বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য: জীবন, কবিতা ও সাম্যবাদী চেতনা

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৫ আগস্ট ১৯২৬ – ১৩ মে ১৯৪৭) ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান বিপ্লবী কবি। ক্ষণজন্মা এই কিশোর কবির আকস্মিক আবির্ভাব ও অকাল প্রস্থান বাংলা সাহিত্যজগতে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ১৯৪০-এর দশকের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাহাকার এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর অনন্য কবি-মানস। তীব্র সমাজচেতনা, প্রখর স্বদেশপ্রেম, সাম্যবাদ এবং গভীর মানবতাবোধই ছিল সুকান্তের কবিতার মূল উপজীব্য। নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর বিপ্লবী কলম আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।[১]

স্বদেশ ও সমাজের দুঃখদুর্দশা, শোষণ, লাঞ্ছনা, তার মধ্যে এক আপোসহীন সংগ্রামী মনোভাবের জন্ম দিয়েছিল। তথাকথিত কবিসুলভ আত্মকেন্দ্রিক রোম্যান্টিক কল্পনা বিলাস তার কবিতায় কোথাও প্রশ্রয় পায়নি। একারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনজীবনের একান্ত আপনার সংগ্রামী কবি।

কলকাতার কালীঘাট অঞ্চলে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট জন্ম হয় কবি সুকান্তের। তাদের পৈতৃক নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কোটালিপাড়ায়। তার পূর্বপুরুষরা ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় এসে বেলেঘাটা অঞ্চলে বসবাস করেন। যজন-যাজন ছিল পারিবারিক বৃত্তি। সুকান্তর পিতার নাম নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, মাতা সুনীতি দেবী। তিনি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান।

বিদ্যাশিক্ষার শুরু হয়েছিল স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় । সুকান্ত ও তাঁর ছোট ভাই প্রথমে মহল্লার কমলা বিদ্যামন্দিরে যা ছিল একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাঠ্য বিষয়ের অতিরিক্ত নানা বিষয়ের বই পড়ার প্রতি তখনই তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল।

বাল্যবয়সেই ছড়া কবিতা লিখতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে স্কুলের হাতেলেখা পত্রিকায় ছড়া ও গল্প লিখে কবি খ্যাতি লাভ করেন। ছাপা অক্ষরে তার প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘বিবেকানন্দের জীবনী’, প্রকাশিত হয়েছিল শিখা পত্রিকায়। বঙ্কিমচন্দ্রের ও বিভূতিভূষণের কিছু উপন্যাস তখনই তিনি পড়ে ফেলেন। সুকান্তের মন তাঁর বয়সের তুলনায় অনেক অগ্রসর ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে সুকান্ত উদ্যোগী হয়ে অন্যদের সঙ্গে মিলে ‘সঞ্চয়’ নামে একটি দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করেন। তখনই তিনি নাটকে অভিনয় করেন এবং ‘রাখাল ছেলে’ নামের গীতিনাট্যটি রচনা করেন। রাজনৈতিক সংগঠনের সংস্পর্শও সম্ভবত তিনি লাভ করেন ওই সময়েই।

পরে তিনি ভর্তি হন বেলেঘাটার দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ে। সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে সুকান্ত কয়েকজন সতীর্থের সঙ্গে মিলে প্রকাশ করেন ‘সপ্তমিকা’ নামে হাতে লেখা পত্রিকা। একাজে সুকান্তের সহযোগী ছিলেন সহপাঠী ও বন্ধু অরুণাচল বসু। অরুণাচলের মা-ও সুকান্তকে খুব আদর করতেন। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ পাঠেও সুকান্ত সময় ব্যয় করতেন। কিন্তু নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকে তাঁর আগ্রহ ছিল না। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়াটা তাঁর কাছে দুঃসহ লাগত। জ্ঞান লাভেই তাঁর আগ্রহ ছিল, স্কুলের বাঁধা-ধরা নিয়ম-কানুনও তিনি পছন্দ করতেন না। স্বাভাবিক ভাবেই পরীক্ষার ফল তাঁর ভালো হত না। তার জন্য যে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল, তাও নয়। জীবন-জগতের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গতানুগতিক ছিল না।

