হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন হয়েছে দর্শন, জার্মান ভাববাদসহ বেশ কিছু বিষয়ে

জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন (ইংরেজি: Evaluation of the thoughts of state) করা যায় মহাদেশীয় দর্শন, হেগেলবাদ, জার্মান ভাববাদ, ইতিহাসবাদ সহ বেশ কিছু এলাকায়। হেগেল জীবনকে এক আঙ্গিক একত্ব, একটি আধ্যাত্মিক ক্রিয়াপরতা হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, মানবজীবনে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে যেসব বিরোধ দৃষ্ট হয়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে যেসব সংঘর্ষ সংঘটিত হয়, কালের প্রবাহে তার সবই নির্মূল হয়ে যায়। তিনি মনে করেন, জীবনে যে বৈচিত্র ও বিরোধিতা দৃশ্যমান হয়, তা হচ্ছে এক উচ্চতর সত্তার অপরিহার্য উপাদান স্বরূপ। আর এ উচ্চতর সত্তার প্রভাবেই জাগতিক বিষয়সমূহের পারস্পরিক সংযোগ ও সমন্বয় ঘটে। হেগেলের এই ধরণের চিন্তাধারা পরবর্তীকালের দার্শনিকদের অভেদের ধারণা সৃষ্টির মূল সূত্ররূপে বিবেচিত হয়।

রাষ্ট্রের স্বরূপ

রাষ্ট্রের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ফ্রিডরিখ হেগেল বলেছেন, রাষ্ট্র এমন একটি সংস্থা, যা ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত। তিনি রাষ্ট্রকে সর্বশক্তিমান সংস্থা হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হবে এমন যেখানে রাজার স্বৈরাচারি ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য জনগণ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত থাকে। হেগেল তাঁর ‘Political Thought’ পৃষ্ঠা ৫৩৯) গ্রন্থে বলেছেন, “ব্যক্তিবিশেষের কল্যাণ কামনা এবং বিশেষের সাথে সার্বিক স্বাধীনতার সমন্বয়করণ হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্রের মূলকথা।” (The essence of the modern state is that the universal is bound up with the full freedom of particularity and the welfare of the individuals).

রাষ্ট্রের স্তম্ভ

হেগেল রাষ্ট্রের যে স্বরূপ অঙ্কন করেছেন তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় রাষ্ট্রের দু’টি স্তম্ভ, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ও জাতীয় রাষ্ট্রের তত্ত্ব। তিনি রাষ্ট্রকে কোনো চুক্তির ফল বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়ে রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হচ্ছে মিলেমিশে বসবাস করা। আর এর পরিণতি হচ্ছে বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক সংগঠন রাষ্ট্র।

পরিবার থেকে রাষ্ট্র

পরিবার হচ্ছে মানুষের প্রাচীনতম সংগঠন। পরিবার মানুষের যাবতীয় চাহিদা মিটাতে পারে না। জীবনের বাস্তবতার প্রয়োজনে মানুষ তখন গড়ে তোলে সমাজ। সমাজ বিকাশের এক পর্যায়ে স্বার্থবোধকে কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। বিবর্তনের এক পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা সহযোগিতায় পরিণত হয়, মানুষের মনে যুক্তিবাদিতা আসন করে নেয়। কাজেই সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে লক্ষ্য বিবেচনা করে রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

ব্যক্তির মিলনক্ষেত্র

হেগেল রাষ্ট্রকে এমন একটি প্রতিষ্ঠান বলেন যা কি না সমাজের সব ধরণের মানুষের মহামিলনক্ষেত্র। এখানে প্রতিযোগিতা বিশেষভাবে কাম্য। বিভেদের চেয়ে ঐক্যকে যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করা হয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি মানুষ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। রাষ্ট্রের নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি হয় সমন্বয়ী। ব্যক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ এবং স্বাধীনতার সুরক্ষা কেবল রাষ্ট্রের পূর্ণ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সম্ভব।

রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য

হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন করতে হলে রাষ্ট্রের স্বরূপ সম্পর্কে তাঁর মতবাদ আলোচনা করা দরকার। রাষ্ট্র সম্পর্কে তিনি যে মত প্রদান করেছেন তা বিশ্লেষণ করলে রাষ্ট্রের কতকগুলো বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে এগুলো আলোচনা করা হলো:

