীনতার অগ্রগতির ইতিহাস। যথার্থ সত্তার দিক থেকে বিবেচনা করলে সমগ্র মানুষই স্বাধীন। কিন্তু মানুষ যে স্বাধীন তাকে এ চেতনায় সদা জাগ্রত থাকতে হবে। হেগেলের মতে, “স্বাধীনতার স্বাদ উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন যথার্থ সত্তার জ্ঞান।

৫. বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ:

হেগেল বিশ্বাস করতেন যে, স্বাধীনতা বলতে শুধু বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতিকে বুঝায় না, আবার মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যথেচ্ছাভাবে অগ্রসর হওয়াকেও স্বাধীনতা বলে না। স্বাধীনতা বলতে মানুষের নিজের প্রয়োজন নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতার সুষ্ঠু বিকাশকে বুঝায়। তবে এ বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো পর্যায়েই রাষ্ট্রীয় নীতি লঙ্ঘন করা যাবে না।

৬. একক স্বাধীনতা:

হেগেল বলেছেন, “সমাজের অন্যান্যের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেউ স্বাধীনতা দাবি করতে পারে না। সে নিজেকে স্বাধীন মনে করতে পারে, কিন্তু সে স্বাধীনতা যথার্থ স্বাধীনতা নয়। কারণ যথার্থ স্বাধীনতা লাভের জন্য যেসব গুণাবলির বিকাশ সাধন দরকার তার যথার্থ বিকাশ কেবল সামাজিক পরিবেশে।”

৭. পাশবিক প্রবৃত্তি দমন:

হেগেল বলেছেন, “মানুষ শুধু সমাজ গঠন করলেই তা স্বাধীনতার জন্য যথেষ্ট হবে না, সমাজের প্রতিটি মানুষকে সে নিয়ন্ত্রণ শক্তির অধিকারী হতে হবে, যাতে সে তার পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে দমন করে মানবীয় গুণাবলির বিকাশ ঘটাতে পারে।” তিনি বলেছেন, আদিম সমাজের মানুষের যথার্থ কোনো স্বাধীনতা ছিল না, কারণ সেখানে পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব ছিল।

৮.স্বাধীনতার আইন ও নৈতিকতা:

হেগেল স্বাধীনতার সাথে আইন ও নৈতিকতার বিশেষ সম্পর্ক দেখিয়েছেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে, আইন দ্বারা স্বাধীনতাকে সীমিত করা হয়, কারণ তা না হলে স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত হয়। আবার মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার যথার্থ অর্থ অনুধাবন ও অন্যের স্বাধীনতা সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন নৈতিক জ্ঞানের।

৯. স্বাধীনতা সামাজিক ব্যাপার:

হেগেল স্বাধীনতাকে সামাজিক ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি স্বাধীনতাকে ব্যক্তি ইচ্ছার অন্তরালে সীমিত রাখার পক্ষপাতী ছিলেন না। কারণ ব্যক্তি ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হলে সমাজের সকলে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে না। তিনি স্বাধীনতাকে সে অর্থে গ্রহণ করার কথা বলেন যেখানে সামাজিক স্বাধীনতা নিজের স্বাধীনতা বলে মনে করা হবে।

আরো পড়ুন:  বামপন্থা পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা সংগঠন কেন মার্কসবাদী লেনিনবাদী নয়?

১০. স্বউপলব্ধি:

হেগেলের মতে,   “নিজেকে যদি কেউ যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে চায়, তবে তার একমাত্র মাধ্যম হলো স্বাধীনতা।” কেউ যদি নিজেকে উপলব্ধি করতে না পারে, নিজের অবস্থান যাচাই করতে না পারে, তবে তাকে কখনই স্বাধীন বলা যাবে না। এই উপলব্ধি বা বিকাশ সাধনের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক বিষয়াদির উপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ।

১১. স্বাধীনতার বিকাশ:

