হেগেলের আইনতত্ত্ব হচ্ছে আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে হেগেলের ধারণাগুলির মর্ম

হেগেলের আইনতত্ত্ব (ইংরেজি: Hegel’s theory of Law) হচ্ছে আইনের প্রকৃতি সম্পর্কে হেগেলের ধারণাগুলির মর্ম উপলব্ধির জন্য পাঠ। হেগেলের রাজনীতি দর্শন বা রাষ্ট্র ধারণা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি না তাঁর আইনতত্ত্ব বা আইনের দর্শনের মূল বক্তব্যকে উপলব্ধি করা যায়। আসলে সমাজ, রাষ্ট্র, আইন সবকিছুর মূলেই আছে তার আইনী চিন্তা। হেগেল তার দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ায় যে পরম শক্তি বা প্রেরণাকে উপস্থিত করেছেন তার বিকাশের বিভিন্ন স্তরগুলি হলো ১. বিশেষ বা ব্যক্তিবাচক শক্তি, যার প্রকাশ নৃতত্ত্ব, মনোবিদ্যা প্রভৃতির মধ্যে; ২. বস্তুগত শক্তি, যার প্রকাশ আইন ও নৈতিকতার মধ্যে এবং ৩. পরম শক্তি যার প্রকাশ ধর্মে, দর্শনে।

রাজনীতি, রাষ্ট্র, আইন যা কিছু ফ্রিডরিখ হেগেলের আলোচনায় এসেছে তার মূলে কাজ করেছে তাঁর দার্শনিক বিচার। আইনকেও তিনি বিচার করেছেন দর্শনেরই আলোকে। হেগেলের কাছে আইন একটা ভাব বা আদর্শ হিসাবেই উপস্থিত। আইনকে তিনি স্বাধীন ইচ্ছার বিদ্যমান অস্তিত্ব হিসাবেই দেখেছেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার সঙ্গে আইনের কোনো পার্থক্য নেই। স্বাধীনতার একটি বিশেষ রূপ হিসাবে তিনি যেমন আইনকে দেখেছেন আবার প্রচলিত ধারণাকে সামনে রেখেও আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন।

হেগেল বিশ্বাস করেন আইনব্যবস্থা হলো কার্যক্ষেত্রে স্বাধীনতার রাজত্বেরই রূপায়ন। বিশেষ আইন হলো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে যে আইন কার্যকর হয়। সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্র সবক্ষেত্রেই বিশেষ আইনের প্রকাশ আছে। এগুলি কখনও সীমাবদ্ধ, কখনও পরস্পর বিরোধী, আবার কখনও পরস্পর নির্ভরশীল, সাধারণভাবে আইন বলতে হেগেল যা বোঝেন তা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে রাষ্ট্রে। সুশীল সমাজের আইনের যে অসঙ্গতি আছে, রাষ্ট্রিক আইনে তা নেই।

পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের পরিপূর্ণ আইন জনসাধারণের কাছে আনুগত্য পায়, কারণ এই আইন তার কাছে কোনো বাইরের ব্যাপার নয় বা এ আইন তার উপর চাপানো কোনো নিয়ম নয়। এই আইনের প্রতি সে অনুবর্তী। সম্পূর্ণ নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় ব্যক্তি চায় সেই শক্তি বা প্রেরণার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে। এটা সম্ভব যখন ব্যক্তি কোনো স্বার্থ বা কামনা বাসনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে ওঠে। পরম ইচ্ছা তথা রাষ্ট্রের নির্দেশ অনুসারে চললেই এই স্বাধীন ইচ্ছাকে কার্যকর করা সম্ভব। আইন এই পরম ইচ্ছার অর্থাৎ রাষ্ট্রের ইচ্ছারই বাস্তব প্রকাশ। কোনোরকম ভয় ভীতি নিয়ে রাষ্ট্রের ইচ্ছার অধীন হলে ব্যক্তি স্বাধীন বলে গণ্য হবে না। রাষ্ট্রের ইচ্ছা তথা আইনকে ব্যক্তি সচেতনভাবেই মেনে নেবে এবং ব্যক্তিকে এই বিশ্বাস জাগ্রত করতে হবে যে রাষ্ট্র যা চায় সেও তাই কামনা করে।