১. ঐশ্বরিক ধারণা:

রাষ্ট্রের ধারণাকে হেগেল একটি ঐশ্বরিক ধারণা বলে অভিহিত করেছেন। এই ঐশ্বরিক ধারণার ক্রমবিবর্তনের চরম পর্যায়ে এসে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পরিণতি লাভ করে। রাষ্ট্রের বাইরে অধ্যাত্মচিন্তার বিকাশ সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র ঐশ্বরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। F.Thilly তাঁর ‘A History of Philosophy’ (পৃষ্ঠা ৯১) গ্রন্থে বলেছেন, “রাষ্ট্র হবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ন্যায় সমন্বিত এবং ব্যক্তির পূর্ণ আত্মার ন্যায়।” (The state should be organized like the universe at large and the individual virtuous soul.)

আরো পড়ুন:  হবসের সার্বভৌম তত্ত্ব হচ্ছে শাসক চরম, অবিভাজ্য ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী

২. রাষ্ট্র একটা সমগ্র বস্তু:

হেগেল বলেছেন, রাষ্ট্র হচ্ছে ইতিহাস ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের ফল। রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলোর কোনো সত্তা থাকতে পারে বা সেগুলো যে স্বতন্ত্র হতে পারে তিনি তা বিশ্বাস করতেন না। তিনি রাষ্ট্রকে একটি সামগ্রিক বস্তু হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর মতে, ”রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকেই তাদের নিজেদেরকে সার্থক করে তুলতে পারে।”

 ৩. রাষ্ট্র নৈতিক আইনের ঊর্ধ্বে:

হেগেল মনে করতেন, রাষ্ট্র কোনোরকম নৈতিক আইন দ্বারা আবদ্ধ করা যায় না। রাষ্ট্র সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁর মতে, রাষ্ট্র সব ধরণের আইন সৃষ্টি করে এবং সর্বোকৃষ্ট সামাজিক চেতনা বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। রাষ্ট্র নাগরিকদের নৈতিকতার মান নির্ধারণ করে দেয়, যা মেনে চলা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্র নির্ধারিত আইন ক্রটিহীন। এজন্য কোনোকিছুর বন্ধনে রাষ্ট্রকে আটকে রাখা যায় না।

৪. সামাজিক চুক্তির ঊর্ধ্বে :

হেগেলের পূর্ববর্তী অনেক চিন্তাবিদ রাষ্ট্রের উদ্ভবের পিছনে সামাজিক চুক্তির কথা বলেন। কিন্তু এসব মতবাদকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ কী কী অধিকার ভোগ করবে তা নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র কর্তৃক। অধিকার বিশেষভাবে কর্তব্যের সাথে যুক্ত। এজন্য কোনো চুক্তির দ্বারা একে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

৫. রাষ্ট্র জীবদেহের ন্যায়:

হেগেল রাষ্ট্রকে জীবদেহের সাথে তুলনা করেছেন। দেহের কোনো অংশকে বাদ দিয়ে যেমন দেহ চলতে পারবে না, তেমনি রাষ্ট্রও যথাযথ অর্থে ক্রিয়াশীল হয় সামগ্রিকভাবে। রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো অংশ নিজে নিজে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় না। সমগ্র আছে বলেই তা বিশেষ মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত। রাষ্ট্রের বাইরে কোনো বিচ্ছিন্ন ক্রিয়া সংঘটিত হতে পারে না।

৬. যুদ্ধের সাথে সম্পর্কযুক্ত :

হেগেলে রাষ্ট্রকে যুদ্ধের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে মনে করতেন। যুদ্ধের একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। তিনি দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি যুদ্ধকে ঘৃণা করেন নি, বরং রাষ্ট্রের গৌরব রক্ষার জন্য অতি প্রয়োজনীয় একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধই এ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে যে রাষ্ট্র হচ্ছে বিশ্ব আত্মার প্রতীক।

৭. জাতীয় রাষ্ট্র:

জাতীয় রাষ্ট্র সম্বন্ধে হেগেল অতি উচ্চমানের ধারণা পোষণ করতেন। তিনি বলেছেন, সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদি সৃষ্টির পিছনে ব্যক্তির কোনো ভূমিকা নেই। কেবল জাতীয় রাষ্ট্রই আইন ও নৈতিকতার জন্ম দিতে পারে। হেগেলের এই জাতীয় রাষ্ট্রের ধারণা গতানুগতিক জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে। তিনি মনে করেন জাতীয় রাষ্ট্র গঠন ছাড়া প্রগতির কথা কল্পনা করা যায় না।

সমালোচনা:

হেগেল রাষ্ট্রের যে স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তাঁর চিন্তাধারার মধ্যে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করা হয় নি। তিনি শুধু ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। তিনি রাষ্ট্রকে ঐশ্বরিক ধারণা বলে যে মত প্রদান করেছেন তা অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয় নি। কারণ রাষ্ট্র একটি বাস্তব বিষয় আর ঈশ্বর পারলৌকিক ধারণা। অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ের সাহায্যে যে প্রাকৃতিক বিষয়ের ব্যাখ্যা যুক্তিবিচারে উত্তীর্ণ নয় তিনি এ সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, নানাবিধ সমালোচনা থাকলেও হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন করেও তাঁর রাষ্ট্র সম্পর্কিত মতের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। তিনি রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্যগুলোকে অতি সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা বিশেষভাবে ব্যক্তিস্বাধীনতা সংরক্ষণের কাজে নিয়োজিত ছিল। পারিবারিক ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি রাষ্ট্রকে ঐশ্বরিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্রকে কোনো আইন দ্বারাই সীমাবদ্ধ করা যায় না। রাষ্ট্র হচ্ছে সব আইনের ঊর্ধ্বে।

আরো পড়ুন:  রাষ্ট্রচিন্তায় রুশোর অবদান প্রকৃতির রাজ্য, সামাজিক চুক্তি, সার্বভৌমত্ব ও ইচ্ছাতত্ত্বে

হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন

রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে হেগেল এক বিতর্কিত ব্যক্তি। তাঁর কল্পনা বিলাসিতা, চিন্তার কঠোরতা ও অস্পষ্টতার বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ ওঠে আবার তাঁর দার্শনিক গভীরতা, দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ও যুগোপযোগী প্রগতিশীল চিন্তা তাঁকে এনে দিয়েছে বিপুল খ্যাতি ও সম্মান। হেগেলীয় মতবাদ বা হেগেলবাদের সমালোচক ও সমর্থক উভয়েই সমান শক্তিশালী। উভয়ের বিতর্কে কখনও  সমালোচকেরা বা নিন্দুকেরা এগিয়ে থেকেছেন আবার কখনও বা হেগেলের সমর্থকদের যুক্তির জালে পড়ে পিছিয়ে গিয়েছেন। হেগেলের বিরুদ্ধে প্রথম ও প্রধান প্রতিক্রিয়ায় বলা হয়, হেগেল সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রতত্ত্বের প্রবক্তা।

হবহাউস হেগেলের রাষ্ট্র ধারণার সমালোচনা করে বলেছেন “Hegelian conception of state is deeply interwoven with the most sinister development in the history of Europes.” হবহাউস তাঁর এই উক্তির সমর্থনে বলেন হেগেল দর্শন তৎকালীন ইউরোপের গণতান্ত্রিক ও মানবতাবাদী ঐতিহ্যের বিরোধী ছিল। তাঁর রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণা জার্মানীর স্বৈরাচারী শাসনের পথ প্রশস্ত করে। হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে সিদ্ধান্তে একথা বলা যায়, তাঁর মতবাদ সর্বগ্রাসী, ভ্রান্ত ও বিপজ্জনক। রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কে হবহাউসের প্রতিক্রিয়া এই রকম:

  • হেগেলের ঈশ্বর রাষ্ট্র একটি মিথ্যা ও দুষ্ট ধারণা, ঊনবিংশ শতাব্দীর বাস্তব, গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী ধারণার এক বিপজ্জনক বিরোধিতা।
  • হেগেলের  ধারণা স্বাধীনতার সঙ্গে আইন, সমতার সঙ্গে শৃঙ্খলা, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে রাষ্ট্র, মানবতার সঙ্গে অতি ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের কথা জুড়ে দিয়ে প্রতিটি ধারণারই উন্নত দৃষ্টিভঙ্গি নষ্ট করেছেন। 
  • রাষ্ট্রকে বড় করে দেখাতে গিয়ে ব্যক্তিকে সাধারণ পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন হেগেল। রাষ্ট্র হয়েছে শক্তি, প্রেরণা, অতি-ব্যক্তির সত্তা আর ব্যক্তি হয়েছে তার অধস্তন উপাদান।
  • রাষ্ট্র ছাড়া ব্যক্তির স্বাধীনতা মূল্যহীন একথা বলে স্বাধীনতা কথাটিকেই গৌণ করেছেন তিনি। হেগেলের এই রাষ্ট্র নির্ভর স্বাধীনতা স্বাধীনতার নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যকেই প্রতিফলিত করে।
  • রাষ্ট্রকে চরম শক্তি দান করে, প্রেরণা ও যুক্তির একমাত্র কেন্দ্র হিসেবে উপস্থিত করে, এর ভালো-মন্দ,  ন্যায়-অন্যায় সব কিছুকেই মহৎ ও পরিপূর্ণ আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে হেগেল আমাদের বিদ্রোহের ক্ষমতাকে অপুষ্ট করেছেন, আমাদের যুক্তিকে মায়াজালে বন্দী করেছেন, আমাদের উন্নতির প্রচেষ্টাকে খর্ব করেছেন। সোজা কথায় রাষ্ট্রের কাছে আমাদের বন্দি করেছেন, আমাদের পরিণত করেছেন রাষ্ট্রের চাটুকারে।

হেগেল কার্যক্ষেত্রে নিজেকেই প্রাশিয়ার রাজতন্ত্রের চাটুকার, অধীনস্ত দাস হিসেবে উপস্থিত করেছেন। তাঁর রাষ্ট্রের ধর্মের এমনই মহিমা যে তার দ্বারা পুষ্ট হয়েছে বিসমার্কের কূটনীতি যে কূটনীতি সদম্ভে ঘোষণা  করে “জার্মানী প্রাশিয়ার উদারপন্থী নীতির দিকে তাকিয়ে নেই – তার শক্তির দিকে তাকিয়ে আছে। বিসমার্কের কর্মপন্থায় পার্লামেন্টের প্রতি উদাসীনতা, জনগণের প্রতি অবজ্ঞা, বিদ্রোহীদের প্রতি ঘৃণা, যুদ্ধের প্রতি আকর্ষণ ও ক্ষমতার যে মত্ততা লক্ষ্য করা গেছে তা যে প্রকারান্তরে হেগেলের সর্বগ্রাসী তত্ত্বের দ্বারা প্রভাবিত তা বলাই বাহুল্য। হেগেলের দার্শনিক অনুজ্ঞাকে সমকালের জার্মান রাজতান্ত্রিক সরকার সুযোগ সুবিধা মত তার ক্ষমতাসিদ্ধির কাজে লাগিয়েছে। হেগেলের দর্শন রাজতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার ও গণবিদ্রোহকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। হেগেলের চিন্তা জার্মানীর ফ্যাসিবাদী চিন্তারও উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিংসা ও যুদ্ধকে লালন করে, জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রচার করে হেগেল অতি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।

আরো পড়ুন:  আর্নেস্ট বার্কার সাম্য সম্পর্কে উদারবাদী মতামত প্রদান করেন

হেগেলের রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে বার্কার বলেছেন হেগেলের জাতীয় রাষ্ট্রের গুণগান রহস্যময়তার পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাজার ক্ষমতার স্বপক্ষে এতকাল ছিল ঐশ্বরিক ক্ষমতার তত্ত্ব। ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও আদর্শ প্রচারের প্রয়োজনে ঈশ্বরের মহিমা কীর্তন। আইভর ব্রাউন বলেছেন হেগেলের ধারণা কার্যত শক্তির কাছে গোলামীকে সমর্থন করেছে, ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে, জাতীয় প্রয়োজনে যুদ্ধকে সমর্থন করেছে, রাষ্ট্র দানবের কাছে শাস্তির সময় এবং মহাশক্তির (Moloch) কাছে যুদ্ধের সময় ব্যক্তিকে উৎসর্গ করেছে। জার্মান রাষ্ট্র সম্পর্কে  তাঁর উদ্বাসন বিদেশনীতির ক্ষেত্রে  বিপজ্জনক এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে নির্দয় ও ক্ষতিকর।