হেগেলের মতে, “রাষ্ট্রীয় আনুগত্য স্বীকার না করে এবং রাষ্ট্রের স্বতন্ত্র অস্তিত্বের স্বীকৃতি না দিয়ে স্বাধীনতার স্বাদ উপলব্ধি করা যায় না।” রাষ্ট্র নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে স্বাধীনতার নামে স্বেচ্ছাচারিতাকে দমন করে। এর অনিবার্য ফলশ্রুতিতে সমাজের অন্যান্যের স্বার্থে সংরক্ষিত হয়। কাজেই স্বাধীনতার যথার্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পরিবেশ।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হিসেবে হেগেলের স্বাধীনতার ধারণা

জার্মানির সমকালীন রাজনীতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি হেগেল এর রাষ্ট্রচিন্তার মূল প্রেরণা। বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি, প্রাদেশিকতা ও গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব জার্মানিকে একেবারে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। তাই হেগেল জাতীয় রাষ্ট্রের একনিষ্ঠ সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। তাঁর কাছে জার্মানির জাতীয় ঐক্য ছাড়া অন্য কোনো কিছুর মর্যাদা অধিক ছিল না। একই কারণে হেগেল প্রচণ্ড ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও প্রাদেশিকতাবাদ প্রায় সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। জার্মানির সর্বব্যাপী দুরবস্থার জন্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদকে দায়ী করেছিলেন। তিনি এত বেশি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ বিরোধী হয়ে উঠেছিলেন যে ফরাসি বিপ্লব কে পর্যন্ত সমর্থন করেন নি। তাঁর এই প্রত্যয় জন্মেছিল যে জ্যাকোবিনবাদ এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জন্মদাতা। ব্যক্তি স্বাধীনতা জাতীয় সঙ্গতির পরিপন্থী ও নৈরাজ্যবাদের উপাদানে পরিণত হোক এটা তাঁর কাছে আদৌ কাম্য ছিল না।

ব্যক্তির উন্নত মানসিকতা:

রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্বার্থ ও ব্যক্তি স্বার্থের মধ্যে আদৌ কোনো সংঘর্ষ হতে পারে বলে হেগেল মনে করতেন না। কারণ একমাত্র মনুষ্যেতর জীবেরাই নিজ স্বার্থ, ভাবাবেগ ও উত্তেজনার দ্বারা (impulse) পরিচালিত হয়। কিন্তু মানুষ জীবজগতে বিবর্তনের সর্বশেষ পর্যায়ে উপস্থিত। সুতরাং অন্যান্য জীবের মত সংকীর্ণ স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হওয়া মানুষের পক্ষে শোভা পায় না। মনুষ্যচিত কাজ হবে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে নিজেকে পুরোপুরি সামিল করে নেওয়া। ব্যক্তিকে মনে করতে হবে পশু জগতের অবাধ স্বাধীনতা তার পক্ষে বেমানান। উন্নততর স্বাধীনতা ও আদর্শের কথা তাকে ভাবতে হবে এবং তা করতে গেলে সে যে রাষ্ট্রের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ সেই ধারণা মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে পোষণ করতে হবে।

রাষ্ট্রের মাধ্যমে ব্যক্তি স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ:

সভ্যতা ও কৃষ্টির পূর্ণতম বিকাশ কেবল জাতীয় রাষ্ট্রের মধ্যেই প্রতিফলিত। জাতীয় রাষ্ট্রের বাইরে ব্যক্তির কোনো স্বতন্ত্র সত্তা স্বীকৃতি লাভ করতে পারে না। হেগেল এর মতে ব্যক্তি স্বাধীনতা সম্পূর্ণরূপে বিশ্ব আত্মার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাবে। আর এই বিশ্ব আত্মার প্রতীক হলো রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করে অথবা তার প্রতি কোনো প্রকার আনুগত্য না দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি তার স্বাধীনতার সম্যক অনুশীলন করতে পারে না। রাষ্ট্রের কল্যাণ মানে ব্যক্তির কল্যাণ। হেগেল মনে করতেন একমাত্র মননই স্বাধীন ও স্বয়ম্বর এবং কোনো আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। অপর পক্ষে জড় পদার্থ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অধীন। মনন যদি স্বাধীন হয় এবং এর বিকাশ যত বেশি ঘটবে স্বাধীনতার ব্যাপ্তিও তত ঘটবে। রাষ্ট্র হলো মননের সর্বোৎকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ। সুতরাং স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি একমাত্র রাষ্ট্রের মাধ্যমেই সম্ভব। সেইজন্য হেগেল বলেন যে রাষ্ট্রের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য দেখিয়েই ব্যক্তি তার স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে ।