আরো পড়ুন:  সামাজিক সাম্য হচ্ছে নির্দিষ্ট সমাজের সমস্ত লোকের সমান অধিকার

আইন বিষয়ে হেগেলের চিন্তার অন্যান্য কতগুলি দিক লক্ষণীয় :

১. আইন মূর্ত হয়ে ওঠে আইনের বিধানগুলির মাধ্যমে। এগুলিই আইনকে একটা সার্বিক, সর্বজনগ্রাহ্য, সুনির্দিষ্ট রূপ দেয়। আইনের সংকলন বা লিপিবদ্ধকরণ, সুবিন্যস্ত প্রকাশ একান্ত বাঞ্ছনীয়।
২. মানবিক সম্পর্কের বাইরের বিষয়গুলিই আইনের দ্বারা প্রভাবিত, অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রটি নয়।
৩. আইনের মাধ্যমে  কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জাতীয় চরিত্র ও তার ঐতিহাসিক বিকাশের পর্যায়গুলি প্রতিফলিত হয় ।

আইন যখন আইনের রূপ পরিগ্রহণ করেনি, যখন আইন ব্যক্তির সামর্থেই, তার চেতনাতেই রূপ নিচ্ছে তখন আইন হলো বিমূর্ত আইন। এই পর্যায়ে ব্যক্তি নিজেই এক অনুশাসন তৈরি করে নিচ্ছে এবং নিজের  ও অপরের ক্ষেত্রে তা মান্য করে চলবে। হেগেল মনে করেন আইন ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, সম্পত্তি, চুক্তির স্বাধীনতাকে রূপ দেয়। ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছাকে কার্যকর করাই আইন। জীবন্ত কোনো প্রাণী তখনই ব্যক্তি বলে গণ্য হবে যখন এর মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছার প্রকাশ ঘটবে। কোন বস্তু সম্পদ কারণ তা নির্ধারিত ব্যক্তির স্বাধীন ইচ্ছার দ্বারা। এই স্বাধীন ইচ্ছার অভাব আছে বলেই– অর্থাৎ স্বাধীন মানুষ হিসাবে গড়ে ওঠার সামর্থ্যরে অভাব আছে বলে কোনো কোনো মানুষ দাস বলে পরিচিত।

হেগেলের মতে, ব্যক্তিকে স্বাধীনতা থেকে, তার নৈতিকতা থেকে সরিয়ে আনা অন্যায়। তিনি ক্রীতদাসদের নিজস্ব স্বাধীনতা, হেগেলের যুগের ভূমিদাসত্ব থেকে স্বাধীনতা, দেবার পক্ষে ছিলেন। হেগেলের চিন্তায় আইন ও আইনতত্ত্ব প্রাধান্য পেলেও নৈতিকতাও যথেষ্ট মূল্য পেয়েছে। হেগেল Social Ethics ধারণাটিকে প্রচার করেছেন এবং বলেছেন সামাজিক নৈতিকতার মধ্যেই আছে স্বাধীন ইচ্ছার প্রকৃত উপলব্ধি। হেগেল সামাজিক নৈতিকতা বলতে প্রথাকে গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বলেছেন আইন যা নয়, প্রথা তাই। প্রথার মধ্যেই আছে প্রেরণা বা মহাশক্তি।

হেগেল আইন প্রসঙ্গে শুধু নৈতিকতার আলোচনা করেছেন তা নয়, ন্যায়-অন্যায় প্রশ্নও বিচার করেছেন। অন্যায় প্রসঙ্গে হেগেল সাধারণ অন্যায়, প্রতারণা, অপরাধ প্রভৃতির কথা বলেছেন। না বুঝে সরলভাবে যে অন্যায় করা হয় সে অন্যায় এতট শাস্তিযোগ্য নয়, যতটা শাস্তিযোগ্য প্রতারণা বা অপরাধের মত ঘটনা। সজ্ঞানে যে অপরাধ করা হয় তার জন্য শাস্তি একান্ত প্রয়োজন, কারণ তা শুধু আইনের কর্তৃত্বকেই প্রকাশ করবে না, সাহায্য করবে অপরাধীকে অপরাধ থেকে নির্বৃত্ত করতে।

আরো পড়ুন:  বিপ্লব হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সংগঠনের মৌলিক ও আকস্মিক পরিবর্তন

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৮৬-৩৮৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!