হেগেলের বিরুদ্ধে অত্যন্ত স্পষ্ট অভিযোগ তিনি আদর্শবাদের মুখ্য প্রবক্তা বটে, কিন্তু তাঁর আদর্শ গণতন্ত্র নয়, মানবতা নয় বা আন্তর্জাতিকতা নয়। তাঁর আদর্শবাদ রাষ্ট্রিক নৈতিকতাকে অগ্রাহ্য করে, তাঁর আদর্শবাদ রাষ্ট্রিক শ্রেষ্ঠত্ববাদকে প্রচার করে, তাঁর আদর্শবাদ যুদ্ধকে প্রশ্রয় দেয়, সর্বোপরি তাঁর আদর্শবাদ মানবতাবাদ নয়, আধিপত্যবাদকে, কর্তৃত্ববাদকেই আদর্শ মনে করে।

হেগেল রাষ্ট্রদর্শনের মধ্যে কেউ আবিষ্কার করেন প্রতিক্রিয়াশীলতা, কেউ কেউ লক্ষ্য করেন রক্ষণশীলতা আবার কেউ লক্ষ্য করেন বুর্জোয়া শ্রেণি দর্শনের প্রকাশ্য প্রতিফলন। তিনি যখন গণতন্ত্র ও উদারবাদকে পরিত্যাগ করে জার্মান সর্বগ্রাসীতার পক্ষ অবলম্বন করেন, যুদ্ধ ও অতি জাতীয়তাবাদের পক্ষে প্রচার করেন তখন তিনি অবশ্যই প্রতিক্রিয়াশীল। বাস্তবকে ছেড়ে, অভিজ্ঞতাকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁর দর্শন যখন মনের দুয়ারে ঘোরে, মানুষকে ছেড়ে তিনি যখন দেবতাকে আশ্রয় করেন, রাষ্ট্রের মধ্যে যখন তিনি দেখেন দৈবিক মহিমা তখন তাঁর দর্শন রক্ষণশীল। উনবিংশ শতকেও রাজতন্ত্রের মধ্যে তিনি যখন দেখেন স্থায়িত্ব, উন্নতি ও প্রগতির লক্ষণ তখন তাঁর দর্শনের রক্ষণশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

হেগেলের দর্শনকে বুর্জোয়া শ্রেণির দর্শন বলে অভিযুক্ত করেছেন মার্কসবাদীরা। অন্যান্য সমালোচকেরা যে দর্শনকে চরম রাষ্ট্রবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বিরোধী মতবাদ, অনৈতিক ও অমানবতাবাদী মতবাদ হিসেবে ধিক্কার জানাচ্ছেন তখন মার্কসবাদীরা হেগেলের তত্ত্বে প্রত্যক্ষ করেন বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতি পক্ষপাতিত্ব। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধে বা ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইউরোপের সর্বত্র যখন বুর্জোয়া জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় রাষ্ট্রের প্রশ্নকে সামনে রেখে শতাব্দীর বাস্তববাদী ও রোমান্টিক যুগের, নেপোলিয়ন, ও প্রাশিয়ার দুটি কৃষ্টির, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও আদর্শবাদের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর রাষ্ট্রচিন্তা।

স্বভাবতই একদিকে রক্ষণশীলতা ও অন্যদিকে গতিময়তা, একদিকে প্রচলিত ধ্যান ধারণা ও সমাজনীতির প্রতি বিশ্বাস অন্যদিকে পরিবর্তনের প্রতি স্বীকৃতি তাঁর চিন্তায় উভয়ের সমন্বয় ঘটেছে। হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন প্রসঙ্গে বলা যায়, তাঁর অবদান রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক স্থায়ী প্রেরণা ও শক্তি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। McGovern তাঁকে বলেছেন, “Uncrowned king of intellectual world in Germany.” স্যাবাই বলেছেন “Hegel aimed at nothing less than complete reconstruction of modern thought.” 

তথ্যসূত্র

১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৮৭-৩৯১।

Leave a Comment

error: Content is protected !!