সুকান্ত ভট্টাচার্য (ইংরেজি: Sukanta Bhattacharya) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি। সংগ্রামী এক যুব-মানস রূপেই আকস্মিকভাবে বাংলা সাহিত্যক্ষেত্রে আবির্ভাব হয়েছিল কিশোর কবি সুকান্তের। আবার অকালে তার বিদায়ও ছিল এক আকস্মিক ঘটনা।
বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ, বিধ্বংসী মহাযুদ্ধের হাহাকার—এমনি এক বিপর্যস্ত পরিবেশের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল সুকান্তের কবি-মানস। প্রখর সমাজনিষ্ঠার সঙ্গে স্বদেশ ও ইতিহাসচেতনায় সাম্যবাদ, মানবপ্রেম ছিল তার কাব্যের উপজীব্য।
স্বদেশ ও সমাজের দুঃখদুর্দশা, শোষণ, লাঞ্ছনা, তার মধ্যে এক আপোসহীন সংগ্রামী মনোভাবের জন্ম দিয়েছিল। তথাকথিত কবিসুলভ আত্মকেন্দ্রিক রোম্যান্টিক কল্পনা বিলাস তার কাব্যে কোথাও প্রশ্রয় পায়নি। একারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনজীবনের একান্ত আপনার সংগ্রামী কবি।
কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট জন্ম হয় কবি সুকান্তের। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায়। তার পূর্বপুরুষরা ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় এসে বেলেঘাটা অঞ্চলে বসবাস করেন। যজন-যাজন ছিল পারিবারিক বৃত্তি। সুকান্তর পিতার নাম নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, মাতা সুনীতি দেবী। তিনি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান।
বিদ্যাশিক্ষার শুরু হয়েছিল স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় কমলা বিদ্যামন্দিরে। বাল্যবয়সেই ছড়া কবিতা লিখতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে স্কুলের হাতেলেখা পত্রিকায় ছড়া ও গল্প লিখে কবি খ্যাতি লাভ করেন। ছাপা অক্ষরে তার প্রথম প্রকাশিত রচনা বিবেকানন্দের জীবনী’, প্রকাশিত হয়েছিল শিখা পত্রিকায়।
সুকান্তর পারিবারিক পরিবেশ তাঁর মানসিক বিকাশের অনুকূল ছিল না। দারিদ্য ছিল পরিবারের নিত্য সহচর। আবাল্য অভাব অনটনের মধ্যেই কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
এই পারিপার্শ্বিকতায় থেকেই সুকান্তর অদম্য কবি প্রতিভা তার কাব্যের উপাদান সঞ্চয় করেছে। সাধারণ দুঃখক্লিষ্ট জীবনকে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে দেখার ও উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই ভাবীকালে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের একনিষ্ঠ সৈনিক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি। দুঃসময়ে, দুর্দিনেও তিনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভূমিচ্যুত হননি।
১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্র প্রয়াণ উপলক্ষে সুকান্ত রেডিওতে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন। গল্পদাদুর আসরে তিনি আবৃত্তিও করতেন। স্কুলে থাকতেই সুকান্ত ১৯৪১-৪২ খ্রিস্টাব্দে মার্কসবাদী চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসেন। কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করেছেন অক্লান্তভাবে।
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সুকান্ত ভট্টাচার্য বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। পরের বছর থেকেই তার শরীরে ক্ষয় বা যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ে। মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। অক্ষম দেহ নিয়েও অক্লান্তভাবে তিনি লিখে গেছেন।
অধুনালুপ্ত স্বাধীনতা পত্রিকার কিশোরসভা অংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন সুকান্ত। তার উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিশোর বাহিনী নামে কিশোর সংগঠনও গঠিত হয়েছিল।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মে রোগ ভোগে সংগ্রামী কিশোর কবির মৃত্যু হয়। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল একুশ বছর। ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস সুকান্তর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। অন্যান্য রচনা মিঠেকড়া, অভিযান, হরতাল প্রভৃতি।
আরো পড়ুন
- অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব
- হাসান ফকরী বাংলাদেশের একজন কবি, গীতিকার, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক
- শামসুল ফয়েজ বাংলাদেশের একজন কবি, লেখক, অনুবাদক ও প্রাবন্ধিক
- জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ছিলেন বিংশ শতকের কবি, লেখক, গীতিকার
- কালীপ্রসন্ন সিংহ বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎ লেখক, নাট্যকার ও সমাজসেবী
- নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন উল্লেখযোগ্য কবি ও লেখক
- দ্বিজেন্দ্রলাল রায় উনবিংশ শতকের কবি, সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা
- গিরিশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন নাট্যকার, কবি, অভিনেতা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা
- কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ
- খোন্দকার আশরাফ হোসেন ছিলেন বাংলাদেশের উত্তরাধুনিক ধারার কবি
- এম এ মতিন ছিলেন বিপ্লবী নেতা, বুদ্ধিজীবি, কবি, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক
- শিবরাম চক্রবর্তী ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি রম্যলেখক ও শিশু সাহিত্যিক
- নবারুণ ভট্টাচার্য বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গল্পকার এবং বিপ্লবী চিন্তাবিদ
- আল্লামা মহম্মদ ইকবাল ছিলেন একজন মুসলিম লেখক, দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ
- কবি সমর সেন বাঙালি ভাবালু মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর
- সুনির্মল বসু ছিলেন বাংলা ভাষার শিশু সাহিত্যিক, লেখক ও সম্পাদক
- মুকুন্দ দাস ছিলেন বাংলার চারণ কবি, লেখক, পালাগায়ক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা ভাষার লেখক, কবি দার্শনিক ও চিন্তাবিদ
- জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময় বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- পাবলো নেরুদা হচ্ছেন চিলির জাতীয় এবং সাম্যবাদী বিপ্লবের কবি
- সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান বিপ্লবী কবি
তথ্যসূত্র
১. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।