হেগেলের স্বাধীনতা ইতিবাচক:

কান্ট ও অন্যান্য ভাববাদীরা স্বাধীনতাকে বিধিনিষেধের অনুপস্থিতি মনে করে একে নেতিবাচকের পর্যায়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু হেগেল এর কাছে স্বাধীনতা ইতিবাচক। নিজেকে পুরোপুরি উপলব্ধি করার মাধ্যম হলো স্বাধীনতা। অতএব স্বাধীনতাকে নেতিবাচক বলা যায় না। মানুষ যদি তার নিজের সত্তাকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে না পারে তাহলে তাকে স্বাধীন বলা যাবে না। আর সত্তার উপলব্ধি বা বিকাশ সাধনের জন্য দরকার রাষ্ট্রের সদস্যপদ। কান্ট এর স্বাধীনতা ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদের আবরণে আবৃত। কিন্তু হেগেল স্বাধীনতাকে ব্যক্তির গণ্ডি থেকে বের করে নিয়ে সমাজের মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। যদিও স্বাধীনতা বলতে তিনি ব্যক্তির স্বাধীনতা বুঝিয়েছেন তবুও তিনি একে পুরোপুরি ব্যক্তির এখতিয়ারের মধ্যে রাখেন নি। স্বাধীনতার ধারণা সর্বার্গে সামাজিক (a social phenomenon)। স্বাধীনতাকে যদি ব্যক্তির ইচ্ছা বা অনিচ্ছার নিগড়ে বেঁধে রাখা যায় তাহলে সমাজের সবাই স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে না। কান্টও স্বাধীনতাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে ভুল করেছেন। সেই জন্য দেখা যায় যে হেগেল এর হাতে স্বাধীনতা একটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার হয়ে ওঠেনি, হয়ে ওঠেছে একটা নীতিশাস্ত্র ও রাষ্ট্রতত্ত্ব বিষয়ক ব্যাপার। যে  সমস্ত কাজ করলে সমাজের কল্যাণ হতে পারে, একমাত্র সেই সমস্ত কাজের সঙ্গে ব্যক্তি নিজেকে মানিয়ে নেবে। অর্থাৎ সামাজিক কল্যাণকে নিজের কল্যাণ বলে ব্যক্তিকে মনে করতে হবে। এইভাবে ব্যক্তি তার স্বাধীনতা অর্জন ও অনুশীলন  করতে পারবে।

আরো পড়ুন:  মানব প্রকৃতি সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা হচ্ছে স্বার্থপর, লোভী, আত্মকেন্দ্রিক

ব্যক্তির আচরণ যদি সমাজের কল্যাণের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত না হয় তবে ব্যক্তি স্বাধীন এবং উন্নত মননের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাজ করছে বলা যাবে না। অন্যভাবে বলা যেতে পারে হেগেলের কাছে স্বাধীনতা রাষ্ট্রের ও সার্বিক কল্যাণের বেদীমূলে উৎসর্গীকৃত। উপযোগবাদীদের মত ব্যক্তি কেবল নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত নয়। আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে – হেগেল এই মতবাদের  সমর্থক। রাষ্ট্রের বিশাল পরিমণ্ডলের মধ্যে এসে কেবল নিজের কথা ভাবলে চলবে না। রাষ্ট্রই স্বাধীনতা সুনিশ্চিতকরণ করতে পারে এবং সেই আস্থা তার উপর রাখতে হবে।

আইন স্বাধীনতা এবং পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র:

পরমাত্মা বা মনন যে রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হতে পেরেছে সেই রাষ্ট্রকে হেগেল পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের (perfect state) মর্যাদা দিয়েছেন। এই পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে মানব ইতিহাস ও সভ্যতা চূড়ান্তরূপে বিকাশ লাভ করেছে। সুতরাং পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রতিটি নাগরিক স্বেচ্ছায় পুর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের আইনের প্রতি আনুগত্য দেখাবে। কোনো ব্যক্তিকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে পীড়নমূলক উপায় অবলম্বনে আইন মেনে চলতে বাধ্য করা হবে না।

পরমাত্মা বা মননের পূর্ণ বিকাশ ব্যক্তির মধ্যে হলেই সে মনে করবে যে রাষ্ট্রিক আইন তার স্বাধীনতা ও নৈতিকতার পরিপন্থি নয়। বরং এগুলো মেনে চলা তার  অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। এর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে হেগেলের কাছে ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়েই পরমাত্মার রূপায়ণ (embodiment)। তাই এদের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। কিন্তু ব্যক্তি যদি মননের রূপায়ন না হয় তাহলে সে নিজেকে রাষ্ট্র থেকে স্বতন্ত্র সত্তা বলে ভাবতে শিখবে। পরাধীন মনোবৃত্তির কাছে সে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হবে। অতএব দেখা যাচ্ছে যে হেগেল এর কাছে স্বাধীনতা অবিবেচনাপ্রসূত ও যুক্তিহীন ইচ্ছা নয়। ব্যক্তির বিজ্ঞানোচিত ও যুক্তিপূর্ণ ইচ্ছাই স্বাধীনতা। হেগেল আরও বলেছেন যে, পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র ব্যক্তিকে শিক্ষা দেবে কিভাবে মননের রূপায়ণ সম্ভব। রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেকটা শিক্ষকের মত। ছাত্র যেমন শিক্ষককে অমান্য করতে পারে না, ব্যক্তিরও উচিত রাষ্ট্রকে অমান্য না করা।

হেগেলের স্বাধীনতা তত্ত্বের মূল্যায়ন:

হেগেলের বক্তব্য হলো এই যে, বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে মানুষের যে কোনোও লক্ষ্য বা আদর্শই হলো এক সাধারণ, বিমূর্ত ধারণা। এই বিমূর্ত ধারণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য প্রয়োজন হয় বস্তুনিষ্ঠ কর্মধারার। এই কর্মধারার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত মানুষের ব্যক্তিগত আশা আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থসিদ্ধির জন্য উদ্যম এবং আবেগ, আসক্তি প্রভৃতি সহজাত প্রবৃত্তি। কারণ এগুলির তাড়নাতেই মানুষ কর্মে প্রবৃত্ত হয়। অতএব, এগুলি হলো মানুষের জীবনের যে কোনোও বিমূর্ত আদর্শকে রূপায়িত করার উপযোগী বাস্তব প্রেক্ষাপট। এই জন্যই হেগেল মনে করেন যে, ভাবসত্তা নিজেকে জানতে গিয়ে, নিজেকে ব্যক্ত করতে গিয়ে এবং একই  সঙ্গে স্বাধীনতার বিকাশ ঘটাতে গিয়ে অবশ্যই এই সহজাত মানবিক প্রবৃত্তিগুলিকে বর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ হেগেলের বক্তব্য এই যে, যদিও সংগতি জগতের নিয়ন্তা শক্তি এবং যদিও সংগতির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই এই সহজাত  মানবিক প্রবৃত্তিগুলির মৌলিক বিরোধিতা রয়েছে, তবুও ইতিহাসের পথ ধরে স্বাধীনতার যাত্রাকে অব্যাহত রাখার জন্য সংগতি এই সাধারণ মানবিক প্রবৃত্তিগুলিকে উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।

