জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেলের রাষ্ট্রদর্শনে সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং সরকারের ধারণা (ইংরেজি: Hegel on constitution, sovereignty and government) কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কাঠামো নয়, বরং এগুলো বিশ্ব-আত্মার (World-Spirit) যৌক্তিক বিবর্তনের অনিবার্য পর্যায়। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাকৃত আইন (Natural Law) এবং অবাধ বাণিজ্যনীতির (Laissez-faire) প্রেক্ষাপটে হেগেল এক নতুন ধারার ভাববাদী দর্শনের অবতারণা করেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র হলো একটি ‘আঙ্গিক একত্ব’ (Organic Totality) এবং একটি সক্রিয় আধ্যাত্মিক সত্তা। এই তাত্ত্বিক কাঠামোতে সংবিধান কেবল একটি লিখিত দলিল নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মিক ও নৈতিক চেতনার বস্তুনিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ, যা নাগরিক জীবনের বৈচিত্র্যকে একীভূত করে।
হেগেল মনে করতেন, জগতে বিদ্যমান সকল বৈচিত্র্য ও আপাত বিরোধিতাসমূহ আসলে এক ‘উচ্চতর সত্তার’ অপরিহার্য উপদান, যার প্রভাবেই জাগতিক বিষয়সমূহের মধ্যে সুসমন্বিত সংযোগ ঘটে। সার্বভৌমত্বকে তিনি রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ ও অবিভাজ্য ইচ্ছাশক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা কোনো বাহ্যিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর এই ‘অভেদের ধারণা’ (Identity Philosophy) পরবর্তীকালের রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রকে একটি নৈতিক ও সার্বভৌম সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মূলসূত্র হিসেবে কাজ করেছে। হেগেলের মতে, সরকার হলো সেই মাধ্যম যার মাধ্যমে এই উচ্চতর সার্বভৌম ইচ্ছা বাস্তব সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে কার্যকর হয়।
সংবিধান সম্পর্কে হেগেল
হেগেল সংবিধানকে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর কল্পনাপ্রসূত ধারণা বলে মনে করেন নি। তাঁর মতে, কিছুসংখ্যক মানুষ মিলিত হয়ে একটি নিদিষ্ট সময়ে সংবিধান রচনা করেন নি। সংবিধানের অস্তিত্ব সে প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান রয়েছে। সংবিধানের ধারণা ঈশ্বরের ধারণার মত নয়। সংবিধানকে কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ধারণার মধ্যে আবদ্ধ করা চলে না।
সংবিধানের স্থান:
রাষ্ট্রীয় নীতিমালা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ উৎস সংবিধান একটা অপরিবর্তনীয় বিষয়। জাগতিক সবকিছুর উপরে এর স্থান। সংবিধানের মধ্যে যেসব নীতির উল্লেখ থাকা বা যেসব নীতি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়, হেগেল সেগুলোকে সংবিধানের সরঞ্জাম বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, সংবিধানকে কার্যকর করতে হলে সংবিাধানের নীতি কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়।
সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির উপর সংবিধানের প্রভাব:
হেগেলের মতে, “দেশের সংবিধান নির্ভর করে সে দেশের ঐতিহ্যের উপর।” সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও বিভিন্ন মতাদর্শ থাকে কিন্তু এগুলো সংবিধানের উপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। হেগেল সংবিধানকে মানুষের মধ্যে সম্পাদিত কোনো চুক্তি বা দলিল বলেন নি। তিনি বলেছেন, দেশের জনগণ তাদের শাসকের সাথে যে সমঝোতার সম্পর্ক গড়ে তোলে তার প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি সংবিধানের উপর।
সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে হেগেলের ধারণা:
হেগেল সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করেন তা রাষ্ট্রের ধারণার সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত। তিনি রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ যুক্তিসিদ্ধ এবং নৈতিকতার মূর্ত প্রতীক বলে মনে করেন। তিনি বলেছেন, কেবল রাষ্ট্রেই স্বাধীনতার সফল রূপায়ণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব। তাঁর মতে, কোনোক্রমেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা চলে না। কারণ রাষ্ট্র সর্বশক্তিমান। হেগেল তাঁর ‘Ideal State’ (পৃষ্ঠা ৭৩) গ্রন্থে বলেছেন, “রাষ্ট্র কোনো আদর্শ সৃষ্টিকর্ম নয়, এটি পৃথিবীতে বিরাজমান। কাজেই এতে জটিলতা, পরিবর্তন এবং ভ্রান্তি থাকবেই। (The state is not ideal world of art, it stands on earth and so in the sphere of caprice, change and error.)
