জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেলের রাষ্ট্রদর্শনে ‘রাষ্ট্র’ কোনো কৃত্রিম চুক্তি বা নিছক প্রশাসনিক যন্ত্র নয়, বরং এটি একটি সর্বব্যাপী, অভ্রান্ত এবং জৈব (Organic) সত্তা, যা বিশ্ব-ইতিহাসে ‘পরমাত্মার’ (Absolute Spirit) বস্তুনিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। হেগেলের মতে, রাষ্ট্র হলো ‘পৃথিবীতে ঈশ্বরের পদচারণা’ (The march of God in the world), যা আত্মসচেতন নৈতিক বস্তু হিসেবে নিজের ইচ্ছা, স্বার্থ ও অধিকার দ্বারা পরিচালিত। এখানে রাষ্ট্র কেবল ব্যক্তি-স্বার্থ রক্ষার উপায় নয়, বরং নিজেই এক ‘চূড়ান্ত লক্ষ্য’ (Teleological end)। তাঁর তাত্ত্বিক কাঠামোতে রাষ্ট্র এমন এক সমন্বয়ক শক্তি, যেখানে ব্যক্তির খণ্ডিত ইচ্ছা ও স্বাধীনতা নৈতিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায় এবং জাতীয় সংহতির এক যুদ্ধংদেহী অথচ সুসংহত রূপ পরিগ্রহ করে।
রাষ্ট্র ঐশ্বরিক ধারণা
রাষ্ট্র হলো একটা ঐশ্বরিক ধারণা, দিব্য ধারণা যুগ যুগ ধরে বিবর্তিত হতে হতে শেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রে চরম পরিণতি লাভ করে। রাষ্ট্রই হলো আধ্যাত্ম শক্তির পূর্ণাঙ্গ বিকাশ। রাষ্ট্রের বাইরে আধ্যাত্মবাদের অন্য কোনো বিকাশ আমরা কল্পনা করতে পারি না। ভগবানই পূর্ণতররূপে রাষ্ট্রে এসে প্রতিফলিত হয়েছেন – অর্থাৎ রাষ্ট্রই ঐশ্বরিক শক্তির বিকল্প বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
রাষ্ট্র সমগ্র বস্তু
ইতিহাস ও সভ্যতা বিবর্তিত হয়ে রাষ্ট্রে এসে চরম পরিণতি লাভ করেছে বলে রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত অংশগুলোর নিজস্ব কোনো সত্তা স্বাতন্ত্র্য নেই। রাষ্ট্র একটা সমগ্র বস্তু। অংশের চেয়ে সমগ্র সব সময় বড়। সমগ্রের মধ্যে থেকেই অংশ নিজেকে তাৎপর্য মণ্ডিত করে তুলতে পারে, সমগ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নয়। ব্যক্তিসহ সমস্ত অংশ রাষ্ট্রের অধীন। (The state has the highest right over the individuals whose highest duty is to be a member of the state.)