স্কুলে অধ্যয়ন কালে সুকান্ত কলকাতা রেডিওর কিশোর অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। একাধিক কিশোর সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়ন কালে সুকান্ত রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগদান করেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ এতে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হন, এবং তাঁকে স্কুল ছেড়ে যেতে বাধ্য করেন। পরে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু পরীক্ষার সময়ে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। দুই বার পরীক্ষা দিয়েও তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করতে পারেননি। স্কুলে অধ্যয়ন কালেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দিয়েছিলেন এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সুকান্তের লেখা রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রেরণাদায়ক ছিল।

সুকান্তর পারিবারিক পরিবেশ তাঁর মানসিক বিকাশের অনুকূল ছিল না। দারিদ্য ছিল পরিবারের নিত্য সহচর। আবাল্য অভাব অনটনের মধ্যেই কাটাতে হয়েছে তাঁকে।

এই পারিপার্শ্বিকতায় থেকেই সুকান্তর অদম্য কবি প্রতিভা তার কাব্যের উপাদান সঞ্চয় করেছে। সাধারণ দুঃখক্লিষ্ট জীবনকে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে দেখার ও উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছিলেন বলেই ভাবীকালে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের একনিষ্ঠ সৈনিক হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি। দুঃসময়ে, দুর্দিনেও তিনি রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভূমিচ্যুত হননি।

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্র প্রয়াণ উপলক্ষে সুকান্ত রেডিওতে স্বরচিত কবিতা পাঠ করেছিলেন। গল্পদাদুর আসরে তিনি আবৃত্তিও করতেন। স্কুলে থাকতেই সুকান্ত ১৯৪১-৪২ খ্রিস্টাব্দে মার্কসবাদী চিন্তাধারার সংস্পর্শে আসেন। কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করেছেন অক্লান্তভাবে।

১৯৪৩ সনে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের ও মন্বন্তর মোকাবিলার (১৩৫০-এর মন্বন্তর) জন্য স্কুলের ছাত্রেরা কিশোর বাহিনী গড়ে তোলে। সংগঠক ও কবি হিসেবে সুকান্ত তাতে সক্রিয় হন। ১৯৪৫ সনে বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরে ভারতে সর্বাত্মক ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলন আরম্ভ হলে সুকান্ত তাতেও সক্রিয় হন।

শ্রমিক-আন্দোলনেও সুকান্ত যোগদান করেছেন। একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হয়ে আন্দোলনের সব রকম কাজে তিনি নিজেকে নিঃশেষে দান করতে চেয়েছেন। তাঁর বয়স আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। পার্টির নিয়ম অনুযায়ী কোনো কর্মীর বয়স আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার পরেই পার্টির সদস্য হওয়ার জন্য প্রার্থী হতে পারতেন। সুকান্ত আপন যোগ্যতা ও পার্টির জন্য ত্যাগের ফলে পার্টির বিশেষ বিবেচনায় আগেই সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪১ সনের ২২ জুন হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন। তাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘মিত্র শক্তি’তে যোগদান করে। এর ফলে যুদ্ধ-পরিস্থিতি বদলে যায়। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তখন ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। যুদ্ধের পরে কমিউনিস্ট পার্টি কংগ্রেস-নেতাদের আহ্বান জানায় স্বাধীনতা-সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য। সুকান্তের লেখক-জীবনের তখনই সবচেয়ে ফলবান সময়। রাজনৈতিক আন্দোলনের গভীরে শরিক থেকে সুকান্ত যে জীবনোপলব্ধি লাভ করেছেন, তাই কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। সুকান্ত স্বভাবগত কবি-প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তবে কবিতার পরিমার্জন-পরিশীলনে তাঁর মনোযোগ ছিল। রাজনৈতিক আন্দোলন গিয়ে তাঁর কবি-প্রতিভা বিশেষ রূপ লাভ করেছে। কাব্যচর্চা ও রাজনৈতিক আন্দোলন দুই-ই সুকান্ত করেছেন অন্তরের তাগিদে সম্পূর্ণ আত্মোৎসর্গ করে।

ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালনায় ও সুকান্তের নেতৃত্বে কিশোর বাহিনী গঠিত হয়। তৎকালীন বাংলার অনেক জেলায় কিশোর বাহিনীর শাখা গঠিত হয়। হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা এই বাহিনীর সদস্য ও কর্মী হয়। কিশোর বাহিনীর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল: ‘শিক্ষা স্বাস্থ্য সেবা স্বাধীনতা।’ যদিও সুকান্ত কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য ছিলেন তবু গান্ধী ও সুভাষ বসুর প্রতিও তাঁর শ্রদ্ধার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি তাঁদের নেতৃত্বকে বিচারমূলক দৃষ্টিতে দেখেছেন-গান্ধীর অহিংসা-নীতির বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেছেন; কিন্তু সাধারণভাবে তাঁদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেননি। রবীন্দ্রনাথের প্রতি অনুরাগ ও বিস্ময় প্রকাশ করেও তিনি বেশ কয়েকটি কবিতা লিখেছেন। গান্ধীকে নিয়েও লিখেছেন কবিতা। সুকান্ত উদার মনের অধিকারী ছিলেন।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সুকান্ত ভট্টাচার্য বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন। পরের বছর থেকেই তার শরীরে ক্ষয় বা যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ে। মাঝেমাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকেন। অক্ষম দেহ নিয়েও অক্লান্তভাবে তিনি লিখে গেছেন।

অধুনালুপ্ত স্বাধীনতা পত্রিকার কিশোরসভা অংশের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন সুকান্ত। তার উদ্যোগে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিশোর বাহিনী নামে কিশোর সংগঠনও গঠিত হয়েছিল।

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ মে রোগ ভোগে সংগ্রামী কিশোর কবির মৃত্যু হয়। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল একুশ বছর। ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস সুকান্তর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। অন্যান্য রচনা মিঠেকড়া, অভিযান, হরতাল প্রভৃতি।

মানবিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ ছিল সুকান্তের ব্যক্তিত্ব। খেলাধূলা, গান শোনা ইত্যাদির প্রতি তিনি আকৃষ্ট ছিলেন। ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন তিনি ভালোই খেলতে পারতেন। মিছিলে গান ধরেছেন সকলের সঙ্গে। কবিতা আবৃত্তিও তিনি ভালো করতে পারতেন। একটি মেয়ের প্রেমেও পড়েছিলেন। তবে তাতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্কল্প থেকে বিচ্যুত হননি। কৌতূহল ও কৌতুকবোধ ছিল তাঁর প্রভূত।

সুকান্তের জীবনযাত্রা ছিল খুবই সাদাসিধে। মনোযোগ ছিল তাঁর কাজে। পোষাক-পরিচ্ছদের প্রতি কোনো মনোযোগই ছিল না। খাওয়া-দাওয়া নিয়েও কোনো চিন্তা করতেন না। পার্টির ত্যাগের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন নিজের জীবনযাত্রায়। পার্টির কাজে বাইরে যেতে হত তাঁকে কলকাতার বাইরেও, বিভিন্ন জেলা ও মহকুমা শহরে। সেক্ষেত্রেও তিনি চেষ্টা করেছেন যতটা কম খরচে পারা যায় চলতে। এমন কথাও বলা হয়েছে যে, সুকান্ত বস্তিতে থাকতেন।[২][৩]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. যাহেদ করিম সম্পাদিত নির্বাচিত জীবনী ১ম খণ্ড, নিউ এজ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৯৭-৯৮।
২. আবুল কাসেম ফজলুল হক সম্পাদিত সুকান্ত সমগ্র, মোহনা প্রকাশনী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০২২, পৃষ্ঠা ৮-৯।
৩. লেখাটি প্রথম ২১ জানুয়ারি ২০২১ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হয়। আজ ১৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পুনরায় সংস্কারসাধন ও উন্নত করা হয়েছে।

Leave a Comment