ফ্রিডরিখ হেগেল ছিলেন জার্মান ভাববাদী দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব

হেগেল বা জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিক হেগেল (ইংরেজি: George Wilhelm Friedrich Hegel; ২৭ আগস্ট ১৭৭০ – ১৪ নভেম্বর ১৮৩১) ছিলেন জার্মান ভাববাদী দর্শনের আদিগুরু। তিনি জার্মানির হিরটেমবার্গ পরগনার অন্তর্গত স্টুটগার্ট শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা গেয়র্ক লুডউইগ হেগেল ছিলেন স্থানীয় সরকারের অর্থ পরিদপ্তরের একজন প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা। মাতা মারিয়া ম্যাগডালেনা ফ্রোম ছিলেন একজন সুগৃহিণী। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন হেগেল। শৈশব থেকে হেগেল ছিলেন মেধাবী।

মূলত হেগেলের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল বেশ উঁচু মানের। অনেকের মতে, তাঁর চিন্তার মধ্যে আভিজাত্য ও আমলাতান্ত্রিক ধ্যানধারণা সুস্পষ্ট। তিনি বাল্যকাল থেকেই প্রখর মেধার পরিচয় দেন, কিন্তু তিনি অন্যান্যের মত খুব তাড়াতাড়ি দার্শনিক পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি পান নি। দার্শনিক চিন্তাচেতনার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃত দার্শনিক হিসেবে তার অবদান স্বীকৃতি পেতে তাঁকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল।[২]

তদানীন্তন সমাজের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে হেগেলের পিতার ইচ্ছানুযায়ী হেগেল ১৭৮০ সালে একাডেমিক শিক্ষার উদ্দেশ্যে স্টুটগার্টের একটি জিমনেসিয়াম মাধ্যমিক গ্রামার স্কুলে তার শিক্ষা জীবন শুরু করেন। সেখান থেকে ১৭৮৮ সনে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ইত্যবসরে ধর্ম শাস্ত্রে অধ্যয়নের জন্য ট্যুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যথাসময়ে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি বিখ্যাত কবি হোল্ডারলিন, শেলিং এর সাথে ঘনিষ্ঠ হন এবং দার্শনিক রুশোর দ্বারা বেশ অনুপ্রাণিত হন। অতঃপর ঐ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি ১৯৯০ সালে দর্শন শাস্ত্রে এম. এ. এবং ১৭৯৩ সালে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ট্যুবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি জার্মানির বার্ন ও ফ্যাঙ্কফুট শহরে প্রায় ছয় বছর যাবৎ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। অত:পর ১৭৯৯ সালের জুলাই মাসে পিতার মৃত্যুর পর তিনি স্বচ্ছন্দে পড়াশুনা চালিয়ে যাবার মানসে জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন এবং বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর পাণ্ডিত্যের বিষয়টি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখানেই হেগেল দার্শনিকদের এর সাথে যৌথ সম্পাদনায়  Critical journal of philosophy নামে একটি সাময়িকী প্রকাশ করেন। এরই ফলশ্রুতিতে ১৮০১ সালে জেনা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দর্শনশাস্ত্রের প্রভাষক নিযুক্ত করেন। চার বছর সফলতার সঙ্গে প্রভাষকের দায়িত্ব পালন করার পর ঐ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ১৮০৫ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়।

আরো পড়ুন:  আল্লামা মহম্মদ ইকবাল ছিলেন একজন মুসলিম লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ

জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের অধ্যাপকের দায়িত্ব পালনকালেই নেপোলিয়নের নেতৃত্বে ফরাসিরা জার্মান আক্রমণ করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। আর এই কর্মহীন জীবনে তিনি একই সঙ্গে সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা ও লেখালেখি করে সময় কাটানো শুরু করেন। বলা বাহুল্য যে, এই সময়েই অর্থাৎ ১৮০৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ চিদাত্মার রুপতত্ত্ব বা Phenomenology of Spirit এবং এরও আট বছর পর অর্থাৎ ১৮১৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Science of Logic। গ্রন্থ দুটি প্রকাশের ফলেই তাঁকে শিক্ষকতা করার জন্য হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানায়।

হেগেল ১৮১৬ সালের শেষ দিকে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন এবং ১৮১৭ সালে রচনা করেন Encyclopaedia of philosophycal science in outline। সেখানে দু’বছরের মতো চাকরি করার পর বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ তাঁকে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানালে তিনি ১৮১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগের অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে বিভাগীয় প্রধানের পদে যোগদান করেন।

বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হেগেল চাকরিরত অবস্থায় ১৮২১ সালে রচনা করেন The Philosophy of Right এবং The philosophy of History। ১৮৩৭ সালে হেগেলের মৃত্যুর ছয় বছর পরে এগুলি প্রকাশিত হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশায় নিয়োজিত থাকা কালেই ১৮৩১ সালের মাঝামাঝি সময়ে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে এই মহান দার্শনিক মৃত্যু বরণ করেন।

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৭৬-৩৭৭।
২. হাসানুজ্জামান চৌধুরী, মো আব্দুর রশীদ, এ এমদাদুল হক ও অন্যান্য; রাষ্ট্রবিজ্ঞান দ্বিতীয় খণ্ড, রাষ্ট্রচিন্তা, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, ত্রয়োদশ প্রকাশ, ২০২০, পৃষ্ঠা ১৪২।

আরো পড়ুন:  কৌটিল্য বা চাণক্য প্রাচীন ভারতীয় কূট রাজনৈতিক গুরু ও অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা

Leave a Comment

You cannot copy content of this page