রাষ্ট্র নৈতিক আইনের ঊর্ধ্বে
রাষ্ট্র কোনো রকম নৈতিক আইনে আবদ্ধ নয়। সব নৈতিক আইনের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্র। কারণ রাষ্ট্র নিজে নৈতিক আইনের সৃষ্টিকর্তা ও সামাজিক নৈতিকতার সর্বোৎকৃষ্ট বহিঃপ্রকাশ। ব্যক্তিগত নৈতিকতা সামাজিক নৈতিকতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। সামাজিক নৈতিকতার প্রতি শর্তহীন আনুগত্যই স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গ অনুশীলনের পূর্বশর্ত। নাগরিকদের নৈতিকতার মান কী হবে তা রাষ্ট্র স্থির করে দেবে এবং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মেনে চলা সবার পক্ষে বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রের নীতিবোধ ত্রুটিহীন ও সম্পূর্ণ। সুতরাং রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রকে নীতি লঙ্ঘনকারী বলে অভিযুক্ত করতে পারে না। এই প্রসঙ্গে হেগেল চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার রথের তলায় বহু নিরীহ ব্যক্তি প্রাণ হারাতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে করার কিছুই নেই। এমন হতেই পারে (So mighty a form must trample down many an innocent flower; it must crush to pieces many an object in its path. Hegel)।
রাষ্ট্রে প্রাকৃত অধিকার ও সামাজিক চুক্তি বর্জন
হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের অন্য একটা বৈশিষ্ট্য হলো এর মধ্যে সামাজিক চুক্তি মতবাদ ও প্রাকৃত অধিকার তত্ত্ব কোনো স্থান পায় নি। রাষ্ট্রের উদ্ভবের পেছনে কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি গোষ্ঠীর সচেতন প্রয়াস আছে বলে তিনি মনে করেন নি। তাঁর মতে আধ্যাত্মিকতা ও সর্বজনীন যুক্তির (universal reason) বাস্তব রূপায়ন (Actualization) হলো রাষ্ট্র। পরিবার ও পৌরসমাজ থেকে দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে। হেগেল এর পূর্বসূরিরা প্রাকৃত অধিকারের উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। তিনি এসে এই অধিকারকে বিন্দু মাত্র আমল দিলেন না। কারণ তিনি মনে করতেন অধিকার কখনও একতরফা হতে পারে না। কর্তব্যের সঙ্গে অধিকার জড়িত। মানুষ কী কী অধিকার ভোগ করবে তা নির্ভর করে সে কী কী কর্তব্য পালন করছে এবং এই কর্তব্যগুলো স্থির করে দেবার পুরো দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সমালোচকরা সেই জন্য অনুমান করেন যে হেগেল প্রাকৃত অধিকারের পরিবর্তে সামাজিক অধিকার (Social right) প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। অবশ্য এ কথা তিনি কোথাও স্পষ্ট করে প্রকাশ করে যান নি।
রাষ্ট্রের জৈব তত্ত্ব
রাষ্ট্রীয় সম্বন্ধে হেগেলীয় মতবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তিনি রাষ্ট্রকে জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন The state must be comprehended as an organism. জীবদেহের কোনো অংশকে বিচ্ছিন্ন করে খণ্ডিত অংশের কার্যকারিতা যেমন অক্ষুণ্ণ রাখা যায় না, তেমনি অংশ বা ব্যক্তি রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ সমগ্রের বাইরে অংশের কোনো মূল্য নেই। সমগ্র আছে বলেই অংশ স্বমর্যাদায় আসীন। জৈব তত্ত্ব থেকে আরও স্পষ্ট যে রাষ্ট্রের মধ্যেই যাবতীয় উদ্দেশ্য বা আশা আকাঙ্খার পরিসমাপ্তি ঘটে (The state is an end in itself)। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও নৈতিকতার বাইরে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য এবং উন্নতমানের আদর্শ বা নৈতিকতা থাকতে পারে বলে মনে করেন নি।
জাতীয় ঐক্য
স্বতন্ত্রভাবে রাষ্ট্রের এইসব আচরণগত বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্রের নিজস্ব সুবিধার্থেই প্রকাশ পায়। জাতীয় মন বা চেতনা রাষ্ট্রের এই সব বিশেষত্বের কারণে চাপা পড়ে যায়। তবে রাষ্ট্রগুলির এইসব আচরণগত বৈশিষ্ট্য দ্বান্দ্বিকভাবে প্রতিফলিত হয় এবং স্বাভাবিক দ্বান্দ্বিক নিয়মেই রাষ্ট্রগুলির ক্রিয়া প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই উঠে আসে এক সার্বিক মন বা চেতনা। হেগেল এই সার্বিক মনকেই বলেছেন “Òmind of the world”. এই বিশ্বমন কোনো বাধা বা সীমার অধীন নয়। এই বিশ্বমন তার নিজের অধিকার প্রয়োগ করে এবং এই অধিকারই হলো সব নিয়মের শ্রেষ্ঠ। বিশ্ব ইতিহাস হলো এই বিশ্বমনের বিচারসভা। এই বিচারসভার বিচার শক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। বিশ্ব মনের অচেতন অংশ বা বিভাগ হিসাবেই আসে জাতীয় রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ ইতিহাসের এক দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়া।
