অভিজ্ঞতাবাদ সমস্ত জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে

অভিজ্ঞতাবাদ (ইংরেজি: Empiricism) হচ্ছে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি যা মনে করে যে প্রকৃত জ্ঞান বা ন্যায্যতা কেবল অথবা প্রাথমিকভাবে সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতামূলক প্রমাণ থেকে আসে। এটি জ্ঞানতত্ত্বের মধ্যে যুক্তিবাদ এবং সংশয়বাদের সাথে সাথে বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি। অভিজ্ঞতাবাদীরা যুক্তি দেন যে অভিজ্ঞতাবাদ সত্য খুঁজে বের করার জন্য যৌক্তিক প্রজ্ঞা ব্যবহারের চেয়ে একটি অধিক নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি, কারণ মানুষের চেতনাগত পক্ষপাত এবং সীমাবদ্ধতা রয়েছে যা মানুষকে বিচারের ত্রুটির দিকে পরিচালিত করে।

মানুষের জ্ঞানের উৎস, জ্ঞানের ক্ষমতা এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে দর্শনে বিভিন্ন তত্ত্ব আছে। সাধারণভাবে দার্শনিক মতবাদে অভিজ্ঞতাবাদ বলতে এরূপ তত্ত্বকে বুঝায় যে, মানুষের ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতাই হচ্ছে জ্ঞানের একমাত্র উৎস। তবে অভিজ্ঞতা কথাটি দর্শনে একটি ব্যাপক ব্যবহৃত শব্দ। ভাববাদ এবং বস্তুবাদ উভয় তত্ত্বে অভিজ্ঞতার ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু ভাববাদের অভিজ্ঞতার অর্থ এবং বস্তুবাদের অভিজ্ঞতার অর্থ এক নয়। যুক্তিবাদ বিরোধী এই মতবাদে সহজাত জ্ঞান ও পূর্বকল্পিত বা অবরোহী পদ্ধতিতে নির্ণীত সত্যকে স্বীকার করা হয় না। পর্যবেক্ষণ (অভিজ্ঞতা) ব্যতীত কোনও কিছুর সামান্যীকরণ এই মতবাদের পরিপন্থী।[১]

জ্ঞানের উৎস কি, এটি দর্শনের একটি মৌলিক প্রশ্ন। সাধারণত ভাবকে জ্ঞানের উৎস বলা হয়। কোনো বিশেষ বস্তু সম্পর্কে আমরা যখন কোনো বক্তব্য প্রকাশ করি, তখন সেই বস্তুটির যে ভাব আমাদের মনে থাকে, সেই ভাবটি নিয়েই আমাদের বক্তব্য তৈরী হয়। ‘ওখানে একটি টেবিল আছে’ –এই বক্তব্যটি আমার মনে ‘টেবিলরূপ’ ভাব কিংবা ভাবসমূহের উপর একটি বক্তব্য।

দর্শনে প্রথমে প্রশ্ন জাগে, মনের ভাবকে আমরা কিরূপে বা কোথা থেকে লাভ করি। এই প্রশ্নের চিরাচরিত জবাব দেকার্ত প্রমুখ যুক্তিবাদীগণ এভাবে দিয়ে আসছিলেন যে, মানুষের মনে জন্মগতভাবেই কতকগুলো মৌলিক ভাব থাকে। মানুষ এই মৌলিক ভাবগুলো বিধাতার নিকট থেকে প্রাপ্ত হয়। আর জন্মগত এই মৌলিক ভাবগুলোর ভিত্তিতেই মানুষের জ্ঞানমণ্ডল তৈরি হয়। এক কথায় এ তত্ত্ব হচ্ছে মনসর্বস্ব তত্ত্ব। আর এ তত্ত্বে মনের ভাবের উৎস বস্তু জগতের ঊর্ধ্ব কোনো লোক। বাস্তব বা বস্তু জগতের স্বাধীন অস্তিত্ব এ মতে অস্বীকৃত। বিজ্ঞানের অগ্রগতি জ্ঞানের এ তত্ত্বকে ক্রমান্বয়ে অগ্রাহ্য করে তোলে। এবং এর জোরালো প্রতিবাদ আসে ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬), টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯), জন লক (১৪৩২-১৭০৪) প্রমুখ বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিকের কাছ থেকে।

সপ্তদশ শতকের জন লককেই অভিজ্ঞতাবাদের প্রধান প্রবক্তা মনে করা হয়। ভাব এবং জ্ঞানের উৎস কি এ প্রশ্নে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, ভাবের উৎস হচ্ছে বাস্তব অভিজ্ঞতা। জন্মগতভাবে মানুষের মন আদৌ কোনো ভাব লাভ করে না। জন্মের সময়ে শিশুর মন একখানি ‘ট্যাবুলারাস’ বা ‘নিদাগ শ্লেট’ বৈ আর কিছু নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা ক্রমান্বয়ে এই ‘নিদাগ শ্লেটে’ ভাবের দাগ এঁকে দেয়। আর সেই ভাবের দাগ দিয়েই মানুষ তার জ্ঞানজগৎ তৈরি করে। জন লকের ‘অভিজ্ঞতাবাদের’ এই বিবরণটি বিশেষ সংক্ষিপ্ত।