সাবভৌমত্বের জন্ম:
হেগেলের মতে,“রাষ্ট্রের উচ্ছ¡সিত প্রশংসা থেকে সার্বভৌমত্বের জন্ম।” কোনো চুক্তির মাধ্যমে জনগণ রাষ্ট্রের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা তুলে দেন নি। সার্বভৌমত্বের জন্ম হয়েছে রাষ্ট্রের ঐক্য ও অতীতের ঐতিহ্য থেকে।সার্বভৌম ক্ষমতা এমনই এক ক্ষমতা যা মানুষের স্বতন্ত্র ইচ্ছাকে স্বীকার করে না। সার্বভৌম শক্তির অধীনেই রাষ্ট্রের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়।
জনগণের সার্বভৌমতা:
হেগেলের মতে.“কোনো একটা জনগোষ্ঠী যখন পৃথক পৃথক সত্তাযুক্ত হয়ে একটা আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে, তখন তাকে জনগণের সার্বভৌমতা বলে।” জনগণের সার্বভৌমতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমতা এক নয়। তাঁর মতে, জনগণের ধারণা একটি বিমূর্ত ধারণা। এর কোনো নিদিষ্ট আকার কল্পনা করা যায় না। এজন্য জনগণের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকা সম্ভব নয়।
সরকার সম্পর্কে হেগেলের ধারণা:
জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে হেগেল শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক দিককে অস্বীকার করেছেন। তিনি গণতন্ত্রের ধারণাকে বিকৃত ধারণা ও এক ধরণের ছলনা মনে করতেন। এজন্য তিনি জনগণের ধারণা একটি বিমূর্ত ধারণা বলেছেন। এর কোনো নির্দিষ্ট আকার কল্পনা করা যায় না। এজন্য জনগণের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকা সম্ভব নয়।
রাজতন্ত্র সমর্থনের কারণ:
হেগেলের লক্ষ্য ছিল একটি স্থিতিশীল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি এমন একটা সরকার ব্যবস্থার কথা বলেন, যা রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য রক্ষা করার নিশ্চয়তা প্রদান করে। আর এসবের বাস্তবায়নের জন্যই তিনি রাজতন্ত্রের সমর্থন করেন। তিনি ঘন ঘন সরকার পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন। কারণ ঘন ঘন সরকার পরিবর্তিত হলে তা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর হয় না, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হয়।
রাজার অবস্থান :
হেগেল রাজার স্বরূপ সম্পর্কে যা বলেন তা স্বৈরতান্ত্রিক নয়, সাংবিধানিক। রাজ্য পরিচালনার কোনো ক্ষেত্রেই তিনি এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। সভাসদবর্গের সাথে পরামর্শ করে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। জনগণের অকল্যাণ হবে এমন কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দিকে রাজা অগ্রসর হতে পারেন না। রাষ্ট্রের জনগণের মত রাজা নিজেও শাসনব্যবস্থা ও আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন।
বিভিন্ন শ্রেণির সমন্বয় :
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যারা প্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন তারা বিশেষ কোনো একটি সম্প্রদায়ের লোক হবে না। সমাজের সব শ্রেণি থেকেই প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রতিনিধি পাঠানোকে প্রত্যেক শ্রেণির নিজস্ব দায়িত্ব বলে তিনি মনে করতেন। অর্থনীতির উপর নির্ভর করে যেসব শ্রেণি গড়ে উঠেছে হেগেল সেগুলোর উপর গুরুত্বারোপ করেন।
কৃষি ব্যবস্থার উপর গুরুত্বারোপ:
হেগেলের সমকালে পুঁজিবাদ তেমন একটা বিকাশলাভ করে নি। হেগেল পুঁজিবাদকে বাদ দিয়ে কৃষি ব্যবস্থার উপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেছেন, সরকারের কৃষি বিভাগকে কোনোমতেই অবহেলা করা যাবে না। কৃষকরা যাতে আইনসভায় পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রতিনিধি পাঠাতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখা সরকারের কর্তব্য।
শাসন বিভাগ পরিচালনা:
হেগেলের মতে, “রাষ্ট্রের শাসন বিভাগ পরিচালিত হবে আইনবিভাগ কর্তৃক প্রণীত নীতির আলোকে।” F. Thilly তার ‘A History of Philosophy’ (পৃষ্ঠা ৯৩) গ্রন্থে বলেছেন, “প্রজ্ঞা এবং অন্তদৃষ্টি ছাড়াও একটি যথার্থ রাষ্ট্রে স্বাধীনতা এবং বন্ধুত্ব থাকা উচিত।” (A good state should have, besides reason or insight, freedom and friendship.) হেগেল বলেছেন, “রাষ্টীয় প্রশাসনে নিযুক্ত ব্যক্তিরা মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন।” জনগণের স্বাধীনতা যাতে লঙ্ঘিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রশাসনের অপরিহার্য কর্তব্য।