অবশ্য এই ব্যবহারের এক বিচিত্র পদ্ধতি অনুসৃত হয়। সংগতি মানুষের তথাকথিত আবেগ ও পাশবিক প্রবৃত্তিকে প্রশ্রয় দেয়, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের পথ প্রশস্ত করে; কিন্তু এই সঙ্গে সংগতি তাদের এমনভাবে ব্যবহার করে যাতে আপনা আপনিই তাদের গতি রুদ্ধ হয় এবং এইভাবে সংগতি নিজের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখে। ব্যাপারটি বিশদ করার জন্য হেগেল গৃহনির্মাণ প্রক্রিয়াকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেছেন যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে গৃহ নির্মাণের পরিকল্পনা এক বিমূর্ত ধারণা মাত্র। এই ধারণাকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য লোহা, কাঠ পাথর প্রভৃতি বিভিন্ন সামাগ্রী ব্যবহৃত হয়। এই সামগ্রীগুলিকে ব্যবহার্য করার জন্য আগুন, বাতাস, জল প্রভৃতি কতগুলি মৌল উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন, লোহা গলাতে আগুন ব্যবহার করা হয়েছে, আগুনকে সক্রিয় রাখতে বাতাসকে ব্যবহার করা হয়েছে, কাঠ চেরাই করার যন্ত্রের চাকা সচল রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে জল। কিন্তু গৃহ যখন নির্মিত হলো তখন দেখা গেল যে, আগুন, বাতাস, জল প্রভৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সুদৃঢ় করাই হলো এই  গৃহের মুখ্য উদ্দেশ্য। অর্থাৎ উপাদানগুলিকে তাদের জিনিস নিজ প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যবহার করা হলো। কিন্তু একই সঙ্গে তাদের এমন এক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োগ করা হলো যার দ্বারা তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রিত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল। একইভাবে, হেগেল মনে করেন, সংগতি ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত মানুষের কর্মতৎপরতাকে সক্রিয় করে রাখে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এই সহজাত মানবিক প্রবৃত্তিকে সে নিজের কৌশল প্রয়োগ করে সংগত ও নিয়ন্ত্রিত করে নিজের কাজে লাগায় এবং এইভাবে পৃথিবীর ইতিহাসের ঘটনাবর্তের মধ্যে স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত হয়।

আরো পড়ুন:  হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন হয়েছে দর্শন, জার্মান ভাববাদসহ বেশ কিছু বিষয়ে

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, হেগেলের মতে, স্বাধীনতার বিকাশ ঘটে এক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। মানুষের ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণ অলীক কল্পনা নয়, এগুলি একান্তই বাস্তব। তাকে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে।  কিন্তু, একই সঙ্গে, সংগতি তার নেতিকরণ ঘটাচ্ছে এইজন্য যে এইসব খণ্ড খণ্ড আশা ও ইচ্ছার মধ্য দিয়ে স্বনির্ভর ও স্বাধীন সমগ্র সত্তা প্রতিফলিত হতে পারে না। এই প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে অবশেষে আসছে সংশ্লেষণ ঘটিয়ে সমগ্র স্বাধীন সত্তাকে বিকশিত করে তুলছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে যে, এই সমগ্রের বাস্তব ও নৈর্বক্তিক (Objective) কাঠামোটি কী যার মধ্যে স্বাধীনতা একান্ত বাস্তব হয়ে দেখা দেয়? হেগেল মনে করেন যে, রাষ্ট্রই হলো সেই বাস্তব আঙ্গিক যাকে অবলম্বন করে স্বাধীনতা সম্পূর্ণভাবে রূপায়িত হয়ে ওঠে।

আমরা আগেই লক্ষ্য করেছি যে, হেগেল মানুষের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের অনুভূতি, তার পছন্দ অপছন্দ, তার একান্ত নিজস্ব ইচ্ছাক্রিয়াকে উপেক্ষা করেননি। কিন্তু যেহেতু  মানুষের ব্যক্তিগত জীবনই হলো এগুলির লীলাভূমি সেহেতু তিনি মনে করেন যে, এগুলি মূলত আত্মগত (Subjective)। এই আত্মগামিতার সীমানা পার হয়ে সম্পূর্ণভাবে নৈর্বক্তিক (Objective) হয়ে উঠতে না পারলে এগুলি বাস্তবতা দাবি করতে পারে না। হেগেলের মতে, এই নৈর্বক্তিক চরিত্র লাভ তখনই সম্ভব যখন ব্যক্তিগত পর্যায়ের আত্মগত অভীপ্সা (Subjective will) রূপান্তরিত হয় এক যুক্তিময় সাধারণ অভীপ্সায় (rational and common will)।