আসলে জন লক অবিমিশ্র অভিজ্ঞতাবাদী ছিলেন না। অবিমিশ্র অভিজ্ঞতাবাদ দ্বারা জ্ঞানের জটিল প্রশ্নের জবাব দানে অসমর্থ হয়ে তিনি মনের অন্তঃঅনুভূতিকেও ভাবের একটি উৎস বলে স্বীকার করেছিলেন। এ আলোচনায় দেখা যায় যে, অভিজ্ঞতাবাদ দুরকমের হতে পারে ভাববাদী অভিজ্ঞতাবাদ এবং বস্তুবাদী অভিজ্ঞতাবাদ।

বস্তুবাদী অভিজ্ঞতাবাদের মত অনুযায়ী আমাদের চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ত্বক –অর্থাৎ ইন্দ্রিয়সমূহ হচ্ছে ভাবের বাহক এবং বস্তুজগৎ হচ্ছে ভাবের উৎসকেন্দ্র। ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতাই হচ্ছে জ্ঞানের মূল। ইন্দ্রিয়ের বাইরে কোনো ভাবের সৃষ্টি সম্ভব নয়। এই নিছক অভিজ্ঞতাবাদের দুর্বলতা এই যে, এরূপ তত্ত্ব দ্বারা মানুষের মনের সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণ, অনুমান প্রভৃতি জটিল ক্ষমতার ব্যাখ্যা দান সম্ভব নয়। অভিজ্ঞতা জ্ঞানের উৎস বটে, কিন্তু ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতার স্তূপই জ্ঞানজগৎ নয়। মানুষের মন ইন্দ্রিয়লব্ধ অভিজ্ঞতাকে ভেঙেচুরে তার জটিল যোগবিয়োগ বস্তু জগতের জ্ঞান তৈরী করেন। মানুষের মনের এই ক্ষমতাকেও স্বীকার করতে হয়। না হলে জ্ঞান কেবল ইন্দ্রিয়ানুভূতির স্তূপে পর্যবসিত হয়।

ভাববাদী অভিজ্ঞতাবাদকে যুক্তিবাদ বলা হয়। ভাববাদের সমস্ত দার্শনিকই জ্ঞানের ব্যাপারে মূলত এই তত্ত্বকে অনুসরণ করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী বার্কলের ন্যায় ভাববাদীর মতে মনের বাইরে জ্ঞেয় বলে কিছু নেই। মনের ভাবই জ্ঞানের একমাত্র বস্তু। আবার কাণ্ট এবং হেগেলের ন্যায় ভাববাদীদের মতে বস্তুজগৎ আছে বটে, আর সে বস্তুজগৎ আমাদের ইন্দ্রিয়জ অনুভূতির সংশ্লেষণ, বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির সূত্র হচ্ছে স্থান, কাল, সম্পর্ক ইত্যাদি সূচক মনের এমত কতকগুলো ভাব যার উৎস হচ্ছে মানুষের অজ্ঞেয়, কিন্তু অনস্বীকার্য এবং অপরিহার্য এক সত্তা।[২]

যৌক্তিক অভিজ্ঞতাবাদ এবং যৌক্তিক প্রত্যক্ষবাদ বিংশ শতাব্দীতে বিশেষ প্রাধান্য পায়। উভয় মতবাদেই অভিজ্ঞতার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ প্রস্তাবনাই একমাত্র বিবেচ্য। তাই কোনও বিষয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরীক্ষিত না হলে অর্থহীন। সমাজতত্ত্ব ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে যেসব অভিজ্ঞতাবাদী লেখক ও তাত্ত্বিক আছেন তাঁদের এই রীতি মেনে চলতে হয়। গবেষণার কাজে লিপিবদ্ধ নথি অপেক্ষা সংশ্লিষ্ট স্থানে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ অধিক মূল্যবান। বলা হয়ে থাকে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তিতে বিশ্বাসী এই মতবাদ ফ্রান্সিস বেকন থেকে জন স্টুয়ার্ট মিল অবধি যুক্তরাজ্যের দর্শনচিন্তায় আধিপত্য করে।[৩]

আরো পড়ুন

চিত্রের ইতিহাস: তিনটি প্যানেল চিত্রে চিন্তা, ভালোবাসা এবং কাজে নেমে পড়ার ক্রম বোঝানো হয়েছে। চিত্র: Nevit Dilmen.

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ১৭ মে ২০১৯, রোদ্দুরে.কম, “অভিজ্ঞতাবাদ সমস্ত জ্ঞানের উৎস হিসেবে অভিজ্ঞতাকে বিবেচনা করে”, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/empiricism-2/
২. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ১৪৯-১৫০।
৩. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ২০।

Leave a Comment