আরো পড়ুন
- প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন: আধুনিক ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় দর্শনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: রাষ্ট্রদর্শন, প্রগতি এবং নৈতিক সংহতির নবদিগন্ত
- হেগেলীয় রাজনৈতিক চিন্তা: জার্মান ভাববাদের বিস্তার এবং ফরাসি বিপ্লবোত্তর দোদুল্যমানতা
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ ও এর বৌদ্ধিক উত্তরধিকার: মার্কস থেকে গ্রামসি পর্যন্ত বিবর্তন
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ (Civil Society): চাহিদার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সংহতির মধ্যবর্তী স্তর
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির অবস্থান: পরম সত্তার বিবর্তনে ব্যষ্টি ও সমষ্টির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
- হেগেলীয় রাজনৈতিক কাঠামো: সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের জৈব ঐক্য
- হেগেলীয় স্বাধীনতা তত্ত্ব: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংহতির নৈতিক রূপায়ণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন: জীবনতত্ত্বের আঙ্গিক একত্ব ও উচ্চতর সত্তার সংশ্লেষণ
- হেগেলের আইনতত্ত্ব: পরম সত্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সমাজ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের স্বরূপ: সার্বভৌম নৈতিক সত্তা, বিশ্ব-আত্মার মূর্তায়ন ও পরম লক্ষ্য
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শন: পরম ইচ্ছার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং আইন ও নৈতিকতার সংশ্লেষণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তা: জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক নিয়তি এবং বিশ্ব-আত্মার মূর্ত প্রকাশ
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিবর্তন: সক্রেটিস, হেগেল এবং মার্কসীয় বস্তুবাদী রূপান্তরের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
রাষ্ট্র এবং যুদ্ধ
রাষ্ট্র সম্বন্ধে হেগেল এর ধারণা ও যুদ্ধ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধকে হেগেল দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার একটা অংশ বলে মনে করতেন। বিশ্ব ইতিহাসে যুদ্ধের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। যুদ্ধের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। যুদ্ধে জয় পরাজয় অবশ্যই আছে। যে রাষ্ট্র জয়লাভ করে সেই রাষ্ট্রই ন্যায় বিচার ও বিশ্ব আত্মার (World spirit) মূর্ত প্রতীকরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়। নেতিবাচক ও ইতিবাচক শক্তির ফলে যেমন প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে তেমনি বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বিরোধে সত্য ও ন্যায়বিচারের প্রতিভূ যে রাষ্ট্র সেই শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করে। হেগেল এর কাছে যুদ্ধ এবং যে রাষ্ট্র যুদ্ধ করে কোনোটাই নিন্দিত হয় নি। বরং যুদ্ধকে তিনি গৌরবের আসনে বসিয়েছেন।
যুদ্ধকে একটা অতীব বাস্তব সত্য হিসেবে মেনে নেবার কথা হেগেল বলেছেন। কারণ যুদ্ধের মাধ্যমে স্থির হবে অশুভ শক্তির পরাজয় ও শুভ শক্তির জয়। সেইজন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ হোক এটা তিনি মনে প্রাণে কামনা করতেন। যুদ্ধকে অনিবার্য বলে মনে করলেও এটা যে একটা অশুভ শক্তি তা তিনি স্বীকার করতে ভোলেন নি। তবে যুদ্ধ অশুভ হলেও চরমরূপে অশুভ নয়। রাষ্ট্র যে বিশ্ব আত্মার প্রতীক তা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বিশেষ কোনো রাষ্ট্রকে তিনি এই আসনে বসাননি।
তথ্যসূত্র
১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৮৪-৩৮৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।