হেগেল মনে করেন যে, এই রূপান্তর সম্ভব হয় একমাত্র রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে – যে রাষ্ট্র হলো প্রকৃত পক্ষে এক সামগ্রিক নৈতিক সত্তা। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত স্বার্থের দিকে ধাবিত হয়ে মানুষ স্বাধীনতা লাভ করতে পারে না, কারণ এর দ্বারা মানুষ শুধু তার যুক্তিহীন, আবেগতাড়িত খেয়াল চরিতার্থ করতে পারে। যেহেতু সংগতিই সূচিত করে সত্যিকারের স্বাধীন অবস্থা সেহেতু সংগতির কাছে আত্মসমর্পণ করেই মানুষ লাভ করে তার যথাযর্থ স্বাধীনতা। এই সংগতি প্রতিফলিত হচ্ছে রাষ্ট্রের অনুশাসন, আইন ও সরকার প্রভৃতির মধ্য দিয়ে ।

কাজেই রাষ্ট্রই হলো সত্যিকারের স্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক এবং এই  রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য দান করে তার প্রতি যথাযথ কর্তব্য পালন করেই মানুষ যথার্থ স্বাধীন হয়ে উঠে। হেগেল আরও বলেছেন যে, রাষ্ট্র মানুষকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থের জগৎ থেকে অর্থাৎ তার ব্যক্তিগত মনোগামী ইচ্ছা ক্রিয়ার স্তর থেকে, তুলে নিয়ে এসে তাকে সাধারণ, সার্বজনীণ স্বার্থের সামিল করে তোলে এবং এর ফলে, রাষ্ট্রের সহায়তায় ব্যক্তি এক অখণ্ড ও সর্বজনীন সত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উন্নীত হয় ঐক্যের স্তরে এবং রূপলাভ করে এক পরম নৈতিক জীবনে।

সমালোচনা:

হেগেল স্বাধীনতার যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তিনি স্বাধীনতার ধারণাকে বিশেষভাবে রাষ্ট্রীয় ধারণার উপর নির্ভরশীল করে তুলেছেন। তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণের কথা বললেও সামাজিক স্বাধীনতার যে রূপ স্থির করেছেন তাতে ব্যক্তিকে সমাজের কাছে উৎসর্গ করে দেওয়া হয়। তিনি আইনের দ্বারা স্বাধীনতার উপর যে সীমারেখা আরোপ করার চেষ্টা করেছেন তাতে স্বাধীনতার ধারণা বেশ সংকীর্ণ হয়ে যায়। তিনি বিশ্বের ইতিহাসকে স্বাধীনতার ইতিহাস বলে ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গিকে খাটো করে ফেলেছেন।

উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, নানাবিধ সমালোচনা থাকলেও স্বাধীনতা সম্পর্কিত হেগেলের মতের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তিনি গতানুগতিক ধারণার বিরোধিতা করে স্বাধীনতার এক নতুন ধরণের ব্যাখ্যা দাঁড় করান। তিনি স্বাধীনতা বলতে বুঝান সামাজিক সচেতনতাকে যে সচেতনতার দরুন ব্যক্তি নিজের স্বার্থের সাথে সাথে অন্যের স্বার্থের ব্যাপারেও উদাসীন হবে না। তিনি বলেছেন, এ সচেতনতার দ্বারা ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে। তিনি স্বাধীনতার জন্য ব্যক্তির নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক আধ্যাত্মিক বিকাশের উপর যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, স্বাধীনতার যথার্থ বিকাশ কেবল রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলেই সম্ভব।

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৯১-৩৯৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!