হেগেলের সংবিধান, সার্বভৌমত্ব ও সরকার সংক্রান্ত ধারণার সমালোচনা
সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং সরকার সম্পর্কে হেগেল যে মত প্রকাশ করেছেন তা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তিনি সংবিধানের প্রাচীন অস্তিত্বের কথা বলেন কিন্তু এ প্রাচীন অস্তিত্বের কোনো উৎসের কথা বলেন নি। তিনি সার্বভৌমত্বের উপর গুরুত্বারোপ করতে গিয়ে একে রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। কিন্তু রাষ্ট্র ছাড়া যে সার্বভৌমত্বের কোনো অর্থ হয় না তা তিনি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। সরকার পদ্ধতি হিসেবে তিনি গণতন্ত্রের চেয়ে রাজতন্ত্রকে আদর্শ বলে মনে করতেন। কিন্তু তিনি তাঁর মতের সমর্থনে পর্যাপ্ত যুক্তি দেন নি।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, নানাবিধ সমালোচনা থাকলেও সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং সরকার সম্পর্কিত হেগেলের মতের গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। তিনি সংবিধানকে কল্পনার ফল বলেন নি। তিনি একে চিরন্তন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। সার্বভৌমত্ব বিষয়ে তাঁর মত হলো যে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই সার্বভৌমত্বের জন্ম হয়েছে। তিনি সার্বভৌম ক্ষমতাকে সবার উপরে স্থান দেন। ব্যক্তির ইচ্ছার বিষয়টি এখানে গৌণ। তিনি সরকার ব্যবস্থা হিসেবে রাজতন্ত্রের সমর্থন করেন।
আরো পড়ুন
- প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলন: আধুনিক ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্র ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় দর্শনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য: রাষ্ট্রদর্শন, প্রগতি এবং নৈতিক সংহতির নবদিগন্ত
- হেগেলীয় রাজনৈতিক চিন্তা: জার্মান ভাববাদের বিস্তার এবং ফরাসি বিপ্লবোত্তর দোদুল্যমানতা
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ ও এর বৌদ্ধিক উত্তরধিকার: মার্কস থেকে গ্রামসি পর্যন্ত বিবর্তন
- হেগেলীয় সুশীল সমাজ (Civil Society): চাহিদার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সংহতির মধ্যবর্তী স্তর
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শনে ব্যক্তির অবস্থান: পরম সত্তার বিবর্তনে ব্যষ্টি ও সমষ্টির দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক
- হেগেলীয় রাজনৈতিক কাঠামো: সংবিধান, সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের জৈব ঐক্য
- হেগেলীয় স্বাধীনতা তত্ত্ব: ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংহতির নৈতিক রূপায়ণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যায়ন: জীবনতত্ত্বের আঙ্গিক একত্ব ও উচ্চতর সত্তার সংশ্লেষণ
- হেগেলের আইনতত্ত্ব: পরম সত্তার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং সমাজ-রাষ্ট্রীয় কাঠামোর তাত্ত্বিক ভিত্তি
- হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের স্বরূপ: সার্বভৌম নৈতিক সত্তা, বিশ্ব-আত্মার মূর্তায়ন ও পরম লক্ষ্য
- হেগেলীয় রাষ্ট্রদর্শন: পরম ইচ্ছার বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশ এবং আইন ও নৈতিকতার সংশ্লেষণ
- হেগেলীয় রাষ্ট্রচিন্তা: জাতীয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক নিয়তি এবং বিশ্ব-আত্মার মূর্ত প্রকাশ
- হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতা বা দ্বন্দ্ববাদ: পরম ভাববাদ ও জগতের প্রপঞ্চ অনুধাবনের দার্শনিক পদ্ধতি
- দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিবর্তন: সক্রেটিস, হেগেল এবং মার্কসীয় বস্তুবাদী রূপান্তরের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
- জর্জ উইলহেল্ম ফ্রিডরিখ হেগেল: জার্মান ভাববাদী দর্শনের চরম উৎকর্ষ ও পরম ভাববাদ
তথ্যসূত্র
১. মো. আবদুল ওদুদ (১৪ এপ্রিল ২০১৪)। “জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল”। রাষ্ট্রদর্শন (২ সংস্করণ)। ঢাকা: মনন পাবলিকেশন। পৃষ্ঠা ৩৯১-৩৯৬।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।